সায়েন্টিফিক আমেরিকানের প্রতিবেদন/বিশ্বজুড়ে আবার বাড়ছে হাম, বাংলাদেশে নিয়ন্ত্রণের বাইরে

স্ট্রিম প্রতিবেদক
স্ট্রিম প্রতিবেদক

প্রকাশ : ২০ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ২১: ০২
স্ট্রিম গ্রাফিক
স্ট্রিম গ্রাফিক

বিশ্বজুড়ে আবারও বাড়ছে সংক্রামক রোগ হাম। বাংলাদেশে চলমান ভয়াবহ প্রাদুর্ভাবের পাশাপাশি কানাডা, মেক্সিকো ও যুক্তরাষ্ট্রেও সাম্প্রতিক সময়ে হাম আক্রান্তের সংখ্যা ও প্রাদুর্ভাব বেড়েছে। টিকাদানের ঘাটতিকে হামের সংক্রমণ বাড়ার প্রধান কারণ হিসেবে দেখছেন বিশেষজ্ঞরা। শুক্রবার (১৮ সেপ্টেম্বর) প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে এসব তথ্য তুলে ধরেছে মার্কিন বিজ্ঞানবিষয়ক সাময়িকী সায়েন্টিফিক আমেরিকান।

‘দিস ইজ হোয়াট অ্যান আউট-অব-কন্ট্রোল মিসেলস আউটব্রেক লুকস লাইক’ শিরোনামের প্রতিবেদনটি লিখেছেন লরেন জে. ইয়ং এবং সম্পাদনা করেছেন ক্লেয়ার ক্যামেরন। প্রতিবেদনে বাংলাদেশের ভয়াবহ হাম পরিস্থিতির সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের বর্তমান পরিস্থিতির তুলনা করা হয়েছে।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, একসময় বিশ্বজুড়ে নির্মূলের পথে থাকা হাম আবারও বিভিন্ন দেশে ফিরে আসছে। এর মধ্যে বাংলাদেশে পরিস্থিতি সবচেয়ে ভয়াবহ। দেশটিতে ২০০৫ সালের পর সবচেয়ে প্রাণঘাতী হাম প্রাদুর্ভাব চলছে বলে উল্লেখ করেছে সাময়িকীটি।

বাংলাদেশের স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের দেওয়া তথ্যের বরাতে সায়েন্টিফিক আমেরিকান জানায়, ১৫ মার্চ থেকে ১৬ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত দেশে অন্তত ১ লাখ ৭৫ হাজার ১৯৮টি সন্দেহভাজন হাম আক্রান্তের ঘটনা শনাক্ত হয়েছে। একই সময়ে নিশ্চিত ও সন্দেহভাজন হাম আক্রান্ত মিলিয়ে ১ হাজার ৪৪ জনের মৃত্যু হয়েছে।

বাংলাদেশে হামে আক্রান্তদের বড় অংশই টিকা না পাওয়া দুই বছরের কম বয়সী শিশু। তবে বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, সরকারি হিসাবে প্রকৃত আক্রান্ত ও মৃত্যুর পুরো চিত্র উঠে আসছে না। বিশেষ করে গ্রামাঞ্চলে টিকা ও প্রয়োজনীয় স্বাস্থ্যসেবা পৌঁছাতে সমস্যা হওয়ায় অনেক ঘটনা হিসাবের বাইরে থেকে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

তবে হামের এই প্রাদুর্ভাবের ভুক্তভোগী বাংলাদেশ একা নয়। যুক্তরাষ্ট্রে চলতি বছর নিশ্চিত হাম আক্রান্তের সংখ্যা ৩ হাজার ২৯৪ জনে পৌঁছেছে। টেক্সাস, সাউথ ক্যারোলাইনা ও পেনসিলভানিয়ায় বড় ধরনের প্রাদুর্ভাব দেখা গেছে। সেপ্টেম্বরের তৃতীয় সপ্তাহে পেনসিলভানিয়ায় হাম-সম্পর্কিত চতুর্থ মৃত্যুর খবর পাওয়া যায়। কানাডা ও মেক্সিকোতেও সাম্প্রতিক সময়ে হাম সংক্রমণ বেড়েছে।

যুক্তরাষ্ট্রের টেক্সাসের গেইনস কাউন্টিতে ২০২৫ সালের হাম প্রাদুর্ভাবের কেন্দ্রস্থলে কিন্ডারগার্টেন শিক্ষার্থীদের হাম টিকা গ্রহণের হার ছিল ৮২ শতাংশ। জাতীয় পর্যায়ে এ হার ছিল প্রায় ৯৩ শতাংশ।

মহামারি বিশেষজ্ঞ ওয়াল্টার ওরেনস্টেইনের মতে, অতীতে যুক্তরাষ্ট্রে বিদেশ থেকে আক্রান্ত ব্যক্তি দেশে ফিরে কম টিকাদানের কোনো জনগোষ্ঠীর মধ্যে ভাইরাস ছড়িয়ে দিতেন। এখন কিছু এলাকায় ভাইরাস স্থানীয়ভাবেও ছড়িয়ে পড়ছে এবং বড় সংক্রমণ তৈরি করছে।

তবে বাংলাদেশ ও যুক্তরাষ্ট্রের পরিস্থিতির কারণ এক নয়। শাকিল ফাইজুল্লাহ বলেন, বাংলাদেশের ক্ষেত্রে টিকার সরবরাহ ও স্বাস্থ্যব্যবস্থায় বিঘ্ন বড় কারণ। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রে নির্দিষ্ট কিছু এলাকায় কম টিকাদান এবং টিকা গ্রহণে অনীহা বা দ্বিধা বড় ভূমিকা রাখছে।

ব্রাউন বিশ্ববিদ্যালয়ের মহামারি বিশেষজ্ঞ জেনিফার নুজ্জো বলেন, যুক্তরাষ্ট্রে কেউ হাম টিকা নিতে চাইলে তা পাওয়ার সুযোগ রয়েছে। বাংলাদেশের বর্তমান পরিস্থিতিকে তিনি টিকাবিরোধী মনোভাবের ফল হিসেবে দেখছেন না। তবে বাংলাদেশের পরিস্থিতি টিকার সরবরাহব্যবস্থায় বিঘ্নের ঝুঁকি স্পষ্ট করেছে বলে মনে করেন তিনি।

হামের বিস্তার ঠেকাতে কোনো জনগোষ্ঠীর অন্তত ৯৫ শতাংশ মানুষের টিকাদান প্রয়োজন বলে বিশেষজ্ঞদের বরাতে জানিয়েছে সায়েন্টিফিক আমেরিকান। ডব্লিউএইচও ও ইউনিসেফের তথ্য অনুযায়ী, ২০১৯ সালে বাংলাদেশে হাম টিকার প্রথম ডোজ গ্রহণের হার ছিল প্রায় ৯৭ শতাংশ এবং দ্বিতীয় ডোজের হার ৯৩ শতাংশ। কিন্তু ২০২৫ সালে তা নেমে আসে ৮৬ শতাংশে। ইউনিসেফের এক মূল্যায়নের বরাতে প্রতিবেদনে বলা হয়, প্রায় ৪ লাখ শিশু প্রয়োজনীয় সব টিকা পায়নি; এর মধ্যে প্রায় ৭০ হাজার শিশু কোনো টিকাই পায়নি।

এপ্রিল মাসে বাংলাদেশে বড় পরিসরে হাম টিকাদান কর্মসূচি শুরু হয়। এতে প্রায় ১ কোটি ৮০ লাখ শিশুকে টিকার আওতায় আনার লক্ষ্য নেওয়া হয়। এরপর সংক্রমণে কিছুটা ধীরগতি দেখা গেলেও বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করেছেন, জাতীয় গড় টিকাদানের হার দিয়ে পুরো পরিস্থিতি বোঝা যায় না। নির্দিষ্ট এলাকায় তৈরি হওয়া ‘টিকাবঞ্চিত পকেট’ থেকেই আবার হাম ছড়িয়ে পড়তে পারে।

বাংলাদেশের পরিস্থিতিকে বিশ্বজুড়ে হাম পুনরুত্থানের বৃহত্তর প্রবণতার অংশ হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে সায়েন্টিফিক আমেরিকানের প্রতিবেদনে।

Ad 300x250
লেটেস্ট
সর্বাধিক পঠিত

সম্পর্কিত