গাজীপুরে মুরগি ও ডিম উৎপাদনের খরচ বাড়াচ্ছে লোডশেডিং

স্ট্রিম সংবাদদাতা
স্ট্রিম সংবাদদাতা
গাজীপুর

প্রকাশ : ১২ আগস্ট ২০২৬, ১৬: ১২
পোল্ট্রি খাত সচল রাখতে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ প্রয়োজন

তীব্র গরমের মধ্যে দীর্ঘ সময় বিদ্যুৎ না থাকায় বিপাকে পড়েছেন গাজীপুরের পোল্ট্রি খামারিরা। পরিস্থিতি সামাল দিতে জেনারেটর চালাচ্ছেন অনেক খামারি। এতে বেড়ে যাচ্ছে মুরগি ও ডিম উৎপাদনের খরচ, যার প্রভাব রাজধানীর বাজারে পড়তে পারে বলে আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা।

খামারের শেডের ভেতরের তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণে সিলিং ফ্যান, এগজস্ট ফ্যান, পানি সরবরাহের যন্ত্র ইত্যাদি চালু রাখতে হয়। লোডশেডিংয়ে এসব যন্ত্র বন্ধ থাকায় শেডের ভেতর তাপমাত্রা বেড়ে যাচ্ছে। এতে মুরগি অসুস্থ হয়ে পড়ছে। কিছু ফার্মে মুরগি মারা যাওয়ার কথাও জানিয়েছে খামারিরা। অনেকে বিকল্প ব্যবস্থা হিসেবে জেনারেটর চালিয়ে যন্ত্রগুলো সচল রাখছেন।

খামারিরা জানান, অতিরিক্ত গরমের কারণে মুরগির খাবার গ্রহণ কমে যায়। এতে মুরগি দুর্বল হয়ে পড়ে, যার প্রভাব পড়ে ডিম উৎপাদনে। পাশাপাশি বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি বাড়ছে। ফলে ওষুধ ও ভিটামিনের খরচও বেড়েছে।

উপজেলার গোলাঘাট গ্রামের খামারি আবু তালেব জানান, ফ্যান ও ভেন্টিলেশন ব্যবস্থা বন্ধ হয়ে গেলে প্রচণ্ড গরমে মুরগিগুলো হাঁপাতে থাকে। দীর্ঘ সময় এমন পরিস্থিতি থাকলে মুরগি মারা যায় এবং ডিম উৎপাদন কমে যায়। শ্রীপুরের কোনো কোনো এলাকায় ২৪ ঘণ্টার মধ্যে ১৫ থেকে ১৮ ঘণ্টা পর্যন্ত বিদ্যুৎ থাকে না বলে জানান তিনি।

আবু তালেব জানান, আগে ১ হাজার মুরগির জন্য মাসে বিদ্যুৎবাবদ প্রায় ৩ থেকে ৪ হাজার টাকা খরচ হতো। এখন সেই খরচ বেড়েছে। জেনারেটর চালাতে ডিজেলের খরচ যোগ হয়েছে। সব মিলিয়ে উৎপাদন ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় প্রতিটি ডিমে দুই টাকা পর্যন্ত লোকসান হচ্ছে বলে জানান তিনি।

গাজীপুরের শ্রীপুর দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ডিম উৎপাদন এলাকা। উপজেলাটি থেকে প্রতিদিন ৫০ থেকে ৬০ লাখ ডিম রাজধানী ঢাকাসহ বিভিন্ন পাইকারি বাজারে সরবরাহ করা হয়। ফলে এই এলাকার উৎপাদন ব্যাহত হলে এর প্রভাব স্থানীয় বাজারের পাশাপাশি রাজধানীর বাজারেও পড়তে পারে।

খামারি জয়নাল আবেদীন বলেন, ‘পোল্ট্রি খামারে বিদ্যুৎ বিলাসিতা নয়, উৎপাদনের অপরিহার্য অংশ। বেশিদিন জেনারেটর চালিয়ে ব্যবসা করা কঠিন। বিদ্যুৎ সরবরাহ স্বাভাবিক না হলে ছোট খামারিরা বেশি বিপদে পড়বেন।’
ময়মনসিংহ পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি-২-এর শ্রীপুর জোনাল অফিসের উপ-মহাব্যবস্থাপক (ডিজিএম) আনোয়ারুল আলম বলেন, শ্রীপুর উপজেলা সদর অংশে রাজাবাড়ী ও রাজেন্দ্রপুর গ্রিড থেকে বিদ্যুৎ সরবরাহ করা হয়। এ অংশে বিদ্যুতের চাহিদা প্রায় ৫০ মেগাওয়াট। বর্তমানে ৪৫ থেকে ৫০ শতাংশ পর্যন্ত লোডশেডিং হচ্ছে। গড়ে চাহিদার তুলনায় ২৫ থেকে ৩০ শতাংশ বিদ্যুৎ কম পাওয়া যাচ্ছে।

ময়মনসিংহ পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি-২-এর মাওনা জোনাল অফিসের উপ-মহাব্যবস্থাপক (ডিজিএম) শান্তনু রায় বলেন, মাওনা জোনে বিদ্যুতের চাহিদা প্রায় ১২০ মেগাওয়াট। পুরো শ্রীপুর উপজেলায় চাহিদা প্রায় ২১২ মেগাওয়াট। তিনটি গ্রিড থেকে উপজেলায় বিদ্যুৎ সরবরাহ করা হয়। শ্রীপুর গ্রিডে বিদ্যুতের চাহিদা প্রায় ১০৫ মেগাওয়াট। পিক আওয়ারে সরবরাহ ঘাটতির কারণে প্রায় ২৫ শতাংশ লোডশেডিং হচ্ছে।

অন্যদিকে, গাজীপুর পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি-১-এর মহাব্যবস্থাপক (জিএম) আবুল বাশার আজাদ বলেন, তাঁদের জোনে মোট বিদ্যুতের চাহিদা প্রায় ৪৮৪ মেগাওয়াট। এর বিপরীতে সরবরাহ পাওয়া যাচ্ছে ৩১২ মেগাওয়াট। অর্থাৎ চাহিদার তুলনায় ১৭২ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ কম পাওয়া যাচ্ছে। এ কারণে গড়ে ৩০ শতাংশ লোডশেডিং দিতে হচ্ছে। এতে জেলায় গড়ে ৫ থেকে ৬ ঘণ্টা বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ থাকছে।

পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি-১ ও পিডিবি সূত্রে জানা গেছে, কালিয়াকৈরে প্রতিদিন বিদ্যুতের চাহিদা প্রায় ২০০ মেগাওয়াট। এর মধ্যে মৌচাক, তেলিরচালা ও চন্দ্রা এলাকার গার্মেন্টস ও টেক্সটাইল কারখানাগুলোর চাহিদাই ১২০ মেগাওয়াটের বেশি। কিন্তু জাতীয় গ্রিডে বিদ্যুৎ ঘাটতি ও গ্যাস সংকটের কারণে বর্তমানে সেখানে মাত্র ৬০ থেকে ৭০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ সরবরাহ পাওয়া যাচ্ছে।

কালিয়াকৈর পিডিবির নির্বাহী প্রকৌশলী জানান, চাহিদার তুলনায় প্রায় ৫০ শতাংশ বিদ্যুৎ পাওয়া যাচ্ছে। এ কারণে রেশনিংয়ের মাধ্যমে বিভিন্ন এলাকায় সংযোগ সচল রাখার চেষ্টা করা হচ্ছে।

তিনি বলেন, ‘এটি জাতীয় সমস্যা। চাহিদার তুলনায় সরবরাহ কম থাকায় লোডশেডিং এড়ানো যাচ্ছে না। অনেক কারখানার মালিক আমাদের জানিয়েছেন, লোডশেডিংয়ের কারণে উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে এবং নির্ধারিত সময়ে পণ্য সরবরাহ করতে না পারায় তাঁরা নানা সমস্যার সম্মুখীন হচ্ছেন।’

উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা আশরাফ হোসেন বলেন, ‘পোল্ট্রি খাত সচল রাখতে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ প্রয়োজন। বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে।’

Ad 300x250
লেটেস্ট
সর্বাধিক পঠিত

সম্পর্কিত