টানা বর্ষণে নাকাল দেশ, ত্রাণ পাচ্ছেন না দুর্গতরা

স্ট্রিম ডেস্ক
স্ট্রিম ডেস্ক

টানা বর্ষণে সৃষ্ট বন্যায় পানিবন্দি রাঙামাটির বহু মানুষ। প্রশাসন দুর্গম এলাকায় ত্রাণ পৌঁছাতে পারছে না। স্ট্রিম ছবি

টানা বর্ষণে নাকাল দেশ। এর মধ্যে পাহাড়ি ঢলে সৃষ্ট বন্যায় চট্টগ্রাম বিভাগের পাঁচ জেলায় পানিবন্দি লাখো মানুষ। দুর্গতরা পর্যাপ্ত ত্রাণ পাচ্ছেন না বলে অভিযোগ করেছেন। আবার বন্যার পানির তোড়ে সড়ক ভেঙে গেছে। ফলে বিচ্ছিন্ন এলাকায় সড়ক যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে। এর মধ্যে চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, খাগড়াছড়ি, রাঙামাটি ও বান্দরবানে অসংখ্য মানুষ দুর্বিষহ দিন কাটাচ্ছেন।

দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের হালনাগাদ তথ্যে জানানো হয়েছে, বন্যা ও পাহাড়ধসে এখন পর্যন্ত ৪৩ জনের মৃত্যু হয়েছে। প্লাবিত হয়েছে ৫২টি উপজেলার কয়েকশ ইউনিয়ন। ক্ষতিগ্রস্ত জেলাগুলোতে উদ্ধার, ত্রাণ এবং পুনর্বাসনে সরকার সমন্বিতভাবে কাজ করছে বলে জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের মুখপাত্র মাহদী আমিন।

শনিবার (১১ জুলাই) প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে দেশের বন্যা পরিস্থিতি নিয়ে ব্রিফিংয়ে তিনি বলেন, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান নিজে সার্বক্ষণিক পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছেন। ক্ষতিগ্রস্তদের জন্য ইতোমধ্যে ২ কোটি টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি খাদ্য, ত্রাণসামগ্রী ও চাল বিতরণ চলছে। ক্ষতিগ্রস্ত ঘরবাড়ি পুনর্নির্মাণের পাশাপাশি কৃষি, মৎস্য ও গবাদিপশু খাতের ক্ষয়ক্ষতি কাটিয়ে উঠতে পুনর্বাসন কর্মসূচি নেওয়া হয়েছে।

চট্টগ্রামে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি

চট্টগ্রামের ১৬টি উপজেলায় ৭ লাখ ৫৯ হাজার ৫৩০ জন বন্যাকবলিত। পানিবন্দি পরিবারের সংখ্যা ১ লাখ ৮৮ হাজার ৬৪৮। বন্যা ও দেয়ালধসে ১১ জনের মৃত্যু হয়েছে এবং আহত হয়েছেন ১২ জন। বসতবাড়ি পানির নিচে চলে যাওয়ায় অনেকেই আশ্রয়কেন্দ্রে রয়েছেন।

জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের প্রাথমিক হিসাবে ১৫ হাজার ৯১১ হেক্টরের বেশি ফসলি জমি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। পাশাপাশি প্রায় ১০ হাজার পুকুর, দিঘি ও মৎস্য খামার থেকে মাছ ও পোনা ভেসে যাওয়ায় প্রায় ৯১ কোটি টাকার ক্ষতি হয়েছে।

কক্সবাজারে সর্বাধিক প্রাণহানি

মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, বন্যা ও পাহাড়ধসে সবচেয়ে বেশি প্রাণহানি হয়েছে কক্সবাজারে। জেলাটিতে এই দুর্যোগে ২৩ জনের মৃত্যু হয়েছে। নিহতদের মধ্যে ১০ জন স্থানীয় বাসিন্দা এবং ১৩ জন রোহিঙ্গা। আহত হয়েছেন আরও ২৪ জন।

শুক্রবারের তুলনায় শনিবার (১১ জুলাই) জেলার বন্যা পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি হয়েছে। তবে আবহাওয়া অধিদপ্তর রোববার দুপুর পর্যন্ত চট্টগ্রাম ও কক্সবাজার অঞ্চলে ভারী থেকে অতিভারী বৃষ্টির পূর্বাভাস দিয়েছে। এতে নতুন করে পাহাড়ধসের আশঙ্কার তথ্য জানিয়েছে। একইসঙ্গে চার দিন ধরে রেলপথ প্লাবিত থাকায় কক্সবাজারের সঙ্গে ঢাকা ও চট্টগ্রামের রেল যোগাযোগ বন্ধ রয়েছে। রোববার থেকে ট্রেন চলাচল স্বাভাবিক হতে পারে বলে জানা গেছে।

রাঙামাটি ও বান্দরবানে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন, খাগড়াছড়িতে দুর্ভোগ

রাঙামাটি ও বান্দরবান সড়কের রাঙ্গুনিয়ার দুধপুকুরিয়া এলাকায় একটি সেতুর সংযোগসড়ক (অ্যাপ্রোচ) ধসে পড়ায় দুই জেলার মধ্যে সরাসরি সড়ক যোগাযোগ বন্ধ রয়েছে। সড়ক ও জনপথ বিভাগ জানিয়েছে, পানি কমলে সেখানে বেইলি সেতু স্থাপন করে যান চলাচল স্বাভাবিকে উদ্যোগ নেওয়া হবে।

রাঙামাটিতে বন্যায় তিনজনের মৃত্যু হয়েছে। জেলার ৯টি উপজেলায় পাঁচ হাজারের বেশি মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। অন্যদিকে, বান্দরবানে পাহাড়ধস ও ঢলের পানিতে ভেসে ৬ জনের মৃত্যু হয়েছে। সাতটি উপজেলায় প্রায় ১০ হাজার মানুষ বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন।

দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের হালনাগাদ তথ্যে জানানো হয়েছে, বন্যা ও পাহাড়ধসে এখন পর্যন্ত ৪৩ জনের মৃত্যু হয়েছে। প্লাবিত হয়েছে ৫২টি উপজেলার কয়েকশ ইউনিয়ন।

রাঙামাটির বিলাইছড়ির বন্যাকবলিত দুর্গম ফারুয়া ইউনিয়নে ত্রাণ বিতরণের জন্য রওনা দিয়েও পারেননি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা। তবে ইউনিয়ন পরিষদের মাধ্যমে বন্যার্তদের ২০০ প্যাকেট ত্রাণসামগ্রী দেওয়া হয়েছে। দুর্গতরা এই ত্রাণসামগ্রী ক্ষতিগ্রস্তদের জন্য পর্যাপ্ত নয় বলে জানিয়েছেন।

শনিবার বেলা ২টার দিকে ইঞ্জিনচালিত নৌকা নিয়ে বিলাইছড়ি উপজেলা সদর থেকে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ও তাঁর টিম রওনা হন। পথে রাইংখ্যং নদীর তীব্র স্রোতে পড়েন তারা। পরে উপজেলা সদরে ফিরে আসেন।

উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা জাকির হোসেন বলেন, ‘মূল নদীতে গিয়ে যে স্রোতে পড়েছি, তা ভয়ংকর। আমাদের নৌকা উল্টে যাওয়ার মতো অবস্থা। স্রোত না কমলে সেখানে যাওয়া সম্ভব নয়।’

রাঙামাটির বাঘাইছড়ি উপজেলা বিএনপির সভাপতি ওমর আলীর বিরুদ্ধে পিআইও কার্যালয়ে এসে উশৃঙ্খল আচরণ ও তাঁর অনুসারীদের বিরুদ্ধে হট্টগোলের অভিযোগে জিডি হয়েছে। উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা (পিআইও) সুপ্তশ্রী সাহা শনিবার থানায় জিডির আবেদন করেন।

জিডিতে তিনি উল্লেখ করেন, বিএনপি নেতা ওমর আলী উপজেলা সরকারি প্রকল্পের বিভিন্ন কাজে প্রভাব খাটানোর চেষ্টা করতেন এবং সর্বশেষ গত ২২ জুন দুপুরে অফিসে এসে উপজেলা প্রকল্পের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ নথির তথ্য চান। আমি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের অনুমতি ছাড়া দিতে অপারগতা জানালে তিনি ক্ষিপ্ত হন। এরই ধারাবাহিকতায় তাঁর অনুসারীরা গত ১০ জুলাই আমার অফিসে এসে বন্যার্তদের বিতরণের ত্রাণ তাদের দিতে বললে আমি রাজি হয়নি। এ সময় তারা দুর্ব্যবহার ও হট্টগোল করে চলে যান।

কক্সবাজারের বন্যা পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি হয়েছে। ছবি: সংগৃহীত
কক্সবাজারের বন্যা পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি হয়েছে। ছবি: সংগৃহীত

বাঘাইছড়ি থানার ওসি নাসির উদ্দীন মজুমদার জানান, পিআইও উপজেলা বিএনপির সভাপতির নাম উল্লেখ করে জিডির আবেদন করেছেন। বিষয়টি তদন্ত করা হচ্ছে।

অভিযোগ নাকচ করে ওমর আলী বলেন, আমাকে নিয়ে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ ষড়যন্ত্র করছে। আমি একজনের বিলের বিষয়ে কথা বলার জন্য পিআইওর রুমে যাই। সেখানে কোনো খারাপ আচরণ করিনি। জিডির বিষয় আমি অবগত। তদন্তে আমি অপরাধী হলে, আমার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিলে আপত্তি নেই।

ত্রাণ ও উদ্ধার কার্যক্রম

চট্টগ্রাম ও বাকি চার জেলার বন্যাদুর্গত মানুষের জন্য এক হাজার ১৩১টি আশ্রয়কেন্দ্র খোলা হয়েছে। সেখানে আশ্রয় নিয়েছেন মোট ৪৪ হাজার ৪৫৭ জন। গত ৭ জুলাই দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয় দেশের ৬৪ জেলার জন্য মোট ছয় হাজার ৯০০ টন চাল ও ৩ কোটি ৪৫ লাখ টাকা বরাদ্দ দেয়। এর মধ্যে বন্যাকবলিত পাঁচ জেলায় বিশেষ অগ্রাধিকার ভিত্তিতে ত্রাণ পাঠানো হয়েছে।

চট্টগ্রামের জন্য ৭০০ টন চাল ও ৪০ লাখ টাকা, কক্সবাজারের জন্য ৪৫০ টন চাল ও ৩০ লাখ টাকা এবং খাগড়াছড়ি, রাঙামাটি ও বান্দরবানের প্রতিটি জেলার জন্য ৪০০ টন চাল ও ২০ লাখ টাকা করে বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে।

Ad 300x250

সম্পর্কিত