বাহাত্তরের সংবিধান ও রাষ্ট্রপতির অতীত ভূমিকা নিয়ে সংসদে নাহিদ ইসলামের তোপ

স্ট্রিম প্রতিবেদক
স্ট্রিম প্রতিবেদক
ঢাকা

প্রকাশ : ৩০ এপ্রিল ২০২৬, ১৪: ৪৫
সংসদে বক্তব্য দিচ্ছেন নাহিদ ইসলাম। ছবি: সংগৃহীত।

জাতীয় সংসদে রাষ্ট্রপতির ভাষণের ওপর আনা ধন্যবাদ প্রস্তাবের আলোচনায় অংশ নিয়ে সরকারের বিভিন্ন নীতি, রাষ্ট্রপতির অতীত কর্মকাণ্ড এবং বাহাত্তরের সংবিধানের কঠোর সমালোচনা করেছেন জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আহ্বায়ক ও বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ নাহিদ ইসলাম।

আজ বৃহস্পতিবার (৩০ এপ্রিল) সংসদে দেওয়া এক দীর্ঘ বক্তব্যে তিনি বর্তমান রাষ্ট্রপতি শাহাবুদ্দিনের অপসারণ দাবি করেন এবং দেশের বিদ্যমান রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সংকটের জন্য সংবিধান ও ক্ষমতাসীনদের নীতিকে দায়ী করেন।

বক্তব্যের একটি বড় অংশ জুড়ে ছিল রাষ্ট্রপতি শাহাবুদ্দিন চুপ্পুর সমালোচনা। নাহিদ ইসলাম রাষ্ট্রপতিকে লক্ষ্য করে বলেন, ‘গাধাকে দিয়ে হালচাষ করিয়ে কোনো বাহাদুরি নেই। যে ব্যক্তি অতীতে জিয়াউর রহমানের বিরোধিতা করেছেন, আজ তিনি স্বার্থসিদ্ধির জন্য তাঁর প্রশংসা করছেন।’

তিনি রাষ্ট্রপতির অতীত কর্মকাণ্ড তুলে ধরে বলেন, শাহাবুদ্দিন চুপ্পু যখন দুদকের কমিশনার ছিলেন, তখন তাঁকে তিনটি বিশেষ এসাইনমেন্ট দেওয়া হয়েছিল: খালেদা জিয়া ও তারেক রহমানের শাস্তি নিশ্চিত করা; পদ্মা সেতুর দুর্নীতি থেকে আওয়ামী লীগকে মুক্তি দেওয়া এবং শেখ হাসিনাসহ আওয়ামী লীগ নেতাদের দুর্নীতির মামলা বাতিল করা।

নাহিদ ইসলাম আরও অভিযোগ করেন, ২০০১ সালের নির্বাচন-পরবর্তী হিন্দু নির্যাতনের তদন্তে গঠিত একটি কমিশনের প্রধান হিসেবে তিনি ২৬ হাজার বিএনপি নেতাকর্মীকে দায়ী করে একপাক্ষিক রিপোর্ট দিয়েছিলেন, যা আওয়ামী লীগ আন্তর্জাতিকভাবে প্রচার করেছিল। এ ছাড়াও এস আলম গ্রুপের হাতে ইসলামী ব্যাংক তুলে দেওয়ার নেপথ্য কারিগর হিসেবেও তিনি রাষ্ট্রপতিকে অভিযুক্ত করেন এবং জুলাই গণহত্যার সময় ফ্যাসিবাদের দোসর হিসেবে তাঁর ভূমিকার সমালোচনা করে অবিলম্বে তাঁর গ্রেপ্তার ও অপসারণ দাবি করেন।

সংবিধান প্রসঙ্গে নাহিদ ইসলাম তাঁর বক্তব্যে বলেন, ‘বাহাত্তরের সংবিধানকে একাত্তরের চেতনার ফসল বলা একটি বড় শুভঙ্করের ফাঁকি। একাত্তরের আদর্শ ছিল সাম্য, মানবিক মর্যাদা ও সামাজিক ন্যায়বিচার। কিন্তু বাহাত্তরের সংবিধানে আমদানিকৃত "চার নীতি" মূলত মুজিববাদী আদর্শের প্রতিফলন।’ তিনি আরও বলেন, এই সংবিধান রচনার কোনো নৈতিক অধিকার ওই পরিষদের ছিল না, কারণ তাঁরা পাকিস্তানের শাসনতন্ত্র রচনার জন্য আইয়ুব খানের অধীনে নির্বাচিত হয়েছিলেন। নাহিদ ইসলামের মতে, বাহাত্তরের সংবিধানটি ছিল অগণতান্ত্রিক। একজনের হাতে সকল ক্ষমতা কুক্ষিগত করার মাধ্যমেই বাংলাদেশে স্বৈরতন্ত্রের বীজ বপন করা হয়েছিল। সেই বিষবৃক্ষের ফল আজ আমরা ভোগ করছি।

দেশের ব্যাংকিং ও আর্থিক খাতের বিশৃঙ্খলা নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেন নাহিদ ইসলাম। তিনি অর্থমন্ত্রীর বক্তব্যের সমালোচনা করে বলেন, ‘মাননীয় অর্থমন্ত্রী বারবার দাবি করেন বিএনপির সময়ে আর্থিক খাতে বিশৃঙ্খলা হয়েছে, কিন্তু বর্তমান সরকারের আমলের চিত্র ভয়াবহ। তিনি অস্বীকার করেছেন যে বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর একটি রাজনৈতিক নিয়োগ। অথচ আমরা জানি, তিনি তাঁদের দলের নির্বাচন কমিটির সদস্য ছিলেন।’

ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) তথ্য উদ্ধৃত করে নাহিদ ইসলাম বলেন, বর্তমান সরকারি দলের ৫৯.৪১ শতাংশ নির্বাচনী প্রার্থী ঋণগ্রস্ত, যাঁদের বেশিরভাগই ক্ষমতাসীন দলের। তিনি জানান, সংসদ সদস্যদের মোট ঋণের পরিমাণ ১১ হাজার কোটি টাকারও বেশি। তিনি অভিযোগ করেন, বাংলাদেশ ব্যাংকের বর্তমান গভর্নরকে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে শুধুমাত্র প্রভাবশালী ব্যবসায়ীদের হাজার হাজার কোটি টাকার ঋণ পুনতফসিল করার বিশেষ সুবিধা দেওয়ার জন্য। বাংলাদেশের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো একজন ব্যবসায়ীকে গভর্নরের চেয়ারে বসানো হয়েছে শুধুমাত্র লুটেরাদের রক্ষার জন্য।

জুলাই গণ-অভ্যুত্থানকে কোনো একক দলের অর্জন হিসেবে মানতে নারাজ নাহিদ ইসলাম। তিনি বলেন, ‘এই অভ্যুত্থান সাধারণ মানুষের, ছাত্রদের। কোনো রাজনৈতিক দল এর কৃতিত্ব নিতে চাইলে তা হবে শহীদদের সাথে বিশ্বাসঘাতকতা।’ তিনি বিএনপি নেতাদের হীনমন্যতা ত্যাগ করার আহ্বান জানিয়ে বলেন, আন্দোলনের সময় তাঁরা পাশে ছিলেন, কিন্তু নেতৃত্বে ছিল সাধারণ ছাত্র-জনতা।

‘জুলাই জাতীয় সনদ’ নিয়ে নাহিদ বলেন, ‘বিএনপি এই সনদকে একটি অন্তহীন প্রতারণার দলিলে পরিণত করেছে। সনদের মূল সংস্কার প্রস্তাবগুলোর পাশে "নোট অব ডিসেন্ট" দিয়ে তাঁরা আসলে নিজেদের দলীয় ইশতেহার চাপিয়ে দিতে চান। যদি নির্বাচনে জিতে সবাই নিজের ইশতেহারই বাস্তবায়ন করবে, তবে এই জাতীয় ঐক্যের বা সনদের মূল্য কী?’

নাহিদ ইসলাম তাঁর বক্তব্যে জুলাই-আগস্ট অভ্যুত্থানে নিজের ওপর হওয়া রাষ্ট্রীয় নির্যাতনের স্মৃতিচারণ করেন। তিনি বলেন, ‘আমাকে ডিবি, ডিজিএফআই এবং এসবি ইন্টারোগেশন করেছে। তারা আমাকে টর্চার করে একটি কথা-ই বলানোর চেষ্টা করেছে যে, এই আন্দোলন বিএনপি-জামায়াতের। কিন্তু আমরা জীবন দিলেও মিথ্যা বলিনি। আমরা কখনো ফ্যাসিবাদবিরোধী রাজনৈতিক দলের অস্তিত্ব অস্বীকার করিনি, কিন্তু এই অভ্যুত্থানকে দলীয় রং দেওয়ার অপচেষ্টাকে রুখে দিয়েছি।’

পররাষ্ট্রনীতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে নাহিদ ইসলাম বলেন, এই সরকার আসার পর ভারতের সাথে সম্পর্কের নামে জাতীয় স্বার্থ বিকিয়ে দেওয়ার একটি প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। সরকার ভারতের সাথে কী করতে যাচ্ছে তার কিছুই বোঝা যাচ্ছে না। বর্তমান সরকার কি আওয়ামী লীগের মতোই ভারতের সাথে সম্পর্ক রাখতে চায় নাকি নতুনভাবে সম্পর্ক উন্নয়ন করতে চায়, সেটি জনগণের কাছে খোলাসা করা দরকার।

বক্তব্যের এক পর্যায়ে বিগত সময়ে জামায়াতের সাথে বিএনপির জোটসঙ্গী থাকা নিয়ে কথা বলেন নাহিদ। তিনি বলেন, গত ৫০ বছর ধরে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে-বিপক্ষের রাজনীতির নামে জাতিকে বিভক্ত করে রাখা হয়েছে। ‘সাথে থাকলে সঙ্গী, না থাকলে জঙ্গি’—এই সস্তা রাজনীতির অবসান করতে হবে। এভাবে জাতিকে বিভক্ত রাখা যাবে না।

সর্বাধিক পঠিত

সম্পর্কিত