গণঅভ্যুত্থানের ২ বছর

প্রত্যাশা ও প্রাপ্তির হিসাব-নিকাশে ‘গরমিল’

স্ট্রিম গ্রাফিক

ক্ষমতার দাম্ভিকতার চূড়ান্ত বহিঃপ্রকাশ দেখিয়ে ছাত্র-জনতার উত্তাল আন্দোলনের মধ্যেও তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী বলেছিলেন, ‘শেখ হাসিনা পালায় না’। অথচ গণআন্দোলনের দুর্বার শক্তির সামনে দাঁড়াতে না পেরে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট দেশ ছাড়তে বাধ্য হন শেখ হাসিনা।

সেই রক্তস্নাত গণঅভ্যুত্থানের সফল পরিণতির দ্বিতীয় বর্ষপূর্তি আজ। দুই বছর আগে এই দিনেই গণজোয়ারের মুখে প্রধানমন্ত্রীর পদ ছেড়ে ভারতে পালিয়ে যান শেখ হাসিনা। অবসান ঘটে দীর্ঘ প্রায় ১৬ বছরের একনায়কতান্ত্রিক ও ফ্যাসিবাদী শাসনের।

সহস্রাধিক শহীদের রক্ত আর অগণিত মানুষের অঙ্গহানির বিনিময়ে পাওয়া এই নতুন বাংলাদেশকে ঘিরে জনপ্রত্যাশার পারদ ছিল অনেক চড়া। একটি বৈষম্যহীন, গণতান্ত্রিক ও ইনসাফভিত্তিক রাষ্ট্র গড়ার স্বপ্ন নিয়ে রাজপথে নেমেছিল মানুষ।

দুই বছর পর আজ সেই ঐতিহাসিক দিনটির স্মরণ ক্ষণে রাজনৈতিক নেতাদের কণ্ঠে যেমন ঐক্য ধরে রাখার আহ্বান শোনা যাচ্ছে, তেমনি বিশ্লেষকদের কথায় উঠে আসছে প্রত্যাশা ও প্রাপ্তির মধ্যকার বিস্তর ফারাকের হতাশাবাণী।

শেখ হাসিনার পতন কেন অনিবার্য ছিল

সরকারি চাকরিতে কোটা সংস্কার দাবিতে ২০২৪ সালের ১ জুলাই শুরু হওয়া আন্দোলন ধীরে ধীরে সরকার পতনের এক দফা দাবিতে রূপ নেয়। জাতিসংঘের হিসাবে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও সরকার দলীয় ক্যাডারদের নির্বিচার গুলিতে প্রায় ১ হাজার ৪০০ মানুষ নিহত ও ২০ হাজারের বেশি মানুষ আহত হন।

আন্দোলনের চূড়ান্ত পর্যায়ে ৫ আগস্ট ‘মার্চ টু ঢাকা’ কর্মসূচিতে লাখো মানুষ সরকারের জারিকৃত কারফিউয়ের রক্তচক্ষু উপেক্ষা করে রাজপথে নেমে আসে। সেই গণজোয়ার এতই প্রকট ছিল যে, হুমকির মুখে পড়ে যায় গণভবনের নিরাপত্তাও। শেষ পর্যন্ত ছোট বোন শেখ রেহানাকে নিয়ে সামরিক হেলিকপ্টারে করে দেশ ছাড়েন শেখ হাসিনা। গণভবন দখলে নেয় জনতা।

দীর্ঘ শাসনামলে গুম, খুন ও আয়নাঘরের মতো গোপন বন্দিশালা তৈরি এবং ২০১৪, ২০১৮ ও ২০২৪ সালের প্রহসনের নির্বাচনের মাধ্যমে গণতান্ত্রিক দেশে মানুষের ভোটাধিকার হরণ করেছিলেন হাসিনা। এই পুঞ্জীভূত ক্ষোভেরই চূড়ান্ত বিস্ফোরণ ঘটেছিল ৫ আগস্ট। বর্তমানে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে জুলাই-আগস্ট গণহত্যার বিচার চলছে। এরই মধ্যে কয়েকটি মামলার রায়ও ঘোষণা হয়েছে।

কী বলছেন নেতারা

দ্বিতীয় বর্ষপূর্তি উপলক্ষে রাজনৈতিক দলগুলোর শীর্ষ নেতারা শহীদদের আত্মত্যাগের কথা স্মরণ করে জাতীয় ঐক্য ধরে রাখার আহ্বান জানিয়েছেন।

প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান তার ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজে দেওয়া এক বার্তায় বলেছেন, ‘হাজার শহীদের রক্তে স্নাত রাজপথে যে অভূতপূর্ব জাতীয় ঐক্য গড়ে উঠেছে, তা যেকোনো মূল্যে রক্ষা করা সবার দায়িত্ব।’

তিনি আরও বলেন, ‘৫ আগস্টের ঘটনা বিশ্বের ইতিহাসে নজিরবিহীন। এখন শহীদদের প্রতি ঋণ পরিশোধের পালা। সাম্য, মানবিক মর্যাদা ও সামাজিক সুবিচার প্রতিষ্ঠার মাধ্যমেই কেবল এই ঋণ শোধ করা সম্ভব।’ বাংলাদেশে আর কখনোই স্বৈরাচার বা উগ্রবাদ কায়েম হতে দেওয়া হবে না বলেও দৃঢ় প্রত্যয় ব্যক্ত করেন তিনি।

এক আলোচনা সভায় স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, ‘জুলাইয়ের রক্তের ঋণ শোধ হবে জনগণের অধিকার প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে। যারা গণতন্ত্রের জন্য জীবন দিয়েছেন, তাদের স্বপ্ন বাস্তবায়নের দায়িত্ব আমাদের সবার।’ তিনি জানান, সরকার জুলাই সনদ বাস্তবায়নে কাজ শুরু করেছে।

অন্যদিকে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান এক বার্তায় আক্ষেপ প্রকাশ করে বলেন, ‘অত্যন্ত দুঃখভারাক্রান্ত হৃদয়ে বলতে হচ্ছে, একটি মহলের কারণে আমরা শহীদদের প্রত্যাশা আজও পূরণ করতে পারিনি। এখনো আমাদের লড়াই চালিয়ে যেতে হচ্ছে। একটি বৈষম্যহীন, পূর্ণাঙ্গ গণতান্ত্রিক ও ইনসাফপূর্ণ বাংলাদেশ গড়তে পারলে শহীদদের রক্তের ঋণ আংশিক পরিশোধ হবে।’

এদিকে প্রত্যাশা পূরণ না হওয়ার আক্ষেপ শোনা গেছে জুলাই আন্দোলনের নেতৃত্বে থাকা রাজনৈতিক অঙ্গনে তুলনামূলক নবীনদের কণ্ঠেও। গণঅভ্যুত্থানের দুই বছর পূর্তির প্রাক্কালে বর্তমান সরকারের কঠোর সমালোচনা করেছেন জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আহ্বায়ক ও বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ মো. নাহিদ ইসলাম।

গত ৩ আগস্ট রাজধানীর কাকরাইলে ইনস্টিটিউট অব ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ার্স মিলনায়তনে এনসিপি আয়োজিত ‘শহীদ পরিবার ও আহতদের কণ্ঠে জনতার ১ দফা’ শীর্ষক আলোচনা সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে নাহিদ ইসলাম ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ‘এক দফা দাবি আংশিক অর্জিত হয়েছে, পুরোপুরি নয়। শেখ হাসিনার পদত্যাগ ও ফ্যাসিবাদী ব্যবস্থার পতন— যুগপৎভাবে এ দুটিই ছিল এক দফার অংশ। কিন্তু দেশে এখনো সেই কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তন আসেনি।’

সরকারের সমালোচনা করে তিনি বলেন, ‘এক দফা পুরোপুরি বাস্তবায়িত হলে পুলিশসহ সব প্রতিষ্ঠানে দলীয়করণ হতো না। গ্রামে গ্রামে চাঁদাবাজি, দুর্নীতি হতো না। চুলায় গ্যাস নেই, ঘরে ঘরে বিদ্যুৎ নেই। দেশে কোনো পরিবর্তন হয়নি। পরিবর্তন একটাই হয়েছে, তারেক রহমান লন্ডন থেকে এসে প্রধানমন্ত্রী হয়েছেন।’

কতটা পূরণ হলো জনতার প্রত্যাশা

গত দুই বছরে জনগণের প্রত্যাশা কতটা পূরণ হয়েছে, তা নিয়ে সমাজে মিশ্র প্রতিক্রিয়া রয়েছে। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সরকার ও রাজনীতি বিভাগের অধ্যাপক কেএম মহিউদ্দিন এই দুই বছরের সামগ্রিক পরিস্থিতির একটি বিশ্লেষণ তুলে ধরেছেন।

অধ্যাপক মহিউদ্দিনের মতে, গণঅভ্যুত্থান-পরবর্তী সময়ে শ্রেণি, পেশা ও সামাজিক অবস্থান নির্বিশেষে জনগণের কিছু অভিন্ন মৌলিক প্রত্যাশা ছিল। সাধারণভাবে মানুষের প্রধান প্রত্যাশা ছিল দেশে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা প্রতিষ্ঠিত হবে, জাতীয় সংসদ কার্যকর ভূমিকা পালন করবে, সরকারের কর্মকাণ্ডে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত হবে এবং আইনের শাসন প্রতিষ্ঠিত হবে। একই সঙ্গে মানুষ আশা করেছিল দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণে আসবে, কর্মসংস্থানের সুযোগ বাড়বে এবং অর্থনীতিতে স্বস্তি ফিরে আসবে।

এই সাধারণ প্রত্যাশার পাশাপাশি বিভিন্ন শ্রেণি ও পেশাভিত্তিক গোষ্ঠীর নিজস্ব কিছু বিশেষ প্রত্যাশাও ছিল। তরুণদের বড় একটি অংশ চেয়েছিল অধিক অন্তর্ভুক্তিমূলক ও অংশগ্রহণমূলক রাজনৈতিক ব্যবস্থা। পেশাজীবীরা প্রত্যাশা করেছিলেন, রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা, নিরপেক্ষতা ও কার্যকারিতা বৃদ্ধি পাবে। ব্যবসায়ী মহল চেয়েছিল নীতিগত স্থিতিশীলতা ও বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ। আর সাধারণ মানুষ সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দিয়েছিল অর্থনৈতিক স্বস্তি ও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম নিয়ন্ত্রণে।

অধ্যাপক মহিউদ্দিনের মতে, গত দুই বছরের অর্জনের চিত্র তাই এককভাবে মূল্যায়ন করা কঠিন। কিছু ক্ষেত্রে অগ্রগতি হলেও মানুষের সামগ্রিক প্রত্যাশার বড় একটি অংশ এখনও অপূর্ণ রয়ে গেছে। তিনি বলেন, অন্তর্ভুক্তিমূলক সরকার গঠনের চেষ্টা করা হলেও সমাজের কিছু অংশ এখনো নিজেদের রাষ্ট্রীয় ও রাজনৈতিক পরিসর থেকে বিচ্ছিন্ন মনে করছে। একই সঙ্গে অর্থনৈতিক পরিস্থিতির উন্নয়ন ও প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারের ক্ষেত্রে দৃশ্যমান ও কাঙ্ক্ষিত অগ্রগতি না হওয়ায় মানুষের মধ্যে হতাশা তৈরি হয়েছে।

অধ্যাপক মহিউদ্দিনের মনে করেন, বর্তমান পরিস্থিতির অন্যতম উদ্বেগের বিষয় হলো কট্টর ডানপন্থী রাজনীতির উত্থান। তিনি বলেন, ‘গণঅভ্যুত্থানের পর কট্টর ডানপন্থী গোষ্ঠীগুলোর প্রভাব ও দৃশ্যমানতা বৃদ্ধি পেয়েছে, যা সমাজের একটি বড় অংশের কাছে উদ্বেগের কারণ হয়ে উঠেছে। শেখ হাসিনার সরকারের অবসান ঘটলেও এই ধরনের কট্টরপন্থী প্রবণতার বিস্তারের কারণে সাধারণ মানুষের মধ্যে নতুন করে উদ্বেগ ও বিতৃষ্ণার সৃষ্টি হয়েছে।’

Ad 300x250
লেটেস্ট
সর্বাধিক পঠিত

সম্পর্কিত