চাঁদপুরে নিষেধাজ্ঞা, বৈশাখের চাহিদা মেটাচ্ছে ফেনী-বরিশাল-বরগুনার ইলিশ

মিজানুর রহমান
মিজানুর রহমান
ঢাকা

ইলিশ। স্ট্রিম গ্রাফিক

পহেলা বৈশাখ মানেই পান্তা-ইলিশ—এই ঐতিহ্য ঘিরে প্রতি বছরই বেড়ে যায় ইলিশের চাহিদা। তবে এবারের চিত্র আরেকটু ভিন্ন। চাঁদপুরে নিষেধাজ্ঞার কারণে সেখানকার ইলিশের সরবরাহ বন্ধ থাকায় বাজারে দাম আরও চড়া। ব্যবসায়ীরা বলছেন, চাঁদপুরের ইলিশের সরবরাহ বন্ধ থাকায় এবারের পহেলা বৈশাখে ইলিশের এই ঘাটতি কিছুটা পূরণ করছে ফেনী, বরিশাল, বরগুনা ও ভোলার নদীর ইলিশ।

রাজধানীর কারওয়ান বাজার ঘুরে দেখা যায়, এবছর বাজারের বড় ইলিশের সরবরাহ তেমন একটা নেই। যেসব ছোট ইলিশ উঠেছে, সেগুলোর দামও তুলনামূলক বেশি। পহেলা বৈশাখের দুদিন আগে ৩০০ থেকে ৩৫০ গ্রাম সাইজের ইলিশ বিক্রি হচ্ছে কেজিপ্রতি ১৪০০ টাকা দরে, ৪০০ থেকে ৪৫০ গ্রাম সাইজের ইলিশ ১৫৫০ টাকা এবং ৬০০ থেকে ৭০০ গ্রাম সাইজের ইলিশ ২ হাজার টাকা কেজিতে। আর ১ কেজি সাইজের ইলিশের দাম কেজিপ্রতি ৩ হাজার ৫০০ থেকে ৩ হাজার ৭০০ টাকায়।

ইলিশের এমন চড়া দামে হতাশ ক্রেতারা। ছেলেকে সঙ্গে নিয়ে কারওয়ান বাজারে ইলিশ কিনতে এসেছেন মো. আসাদুজ্জামান নামে এক বেসরকারি চাকরিজীবী। তিনি স্ট্রিমকে বলেন, ‘পহেলা বৈশাখের জন্য ছেলের আবদারে ইলিশ কিনতে এসেছি। বড় ইলিশ মাছের বাজারে সংকট। যে কয়েকটা আছে, দাম অনেক। ছেলেকে সঙ্গে নিয়ে এসেছি, এখন বেশি দামে হলেও ছোট ইলিশই কিনতে হবে।’

বৈশাখ উপলক্ষে দাম বেড়েছে

পহেলা বৈশাখকে ঘিরে ছোট-বড় সব সাইজের ইলিশের দাম বাড়তি। বিক্রেতারা বলছেন, সাইজভেদে প্রতি কেজিতে ২০০ থেকে ৩০০ টাকা পর্যন্ত দাম বেড়েছে। বড় সাইজের (১ কেজি বা তার বেশি) ইলিশে এই বৃদ্ধি ৪০০ থেকে ৫০০ টাকা পর্যন্ত।

কারওয়ান বাজারের মো. সালাম নামে এক মাছ বিক্রেতা বলেন, ‘বর্তমানে ইলিশের চাহিদা বেড়েছে। সরবরাহ তুলনামূলক কম। প্রতি কেজি ইলিশে ২০০ থেকে ৩০০ টাকা বেড়েছে। ৬০০ থেকে ৭০০ গ্রাম ইলিশের চাহিদা বেশি। সবধরনের ইলিশেরই দাম বেড়েছে, তবে কাঁচা (টাটকা) বড় ইলিশের দাম অনেক বেশি।’

চাঁদপুরে নিষেধাজ্ঞা

ইলিশের উৎপাদন বাড়ানো ও জাটকা সংরক্ষণের লক্ষ্যে ১ মার্চ থেকে ৩০ এপ্রিল পর্যন্ত চাঁদপুরের পদ্মা-মেঘনা নদীতে ইলিশসহ সব ধরনের মাছ ধরা নিষিদ্ধ করেছে সরকার। মতলব উত্তর উপজেলার ষাটনল থেকে হাইমচর উপজেলার চরভৈরবী পর্যন্ত প্রায় ৭০ কিলোমিটার এলাকা অভয়াশ্রম ঘোষণা করা হয়েছে। এ সময়ে মাছ ধরা, ক্রয়-বিক্রয়, পরিবহন ও মজুত নিষিদ্ধ।

চাঁদপুর জেলা মৎস্য কর্মকর্তা শ্রীবাস চন্দ্র চন্দ স্ট্রিমকে বলেন, ‘সরকারি নির্দেশে আমরা অভয়াশ্রম এরিয়াতে নিষেধাজ্ঞা দিয়েছি। অভিযান পরিচালনা করছি। ধরা পড়লে নিয়ম অনুযায়ী শাস্তি দিচ্ছি। নিষিদ্ধ এরিয়াতে শুধু মাছ ধরা না ইলিশ বিক্রিও শাস্তিযোগ্য অপরাধ।’

চাঁদপুর বড় স্টেশন বাজারের খন্দকার মৎস্য আড়তের স্বত্তাধিকারী ইরফাত খন্দকার বলেন, ‘আমাদের এখানে নিষেধাজ্ঞা চলছে। আড়তগুলোতে কাঁচা ইলিশ মাছ নেই। বাজারে যেসব মাছ চাঁদপুরের ইলিশ বলে বিক্রি হচ্ছে, ওগুলো ফ্রোজেন মাছ অথবা অন্য এলাকার।’

চাহিদা মেটাচ্ছে দক্ষিণাঞ্চল

চাঁদপুরের ইলিশ না থাকায় ঢাকার কারওয়ান বাজার, যাত্রাবাড়ীসহ দেশের বড় আড়তগুলোতে এখন বরিশাল, বরগুনা, ভোলা ও ফেনীর ইলিশ বিক্রি হচ্ছে। বরিশালের মেঘনা, তেঁতুলিয়া, আড়িয়াল খাঁ ও বিষখালী নদী এবং বরগুনার বিষখালী ও বলেশ্বর নদীতে ইলিশ ধরা পড়ছে। ভোলার মেঘনা, তেতুলিয়া, ইলিশা ও কালাবাদর নদীতেও মিলছে ইলিশ।

মৎস্য অধিদপ্তরের ইলিশ সম্পদ ব্যবস্থাপনা শাখার উপপরিচালক মো. আবুল কালাম আজাদ বলেন, ‘বৈশাখ উপলক্ষে ইলিশের চাহিদা অনান্য সময়ের চেয়ে বেশি থাকে। এসময় ব্যবসায়ীরা দাম বাড়িয়ে দেয়। দাম বাড়লেও প্রান্তিক পর্যায়ের জেলেরা এতে খুব বেশি লাভবান হয় না। বর্তমানে চাঁদপুর অঞ্চলের ইলিশ না থাকলেও বরিশাল, বরগুনা ও ফেনীর নদীগুলোতে ইলিশ পাওয়া যাচ্ছে। বাজারে এই অঞ্চলের ইলিশ পাওয়া যাচ্ছে।’

ফ্রোজেন ইলিশের দাম কিছুটা কম

টাটকা ইলিশের দাম বেশি হলেও ফ্রোজেন ইলিশ তুলনামূলক কম দামে বিক্রি হচ্ছে। যেখানে ১ কেজি টাটকা ইলিশ ৩ হাজার ৫০০ টাকা পর্যন্ত বিক্রি হচ্ছে, সেখানে ১ কেজি ২০০–৩০০ গ্রাম ওজনের ফ্রোজেন ইলিশ কেজিপ্রতি ২ হাজার থেকে ২ হাজার ২০০ টাকায় পাওয়া যাচ্ছে। বিক্রেতারা জানান, এসব মাছ মৌসুমে সংরক্ষণ করে রাখা হয়েছিল। তবে স্বাদ ও গন্ধে ফ্রেশ ইলিশের তুলনায় কিছুটা কম।

অনলাইনেও বাড়ছে চাহিদা

এখন বাজারের পাশাপাশি অনলাইন প্ল্যাটফর্মেও ইলিশ বিক্রি হচ্ছে। বাংলা নববর্ষ উপলক্ষে ফেসবুকভিত্তিক বিক্রেতাদের চাহিদা বেড়েছে। বিভিন্ন অনলাইন পেজে ৩০০ গ্রাম ইলিশ ১২৫০–১৩০০ টাকা, ৪০০–৫০০ গ্রাম ১৫৫০–১৬০০ টাকা, ৭০০–৮০০ গ্রাম ২৯৫০–৩০০০ টাকা এবং ১ কেজি ইলিশ ৩৬০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।

অনলাইন প্ল্যাটফর্ম ফিশ ভ্যালির স্বত্ত্বাধিকারী রাসেল হাওলাদার বলেন, ‘বৈশাখ উপলক্ষে আমাদের ইলিশের অর্ডার বেড়েছে। ইলিশ মাছের দাম সব সময়েই বেশি থাকে। বৈশাখ উপলক্ষে প্রতি কেজি মাছের দাম ২০০ থেকে ৩০০ টাকা বেড়েছে। এরপরেও চাহিদা অনেক।’

সম্পর্কিত