বৃষ্টি-বন্যায় বিপর্যস্ত দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া, বাড়ছে প্রাণহানি

স্ট্রিম ডেস্ক
স্ট্রিম ডেস্ক

প্রকাশ : ১১ জুলাই ২০২৬, ২২: ৪৮
সংগৃহীত ছবি।

আকস্মিক বন্যা ও ভূমিধসে চলতি মাসেই দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া অঞ্চলে অন্তত ১০৬ জনের মৃত্যু হয়েছে। শনিবার (১১ জুলাই) সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, টানা বৃষ্টি আর উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলে এখন পর্যন্ত শুধু বাংলাদেশেই মারা গেছেন ৩৯ জন।

শুধু বাংলাদেশে নয়, পুরো এশিয়া জুড়েই বন্যা পরিস্থিতি ভয়াবহ রূপ নিয়েছে। প্রতিবেশী দেশ ভারতের দিল্লি, হিমাচল ও অরুণাচল প্রদেশে বৃষ্টিজনিত দুর্যোগে প্রাণ হারিয়েছেন অন্তত ১০ জন। মিয়ানমারের রাখাইন ও চিন রাজ্যে বন্যায় ৩ জনের মৃত্যু হয়েছে। দক্ষিণ চীনের গুয়াংজিতে একটি জলাধারের বাঁধ ভেঙে ৩৯ জনের প্রাণহানি ঘটেছে। ফিলিপাইনে শক্তিশালী টাইফুন ‘বাভি’র প্রভাবে সৃষ্ট ভূমিধসে অন্তত ১৫ জনের মৃত্যু হয়েছে।

শ্রীলঙ্কা, পাকিস্তান ও নেপালেও আকস্মিক বন্যা ও ভূমিধসের শঙ্কা রয়েছে বলে সতর্ক করেছে আবহাওয়া সংক্রান্ত সংস্থাগুলো।

খামখেয়ালি মৌসুমি বায়ু ও চরম বিপদের শঙ্কা

হিন্দুকুশ হিমালয় অঞ্চলের দেশগুলো এখন ভয়াবহ পরিস্থিতির মুখে দাঁড়িয়ে আছে। ইন্টারন্যাশনাল সেন্টার ফর ইন্টিগ্রেটেড মাউন্টেন ডেভেলপমেন্টের (ইসিমোড) পূর্বাভাস অনুযায়ী, এ বছর দক্ষিণ এশিয়ায় মৌসুমি বৃষ্টিপাত সার্বিকভাবে স্বাভাবিকের চেয়ে কম হওয়ার কথা রয়েছে। সাধারণ মানুষ ভাবতে পারে কম বৃষ্টি মানে বন্যার ঝুঁকিও কম। বিজ্ঞানীদের মতে এই ধারণা সম্পূর্ণ ভুল।

ইসিমোডের দুর্যোগ ঝুঁকি হ্রাস বিশেষজ্ঞ শাশ্বত সান্যাল জানিয়েছেন, এল নিনোর প্রভাবে এই অঞ্চলে দীর্ঘ শুষ্ক আবহাওয়া বিরাজ করছে। সেই শুষ্কতার মাঝেই হঠাৎ করে প্রচণ্ড ভারী বৃষ্টিপাত হচ্ছে। এই ধরনের খামখেয়ালি বৃষ্টিই আকস্মিক বন্যা ও ভূমিধস ডেকে আনছে।

জলবায়ু বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলছেন, ভারত মহাসাগর ও বঙ্গোপসাগরের পৃষ্ঠের তাপমাত্রা অস্বাভাবিক হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। এর ফলে মৌসুমি বায়ুর আচরণ সম্পূর্ণ বদলে গেছে। বৈশ্বিক উষ্ণায়নের কারণে বায়ুমণ্ডলে আগের চেয়ে অনেক বেশি জলীয় বাষ্প জমা হচ্ছে। এই জলীয় বাষ্প হঠাৎ ঘনীভূত হয়ে নির্দিষ্ট কিছু এলাকায় 'ক্লাউডবার্স্ট' বা মেঘভাঙা বৃষ্টির সৃষ্টি করছে। দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর দুর্বল অবকাঠামো এবং অপরিকল্পিত নগরায়ণ এই বিপুল পরিমাণ বৃষ্টির পানি সামলাতে মোটেও প্রস্তুত নয়।

ওয়ার্ল্ড মেটিওরোলজিক্যাল অর্গানাইজেশনের (ডব্লিউএমও) সাম্প্রতিক সতর্কতা অনুযায়ী, চরম ভাবাপন্ন এই আবহাওয়া আগামী বছরগুলোতে এই অঞ্চলে আরও ঘন ঘন আঘাত হানবে।

একযোগে খরা ও বন্যার অদ্ভুত ফাঁদ

ইসিমোডের জলবিজ্ঞানী মনীশ শ্রেষ্ঠ এবং রিমোট সেন্সিং বিশেষজ্ঞ শের মুহাম্মদদের মতে, পাহাড়ি এলাকা ও নদী অববাহিকায় বিপদ এখন একে অপরের সঙ্গে মিলে যাচ্ছে। তীব্র গরমের কারণে হিমালয়ের হিমবাহ দ্রুত গলছে। সেই গলা পানির সঙ্গে যোগ হচ্ছে মেঘভাঙা প্রবল বৃষ্টিপাত। এর ফলে নদীর পানি ধারণক্ষমতার বাইরে চলে যাচ্ছে।

বিজ্ঞানীরা বলছেন, এই অঞ্চলের দেশগুলো এখন শুধু বন্যা মোকাবিলার কথা ভাবলে চলবে না। একই সঙ্গে খরা, দাবদাহ ও ভূমিধসের মতো দুর্যোগ সামাল দেওয়ার প্রস্তুতি নিতে হবে। বিপদের ধরন বদলে যাওয়ায় পুরোনো ধাঁচের দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা দিয়ে এই পরিস্থিতি সামাল দেওয়া অসম্ভব হয়ে পড়বে।

আগামী দিনগুলোতে আরও বড় দুর্যোগের শঙ্কা

ভিয়েতনামের আবহাওয়া দপ্তর ১৯ থেকে ২৩ জুলাইয়ের মধ্যে উত্তরাঞ্চলে প্রবল আকস্মিক বন্যার সতর্কতা জারি করেছে। সেখানে একটি ট্রপিক্যাল ডিপ্রেশন বা লঘুচাপ থেকে শক্তিশালী ঘূর্ণিঝড় তৈরি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। পাহাড়ি মাটি বৃষ্টির পানিতে আগে থেকেই ভিজে থাকায় সেখানে ভূমিধসের সর্বোচ্চ সতর্কতা জারি করা হয়েছে।

তাইওয়ান ও চীনের দিকে ধেয়ে যাচ্ছে সুপার টাইফুন বাভি। প্রায় এক হাজার কিলোমিটার বিস্তৃতির এই টাইফুন ভয়াবহ ধ্বংসযজ্ঞ চালাতে পারে। চীনের উত্তরাঞ্চলীয় প্রদেশগুলোতে এর মারাত্মক প্রভাব পড়তে পারে বলে সতর্ক করেছেন দেশটির জন ও পরিবেশ বিষয়ক ইনস্টিটিউটের পরিচালক মা জুন।

নেপালের অবস্থাও উদ্বেগজনক। দেশটিতে ছোট নদীগুলোর পানি বেড়ে আকস্মিক বন্যার মাঝারি ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যেও নদীর পানি বেড়ে যাওয়ায় বহু বাড়িঘর নদীগর্ভে বিলীন হওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে।

তথ্যসূত্র: দ্য হিন্দু, ইসিমোড ও রয়টার্স

Ad 300x250

সম্পর্কিত