leadT1ad

ইসিতে দ্বিতীয় দিনের আপিল শুনানি

প্রার্থিতা হারালেন খেলাফতের শামসুল, জামায়াত প্রার্থীর সম্ভাবনা এখনো টিকে আছে

স্ট্রিম প্রতিবেদক
স্ট্রিম প্রতিবেদক

প্রকাশ : ১১ জানুয়ারি ২০২৬, ২২: ২৭
বাংলাদেশ নির্বাচন কমিশন

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে মনোনয়নপত্র বাছাইয়ে রিটার্নিং কর্মকর্তার সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে আপিল শুনানির দ্বিতীয় দিনে ৫৮টি আবেদন মঞ্জুর করেছে নির্বাচন কমিশন। এ ছাড়া ৭টি আবেদন নামঞ্জুর এবং ৬টি আবেদন অপেক্ষমাণ রাখা হয়েছে।

এদিন খেলাফত মজলিস মনোনীত প্রার্থী শামসুল ইসলামের বিরুদ্ধে ঋণখেলাপির অভিযোগ থাকায় তার প্রার্থিতা বাতিলের সিদ্ধান্ত বহাল রেখেছে নির্বাচন কমিশন, একই অভিযোগে প্রার্থিতা হারাতে পারেন জামায়াতের পারতেন যশোর-২ আসনের বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী মোহাম্মদ মোসলেহউদ্দিন ফরিদ। তাঁর আবেদন আবার শুনানি হবে।

রোববার ইসি সিনিয়র সচিব আখতার আহমেদ জানান, ইসি প্রতিদিন গড়ে ৭০টি আপিল শুনানির লক্ষ্য রাখলেও শনিবারের অপেক্ষমাণ মুন্সিগঞ্জ-৩ আসনের স্বতন্ত্র প্রার্থী মো. মহিউদ্দিনের আপিল আজ শুনানি হওয়ায় মোট ৭১টি শুনানি অনুষ্ঠিত হয়েছে।

সোমবার ১৪১ থেকে ২১০ নম্বর আপিলের শুনানি অনুষ্ঠিত হবে। ঢাকার আগারগাঁওয়ে নির্বাচন ভবনের অডিটোরিয়ামে সকাল ১০টা থেকে বিকেল ৫টা পর্যন্ত শুনানি চলবে।

এখন পর্যন্ত মোট ১০৯ জন প্রার্থী প্রার্থিতা ফিরে পেয়েছেন এবং ৮টি আপিল শুনানি এখনো মুলতবি রয়েছে।

এর মধ্যে ময়মনসিংহ-৯ আসনে খেলাফত মজলিস মনোনীত প্রার্থী শামসুল ইসলামের বিরুদ্ধে ঋণখেলাপির অভিযোগ থাকায় তার প্রার্থিতা বাতিলের সিদ্ধান্ত বহাল রেখেছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)।

জানা যায়, ৩ জানুয়ারির আগে মনোনয়ন যাচাই-বাছাইয়ের সময় জেলা রিটার্নিং কর্মকর্তা জানান, শামসুল ইসলামের নামে অগ্রণী ব্যাংকের একটি ঋণ বকেয়া রয়েছে। শামসুল ইসলামের দাবি ছিল, তিনি তিন বছর আগেই ওই ঋণ পরিশোধ করেছেন। তবে রিটার্নিং কর্মকর্তা তার মনোনয়নপত্র বাতিল করেন।

প্রার্থিতা ফিরে পেতে তিনি ৫ জানুয়ারি নির্বাচন কমিশনে আপিল করেন। রোববার বিকেলে অনুষ্ঠিত শুনানিতে ইসি জানান, মনোনয়নপত্র দাখিলের দিনে তিনি ঋণখেলাপি অবস্থায় ছিলেন। ফলে তার আপিল নামঞ্জুর করা হয়।

শুনানিকালে শামসুল ইসলাম বলেন, তিনি মূলত একজন মাদ্রাসাশিক্ষক এবং তার ছোট ভাই তার ব্যবসা দেখাশোনা করেন। তার জানামতে, তিনি আগেই ঋণ পরিশোধ করেছিলেন। ফলে বাকি থাকা ১ লাখ ৯ হাজার টাকার দায় সম্পর্কে তিনি অবগত ছিলেন না।

এ সময় অবসরপ্রাপ্ত জেলা ও দায়রা জজ এবং নির্বাচন কমিশনার আব্দুর রহমানেল মাছউদ বলেন, ঋণখেলাপি না হওয়া এবং দ্বৈত নাগরিকত্ব না থাকা—এ দুটি সংসদ নির্বাচনের মৌলিক যোগ্যতা। সংসদ সদস্য হতে চাইলে প্রার্থীকে আগেই নিজের আইনগত প্রস্তুতি নিশ্চিত করতে হবে।

শামসুল ইসলাম ঢাকা স্ট্রিমকে বলেন, অনেক ক্ষেত্রে অজ্ঞাত ফৌজদারি মামলা থাকলেও ইসি তা এড়িয়ে যায়, কিন্তু অজ্ঞাত ঋণের বিষয়ে ইসি কঠোর অবস্থান নিয়েছে। অনিচ্ছাকৃত এই ভুলের ক্ষেত্রে আইন আরও নমনীয় হওয়া প্রয়োজন।

কোনো অজ্ঞাত ফৌজদারি মামলা যদি আমলি পর্যায়ে থাকে এবং আদালত অভিযুক্তকে পলাতক ঘোষণা না করে, তবে ইসি কিছু ক্ষেত্রে ছাড় দেয়। তবে শুনানির প্রথম দিনে, আমলি পর্যায়ে মামলা থাকলেও আদালত কর্তৃক পলাতক ঘোষিত হওয়ায় ব্রাহ্মণবাড়িয়া-১ আসনের একরামুজ্জামানের প্রার্থিতা অবৈধ ঘোষণা করা হয়।

একই ধরনের পরিস্থিতিতে চূড়ান্তভাবে প্রার্থিতা হারাতে পারতেন যশোর-২ আসনের বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী মোহাম্মদ মোসলেহউদ্দিন ফরিদ। তিনি শুনানিতে বলেন, ২০০২ সালে তার কোম্পানি বন্ধ করে যুক্তরাজ্যে চলে যাওয়ার সময় ব্যাংকের ১ কোটি ২০ লাখ টাকা দায় পরিশোধ করেন। তিনি জানতেন না যে আরও প্রায় ৪০ হাজার টাকা বকেয়া রয়ে গেছে। তার বক্তব্য, যদি তিনি ১ কোটি ২০ লাখ টাকা পরিশোধ করতে পারেন, তবে বাকি ৪০ হাজার টাকাও পরিশোধ করা যেত।

এ সময় নির্বাচন কমিশনার রহমানেল মাছউদ জানতে চান, ২৯ ডিসেম্বর তার ঋণের অবস্থান কী ছিল। তার পক্ষে আইনজীবী জানান, মোসলেহউদ্দিন ফরিদ শুধু নির্বাচনে অংশগ্রহণ ও জনগণের কল্যাণে কাজ করার উদ্দেশ্যে ব্রিটিশ নাগরিকত্ব ত্যাগ করে দেশে ফিরে এসেছেন।

ইসি তার নাগরিকত্ব ত্যাগ সংক্রান্ত কাগজপত্র দেখতে চাইলে তিনি যে নথি উপস্থাপন করেন, তাতে ১৮ ডিসেম্বর নাগরিকত্ব ত্যাগের আবেদন করার তথ্য থাকলেও বর্তমান অবস্থার কোনো চূড়ান্ত দলিল ছিল না।

নতুন বিষয় যুক্ত হওয়ায়, আপাতত শিশু হৃদরোগ বিশেষজ্ঞ ডা. মোসলেহউদ্দিন ফরিদের প্রার্থিতার সম্ভাবনা টিকে রয়েছে। এই আপিলের শুনানি আগামী ১৬ জানুয়ারি বেলা ৩টায় অনুষ্ঠিত হবে। এ সময় ইসি তিনটি বিষয়ে তথ্য চেয়েছে—দ্বৈত নাগরিকত্ব বিষয়ে কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত বা রেফারেন্স আছে কি না, নাগরিকত্ব পরিত্যাগের ক্ষেত্রে ব্রিটিশ আইনের বিধান কী এবং কোম্পানি বন্ধ হলে দায় বাতিল হয়—এমন কোনো আইনগত রেফারেন্স আছে কি না।

ডা. মোসলেহউদ্দিন ফরিদের প্রার্থিতার বিরুদ্ধে করা আপিলের শুনানিও একই দিনে অনুষ্ঠিত হবে বলে সিদ্ধান্ত দিয়েছে ইসি।

এদিন আরও দুটি আপিলে ঋণসংক্রান্ত বিষয় আলোচনায় আসে। এর মধ্যে মুন্সিগঞ্জ-৩ আসনের স্বতন্ত্র প্রার্থী (বিএনপির বিদ্রোহী প্রার্থী) জেলা বিএনপির সদস্য সচিব মো. মহিউদ্দিনের আপিলে তার আইনজীবীরা জানান, তিনি ঋণের গ্যারান্টর হওয়া সত্ত্বেও তাকে ঋণখেলাপি হিসেবে দেখানো হয়েছে। পূর্ববর্তী নির্বাচনের রেফারেন্স বিবেচনায় নিয়ে ইসি তার প্রার্থিতা ফিরিয়ে দেয়।

দিনের শুনানি শেষে ইসি স্পষ্ট করেছে—দাপ্তরিক বা ছোটখাটো ভুল, যেগুলোর অধিকতর যাচাই প্রয়োজন নেই, সে ক্ষেত্রে প্রার্থিতা ফেরত দেওয়া হবে। তবে ঋণখেলাপি ও দ্বৈত নাগরিকত্বের বিষয়ে কোনো ছাড় দেওয়া হবে না।

আপিল শুনানির প্রথম দিনে জাতীয় পার্টির (জাপা) ১৩ প্রার্থীর মধ্যে ১১ জন প্রার্থিতা ফিরে পান। দ্বিতীয় দিনে দলটির ছয় প্রার্থীর আপিল শুনানি শেষে সবাই প্রার্থিতা ফিরে পেয়েছেন।

আজ প্রার্থিতা ফিরে পাওয়া প্রার্থীরা হলেন— কুমিল্লা-১ এর সৈয়দ মো. ইফতেকার আহসান, বগুড়া-২ এর মো. শরিফুল ইসলাম জিন্নাহ, যশোর-৪ এর মো জহুরুল হক, যশোর-৫ এর এম. এ. হালিম, যশোর-৬ এর জি এম হাসান এবং রাজশাহী-৬ এর মো. ইকবাল হোসেন।

গতকালের মতো আজও জাপা প্রার্থীদের মূল সমস্যা ছিল ফর্ম-২০ ও ২১ যথাযথভাবে পূরণ না করা, নির্ধারিত স্থানে স্বাক্ষর না থাকা এবং অঙ্গীকারনামায় দলীয় প্রধানের স্বাক্ষরের অভাব।

শুনানির শেষে প্রধান নির্বাচন কমিশনার এ এম এম নাসির উদ্দিন জাপা প্রার্থীদের পক্ষে আইনজীবী ব্যারিস্টার শামীম হায়দার পাটোয়ারীকে প্রশ্ন করেন—প্রার্থীদের ফরমগুলো একই স্থান থেকে পূরণ করা হয়েছিল কি না এবং একই ধরনের ভুল কীভাবে হয়েছে।

ব্যারিস্টার শামীম হায়দার পাটোয়ারী ঢাকা স্ট্রিমকে বলেন, ইসি যদি পক্ষপাতমূলক আচরণ না করে, সে বিষয়ে তারা আত্মবিশ্বাসী ছিলেন এবং তারাই প্রমাণ পেয়েছেন। অধিকাংশ প্রার্থী প্রার্থিতা ফিরে পেয়েছেন।

জাতীয় পার্টির বাতিল হওয়া ২৫ প্রার্থীর মধ্যে এ পর্যন্ত ১৯ জনের শুনানি হয়েছে। এর মধ্যে ১৭ জন প্রার্থিতা ফিরে পেয়েছেন।

Ad 300x250

সম্পর্কিত