টানা মূল্যস্ফীতিতে শিক্ষাব্যয় মেটাতে হিমশিম

স্ট্রিম প্রতিবেদক
স্ট্রিম প্রতিবেদক
ঢাকা

প্রকাশ : ০৩ জুলাই ২০২৬, ২১: ৪৪
ছবি: সংগৃহীত

এ বছরের উচ্চমাধ্যমিক সার্টিফিকেট (এইচএসসি) পরীক্ষায় লাখো শিক্ষার্থী অংশ নিচ্ছে। কিন্তু পরীক্ষার চাপ শুধু শিক্ষার্থীদের নয়, তাদের পরিবারেরও। সন্তানকে এই পর্যায়ে পৌঁছতে মাসের পর মাস, এমনকি বছর আর্থিক লড়াই চালিয়ে যেতে হয়েছে। ক্রমাগত মূল্যস্ফীতির কারণে কোচিং, প্রাইভেট টিউশন, বই, যাতায়াতসহ ব্যয় বেড়েছে শিক্ষা খাতে। ফলে অনেক অভিভাবক সংসারের খরচ কমাচ্ছেন, সঞ্চয় ভাঙছেন, এমনকি ঋণও নিচ্ছেন।

অভিভাবকদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, একসময় মাসিক আয়ের তুলনায় শিক্ষাব্যয় ছিল একেবারেই কম। কিন্তু প্রাইভেট টিউশন, যাতায়াত, ইন্টারনেট ও শিক্ষা-উপকরণের ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় সেই খরচ এখন অনেকটাই বেড়ে গেছে। কেউ কেউ বলছেন, তাঁদের মাসিক আয়ের ৬০ শতাংশ পর্যন্ত সন্তানদের পড়াশোনার পেছনে ব্যয় হচ্ছে।

বৃহস্পতিবার তেজগাঁও সরকারি বিজ্ঞান কলেজ কেন্দ্রের বাইরে অপেক্ষমাণ অভিভাবক শিউলি বলেন, সন্তানদের পড়াশোনার খরচে যেন কোনো ঘাটতি না হয়, সে জন্য গত দুই বছর ধরে সংসারের প্রতিটি খাতে ব্যয় কমাতে হয়েছে। আমাদের দুই সন্তান। বড় ছেলে এ বছর ঢাকা কলেজ থেকে এইচএসসি পরীক্ষা দিচ্ছে। ছোট ছেলে চতুর্থ শ্রেণিতে পড়ে।

বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে কর্মরত শিউলি বলেন, তাঁর স্বামী ছোট একটি ব্যবসা করেন। দুজনের আয় থাকলেও সংসারের খরচ সামলাতে তাঁদের হিমশিম খেতে হচ্ছে।

তাঁর ভাষ্য, পরিবারের মোট মাসিক ব্যয়ের প্রায় ৪০ শতাংশই সন্তানদের শিক্ষার পেছনে চলে যায়। বড় ছেলের পড়াশোনার জন্য মাসে গড়ে ১৫ হাজার টাকা ব্যয় হয়। এর মধ্যে শুধু কোচিং ও প্রাইভেট শিক্ষকের পেছনেই খরচ হয় ১২ হাজার টাকা।

এই বাড়তি ব্যয়ের চাপ সামলাতে তাঁরা ভাড়া বাসার তিনটি কক্ষের একটি কক্ষ সাবলেট দিয়েছেন।

দেশের বিভিন্ন এলাকার পরিবারগুলোর সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, কয়েক বছর ধরে চলা মূল্যস্ফীতিতে ক্রয়ক্ষমতা কমে যাওয়ায় শিক্ষার বাড়তি ব্যয় বহন করা দিন দিন কঠিন হয়ে উঠছে।

২০২২ সালের মাঝামাঝি থেকে ক্রমাগত মূল্যস্ফীতির কবলে পড়ে দেশ। তখন থেকে প্রতি মাসে দাম বৃদ্ধির গড় হার ৮ শতাংশেরও বেশি। ২০২৪ সালের মাঝামাঝি সময়ে মূল্যস্ফীতি তীব্রভাবে বৃদ্ধি পায়। তখন ১০ শতাংশের ওপরে ওঠার পর পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি হলেও, এটি ভোক্তাদের জন্য একটি বড় উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। চলতি বছরের মে মাসে সার্বিক মূল্যস্ফীতি ১৬ মাসের মধ্যে সর্বোচ্চ ৯ দশমিক ৪২ শতাংশে পৌঁছেছে।

একই সঙ্গে আরেকটি বড় উদ্বেগের বিষয় হলো, টানা ৫০ মাস ধরে মজুরি বৃদ্ধির হার মূল্যস্ফীতির চেয়ে কম।

ঢাকা কলেজের আরেক পরীক্ষার্থীর বাবা আবদুর রহমান বলেন, তিনি ও তাঁর স্ত্রী নোয়াখালীর একটি বেসরকারি হাসপাতালে প্যাথোলজিস্ট হিসেবে কাজ করেন। তাঁদের মেয়ে একটি কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ছেন।

তিনি বলেন, দুই সন্তানের পড়াশোনার পেছনে এখন মাসে ৩০ থেকে ৩৫ হাজার টাকা ব্যয় করতে হচ্ছে। ফলে সংসারের অন্যান্য খাতের খরচ কমাতে বাধ্য হচ্ছেন তিনি।

আরেক অভিভাবক তাঁতীবাজারের বাসিন্দা পান্না ধর বলেন, তাঁদের মাসিক আয়ের প্রায় অর্ধেকই সন্তানদের শিক্ষার পেছনে ব্যয় হয়। তাঁর স্বামী রুপার ব্যবসা করেন। ঢাকায় নিজেদের বাড়িতে থাকি, উচ্চ-মধ্যবিত্ত পরিবার আমাদের। তারপরও তিন মেয়ের পড়াশোনার খরচ বহন করতে হিমশিম খেতে হচ্ছে।

সরকারি কর্মকর্তা জিএম আমানত বলেন, গত বছর সন্তানদের পড়াশোনার ব্যয় মেটাতে তাঁকে সঞ্চয় ভাঙতে হয়েছে। এমনকি ব্যাংক ঋণও নিতে হয়েছে।

তবে ব্যবসায়ী শহিদুল ইসলাম মনে করেন, যথাযথ পরিকল্পনা ও সঠিক ব্যবস্থাপনা থাকলে পরিস্থিতি সামাল দেওয়া সম্ভব। তিনি বলেন, এখন অনলাইনে বিনামূল্যে অনেক শিক্ষামূলক ভিডিও ও পড়াশোনার উপকরণ পাওয়া যায়। সন্তানদের পড়াশোনার ব্যয় নিয়ে অভিভাবকেরা সব সময়ই চাপে ছিলেন। এতে নতুন কিছু নেই।

তবে অধিকাংশ অভিভাবক এ ধরনের বক্তব্যের সঙ্গে একমত নন। আসলাম নামের এক বাবা বাবা বলেন, সন্তানদের পড়াশোনার জন্য অভিভাবকেরা সবকিছুই করতে প্রস্তুত। তাঁর নিজের আয়ের ৬০ শতাংশই এ খাতে ব্যয় হয়।

তিনি বলেন, নিজেরা না খেয়ে থাকলেও সন্তানদের পড়াশোনার খরচ আমাদের দিতেই হবে।

তিনি আরও বলেন, পরিবারের ওপর অতিরিক্ত ব্যয়ের চাপ কমাতে সরকারের উচিত বিদ্যালয়ের শিক্ষার মান উন্নয়নে কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া। বিদ্যালয়ে শিক্ষকরা যদি ঠিকভাবে পড়াতেন, তাহলে অতিরিক্ত খরচের প্রয়োজন হতো না।

সরকারি সহায়তা, শ্রেণিকক্ষভিত্তিক মানসম্মত শিক্ষা, সাশ্রয়ী মূল্যের শিক্ষা-উপকরণ এবং কোচিংনির্ভরতা কমানোর উদ্যোগও শিক্ষাব্যয় কমাতে সহায়ক হতে পারে বলে তিনি মনে করেন।

২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে বাংলাদেশ ব্যাংক মূল্যস্ফীতি ৭ দশমিক ৫ শতাংশে নামিয়ে আনার লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে। তবে এতে মানুষের উদ্বেগ খুব একটা কমেনি। বিশেষ করে কেন্দ্রীয় ব্যাংক অতীতেও বারবার নির্ধারিত লক্ষ্য অর্জনে ব্যর্থ হয়েছে।

বিদায়ি অর্থবছরেও মূল্যস্ফীতি নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে বেশি থাকার আশঙ্কা রয়েছে। সে ক্ষেত্রে টানা ৬ বছর কেন্দ্রীয় ব্যাংক লক্ষ্য পূরণ করতে পারেনি। জ্বালানি, বিদ্যুৎ, খাদ্য সরবরাহ ও বাজার ব্যবস্থাপনায় কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে কেন্দ্রীয় ব্যাংক যে লক্ষ্যই নির্ধারণ করুক না কেন, মূল্যস্ফীতির চাপ দ্রুত কমবে না।

কয়েক সপ্তাহের মধ্যে এইচএসসি পরীক্ষা শেষ হবে। কিন্তু হাজারো পরিবারের আর্থিক পরীক্ষার শেষ হবে না।

দৈনন্দিন বাজার খরচ, বাড়িভাড়া, বিদ্যুৎ বিল এবং সন্তানদের শিক্ষাব্যয় সামলাতে গিয়ে অনেক পরিবারকে কঠিন সিদ্ধান্ত নিতে হচ্ছে। তবে একটি বিষয়ে তাঁরা কোনো আপস করতে চান না—সন্তানদের ভবিষ্যৎ।

Ad 300x250
সর্বাধিক পঠিত

সম্পর্কিত