না খেয়ে জমানো অর্থে ফি, তবুও পরীক্ষা দিতে পারল না জান্নাতুল

>> সরকারি নিয়মে ৭ দিন আগে প্রবেশপত্র দেওয়ার কথা। কিন্তু বিতরণ পরীক্ষার দিন কেন্দ্রে

>> বাড়ি গিয়ে ছাত্রীর মাকে দুই হাজার টাকা দিয়ে মেটানোর চেষ্টা

>> মাদ্রাসার সুপার বললেন, এবার নয়, আগামী বছর পরীক্ষা দিও

স্ট্রিম সংবাদদাতা
স্ট্রিম সংবাদদাতা
রংপুর

শিক্ষকদের গাফিলতির কারণে প্রবেশপত্র পায়নি জান্নাতুল ফেরদৌস। স্ট্রিম ছবি

সংসার চালাতে হিমশিম রিকশাচালক জিয়াউর রহমানের। তবুও মেয়ের পড়ালেখা থামাননি তিনি। কারণ, মেয়ের মধ্যে পেয়েছিলেন পড়ালেখা করে মানুষ হওয়ার জেদ। মেয়ে জান্নাতুল ফেরদৌসের দাখিল পরীক্ষায় অংশ নেওয়ার স্বপ্নপূরণে টানা এক মাস সংসারের একবেলার খাবার কমিয়ে দেন জিয়াউর।

জমানো সেই অর্থে ফরম পূরণ করলেও গতকাল মঙ্গলবার থেকে শুরু হওয়া পরীক্ষা দিতে পারেনি জান্নাতুল। সকালে মা-বাবার দোয়া নিয়ে রংপুরের মিঠাপুকুরের শঠিবাড়ি ইসলামিয়া আলিম মাদ্রাসা পরীক্ষা কেন্দ্রে পৌঁছে তার মাথায় আকাশ ভেঙে পড়ে। শিক্ষকেরা সবার প্রবেশপত্র দিলেও, কিছুক্ষণ পরে জান্নাতুল জানতে পারে, তার প্রবেশপত্র আসেনি।

কেন আসেনি, সে ব্যাখ্যা শিক্ষকেরা দেননি। সমাধান বের না করে রংপুর মিঠাপুকুরের বুজর্গ সন্তোষপুর কারামতিয়া ফাজিল মাদ্রাসার সুপার একে মোনায়েম সরকার এই বছর নয়, আগামী বছর পরীক্ষা দিতে বলেন বিজ্ঞান বিভাগের ছাত্রী জান্নাতুলকে।

এই কথা জেনে সেখানেই কান্নায় ভেয়ে পড়ে মিঠাপুকুরের বালুয়া মাসুমপুর ইউনিয়নের সন্তোষপুর গ্রামের এই কিশোরী। সরেজমিন বিকেলে সন্তোষপুর গ্রামে জান্নাতুলের বাড়িতেও পাওয়া যায় ‘শোকের’ আবহ। কান্না করছে জান্নাতুল, মা-বাবার কোনো সান্ত্বনা কাজে আসছে না।

এ সময় জান্নাতুল বলে, আমাদের মাদ্রাসার সবার প্রবেশপত্র পরীক্ষা কেন্দ্রে দেওয়া হয়। এজন্য সবার কাছ থেকে ৫০০ টাকা নেওয়া হয়। সবাই প্রবেশপত্র পেলেও আমি পাইনি। স্যারদের কারণে আমি পরীক্ষা দিতে পারলাম না।

জান্নাতুলের ভাষ্যে, প্রবেশপত্র না পাওয়ায় শঠিবাড়িতে প্রিন্সিপালের কাছে আমাকে নিয়ে যাওয়া হয়। তখন প্রিন্সিপাল স্যার বলেন– ‘মা এ বছর তোমার পরীক্ষা দেওয়া হলো না। সামনের বছর দিতে যা খরচ হবে, সব আমি দেব’। স্যারের কথা শুনে আমার এমন অবস্থা হইছে, গাড়ির নিচে মাথা ঢুকাই দিতে ধরছিলাম। পরে রবিউল হুজুর ও মাদ্রাসার দপ্তরি বাদল ভাই আমাকে বাড়িতে রেখে যান। তাঁরা আমার আম্মুকে টাকা দিতে চাইছিল দুই হাজার। আম্মু নেয় নাই। স্যারেরা তো টাকা দিয়ে আমার এক বছর ফিরিয়ে দিতে পারবে না।

জান্নাতুলের মা এসমোতারা বলেন, পরীক্ষার ফরম পূরণের সময় আমাদের কাছে ৩ হাজার টাকা চাইছিল। আমরা ২ হাজার ৩০০ টাকায় ফরম পূরণ করি। এই টাকা আমরা এক মাস একবেলা না খেয়ে জমাইছিলাম। সেই মেয়ে আমার পরীক্ষা দিতে পারল না।

তিনি বলেন, মেয়ে লেখাপড়া করে চিকিৎসক হবার চায়। সেই মেয়ের স্বপ্ন ভেঙে গেল। পরীক্ষা দিতে পারল না। আমাকে শিক্ষকেরা দুই হাজার টাকা দেয়। আমি টাকা কি করি? আমার মেয়ের পরীক্ষা চাই।

জান্নাতুলের সহপাঠীরা জানায়, পরীক্ষার দিন প্রবেশপত্র দেওয়ায় খুব সকালে তারা তাড়াহুড়ো করে কেন্দ্রে যায়। সেখানে সবাই ৫০০ টাকা করে দিয়ে প্রবেশপত্র নেয়।

মাদ্রাসার সুপার একে মোনায়েম সরকার বলেন, জান্নাতুলের ফরম পূরণের টাকা আমি শিক্ষক আশিকুর রহমানকে দিয়েছিলাম। তিনি বিষয়টি আমাদের জানাননি। কমিটিসহ বসে ওই শিক্ষককের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেব। এবার যেহেতু পরীক্ষা দিতে পারেনি, আগামী বছর আমরা তার পরীক্ষার সব খরচ দেব।

পরীক্ষার দিন প্রবেশপত্র দেওয়ার বিষয়ে তিনি বলেন, আমি সোমবার পর্যন্ত ঢাকায় ছিলাম। এজন্য প্রবেশপত্র পরীক্ষার কেন্দ্রে বিতরণ করা হয়েছে। তাছাড়া ৪৯ শিক্ষার্থীর বিপরীতে সবার প্রবেশপত্র পাওয়ার তথ্য ছিল। পরে দেখা গেল, জান্নাতুলের প্রবেশপত্র আসেনি।

উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. পারভেজ বলেন, সরকারিভাবে সাত দিন আগে প্রবেশপত্র বিতরণের কথা। তখন কোনো সমস্যা হলে, সমাধান করা যায়। জান্নাতুল ফেরদৌসের বিষয় প্রতিষ্ঠানপ্রধানের ব্যর্থতায় ঘটেছে। তিনি কোনোভাবে এর দায় এড়াতে পারেন না।

তিনি বলেন, বিষয়টি মঙ্গলবার বিকেলে আমি জানতে পেরেছি। এ ঘটনায় তদন্ত কমিটি হবে। যার অবহেলা আছে, গাফিলতি আছে, আমরা তাঁর বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেব।

সম্পর্কিত