সুরে-স্মৃতিতে প্রখ্যাত বাউল সুনীল কর্মকারকে স্মরণ

স্ট্রিম সংবাদদাতা
স্ট্রিম সংবাদদাতা
ময়মনসিংহ

প্রকাশ : ২৫ এপ্রিল ২০২৬, ০৮: ২২
‘সুনীল আলোয় বাউল সুর’-এ সুনীল কর্মকারকে স্মরণ। সংগৃহীত ছবি

ময়মনসিংহ নগরীতে সুরে-স্মৃতিতে স্মরণ করা হয়েছে উপমহাদেশের প্রখ্যাত বাউল সাধক সুনীল কর্মকারকে। তাঁর স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে উপস্থিত হয়েছিলেন বাউলপ্রেমী, তাঁর ভক্ত ও শ্রোতারা।

শুক্রবার (২৪ এপ্রিল) নগরের টাউন হল আঙিনায় অনুষ্ঠিত হয় ‘সুনীল আলোয় বাউল সুর’ শিরোনামে স্মরণায়োজন।

সরেজমিনে দেখা গেছে, বিকেল গড়াতেই শুরু হয় অনুষ্ঠানের মূল পর্ব। সুনীল কর্মকারের প্রিয় বাদ্যযন্ত্র বেহালার সম্মিলিত সুরে সূচনা—যা মুহূর্তেই ছুঁয়ে যায় উপস্থিত দর্শকদের হৃদয়। বেহালার সেই বিষণ্ন, বিরহী সুর যেন স্মৃতির দরজা খুলে দেয়; অনেকের চোখের কোণ ভিজে ওঠে অজান্তেই। এরপর সমবেত কণ্ঠে ভেসে ওঠে ‘এ বিশ্ব বাগানে’—গানটি যেন হয়ে ওঠে শ্রদ্ধা আর ভালোবাসার এক সম্মিলিত উচ্চারণ।

সন্ধ্যা নামার সঙ্গে সঙ্গে আয়োজন পায় অন্যমাত্রা। ৭টার দিকে শুরু হয় বাউল সাধক সুনীল কর্মকারের জীবন, দর্শন ও কর্ম নিয়ে আলোচনা পর্ব। এতে অংশ নেন বাউল সিরাজ উদ্দীন খান পাঠান, বাউল ফকির আবুল সরকার, শিল্পী ও গবেষক মৌসুমী ভৌমিক, লোকগবেষক ড. আব্দুর রহমান খোকনসহ অনেকে।

কলকাতার লোকশিল্পী ও গবেষক মৌসুমী ভৌমিক স্মৃতিচারণা করতে গিয়ে বলেন, ‘একবার উকিল মুন্সির গান সম্পর্কে জানার জন্য তিনি সুনীল কর্মকারের কাছে গিয়েছিলাম। বাইরে বসে থাকা অবস্থাতেই ভেসে আসে তাঁর কণ্ঠস্বর—যা আমাকে মুহিত করেছিল। চোখে আলো না থাকলেও তিনি ধ্বনির মধ্য দিয়ে ভুবনটাকে দেখেছেন—এই অনুভবের মধ্য দিয়েই আমি সুনীল কর্মকারের অন্তর্দৃষ্টির পরিচয় পাই প্রথম সাক্ষাতেই।’

লোকগবেষক ড. আব্দুর রহমান খোকন বলেন, বাহ্যিকভাবে দৃষ্টিহীন হলেও সুনীল কর্মকারের অন্তর্দৃষ্টি ছিল উন্মুক্ত ও গভীর। তিনি ছিলেন মা-মাটি-মানুষের শিল্পী। সত্যিকারের একজন মানুষের যেসব গুণাবলি থাকা প্রয়োজন, তার সবই ছিল তাঁর মধ্যে।

তিনি আরও বলেন, হাজারো মানুষের অংশগ্রহণই প্রমাণ করে—যারা মানুষের কথা বলে, মরমি সংগীতের কথা বলে, তারা মানুষের হৃদয়ে বেঁচে থাকেন চিরকাল। এটাই সুনীল কর্মকারের প্রকৃত সার্থকতা।

স্মরণ অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন ময়মনসিংহ সিটি করপোরেশনের প্রশাসক রুকুনোজ্জামান রোকন। তিনি বলেন, সুনীল কর্মকারের জীবন মানেই ছিল লোকসংগীতের প্রতি নিবেদন। এই সংস্কৃতিকে সমৃদ্ধ করা এবং নতুন প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দেওয়াই ছিল তাঁর সাধনা। যারা তাঁকে স্মরণ করেছেন, তারা কেবল দায়িত্বই পালন করেননি, বরং নিজেদের আরও মহৎ করে তুলেছেন।

আলোচনা শেষে আবারও জমে ওঠে সঙ্গীতের আসর। বাউল ফকির আবুল সরকার গেয়ে ওঠেন, ‘আসতো যদি প্রাণ বন্ধু, দুঃখ রইতো না...’ তার কণ্ঠে মঞ্চ যেন হয়ে ওঠে আবেগ আর মরমি সুরের এক অনন্য মেলবন্ধন।

রাত যত গভীর হয়, ততই গাঢ় হয় সুরের আবেশ। জালাল খাঁ ও লালনের গান ধ্বনিত হতে থাকে চারপাশে। দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আসা অর্ধশতাধিক শিষ্য ও ভক্ত সুরে সুরে, গানে গানে শ্রদ্ধা জানান প্রিয় সাধককে। সুর, স্মৃতি আর মানুষের ভালোবাসায় ভরপুর এই আয়োজন ছড়িয়ে দেয় এক অনির্বচনীয় মুগ্ধতা, যার রেশ থেকে যায় মধ্যরাত পেরিয়েও।

বাউল সুনীল কর্মকার স্মরণায়োজন কমিটির সদস্যসচিব শামীম আশরাফ বলেন, সুনীল কর্মকার শুধু একজন বাউল ছিলেন না; তিনি ছিলেন মানবপ্রেমী এক সাধকসত্তা এবং শান্তির পক্ষে প্রতিবাদী কণ্ঠ। তাঁর স্মরণে আয়োজিত এই অনুষ্ঠান কেবল শ্রদ্ধা নিবেদন নয়, বরং তাঁর দর্শন ও চেতনার বহিঃপ্রকাশও।

তিনি জানান, প্রচারবিমুখ এই মানুষটির জীবনদর্শনকেই সামনে রেখে আয়োজনের নাম রাখা হয়েছে ‘সুনীল আলোয় বাউল সুর’।

সম্পর্কিত