সারচার্জ প্রথা বাতিল করে আসছে ‘সম্পদ কর’, বাজারমূল্যে নির্ধারণ হবে সম্পত্তির দাম

স্ট্রিম প্রতিবেদক
স্ট্রিম প্রতিবেদক
ঢাকা

প্রকাশ : ১৯ এপ্রিল ২০২৬, ১৩: ২৮
জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)। ছবি: সংগৃহীত

কর ব্যবস্থায় ‘ন্যায্যতা প্রতিষ্ঠা’ ও ‘বৈষম্য দূর করতে’ আগামী অর্থবছরের (২০২৬-২৭) বাজেটে বড় ধরনের সংস্কার আনতে যাচ্ছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)। বিদ্যমান ‘সারচার্জ’ বা মাশুল ব্যবস্থা পুরোপুরি বাতিল করে এর স্থলে ‘সম্পদ কর’ চালুর পরিকল্পনা করা হয়েছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এর মাধ্যমে দলিল মূল্যের বদলে সম্পদের প্রকৃত বাজারমূল্য বা মৌজামূল্যের ভিত্তিতে কর আদায় করা হবে।

ইতোমধ্যে এই সংক্রান্ত আইন ও বিধিমালার একটি খসড়া প্রস্তুত করেছে এনবিআর। সরকারের উচ্চপর্যায়ের চূড়ান্ত অনুমোদন পেলেই এটি বাজেটে অন্তর্ভুক্ত করা হবে।

এনবিআরের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, ঢাকা ও চট্টগ্রামের অভিজাত এলাকা—বিশেষ করে গুলশান, বারিধারা, বনানী, ধানমন্ডি, আগ্রাবাদ ও খুলশীসহ বিভাগীয় শহরের উচ্চবিত্তদের প্রগতিশীল করের আওতায় আনতেই এই উদ্যোগ। নতুন নিয়মে করযোগ্য সম্পদের ন্যূনতম সীমা আগের মতোই ৪ কোটি টাকা রাখা হয়েছে। তবে গণনার পদ্ধতিতে বড় পরিবর্তন আসবে। নতুন কাঠামো অনুযায়ী, সম্পদের মূল্য ৪ থেকে ১০ কোটি টাকার মধ্যে হলে ০ দশমিক ৫০ শতাংশ, ১০ থেকে ২০ কোটির মধ্যে হলে ১ শতাংশ, ২০ থেকে ৫০ কোটির ক্ষেত্রে ১ দশমিক ৫০ শতাংশ এবং ৫০ কোটির বেশি হলে ২ শতাংশ হারে ‘সম্পদ কর’ আরোপিত হবে।

তবে এই নতুন কর কোনোভাবেই করদাতার মূল প্রদেয় আয়করের চেয়ে বেশি হবে না। কর কর্মকর্তারা উদাহরণ দিয়ে জানান, কোনো ব্যক্তির ৬ কোটি টাকার সম্পদ থাকলে তাকে ০ দশমিক ৫০ শতাংশ হারে ৩ লাখ টাকা সম্পদ কর দেওয়ার কথা। কিন্তু তার প্রদেয় আয়কর যদি ১ লাখ টাকা হয়, তবে তাকে সম্পদ কর হিসেবে ওই ১ লাখ টাকাই পরিশোধ করতে হবে (মোট ২ লাখ টাকা)। যেহেতু সারচার্জ বাতিল হবে, তাই বাড়তি কোনো চাপ পড়বে না।

বর্তমানে ৪ কোটি টাকার বেশি স্থাবর-অস্থাবর সম্পদ, একাধিক গাড়ি কিংবা ৮ হাজার বর্গফুটের বড় গৃহসম্পত্তি থাকলে আয়করের ওপর সারচার্জ বসে। সম্পদের পরিমাণ অনুযায়ী বর্তমানে প্রদেয় করের ওপর ১০, ২০, ৩০ এবং ৩৫ শতাংশ (৫০ কোটির বেশি সম্পদে) হারে এই মাশুল দিতে হয়। যেমন, ৫ কোটি টাকার সম্পদের মালিকের আয়কর ১ লাখ টাকা হলে তাকে ১০ শতাংশ অর্থাৎ ১০ হাজার টাকা সারচার্জ দিতে হয়।

এনবিআরের তথ্যমতে, চলতি অর্থবছরের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত সারচার্জ আদায় হয়েছে ২৯৬ কোটি টাকা, যা বছর শেষে ১ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। এর আগে ২০২২-২৩ অর্থবছরে ৫০ হাজার ৫৩ জনের কাছ থেকে ৬৯৫ কোটি ৯৩ লাখ টাকা, ২০২১-২২ অর্থবছরে ১৪ হাজার ৮৫৪ জনের কাছ থেকে ৬২৬ কোটি ৩৫ লাখ টাকা এবং ২০২০-২১ অর্থবছরে ১৪ হাজার ৯১৯ জনের কাছ থেকে ৫৯৯ কোটি ৩১ লাখ টাকা সারচার্জ আদায় হয়েছিল।

উন্নত বিশ্বে রাজস্বের একটি বড় অংশ আসে সম্পদ কর থেকে। জিডিপির অনুপাতে যুক্তরাজ্যে ৪ দশমিক ২০ শতাংশ, ফ্রান্স ও দক্ষিণ কোরিয়ায় ৪ শতাংশ, কানাডায় ৩ দশমিক ১০ শতাংশ, যুক্তরাষ্ট্রে ৩ শতাংশ, জাপানে ২ দশমিক ৮০ শতাংশ, স্পেনে ২ দশমিক ৫০ শতাংশ এবং সুইজারল্যান্ডে ২ দশমিক ১০ শতাংশ সম্পদ কর আদায় হয়।

এনবিআর কর্মকর্তাদের বিশ্বাস, নতুন এই ব্যবস্থা সঠিকভাবে প্রয়োগ করা গেলে দেশীয় অর্থনীতিতে সম্পদ কর থেকে ১০ হাজার কোটি টাকার বেশি রাজস্ব সংগ্রহ করা সম্ভব হবে।

সম্পর্কিত