ডেঙ্গুতে বেশি আক্রান্ত পুরুষ, মৃত্যুতে নারী

প্রতিদিনি বাড়ছে ডেঙ্গু আক্রান্ত। ছবি: সংগৃহীত

সারা দেশে চোখ রাঙাচ্ছে ডেঙ্গু। শুক্রবার সকাল ৮টা পর্যন্ত গত ২৪ ঘণ্টায় একজনের মৃত্যু হয়েছে; নতুন ১৫৩ জন হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। এ নিয়ে চলতি বছরের প্রথম সাত মাসে ৫৪ জনের মৃত্যু এবং আক্রান্ত ১৫ হাজার ৩১০ জনে দাঁড়িয়েছে বলে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর জানিয়েছে।

গত বছরের প্রথম সাত মাসে ডেঙ্গুতে ৮৩ জনের মৃত্যু এবং আক্রান্ত হয়েছিল ২০ হাজার ৯৮০। পরিসংখ্যানে আক্রান্ত এবং মৃত্যু কমেছে। তবে গত বছরের মতো এবারো আক্রান্তের হারে পুরুষ বেশি। গত বছরের জুলাই পর্যন্ত আক্রান্তদের মধ্যে ৫৯ শতাংশ ছিল পুরুষ; নারী ৪১ শতাংশ। শুক্রবার (৩১ জুলাই) পর্যন্ত ৬২ শতাংশ পুরুষ এবং ৩৮ শতাংশ নারী আক্রান্ত হয়েছে।

গত বছরের জুলাই পর্যন্ত যেখানে মৃতদের ৫৭ শতাংশ পুরুষ ছিল, এবার তা দাঁড়িয়েছে ৩৯ শতাংশে। বিপরীতে জুলাই পর্যন্ত ডেঙ্গুতে নারীর মৃত্যুহার ৬১ শতাংশ, যা গত বছর প্রথম সাত মাসে ছিল ৪৩।

জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ডেঙ্গুতে আক্রান্ত ও মৃত্যু কমের পরিসংখ্যানে আত্মতুষ্টির সুযোগ নেই। বৃষ্টির কারণে এডিস মশার বিস্তার বেড়েছে। জুলাইয়ে প্রত্যেক দিনই আক্রান্ত বেড়েছে। ফলে আগস্টে পরিস্থিতি ভয়াবহ রূপ নিতে পারে।

গতবারের মতো ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন (ডিএসসিসি) এলাকায় বেশি মারা গেছে। গত বছর জুলাই পর্যন্ত ৮৩ জনের মধ্যে ঢাকা দক্ষিণ সিটিতে ছিল ৩৭। এবারের ৫৪ মৃত্যুর মধ্যে ১৭ জনই এই সিটি এলাকার।

চলতি বছর নারীর মৃত্যুহার বেশি হওয়ার বিষয়ে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের রোগ নিয়ন্ত্রণ শাখার সাবেক পরিচালক ও জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ডা. বে-নজির আহমেদ স্ট্রিমকে বলেন, ‘দেশের সামাজিক বাস্তবতায় অনেক নারী অসুস্থ হলেও সময় মতো চিকিৎসকের কাছে যান না। পরিবার থেকেও তাদের দ্রুত হাসপাতালে নেওয়া হয় না। এতে জটিলতা বেড়ে যায় এবং নারীরা বেশি মারা যান।’

বয়সভিত্তিক আক্রান্ত ও মৃত্যু

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্যে, শুধু গত বছরের জুলাইয়ে আক্রান্ত হয়েছিল ১০ হাজার ৬৮৪; মারা যায় ৪১ জন। এবারের জুলাইয়ে ৯ হাজার ২০৬ জন আক্রান্ত এবং মারা গেছে ৩৬ জন।

গত বছরের প্রথম সাত মাসে সবচেয়ে বেশি আক্রান্ত হয়েছিল ২১ থেকে ২৫ বছর বয়সীরা, ২ হাজার ৬২৫ জন। এবার একই সময়ে বেশি ২৬ থেকে ৩০ বছর বয়সী ২ হাজার ৯৭ জন আক্রান্ত হয়েছে। ৩১ জুলাই পর্যন্ত ২৬ থেকে ৩০ বছর বয়সী যেখানে ৯ জন মারা গেছে, সেখানে গত বছর একই সময়ে ৩৬ থেকে ৪০ বছর বয়সীদের মৃত্যু বেশি, ১০ জন।

গত বছরের প্রথম সাত মাসে সবচেয়ে বেশি ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়েছিল বরিশাল বিভাগে, ৭ হাজার ৯৪২ জন। সবচেয়ে কম সিলেট বিভাগে, ৪৫ জন। এবার সবচেয়ে বেশি ঢাকা বিভাগে (ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশনসহ), ৫ হাজার ৭৮৫; সবচেয়ে কম সিলেট বিভাগে, ৯৭ জন।

গতবারের মতো ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন (ডিএসসিসি) এলাকায় বেশি মারা গেছে। গত বছর জুলাই পর্যন্ত ৮৩ জনের মধ্যে ঢাকা দক্ষিণ সিটিতে ছিল ৩৭। এবারের ৫৪ মৃত্যুর মধ্যে ১৭ জনই এই সিটি এলাকার।

ডিএসসিসির প্রধান স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ডা. জাহানে ফেরদৌস বিনতে রহমান স্ট্রিমকে বলেন, ‘ডিএসসিসি এলাকায় সবচেয়ে বেশি মৃত্যু, তথ্যটি পুরোপুরি সঠিক নয়। কারণ, ঢাকার আশপাশের বিভিন্ন জেলা থেকে রোগীরা ডিএসসিসির আওতাধীন হাসপাতালে ভর্তি হন। এসব রোগীর কেউ হাসপাতালে মারা গেলে সিটির পরিসংখ্যানে যুক্ত হন।’ তিনি বলেন, ‘আমার জানা মতে, এখন পর্যন্ত শুধু যাত্রাবাড়ী এলাকায় একজন মারা গেছেন। বাকিদের অধিকাংশ ঢাকা দক্ষিণ সিটি এলাকার স্থায়ী বাসিন্দা নন।’

ডা. বে-নজির আহমেদ বলেন, ‘চলতি বছরের প্রথম পাঁচ মাস খুবই কম ছিল ডেঙ্গুর প্রকোপ। কিন্তু জুন ও জুলাই– দুই মাসেই আক্রান্ত বেড়েছে। এর মানে এডিস মশার বংশবৃদ্ধি হয়েছে। এর সঠিক চিত্র পাওয়া যাবে আগস্টে। সামনে আক্রান্ত আরও বাড়তে পারে।’

জানতে চাইলে রোগতত্ত্ব, রোগনিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের (আইইডিসিআর) সাবেক প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ডা. মুশতাক হোসেন স্ট্রিমকে বলেন, ‘ডেঙ্গু পরিস্থিতির উন্নতি হয়েছে, এটি বলার সুযোগ নেই। আত্মতুষ্টিতে ভোগারও অবকাশ নেই। বরং বলা যেতে পারে– গত বছরের প্রথম সাত মাসের তুলনায় পরিস্থিতি কিছুটা নিচে আছে। এটিকে নিয়ন্ত্রণে চলে এসেছে বলা যাবে না।’

তিনি আরও বলেন, ‘যে কোনো সময় ডেঙ্গুর পরিস্থিতির অবনতি হতে পারে। কার্যকরভাবে মশা নিয়ন্ত্রণ করা গেলে কিংবা রোগীর সংখ্যা নিয়ন্ত্রণে রাখা গেলে, তখনই বলা যেত পরিস্থিতি উন্নত হয়েছে।’

Ad 300x250

সম্পর্কিত