লেখা:

এপ্রিলের ২৮ তারিখ, ২০২৬। রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রে পারমাণবিক জ্বালানি বা ইউরেনিয়াম লোডিং শুরু হয়েছে। তবে নিরাপত্তা ঝুঁকি, বিপুল অর্থনৈতিক দায় এবং পরিবেশগত উদ্বেগের জায়গাগুলো রয়েই গেছে। একটি পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র কেবল একটি অবকাঠামো নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে থাকে প্রজন্মের পর প্রজন্মের অস্তিত্বের প্রশ্ন। তাই উদ্বেগগুলো উড়িয়ে দেয়া যায় না।
যেকোনো উন্নয়ন প্রকল্পেই ঝুঁকি থাকে, কিন্তু পারমাণবিক ঝুঁকির সমীকরণ সম্পূর্ণ ভিন্ন। উদাহরণস্বরূপ, একটি বিমান দুর্ঘটনা ঘটলে তা যদি কোন অজানা বা আশাতীত কারণে ঘটে তাহলে হাজারটি স্বাভাবিক ঘটনার মধ্যে একটি হিসেবে গণ্য হয়। কিন্তু পারমাণবিক দুর্ঘটনার ক্ষেত্রে ইতিহাস আমাদের ভিন্ন চিত্র দেয়। চেরনোবিল ও ফুকুশিমার মতো দুর্ঘটনাগুলো প্রমাণ করেছে যে, পারমাণবিক বিকিরণের প্রভাব কতটা ভয়াবহ হতে পারে। এর ফলে কেবল তাৎক্ষণিক প্রাণহানিই ঘটে না; বরং বিশাল এলাকার মানুষ তেজস্ক্রিয়তার শিকার হয়, বিকলাঙ্গ শিশুর জন্ম হয় এবং প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে সেই অভিশাপ বয়ে বেড়াতে হয়।
পারমাণবিক শক্তির এই ভয়াবহতার কথা উপলব্ধি করেই বর্তমানে সারা পৃথিবী এই প্রযুক্তি থেকে মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছে। জার্মানি এবং ফ্রান্সের মতো উন্নত দেশগুলো, যারা পারমাণবিক শক্তির ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল হয়ে উঠেছিল, তারা এখন ইউরোপের গ্রিন মুভমেন্টের চাপে নিউক্লিয়ার থেকে সরে আসার ব্যাপারে পরিকল্পনা করেছে। এর প্রধান কারণ হলো দুর্ঘটনার ঝুঁকি ও পারমাণবিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনার অনিশ্চয়তা। এই বর্জ্যের তেজস্ক্রিয়তা হাজার হাজার বছর ধরে সক্রিয় থাকে এবং আজ পর্যন্ত পৃথিবীর কোনো দেশ এর শতভাগ নিরাপদ ব্যবস্থাপনা আবিষ্কার করতে পারেনি। এই বর্জ্য যদি কোনোভাবে পরিবেশ বা খাদ্যচক্রের সঙ্গে মিশে যায়, তবে তা পুরো প্রতিবেশ ব্যবস্থাকে ধ্বংস করে দিতে পারে।
সারা পৃথিবীতেই নতুন পারমাণবিক বিদ্যুৎ উৎপাদনের প্রবৃদ্ধি নিম্নমুখী। ২০২৫ সালে নতুন ২৯৫৬ মেগাওয়াট নতুন উৎপাদন ক্ষমতা যুক্ত হয়েছে, এর সাথে বন্ধ হয়েছে ২৮২৩ মেগাওয়াট। অর্থাৎ মাত্র ১৩৩ মেগাওয়াট নতুন যুক্ত হয়েছে। রাশিয়া, ভারত ও চায়নায় নতুন রিঅ্যাক্টর যুক্ত হয়েছে, অন্যদিকে বেলজিয়াম ও তাইওয়ানের পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র বন্ধ হয়েছে। বিশ্বজুড়ে নিম্নমুখী প্রবৃদ্ধির মূল কারণ বিকল্প সস্তা জ্বালানি (নবায়নযোগ্য) ব্যবহার করে, অল্প সময়ে আরও সহজে বিদ্যুৎ উৎপাদন করা যায়। নিউক্লিয়ার আরও ব্যয়বহুল হয়েছে। দুর্ঘটনা ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনার ঝুঁকি বিবেচনা করলে নিউক্লিয়ার প্রযুক্তি সময় সাপেক্ষ এবং জটিল। আশ্চর্যের বিষয় হলো, ঠিক যে সময়ে উন্নত বিশ্ব নিউক্লিয়ার প্রযুক্তি থেকে সরে আসছিল, বাংলাদেশ ঠিক সেই সময়েই এই পথে হাঁটা শুরু করে।
প্রশ্ন হল কেন বাংলাদেশের মত একটি উন্নয়নশীল দেশ যার স্বাস্থ্য ও শিক্ষা খাতে বিনিয়োগের অর্থের ঘাটতি হয় তাকে এই ব্যয়বহুল প্রকল্প নির্মাণ করতে হবে? তাও এমন একটি সময় যখন নবায়নযোগ্য জ্বালানির খরচ দিনে দিনে কমে এসেছে। বাংলাদেশের ক্ষমতাসীনরা পারমাণবিক মর্যাদার একটি বিভ্রান্তিকর সংজ্ঞা মানুষের কাছে হাজির করেছে। একটি বড় ব্যয়বহুল স্থাপনা যেই চাকচিক্য প্রদর্শন করে বা উন্নত দেশের নিউক্লিয়ার ক্লাবে প্রবেশের সক্ষমতা যেই মর্যাদা বা “প্রেস্টিজের” বিষয় হিসাবে সামনে আসে, তার একটি রাজনৈতিক মূল্য তৈরি হয়। এই রাজনৈতিক মূল্যের ভাগীদার হতে চায় রাজনৈতিক দলগুলো। কিন্তু দুর্ঘটনা ঘটলে সবার আগে এই দলগুলোই দুর্ঘটনার দায়কে যে অস্বীকার করতে পারে সেই সম্ভাবনা উড়িয়ে দেয়া যায় না।
রূপপুর প্রকল্পের ব্যয়ভার নিয়ে শুরু থেকেই বিতর্ক ছিল। পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের কস্ট বা ব্যয় হিসাব করার একটি নির্দিষ্ট ধরন আছে। বলা হয়, একটি কেন্দ্র ৬০ বছর ধরে চললে এর জ্বালানি ও পরিচালন ব্যয় তুলনামূলক কম হয়। কিন্তু দীর্ঘ মেয়াদে একটি নির্দিষ্ট জ্বালানির ওপর নির্ভরশীলতা, ভূ-রাজনৈতিক ঝুঁকি এবং বর্জ্য ব্যবস্থাপনার খরচ হিসাব করলে এই প্রযুক্তি মোটেও সস্তা নয়। পরিচালন ব্যয়, ডিকমিশনিংয়ের খরচ যুক্ত করলে ব্যয় অনেক বেশি, যা দাম প্রচারের সময় হিসাব করা হয় না।
প্রকল্প নিয়ে ২০০৯ সালে যখন আলোচনা হচ্ছিল, তখন এর ব্যয় ধরা হয়েছিল ৩-৪ বিলিয়ন ডলারের মধ্যে। এরপর বারবার সময়ক্ষেপণ এবং নানা কারণে ২০১৭ সালে যখন এটি চূড়ান্তভাবে অনুমোদন পায়, তখন এর ব্যয় দাঁড়ায় প্রায় ১২.৬৫ বিলিয়ন ডলারে। আর বর্তমানে এই খরচ গিয়ে ঠেকেছে ১৩.৩৫ বিলিয়ন ডলারের ওপর। দেরির কারণে এই আপফ্রন্ট কস্ট বা প্রাথমিক খরচ আকাশচুম্বী হয়েছে।
অথচ বিগত এক দশকে সারা বিশ্বে সৌর ও বায়ুবিদ্যুতের মতো নবায়নযোগ্য জ্বালানির খরচ অভাবনীয় হারে কমেছে। ২০১০-২০২০ সময়কালে বাংলাদেশ যদি এই বিপুল পরিমাণ অর্থ পারমাণবিক কেন্দ্রে বিনিয়োগ না করে সমন্বিতভাবে সৌর ও বায়ুবিদ্যুতে বিনিয়োগ করত, তবে রূপপুরের ২৪০০ মেগাওয়াটের চেয়েও অনেক বেশি পরিমাণ বিদ্যুৎ আমরা উৎপাদন করতে পারতাম। নবায়নযোগ্য জ্বালানির প্রাথমিক খরচ থাকলেও ১৫-২০ বছর মেয়াদে এর উৎপাদন ব্যয় অনেক কম এবং এটি সম্পূর্ণ ঝুঁকিমুক্ত।
রূপপুর প্রকল্পের সবচেয়ে বড় উদ্বেগের জায়গা হলো এর বিপুল বিদেশি ঋণ। এই প্রকল্পের ব্যয়ের প্রায় ৯০ শতাংশই আসছে রাশিয়ার কাছ থেকে ঋণ হিসেবে। একসময় এই ঋণটি ছিল বাংলাদেশের মোট বৈদেশিক ঋণের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ। এত বিপুল অঙ্কের একটি একক ঋণ দেশের সামগ্রিক অর্থনীতির ওপর মারাত্মক চাপ সৃষ্টি করবে। আগামী ২০২৮ সাল থেকে এই ঋণের আসল ও সুদ পরিশোধ শুরু করতে হবে, যা অন্তত ২০ বছর ধরে চলবে। যদিও বলা হচ্ছে এই ঋণ ইউয়ান বা রাশিয়ান মুদ্রায় পরিশোধ করা যাবে, তবুও দেশের রিজার্ভ থেকে এই বিপুল পরিমাণ অর্থের জোগান দেওয়া অর্থনীতির জন্য একটি বড় ধাক্কা হবে।
পাশাপাশি, এককভাবে একটি দেশের ওপর এত বড় প্রযুক্তিগত ও আর্থিক নির্ভরতা আমাদের জন্য ভূ-রাজনৈতিক চাপের কারণ হতে পারে কিনা, সেই শঙ্কাও উড়িয়ে দেওয়া যায় না। বিশেষজ্ঞদের মতে, বাংলাদেশের মতো দেশে রাশিয়ার এই বিনিয়োগ কেবল বাণিজ্যিক নয়, বরং এই অঞ্চলে নিজেদের ভূ-রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সম্প্রসারণের একটি কৌশলগত চাল।
চুক্তি অনুযায়ী, বাংলাদেশ নিজেরা কেন্দ্রটি পরিচালনার সক্ষমতা অর্জন করার পর রাশিয়া এর দায়িত্ব হস্তান্তর করবে। কিন্তু বাংলাদেশ কবে সেই পূর্ণ সক্ষমতা অর্জন করবে, তার কোনো সুনির্দিষ্ট রূপরেখা নেই। পারমাণবিক প্রযুক্তির রক্ষণাবেক্ষণ, কুলিং সিস্টেম ম্যানেজমেন্ট এবং বর্জ্য ব্যবস্থাপনার মতো জটিল কাজগুলো করার মতো দক্ষ জনবল আমাদের এখনও সেভাবে তৈরি হয়নি।
কেবল কিছু তাত্ত্বিক প্রশিক্ষণ নিলেই একটি নিউক্লিয়ার প্ল্যান্ট চালানোর সক্ষমতা আসে না, এর জন্য প্রয়োজন দীর্ঘদিনের বাস্তব অভিজ্ঞতা। সবচেয়ে দুঃখজনক বিষয় হলো, জনবল নিয়োগের ক্ষেত্রেও আমরা স্বচ্ছতার অভাব দেখেছি। বিভিন্ন সময়ে গণমাধ্যমে প্রতিবেদন এসেছে যে, যোগ্যতা ও মেধার ভিত্তিতে নয়, বরং আত্মীয়করণ, অনিয়ম ও দুর্নীতির মাধ্যমে অনেককে এই প্রকল্পে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। এমন একটি স্পর্শকাতর প্রকল্পে নিয়োগ বা ব্যবস্থাপনায় অস্বচ্ছতা ও জবাবদিহির অভাব পুরো দেশের জন্য অশনিসংকেত।
রূপপুর প্রকল্প পাবনার মতো একটি ঘনবসতিপূর্ণ এবং কৃষিপ্রধান অঞ্চলে অবস্থিত। পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপনের আন্তর্জাতিক নিয়মানুযায়ী, প্ল্যান্টের চারপাশের কয়েক মাইল এলাকাকে প্রিকশনারি অ্যাকশন জোন হিসেবে নির্ধারণ করতে হয়, যেন কোনো দুর্ঘটনা ঘটলে দ্রুত মানুষকে সরিয়ে নেওয়া যায়। কিন্তু রূপপুরের আশপাশে যেভাবে মানুষের বসবাস, তাতে কোনো জরুরি পরিস্থিতিতে এই বিপুলসংখ্যক মানুষকে নিরাপদে সরিয়ে নেওয়ার সক্ষমতা বা পরিকল্পনার ঘাটতি রয়েছে।
প্রকল্পের নির্মাণকাজ চলার সময় একটি সাধারণ দুর্ঘটনায় আহত কর্মীকে স্থানীয় কোনো হাসপাতালে চিকিৎসা দেওয়া সম্ভব হয়নি, তাকে রাজশাহীতে নিতে হয়েছিল। এখান থেকেই বোঝা যায়, বড় কোনো বিপর্যয় ঘটলে স্থানীয় পর্যায়ে চিকিৎসা বা শেল্টারের ন্যূনতম কোনো প্রস্তুতি সেখানে নেই।
পারমাণবিক দুর্ঘটনার সঙ্গে কেবল প্রযুক্তি নয়, সমাজ ও সংস্কৃতিরও নিবিড় সম্পর্ক রয়েছে। আমাদের সমাজে ঝুঁকি সম্পর্কে মানুষের ধারণা বা 'রিস্ক পারসেপশন' অত্যন্ত দুর্বল। আমরা সাধারণত দুর্ঘটনা ঘটার পর সচেতন হই। তাও অল্প কিছুদিনের জন্য। চেরনোবিল বা থ্রি মাইল আইল্যান্ডের মতো দুর্ঘটনাগুলো কিন্তু বিশাল কোনো কারিগরি ত্রুটির কারণে ঘটেনি; বরং ছোটখাটো ক্রেন বিকল হওয়া, দুর্ঘটনার কারণ আগে থেকে বুঝতে না পারার কারণে ঘটেছিল। আমাদের দেশের সাধারণ কর্মপরিবেশ ও গা-ছাড়া মনোভাবের কারণে এখানে মানবসৃষ্ট ভুলের আশঙ্কা অনেক বেশি।
প্রকল্পটি যেহেতু চূড়ান্ত পর্যায়ে চলে এসেছে, তাই এখন আর একে বাতিল বা উল্টো পথে হাঁটার আগ্রহ রাজনৈতিক মহলের নেই। এর আগে উদাহরণ আছে কিছু বিদ্যুতকেন্দ্র এত ব্যয় করার পরও ত্রুটি থাকার কারণে বন্ধ করে দিতে হয়েছে। যেমন বুলগেরিয়ার একটি বিদ্যুতকেন্দ্র বন্ধ করা হয়েছিল ২০০৪ সালে, একটি ২০০৬ সালে। বাংলাদেশের ক্ষেত্রে কী হয় তা দেখার বিষয়। তবে এখন সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন কঠোর নজরদারি। যতদিন এই কেন্দ্রটি থাকবে, ততদিন আমাদের এই নিরাপত্তা উদ্বেগগুলো নিয়ে সজাগ থাকতে হবে।
ড. মোশাহিদা সুলতানা: অর্থনীতির সহযোগী অধ্যাপক, একাউন্টিং বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়; বিদ্যুৎ ও জ্বালানি বিষয়ক গবেষক।

এপ্রিলের ২৮ তারিখ, ২০২৬। রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রে পারমাণবিক জ্বালানি বা ইউরেনিয়াম লোডিং শুরু হয়েছে। তবে নিরাপত্তা ঝুঁকি, বিপুল অর্থনৈতিক দায় এবং পরিবেশগত উদ্বেগের জায়গাগুলো রয়েই গেছে। একটি পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র কেবল একটি অবকাঠামো নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে থাকে প্রজন্মের পর প্রজন্মের অস্তিত্বের প্রশ্ন। তাই উদ্বেগগুলো উড়িয়ে দেয়া যায় না।
যেকোনো উন্নয়ন প্রকল্পেই ঝুঁকি থাকে, কিন্তু পারমাণবিক ঝুঁকির সমীকরণ সম্পূর্ণ ভিন্ন। উদাহরণস্বরূপ, একটি বিমান দুর্ঘটনা ঘটলে তা যদি কোন অজানা বা আশাতীত কারণে ঘটে তাহলে হাজারটি স্বাভাবিক ঘটনার মধ্যে একটি হিসেবে গণ্য হয়। কিন্তু পারমাণবিক দুর্ঘটনার ক্ষেত্রে ইতিহাস আমাদের ভিন্ন চিত্র দেয়। চেরনোবিল ও ফুকুশিমার মতো দুর্ঘটনাগুলো প্রমাণ করেছে যে, পারমাণবিক বিকিরণের প্রভাব কতটা ভয়াবহ হতে পারে। এর ফলে কেবল তাৎক্ষণিক প্রাণহানিই ঘটে না; বরং বিশাল এলাকার মানুষ তেজস্ক্রিয়তার শিকার হয়, বিকলাঙ্গ শিশুর জন্ম হয় এবং প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে সেই অভিশাপ বয়ে বেড়াতে হয়।
পারমাণবিক শক্তির এই ভয়াবহতার কথা উপলব্ধি করেই বর্তমানে সারা পৃথিবী এই প্রযুক্তি থেকে মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছে। জার্মানি এবং ফ্রান্সের মতো উন্নত দেশগুলো, যারা পারমাণবিক শক্তির ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল হয়ে উঠেছিল, তারা এখন ইউরোপের গ্রিন মুভমেন্টের চাপে নিউক্লিয়ার থেকে সরে আসার ব্যাপারে পরিকল্পনা করেছে। এর প্রধান কারণ হলো দুর্ঘটনার ঝুঁকি ও পারমাণবিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনার অনিশ্চয়তা। এই বর্জ্যের তেজস্ক্রিয়তা হাজার হাজার বছর ধরে সক্রিয় থাকে এবং আজ পর্যন্ত পৃথিবীর কোনো দেশ এর শতভাগ নিরাপদ ব্যবস্থাপনা আবিষ্কার করতে পারেনি। এই বর্জ্য যদি কোনোভাবে পরিবেশ বা খাদ্যচক্রের সঙ্গে মিশে যায়, তবে তা পুরো প্রতিবেশ ব্যবস্থাকে ধ্বংস করে দিতে পারে।
সারা পৃথিবীতেই নতুন পারমাণবিক বিদ্যুৎ উৎপাদনের প্রবৃদ্ধি নিম্নমুখী। ২০২৫ সালে নতুন ২৯৫৬ মেগাওয়াট নতুন উৎপাদন ক্ষমতা যুক্ত হয়েছে, এর সাথে বন্ধ হয়েছে ২৮২৩ মেগাওয়াট। অর্থাৎ মাত্র ১৩৩ মেগাওয়াট নতুন যুক্ত হয়েছে। রাশিয়া, ভারত ও চায়নায় নতুন রিঅ্যাক্টর যুক্ত হয়েছে, অন্যদিকে বেলজিয়াম ও তাইওয়ানের পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র বন্ধ হয়েছে। বিশ্বজুড়ে নিম্নমুখী প্রবৃদ্ধির মূল কারণ বিকল্প সস্তা জ্বালানি (নবায়নযোগ্য) ব্যবহার করে, অল্প সময়ে আরও সহজে বিদ্যুৎ উৎপাদন করা যায়। নিউক্লিয়ার আরও ব্যয়বহুল হয়েছে। দুর্ঘটনা ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনার ঝুঁকি বিবেচনা করলে নিউক্লিয়ার প্রযুক্তি সময় সাপেক্ষ এবং জটিল। আশ্চর্যের বিষয় হলো, ঠিক যে সময়ে উন্নত বিশ্ব নিউক্লিয়ার প্রযুক্তি থেকে সরে আসছিল, বাংলাদেশ ঠিক সেই সময়েই এই পথে হাঁটা শুরু করে।
প্রশ্ন হল কেন বাংলাদেশের মত একটি উন্নয়নশীল দেশ যার স্বাস্থ্য ও শিক্ষা খাতে বিনিয়োগের অর্থের ঘাটতি হয় তাকে এই ব্যয়বহুল প্রকল্প নির্মাণ করতে হবে? তাও এমন একটি সময় যখন নবায়নযোগ্য জ্বালানির খরচ দিনে দিনে কমে এসেছে। বাংলাদেশের ক্ষমতাসীনরা পারমাণবিক মর্যাদার একটি বিভ্রান্তিকর সংজ্ঞা মানুষের কাছে হাজির করেছে। একটি বড় ব্যয়বহুল স্থাপনা যেই চাকচিক্য প্রদর্শন করে বা উন্নত দেশের নিউক্লিয়ার ক্লাবে প্রবেশের সক্ষমতা যেই মর্যাদা বা “প্রেস্টিজের” বিষয় হিসাবে সামনে আসে, তার একটি রাজনৈতিক মূল্য তৈরি হয়। এই রাজনৈতিক মূল্যের ভাগীদার হতে চায় রাজনৈতিক দলগুলো। কিন্তু দুর্ঘটনা ঘটলে সবার আগে এই দলগুলোই দুর্ঘটনার দায়কে যে অস্বীকার করতে পারে সেই সম্ভাবনা উড়িয়ে দেয়া যায় না।
রূপপুর প্রকল্পের ব্যয়ভার নিয়ে শুরু থেকেই বিতর্ক ছিল। পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের কস্ট বা ব্যয় হিসাব করার একটি নির্দিষ্ট ধরন আছে। বলা হয়, একটি কেন্দ্র ৬০ বছর ধরে চললে এর জ্বালানি ও পরিচালন ব্যয় তুলনামূলক কম হয়। কিন্তু দীর্ঘ মেয়াদে একটি নির্দিষ্ট জ্বালানির ওপর নির্ভরশীলতা, ভূ-রাজনৈতিক ঝুঁকি এবং বর্জ্য ব্যবস্থাপনার খরচ হিসাব করলে এই প্রযুক্তি মোটেও সস্তা নয়। পরিচালন ব্যয়, ডিকমিশনিংয়ের খরচ যুক্ত করলে ব্যয় অনেক বেশি, যা দাম প্রচারের সময় হিসাব করা হয় না।
প্রকল্প নিয়ে ২০০৯ সালে যখন আলোচনা হচ্ছিল, তখন এর ব্যয় ধরা হয়েছিল ৩-৪ বিলিয়ন ডলারের মধ্যে। এরপর বারবার সময়ক্ষেপণ এবং নানা কারণে ২০১৭ সালে যখন এটি চূড়ান্তভাবে অনুমোদন পায়, তখন এর ব্যয় দাঁড়ায় প্রায় ১২.৬৫ বিলিয়ন ডলারে। আর বর্তমানে এই খরচ গিয়ে ঠেকেছে ১৩.৩৫ বিলিয়ন ডলারের ওপর। দেরির কারণে এই আপফ্রন্ট কস্ট বা প্রাথমিক খরচ আকাশচুম্বী হয়েছে।
অথচ বিগত এক দশকে সারা বিশ্বে সৌর ও বায়ুবিদ্যুতের মতো নবায়নযোগ্য জ্বালানির খরচ অভাবনীয় হারে কমেছে। ২০১০-২০২০ সময়কালে বাংলাদেশ যদি এই বিপুল পরিমাণ অর্থ পারমাণবিক কেন্দ্রে বিনিয়োগ না করে সমন্বিতভাবে সৌর ও বায়ুবিদ্যুতে বিনিয়োগ করত, তবে রূপপুরের ২৪০০ মেগাওয়াটের চেয়েও অনেক বেশি পরিমাণ বিদ্যুৎ আমরা উৎপাদন করতে পারতাম। নবায়নযোগ্য জ্বালানির প্রাথমিক খরচ থাকলেও ১৫-২০ বছর মেয়াদে এর উৎপাদন ব্যয় অনেক কম এবং এটি সম্পূর্ণ ঝুঁকিমুক্ত।
রূপপুর প্রকল্পের সবচেয়ে বড় উদ্বেগের জায়গা হলো এর বিপুল বিদেশি ঋণ। এই প্রকল্পের ব্যয়ের প্রায় ৯০ শতাংশই আসছে রাশিয়ার কাছ থেকে ঋণ হিসেবে। একসময় এই ঋণটি ছিল বাংলাদেশের মোট বৈদেশিক ঋণের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ। এত বিপুল অঙ্কের একটি একক ঋণ দেশের সামগ্রিক অর্থনীতির ওপর মারাত্মক চাপ সৃষ্টি করবে। আগামী ২০২৮ সাল থেকে এই ঋণের আসল ও সুদ পরিশোধ শুরু করতে হবে, যা অন্তত ২০ বছর ধরে চলবে। যদিও বলা হচ্ছে এই ঋণ ইউয়ান বা রাশিয়ান মুদ্রায় পরিশোধ করা যাবে, তবুও দেশের রিজার্ভ থেকে এই বিপুল পরিমাণ অর্থের জোগান দেওয়া অর্থনীতির জন্য একটি বড় ধাক্কা হবে।
পাশাপাশি, এককভাবে একটি দেশের ওপর এত বড় প্রযুক্তিগত ও আর্থিক নির্ভরতা আমাদের জন্য ভূ-রাজনৈতিক চাপের কারণ হতে পারে কিনা, সেই শঙ্কাও উড়িয়ে দেওয়া যায় না। বিশেষজ্ঞদের মতে, বাংলাদেশের মতো দেশে রাশিয়ার এই বিনিয়োগ কেবল বাণিজ্যিক নয়, বরং এই অঞ্চলে নিজেদের ভূ-রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সম্প্রসারণের একটি কৌশলগত চাল।
চুক্তি অনুযায়ী, বাংলাদেশ নিজেরা কেন্দ্রটি পরিচালনার সক্ষমতা অর্জন করার পর রাশিয়া এর দায়িত্ব হস্তান্তর করবে। কিন্তু বাংলাদেশ কবে সেই পূর্ণ সক্ষমতা অর্জন করবে, তার কোনো সুনির্দিষ্ট রূপরেখা নেই। পারমাণবিক প্রযুক্তির রক্ষণাবেক্ষণ, কুলিং সিস্টেম ম্যানেজমেন্ট এবং বর্জ্য ব্যবস্থাপনার মতো জটিল কাজগুলো করার মতো দক্ষ জনবল আমাদের এখনও সেভাবে তৈরি হয়নি।
কেবল কিছু তাত্ত্বিক প্রশিক্ষণ নিলেই একটি নিউক্লিয়ার প্ল্যান্ট চালানোর সক্ষমতা আসে না, এর জন্য প্রয়োজন দীর্ঘদিনের বাস্তব অভিজ্ঞতা। সবচেয়ে দুঃখজনক বিষয় হলো, জনবল নিয়োগের ক্ষেত্রেও আমরা স্বচ্ছতার অভাব দেখেছি। বিভিন্ন সময়ে গণমাধ্যমে প্রতিবেদন এসেছে যে, যোগ্যতা ও মেধার ভিত্তিতে নয়, বরং আত্মীয়করণ, অনিয়ম ও দুর্নীতির মাধ্যমে অনেককে এই প্রকল্পে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। এমন একটি স্পর্শকাতর প্রকল্পে নিয়োগ বা ব্যবস্থাপনায় অস্বচ্ছতা ও জবাবদিহির অভাব পুরো দেশের জন্য অশনিসংকেত।
রূপপুর প্রকল্প পাবনার মতো একটি ঘনবসতিপূর্ণ এবং কৃষিপ্রধান অঞ্চলে অবস্থিত। পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপনের আন্তর্জাতিক নিয়মানুযায়ী, প্ল্যান্টের চারপাশের কয়েক মাইল এলাকাকে প্রিকশনারি অ্যাকশন জোন হিসেবে নির্ধারণ করতে হয়, যেন কোনো দুর্ঘটনা ঘটলে দ্রুত মানুষকে সরিয়ে নেওয়া যায়। কিন্তু রূপপুরের আশপাশে যেভাবে মানুষের বসবাস, তাতে কোনো জরুরি পরিস্থিতিতে এই বিপুলসংখ্যক মানুষকে নিরাপদে সরিয়ে নেওয়ার সক্ষমতা বা পরিকল্পনার ঘাটতি রয়েছে।
প্রকল্পের নির্মাণকাজ চলার সময় একটি সাধারণ দুর্ঘটনায় আহত কর্মীকে স্থানীয় কোনো হাসপাতালে চিকিৎসা দেওয়া সম্ভব হয়নি, তাকে রাজশাহীতে নিতে হয়েছিল। এখান থেকেই বোঝা যায়, বড় কোনো বিপর্যয় ঘটলে স্থানীয় পর্যায়ে চিকিৎসা বা শেল্টারের ন্যূনতম কোনো প্রস্তুতি সেখানে নেই।
পারমাণবিক দুর্ঘটনার সঙ্গে কেবল প্রযুক্তি নয়, সমাজ ও সংস্কৃতিরও নিবিড় সম্পর্ক রয়েছে। আমাদের সমাজে ঝুঁকি সম্পর্কে মানুষের ধারণা বা 'রিস্ক পারসেপশন' অত্যন্ত দুর্বল। আমরা সাধারণত দুর্ঘটনা ঘটার পর সচেতন হই। তাও অল্প কিছুদিনের জন্য। চেরনোবিল বা থ্রি মাইল আইল্যান্ডের মতো দুর্ঘটনাগুলো কিন্তু বিশাল কোনো কারিগরি ত্রুটির কারণে ঘটেনি; বরং ছোটখাটো ক্রেন বিকল হওয়া, দুর্ঘটনার কারণ আগে থেকে বুঝতে না পারার কারণে ঘটেছিল। আমাদের দেশের সাধারণ কর্মপরিবেশ ও গা-ছাড়া মনোভাবের কারণে এখানে মানবসৃষ্ট ভুলের আশঙ্কা অনেক বেশি।
প্রকল্পটি যেহেতু চূড়ান্ত পর্যায়ে চলে এসেছে, তাই এখন আর একে বাতিল বা উল্টো পথে হাঁটার আগ্রহ রাজনৈতিক মহলের নেই। এর আগে উদাহরণ আছে কিছু বিদ্যুতকেন্দ্র এত ব্যয় করার পরও ত্রুটি থাকার কারণে বন্ধ করে দিতে হয়েছে। যেমন বুলগেরিয়ার একটি বিদ্যুতকেন্দ্র বন্ধ করা হয়েছিল ২০০৪ সালে, একটি ২০০৬ সালে। বাংলাদেশের ক্ষেত্রে কী হয় তা দেখার বিষয়। তবে এখন সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন কঠোর নজরদারি। যতদিন এই কেন্দ্রটি থাকবে, ততদিন আমাদের এই নিরাপত্তা উদ্বেগগুলো নিয়ে সজাগ থাকতে হবে।
ড. মোশাহিদা সুলতানা: অর্থনীতির সহযোগী অধ্যাপক, একাউন্টিং বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়; বিদ্যুৎ ও জ্বালানি বিষয়ক গবেষক।

বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ এখন একটি ‘জিরো-সাম গেম’-এ পরিণত হয়েছে, যেখানে ক্ষমতার বিচ্যুতি মানেই তার জন্য অনিবার্য কারাবাস। এই ব্যক্তিগত অস্তিত্ব রক্ষার তাগিদে তিনি যে কেবল দেশের ভেতরে জনবিচ্ছিন্ন হয়েছেন তা নয়, আন্তর্জাতিক মঞ্চেও তিনি আজ প্রায় মিত্রহীন।
১ ঘণ্টা আগে
জ্বালানি বাণিজ্যের পাশাপাশি চীন, রাশিয়া ও ইরান এখন ওমান উপসাগর এবং ভারত মহাসাগরের কৌশলগত জলসীমায় নিয়মিত যৌথ নৌ-মহড়া পরিচালনা করছে। এই সামরিক সমন্বয় সরাসরি বার্তা দিচ্ছে যে, এই দেশগুলো তাদের জ্বালানি সরবরাহ পথ রক্ষায় এবং সামুদ্রিক অবরোধ মোকাবিলায় একে অপরের ওপর নির্ভরশীল।
১ দিন আগে
দেশে খুনের মতো গুরুতর সহিংস অপরাধের মাত্রা উদ্বেগজনক হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। কিছু কিছু রোমহর্ষক ঘটনা জনমনে ব্যাপক আলোড়ন ও ভীতির সঞ্চার করছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম থেকে শুরু করে সর্বত্র তীব্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করেছে।
১ দিন আগে
এশীয় হাতি নিয়ে বাংলাদেশে নানা দুর্ঘটনা ঘটে চলেছে। একের পর এক হাতি হত্যাকাণ্ড কিংবা অপঘাতে মৃত্যু। কিছুদিন আগে ছিল পালা হাতির চাঁদাবাজি ও হাতির ওপর মাহুতের নির্মম অত্যাচার নিয়ে তুমুল আলোচনা। তারপর ঘটল চট্টগ্রামের চুনতিতে ট্রেনের ধাক্কায় হাতির মৃত্যু।
২ দিন আগে