নীলফামারীর সৈয়দপুর। রেলের শহর হিসেবে পরিচিতি পাওয়ার অনেক আগে থেকেই এখানে মাথা তুলে দাঁড়িয়ে আছে এক অনন্য স্থাপত্য—চিনি মসজিদ। ১৮৬৩ সালে যখন সৈয়দপুর শহর হিসেবে গড়ে ওঠেনি, এমনকি রেলওয়ে স্টেশনও তৈরি হয়নি, তখন ইছলামবাগ এলাকায় এই মসজিদের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করা হয়। আজ ১৬০ বছর পেরিয়ে এই মসজিদটি কেবল ধর্মীয় উপাসনালয় নয়, বরং উত্তরবঙ্গের অন্যতম প্রধান পর্যটন আকর্ষণে পরিণত হয়েছে।
জনশ্রুতি আছে, হাজি বাকের এবং হাজি মুকু নামের দুই ধর্মপ্রাণ ব্যক্তির উদ্যোগে এই মসজিদের নির্মাণকাজ শুরু হয়। অর্থাভাবে তখন এলাকাবাসী ‘মুষ্টির চাল’ সংগ্রহ করে এবং নিজেদের এক মাসের পুরো উপার্জন দান করে এই পুণ্য কাজের সূচনা করেন। শণ ও বাঁশ দিয়ে তৈরি সেই প্রাথমিক কাঠামোটি ১৮৭৮ সালে সৈয়দপুর রেলওয়ে স্টেশন তৈরিরও ১৫ বছর আগে নির্মিত হয়েছিল। এর স্থপতি ছিলেন মো. মখতুল ও নবী বক্স।
কালক্রমে বাঁশের মসজিদটি টিনের দোচালা ঘরে রূপ নেয়। ১৯২০ সালে হাজি হাফিজ আব্দুল করিমের উদ্যোগে মসজিদটির প্রথম অংশ (৩৯ ফুট বাই ৪০ ফুট) পাকা করা হয়। তিনি নিজেই এই অংশের নকশা করেছিলেন। পরবর্তীতে ১৯৬৫ সালে দক্ষিণ দিকে ২৫ ফুট বাই ৪০ ফুট আয়তনের দ্বিতীয় অংশটি পাকা করা হয়। আদি কাঠামো ও বর্ধিতাংশ চুন-সুরকি দিয়ে তৈরি। মুঘল স্থাপত্যরীতিতে নির্মিত দোতলা এই মসজিদে রয়েছে ২৭টি মিনার এবং ৩টি বড় গম্বুজ।
মসজিদটির পুরো অবয়ব রঙিন উজ্জ্বল চীনামাটির পাথরের ছোট ছোট টুকরো দিয়ে ঢাকা। এই বিশেষ অলঙ্করণের কারণেই এটি স্থানীয়ভাবে ‘চিনি মসজিদ’ নামে পরিচিতি পায়। জানা যায়, বগুড়ার একটি গ্লাস ফ্যাক্টরি একসময় এই অলঙ্করণের জন্য ২৫ টন চীনামাটির পাথর দান করেছিল। এ ছাড়া কলকাতা থেকে আনা হয়েছিল ২৪৩টি বিশেষ সংকর পাথর। মসজিদের দেয়ালে মার্বেল পাথরের সূক্ষ্ম কাজ এবং ফুলদানি, গোলাপ, চাঁদ-তারা ও বিচিত্র লতাপাতার নকশা একে অনন্য করে তুলেছে।
চিনি মসজিদ নির্মাণের ইতিহাসের সঙ্গে জড়িয়ে আছে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির এক চমৎকার গল্প। মসজিদের প্রাচীন ভবনটি নির্মাণ করেছিলেন ‘শঙ্কু’ নামের এক হিন্দু নির্মাণশ্রমিক। তৎকালীন সময়ে তাঁর দৈনিক মজুরি ছিল মাত্র ১০ আনা। বর্তমানে এই মসজিদে একসঙ্গে পাঁচ শতাধিক মুসল্লি নামাজ আদায় করতে পারেন।
সৈয়দপুর রেলস্টেশনের পূর্ব দিকে রেললাইনের সমান্তরাল রাস্তা ধরে কিছুটা এগোলে খ্রিষ্টান কবরস্থানের পাশেই ইছলামবাগ এলাকায় এই মসজিদের অবস্থান। মসজিদের ডানে একটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় এবং বামে একটি ইমামবাড়া রয়েছে। দক্ষিণ পাশে থাকা ১২টি দোকানঘরের ভাড়া এবং মুসল্লিদের নিয়মিত চাঁদাই এই মসজিদের প্রধান আয়ের উৎস, যার মাধ্যমে এর রক্ষণাবেক্ষণ ও উন্নয়নমূলক কাজ পরিচালিত হয়।
অপূর্ব এই কারুকাজ দেখতে প্রতিদিন দেশি-বিদেশি পর্যটকরা এখানে ভিড় জমান। ইতিহাস ও ঐতিহ্যের সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে থাকা চিনি মসজিদ আজও আমাদের মনে করিয়ে দেয় পূর্বপুরুষদের ত্যাগ ও শৈল্পিক চেতনার কথা।