জাতীয় সংসদ নির্বাচন ২০২৬

ও গণভোট

ক্লিক করুন

গোলটেবিলে বক্তারা

বাণিজ্যিকীকরণ নয়, সেবায় রূপান্তর করতে হবে বিদ্যুৎ-জ্বালানি খাতকে

স্ট্রিম প্রতিবেদক
স্ট্রিম প্রতিবেদক
ঢাকা

ক‍্যাব ও ঢাকা স্ট্রিমের যৌথ আয়োজনে গোলটেবিল বৈঠক অনুষ্ঠিত। স্ট্রিম ছবি

দেশের বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতকে বাণিজ্যিকীকরণের বৃত্ত থেকে বের করে জনসেবামুখী কাঠামোয় ফিরিয়ে আনা, আমদানিনির্ভরতা কমানো এবং সাশ্রয়ী ও জবাবদিহিমূলক নীতি প্রণয়নের দাবি উঠেছে। আর বিদ্যুৎ ও জ্বালানি নিরাপত্তাকে কেবল উৎপাদন ক্ষমতার প্রশ্ন হিসেবে না দেখে ভোক্তার অধিকার, ন্যায্যমূল্য ও সুশাসনের প্রশ্ন হিসেবে বিবেচনার আহ্বান জানানো হয়েছে।

রাজধানীর পান্থপথে নতুন সময়ের গণমাধ্যম ঢাকা স্ট্রিমে শনিবার (১৪ মার্চ) ‘বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সংকট: ক্যাবের ১৩ দফা ও জনপ্রত্যাশা’ শীর্ষক গোলটেবিল আলোচনায় এসব কথা বলেন বক্তারা। যৌথভাবে এই আয়োজন করে ঢাকা স্ট্রিম ও কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ক্যাব)। স্বাগত বক্তব্য দেন ঢাকা স্ট্রিমের প্রধান সম্পাদক ইফতেখার মাহমুদ।

বৈঠকে ধারণাপত্র উপস্থাপন করেন ক্যাবের গবেষণা সমন্বয়ক প্রকৌশলী শুভ কিবরিয়া। ১৩ দফা দাবিও উত্থাপন করেন তিনি। এরমধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো—বিদ্যুৎ ও প্রাথমিক জ্বালানি খাতকে পুনরায় সেবাখাত হিসেবে প্রতিষ্ঠা, জীবাশ্ম জ্বালানি আমদানি কমানো এবং নিজস্ব গ্যাস অনুসন্ধানে জোর দেওয়া, নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বাড়ানো, তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) ও কয়লানির্ভরতা সীমিত করা, ভোলা ও দক্ষিণাঞ্চলের অব্যবহৃত গ্যাসসম্পদ ব্যবহারের উদ্যোগ, ব্যয়বহুল চুক্তি পুনর্বিবেচনা, স্পিডি অ্যাক্ট বাতিল, বিদ্যুৎ-জ্বালানির মূল্য পুনর্মূল্যায়ন, বিইআরসির জবাবদিহি নিশ্চিতকরণ এবং জ্বালানি খাতে দুর্নীতি ও অপরাধের বিচারের ব্যবস্থা করা।

গোলটেবিলে আলোচকরা বলেন, গত কয়েক দশকে দেশে বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা বাড়লেও এলএনজি, কয়লা ও তেল আমদানির ওপর বাড়তি নির্ভরতা, প্রতিযোগিতাহীন বিনিয়োগ, উচ্চব্যয়ী চুক্তি, বারবার মূল্যবৃদ্ধি এবং প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতা খাতটিকে গভীর কাঠামোগত সংকটে ঠেলে দিয়েছে। এটি কেবল প্রযুক্তিগত বা আর্থিক নয়, বরং নীতি, শাসনব্যবস্থা ও রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক সংকটও তৈরি করছে।

‘জ্বালানি ন্যায়বিচার’ নিয়েও কথা বলেন বক্তারা। এক্ষেত্রে জ্বালানির ব্যয় ও সুবিধার ন্যায্য বণ্টন, নীতিনির্ধারণে স্বচ্ছতা ও জনঅংশগ্রহণ এবং ভোক্তা ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর অধিকারকে স্বীকৃতি দেওয়ার ওপর জোর দেওয়া হয়। বক্তারা মনে করেন, শুধু উৎপাদন বাড়িয়ে নয়, আইনি সংস্কার, নিয়ন্ত্রক সংস্থার স্বাধীনতা, নাগরিক অংশগ্রহণ এবং জবাবদিহি নিশ্চিত করেই এই খাতে টেকসই পরিবর্তন আনা সম্ভব।

অন্তর্বর্তী সরকারের সাবেক উপদেষ্টা ফরিদা আখতার বলেন, জ্বালানির সঙ্গে কৃষির সরাসরি সম্পর্ক। ডিজেলের দাম বাড়লে কৃষকের সেচের খরচ বাড়ে, সারের দাম বাড়ে। ফলে খাদ্যনিরাপত্তা হুমকির মুখে পড়ে। জ্বালানি নীতি করার সময় আমাদের কৃষক এবং নারীদের কথা মাথায় রাখতে হবে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের প্রাক্তন অধ্যাপক এমএম আকাশ বলেন, বিগত দিনে ক্যাপাসিটি চার্জের নামে জনগণের টাকা লুট করা হয়েছে। ইনডেমনিটি আইন বা স্পিডি সাপ্লাই অ্যাক্ট করে এই লুটপাটকে বৈধতা দেওয়া হয়েছে। যারা এই চুক্তির সাথে জড়িত ছিল, তাদের খুঁজে বের করতে হবে।

সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) প্রধান নির্বাহী ড. ফাহমিদা খাতুন বলেন, ক্যাপাসিটি চার্জের যে ভূত, সেটা আমাদের ঘাড়ে চেপে বসেছে। এটি মূলত ধনীদের জন্য একটি ভর্তুকি। আমরা উৎপাদনের দিকে জোর দিয়েছি, কিন্তু সঞ্চালন ও বিতরণ ব্যবস্থায় জোর দিইনি। নবায়নযোগ্য জ্বালানির ক্ষেত্রে আমরা টার্গেট পূরণ করতে পারিনি।

নাগরিক ঐক্যের সভাপতি মাহমুদুর রহমান মান্না বলেন, রাজনীতি ঠিক না থাকলে কোনো খাতই ঠিক থাকে না। বিগত সরকার (আওয়ামী লীগ) এই খাতকে লুটপাটের আখড়া বানিয়েছিল। বর্তমান সরকারের উচিত এই মাফিয়াদের বিরুদ্ধে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া।

বিএনপির চেয়ারপারসনের ফরেন অ্যাডভাইজরি কমিটির সদস্য ড. সাইমুম পারভেজ বলেন, ক্যাবের ১৩ দফার অনেকগুলোই বিএনপির কোর পলিসির সঙ্গে মিলে। যেমন, জীবাশ্ম জ্বালানির ব্যবহার কমিয়ে যতটা সম্ভব নবায়নযোগ্য জ্বালানি ব্যবহার।

তবে বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশের এখনই পুরোপুরি নবায়নযোগ্য জ্বালানির দিকে যাওয়াটা খুব একটা কস্ট-ইফেক্টিভ হবে না জানিয়ে তিনি বলেন, দীর্ঘমেয়াদে এটি ভাবা যেতে পারে। ২০৩০ সালের মধ্যে ২০ শতাংশ নবায়নযোগ্য জ্বালানি থেকে আনার একটি প্রতিশ্রুতি দিয়েছি। সেই লক্ষ্যে একটি বিশেষজ্ঞ দল কাজও করছে।

অনুষ্ঠানে গবেষক ও লেখক মাহা মির্জা বলেন, চুক্তি সই হয়ে যাওয়ার পরে সেটা থেকে বের হয়ে আসা বা বাতিল করা যে কত কঠিন, আদানি চুক্তি হচ্ছে তারই জ্বলন্ত উদাহরণ। আমরা সিঙ্গাপুর হওয়ার বাসনা থেকে বের হতে পারি নাই। আমাদের উন্নয়ন মডেলটাই এনার্জি ইন্টেনসিভ। আমাদের এমন উন্নয়ন মডেলে যেতে হবে যা লোকাল অর্থনীতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ।

বিকেএমইএ’র সাবেক সভাপতি ফজলুল হক বলেন, শিল্প কারখানায় গ্যাসের চরম সংকট চলছে। গ্যাস না থাকলে উৎপাদন বন্ধ হয়ে যাবে। শ্রমিকরা বেকার হবে। আমাদের দেশীয় গ্যাস উত্তোলনের দিকে জোর দিতে হবে। এলএনজি আমদানির ওপর নির্ভরতা কমাতে হবে।

বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের যুগ্ম মহাসচিব তোফাজ্জল হোসাইন মিয়াজি বলেন, জ্বালানি সংকটে সবচেয়ে বেশি ভোগে পরিবহন খাত। সরকার বলে তেল আছে, কিন্তু পাম্পে গেলে বলে তেল নাই। রাস্তায় গাড়ি চললে পথে পথে চাঁদা দিতে হয়। এই চাঁদাবাজি যদি বন্ধ করা যায়, তবে তেলের দাম না কমালেও পরিবহন ভাড়া কমানো সম্ভব।

প্রথম আলোর জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক মহিউদ্দিন নিলয় বলেন, আমাদের জ্বালানি তেলের মজুদ সক্ষমতা খুবই কম। রিফাইনারি করতে পারিনি। নিজস্ব গ্যাস উৎপাদন কমতে কমতে ১৭০০ এমএমসিএফডির নিচে নেমে এসেছে। সাগরে গ্যাস অনুসন্ধানও করা যায়নি। ২০১৪ সালে সমুদ্রসীমা নির্ধারণের পর মিয়ানমার ও ভারত গ্যাস তুলছে, কিন্তু আমরা পারিনি। ভোলায় যে গ্যাস আছে তা মূল ভূখণ্ডে আনতে পারছি না। অন্যদিকে এলএনজি আমদানির দিকে ঝুঁকছি।

ক্যাবের সাংগঠনিক সম্পাদক অধ্যাপক সৈয়দ মিজানুর রহমান বলেন, অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের কাছে আমাদের প্রত্যাশা ছিল অনেক, কিন্তু তাদের কাজের ধীরগতি হতাশ করেছে। জ্বালানি খাতের মাফিয়াদের দ্রুত বিচারের আওতায় আনতে হবে।

বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলনের (বাপা) সহসভাপতি জাকির হোসেন বলেন, রামপাল বা মাতারবাড়ির মতো কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো আমাদের সুন্দরবন ও উপকূলীয় পরিবেশ ধ্বংস করছে। আমাদেরকে ফসিল ফুয়েল থেকে বের হয়ে এসে শতভাগ নবায়নযোগ্য জ্বালানির দিকে যেতে হবে।

ঢাকা স্ট্রিমের প্রধান প্রতিবেদক মাসুম বিল্লাহ বলেন, দেশে জ্বালানি খাতে অপরাধ হয়েছে। দায়মুক্তি আইনের অধীনে যেসব চুক্তি হয়েছে, সেগুলো রিভিউ করতে হবে।

ঢাকা স্ট্রিমের পরামর্শক সম্পাদক হাসান মামুনের সঞ্চালনায় অনুষ্ঠানে ধন্যবাদ জ্ঞাপন করেন ক্যাবের সাধারণ সম্পাদক হুমায়ুন কবির ভূঁইয়া এবং ঢাকা স্ট্রিমের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা কর্নেল (অব.) সোহেল রানা।

সর্বাধিক পঠিত

সম্পর্কিত