জাতীয় সংসদ নির্বাচন ২০২৬

ও গণভোট

ক্লিক করুন

গণতান্ত্রিক অধিকার কমিটির সেমিনার

যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে চুক্তি ‘দাসত্বের দলিল’, বাতিল দাবি

স্ট্রিম প্রতিবেদক
স্ট্রিম প্রতিবেদক
ঢাকা

ইআরএফ মিলনায়তনে আয়োজিত ‘গণতান্ত্রিক অধিকার কমিটি’র সেমিনারে বক্তারা। ছবি: সংগৃহীত

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের তিন দিন আগে (৯ ফেব্রুয়ারি) যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে অন্তর্বর্তী সরকারের স্বাক্ষরিত বাণিজ্য ও বিনিয়োগ চুক্তিকে ‘অসম’, ‘ঔপনিবেশিক দাসত্বের দলিল’ এবং ‘সংবিধান পরিপন্থী’ বলে আখ্যায়িত করেছে ‘গণতান্ত্রিক অধিকার কমিটি’।

শুক্রবার (১৩ মার্চ) বেলা সাড়ে ১১টার দিকে রাজধানীর বিজয়নগরে ইকোনমিক রিপোর্টার্স ফোরাম (ইআরএফ) মিলনায়তনে আয়োজিত ‘যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্য চুক্তি কেন বাংলাদেশের জন্য বিপজ্জনক?’ শীর্ষক সেমিনারে বক্তারা এসব কথা বলেন। তাঁরা আশঙ্কা প্রকাশ করেন যে চুক্তির শর্তগুলো বাস্তবায়িত হলে দেশের অর্থনীতি, দেশীয় শিল্প এবং কৃষিখাতে ভয়াবহ ধস নামবে। একই সঙ্গে দেশের সার্বভৌমত্ব রক্ষায় অবিলম্বে নতুন নির্বাচিত সংসদের মাধ্যমে এই চুক্তি বাতিলের জোর দাবি জানান তাঁরা।

সেমিনারে সভাপতিত্ব করেন অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক আনু মুহাম্মদ। মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন ড. গোলাম রসুল। প্যানেল আলোচক হিসেবে উপস্থিত ছিলেন সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ব্যারিস্টার জ্যোতির্ময় বড়ুয়া, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ড. মোশাহিদা সুলতানা এবং গবেষক ড. মাহা মির্জা।

সভাপতির সমাপনী বক্তব্যে অধ্যাপক আনু মুহাম্মদ অন্তর্বর্তী সরকারের সমালোচনা করে বলেন, “যাঁরা দেশের জনগণ, ব্যবসায়ী বা রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে কোনো আলোচনা ছাড়াই গোপনে এই চুক্তি স্বাক্ষর করে দেশের স্বার্থ বিকিয়ে দিয়েছেন, তাঁরা গণশত্রু। বিদেশি প্রভুদের নির্দেশে কাজ করা এসব ব্যক্তিদের বিচার হওয়া উচিত।”

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সম্প্রতি দেওয়া ‘সবার আগে বাংলাদেশ’ স্লোগানের প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, “এই চুক্তির ক্ষেত্রে সেই স্লোগানের আসল পরীক্ষা হবে। যদি সত্যিই ‘সবার আগে বাংলাদেশ’ নীতিতে বিশ্বাস করা হয়, তবে নতুন নির্বাচিত সরকারকে অবিলম্বে সংসদে এই চুক্তি উত্থাপন করে তা বাতিল করতে হবে। নতুন সংসদ যদি এই চুক্তি বাতিলে ব্যর্থ হয়, তবে তা হবে জাতির সঙ্গে চরম বিশ্বাসঘাতকতা।” তিনি দেশের সম্পদ রক্ষায় দেশবাসীকে ঐক্যবদ্ধ প্রতিরোধের ডাক দেন।

মূল প্রবন্ধ উপস্থাপনায় ড. গোলাম রসুল চুক্তির ঝুঁকি তুলে ধরে বলেন, “এটি সম্পূর্ণ একতরফা চুক্তি। বাংলাদেশ যুক্তরাষ্ট্রকে ‘জিরো-ট্যারিফ’ (শূন্য শুল্ক) সুবিধা দিলেও যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশের প্রধান রপ্তানি খাত তৈরি পোশাকের ওপর তাদের ১৬ শতাংশ শুল্ক প্রত্যাহার করেনি। যুক্তরাষ্ট্র থেকে তুলা আমদানিতে শুল্কমুক্ত সুবিধার কথা বলা হলেও তাতে এত শর্ত জুড়ে দেওয়া হয়েছে যে গার্মেন্টস মালিকরাই এর লাভ নিয়ে সন্দিহান।”

তিনি আরও জানান, চুক্তির শর্ত অনুযায়ী আগামী ৫ বছরে বাজারদরের চেয়ে অনেক বেশি মূল্যে যুক্তরাষ্ট্র থেকে ২২ বিলিয়ন ডলারের সামরিক সরঞ্জাম, ১৪টি বোয়িং বিমান, এলএনজি, তুলা ও সয়াবিন কিনতে বাধ্য থাকবে বাংলাদেশ। বিরোধ নিষ্পত্তির ক্ষেত্রে ডব্লিউটিও-এর বদলে যুক্তরাষ্ট্রের নিজস্ব মেকানিজম এবং ‘জিএমও’ বীজ ও প্যাটেন্ট আইনের বাধ্যবাধকতার ফলে দেশীয় ফার্মাসিউটিক্যালস শিল্প ধ্বংসের পাশাপাশি দেশের সার্বভৌমত্ব মারাত্মকভাবে ক্ষুণ্ণ হবে।

কৃষি ও দুগ্ধ শিল্পের পরিণতির কথা তুলে ধরে ড. মাহা মির্জা বলেন, “যুক্তরাষ্ট্র থেকে শূন্য শুল্কে দুধ, মাখন, পনির, গুঁড়ো দুধ এবং হিমায়িত মাংস দেশে প্রবেশ করলে স্থানীয় পোল্ট্রি ও দুগ্ধ শিল্প পুরোপুরি ধ্বংস হয়ে যাবে। এর ফলে গ্রামীণ অর্থনীতির সঙ্গে যুক্ত ৬৫ থেকে ৭০ লাখ মানুষ, বিশেষ করে নারীরা কর্মহীন হয়ে পড়বেন।” তিনি জানান, যুক্তরাষ্ট্রের কৃষকরা বিপুল ভর্তুকি পেলেও চুক্তির কারণে বাংলাদেশ তার দেশীয় কৃষকদের কোনো ভর্তুকি বা বিদেশি পণ্যের ওপর রেগুলেটরি বাধা দিতে পারবে না।

ভূ-রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট বিশ্লেষণ করে ড. মোশাহিদা সুলতানা বলেন, “যুক্তরাষ্ট্রের ম্যানুফ্যাকচারিং খাত সংকুচিত হওয়ায় তারা এখন জোরপূর্বক বিভিন্ন দেশের বাজার দখলের চেষ্টা করছে। এটি স্পষ্টতই একটি দাসত্বের চুক্তি।”

চুক্তিটির আইনি বৈধতা নিয়ে ব্যারিস্টার জ্যোতির্ময় বড়ুয়া বলেন, “অন্তর্বর্তী সরকারের এ ধরনের দীর্ঘমেয়াদি আন্তর্জাতিক চুক্তি স্বাক্ষরের কোনো ম্যান্ডেট ছিল না। সংবিধানের ১৪৫(ক) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী বিদেশের সাথে হওয়া কোনো চুক্তি রাষ্ট্রপতির মাধ্যমে সংসদে উপস্থাপন করার বাধ্যবাধকতা রয়েছে। কিন্তু এই চুক্তিটি সম্পূর্ণ গোপনীয়তার সাথে করা হয়েছে, যা সরাসরি সংবিধানের লঙ্ঘন।”

বক্তারা আরও উল্লেখ করেন, শুল্ক ছাড়ের কারণে বাংলাদেশের প্রায় ১৫ হাজার কোটি টাকার রাজস্ব ক্ষতি হবে, যা দেশের ট্যাক্স-জিডিপি অনুপাতকে আরও তলানিতে নিয়ে যাবে। চট্টগ্রাম বন্দরের নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনাল নিয়ে চলমান তৎপরতাকেও দেশের সক্ষমতা ধ্বংসের ষড়যন্ত্র বলে আখ্যায়িত করেন তাঁরা।

বিষয়:

আলোচনা

সম্পর্কিত