জাতীয় সংসদ নির্বাচন ২০২৬

ও গণভোট

ক্লিক করুন

আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধবিষয়ক সংবাদ কতটা নিরপেক্ষ?

প্রকাশ : ০৮ মার্চ ২০২৬, ২০: ০৪
এআই জেনারেটেড ছবি

ইরানে হামলার দ্বিতীয় দিন। বিবিসির ওয়েবসাইটে পাশাপাশি দুটি খবর ছিল। প্রথম শিরোনামে বলা হয়েছে, ‘ইরানের দাবি অনুযায়ী, স্কুলে হামলায় অন্তত ১৪৮ জন নিহত।’ পাশের শিরোনামটি ছিল, ‘ইসরায়েলে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় ৯ জন নিহত।’এই শিরোনাম দুটির দিকে তাকালে পশ্চিমা গণমাধ্যমের চরিত্র বিশ্লেষণ করা অনেকটা সহজ হয়ে যায়।

যখন ইরানিরা নিহত হয়, যাদের মধ্যে অধিকাংশই শিশু, তখন হামলাকারীর নাম একেবারেই উল্লেখ করা হয় না, যা নিঃসন্দেহে ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের হামলা। আর এটিকে কোনো প্রতিষ্ঠিত সত্য হিসেবে উপস্থাপন না করে কেবল ‘ইরানের দাবি’ হিসেবে দেখানো হয়। কিন্তু যখন ইসরায়েলিরা নিহত হয়, তখন হামলাকারীকে স্পষ্টভাবে চিহ্নিত করা হয় এবং এটিকে সত্য হিসেবেই উপস্থাপন করা হয়, ‘প্রতিবেদন অনুসারে’ বা ‘ইসরায়েল বলছে’-তে সীমাবদ্ধ রাখা হয় না।

এই দ্বিমুখী নীতি কেবল একটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়, বরং এটি পশ্চিমা গণমাধ্যমগুলোর একটি ধারাবাহিক কৌশলের অংশ, যা তারা ইরাক, আফগানিস্তান এবং লিবিয়ার মতো সংঘাতেও প্রয়োগ করেছে। এর মাধ্যমে তারা যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের অবৈধ যুদ্ধকে বৈধতা দেয় এবং এর ভয়াবহতাকে সাধারণ মানুষের চোখের আড়াল করে। যুদ্ধযন্ত্রে গণমাধ্যম কতটা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে, তা এই চরম আপত্তিকর পক্ষপাতিত্বের মধ্যেই স্পষ্ট হয়ে ওঠে।

এই লেখায় আমরা পশ্চিমা গণমাধ্যমগুলোর এমন কিছু সুস্পষ্ট পক্ষপাতিত্বের উদাহরণ তুলে ধরব, যা যুদ্ধ পরিচালনায় তাদের সহযোগী ভূমিকার প্রমাণ দেয়।

হতাহতের সংবাদে দ্বিমুখী নীতি

পক্ষপাতিত্বের সবচেয়ে নগ্ন উদাহরণ পাওয়া যায় হতাহতের সংবাদ পরিবেশনের ধরনে। ইরানে হামলার দ্বিতীয় দিন বিবিসির ওয়েবসাইটে পাশাপাশি দুটি শিরোনাম দেখা যায়। প্রথমটি ছিল, ‘ইরানের দাবি অনুযায়ী, স্কুলে হামলায় অন্তত ১৪৮ জন নিহত।’ পাশের শিরোনামটি ছিল, ‘ইসরায়েলে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় ৯ জন নিহত।’

বিবিসির প্রকাশিত দুটি সংবাদ

এখানে দুটি সংবাদের উপস্থাপনায় আকাশ-পাতাল পার্থক্য লক্ষণীয়:

এক. পরিচয় গোপন: যখন ইরানের শিশুরা মারা যায়, তখন হামলাকারী অর্থাৎ যুক্তরাষ্ট্র বা ইসরায়েলের নাম উহ্য রাখা হয়। কিন্তু ইসরায়েলিদের মৃত্যুর ক্ষেত্রে হামলাকারী হিসেবে ইরানের নাম স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়।

দুই. তথ্যের সত্যতা: ইরানের দেওয়া তথ্যকে কেবল ‘দাবি’ বলে উপস্থাপন করা হয়, যা পাঠকের মনে সংবাদের সত্যতা নিয়ে সংশয় তৈরি করে। অন্যদিকে, ইসরায়েলের ক্ষেত্রে তথ্যকে প্রতিষ্ঠিত সত্য হিসেবে তুলে ধরা হয়, সেখানে ‘ইসরায়েলের দাবি’ বা ‘প্রতিবেদন অনুযায়ী’ মতো কোনো শব্দ ব্যবহার করা হয় না।

এই কৌশল অত্যন্ত কৌশলী ভঙ্গিতে পাঠকের মনে একটি ধারণা তৈরি করে দেয়—একপক্ষের হতাহতের খবর বিশ্বাসযোগ্য, অন্যপক্ষেরটি প্রচারণামূলক।

মানবতার মূল্যে বৈষম্য

ইসরায়েল বা যুক্তরাষ্ট্রের দ্বারা ইরানের স্কুলে হওয়া এই হামলার বিষয়টি নিয়ে একটু ভাবা দরকার। হামলার পরের অবস্থার ভিডিও ফুটেজে দেখলেই বুঝা যায় সেই হামলা কতটা বর্বর ছিল। ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় কিধ্বস্ত ভবন, চারদিকে ছড়ানো ছিটানো কংক্রিটের টুকরো আর ধুলার আস্তরন। মানুষের আর্তনাদ, আহত/নিহতদের বহন করে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে, কেউ কেউ শিশুদের ছিন্নভিন্ন হওয়া শরীরের টুকরো হাতে ধরে কাঁদছেন।

কল্পনা করুন, ইরান যদি ইসরায়েলের কোনো স্কুলে বোমা হামলা চালাতো এবং ১৮৫ জন নিহত হতো তাহলে কী ঘটত? প্রতিটি সংবাদপত্রের প্রথম পাতা এবং টেলিভিশন চ্যানেলের প্রাইম টাইম এই খবরে সয়লাব হয়ে যেত। নিহত শিশুদের হাস্যোজ্জ্বল মুখের ছবি, পরিবারের সাথে কাটানো সুন্দর মুহূর্তের ভিডিও দেখিয়ে তাদের জীবনকে মানবিক করে তোলা হতো। তাদের শোকাহত বাবা-মায়ের সাক্ষাৎকার নেওয়া হতো এবং পশ্চিমা নেতারা একযোগে ইরানের ‘বর্বরতা’র নিন্দা জানাতেন।

এই দ্বৈত আচরণ প্রমাণ করে, পশ্চিমা গণমাধ্যমের চোখে সব জীবনের মূল্য সমান নয়। তাদের কাছে নিজেদের মিত্রদের নাগরিকদের জীবন যতটা মূল্যবান, প্রতিপক্ষের নাগরিকদের জীবন ততটাই গুরুত্বহীন।

ভাষার চাতুর্য ও আবেগঘন উপস্থাপনা

সংবাদের ভাষা কীভাবে জনমতকে প্রভাবিত করতে পারে, তার একটি বড় উদাহরণ স্কাই নিউজের একটি প্রতিবেদন। ইসরায়েলে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র হামলার একটি স্থান দেখিয়ে প্রতিবেদক বলছেন:

“ইরানের ক্ষোভ দেখতে ঠিক এমনই।… বিস্ফোরণে একটি স্কুল, একটি সিনাগগ, ঘরবাড়ি এবং একটি বোম্ব শেল্টার গুঁড়িয়ে গেছে, যেখানে ডজন ডজন মানুষ আশ্রয় নিয়েছিল।”

এখানে ‘ইরানের ক্ষোভ’ শব্দটি ব্যবহার করে হামলাটিকে একটি আবেগতাড়িত ও অযৌক্তিক হামলা হিসেবে দেখানো হয়েছে। ‘ডজন ডজন মানুষ আশ্রয় নিয়েছিল’—এই বাক্যটি ভুক্তভোগীদের প্রতি সহানুভূতি জাগিয়ে তোলে। কিন্তু গাজায় বা ইরানে ইসরায়েলি হামলায় যখন শত শত মানুষ মারা যায়, তখন স্কাই নিউজ কি এমন আবেগঘন ভাষা ব্যবহার করে? উত্তরটি আমাদের সবারই জানা।

একইভাবে, নিউইয়র্ক টাইমসের শিরোনামগুলোতেও এই পক্ষপাত স্পষ্ট:

‘ইরানি রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমের দাবি, মেয়েদের স্কুলে হামলায় ১১৫ জন নিহত।’ (এখানে হামলাকারীর নাম নেই এবং ‘দাবি’ শব্দটি ব্যবহার করে খবরটিকে দুর্বল করা হয়েছে।)

‘আরব দেশগুলোতে সস্তা ড্রোন ছুড়েছে ইরান, ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞ চলছে।’ (এখানে ইরানকে সরাসরি আক্রমণকারী হিসেবে চিহ্নিত করে ‘ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞ’ শব্দ দিয়ে ভয়াবহতা ফুটিয়ে তোলা হয়েছে।)

ঘটনার প্রেক্ষাপট ও কারণ বিকৃতি

পক্ষপাতিত্ব শুধু হতাহতের সংখ্যা বা ভাষার ব্যবহারে সীমাবদ্ধ নয়, বরং যুদ্ধের কারণ এবং প্রেক্ষাপট উপস্থাপনেও এটি প্রকট। বিবিসির এক প্রতিবেদনে সাংবাদিক ক্লাইভ মাইরি বলেন, “এটি পুরো মধ্যপ্রাচ্যের জন্য একটি বিপজ্জনক মুহূর্ত… কারণ ইসরায়েল ও আমেরিকা ইরানকে পরিবর্তন করার চেষ্টা করছে।”

এখানে একটি অবৈধ আগ্রাসনকে ‘পরিবর্তন করার চেষ্টা’ নামক একটি নিরীহ মোড়ক দেওয়া হয়েছে। এই বাক্যটি শুনে মনে হতে পারে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল যেন ইরানের মঙ্গলের জন্যই কোনো ইতিবাচক পদক্ষেপ নিচ্ছে। এটি এই সত্যকে আড়াল করে যে, তাদের মূল উদ্দেশ্য ইরানকে অস্থিতিশীল করে খণ্ড-বিখণ্ড করা এবং দেশটিকে স্থায়ীভাবে দুর্বল করে দেওয়া।

একইভাবে, দ্য টেলিগ্রাফের একটি শিরোনাম ছিল: “ইরান কথা বলতে চায়: ট্রাম্প”। এই শিরোনাম পড়লে মনে হবে, ইরানই যুদ্ধ শুরু করেছিল এবং এখন তারাই শান্তির জন্য আলোচনার প্রস্তাব দিচ্ছে। অথচ বাস্তবতা হলো, যুক্তরাষ্ট্রই আলোচনা থেকে বেরিয়ে গিয়ে বোমা হামলা শুরু করেছিল, যখন কিনা আলোচনার মধ্যস্থতাকারীরা একটি সমাধানের দ্বারপ্রান্তে ছিলেন।

উদাহরণগুলো থেকে এটি স্পষ্ট যে, পশ্চিমা গণমাধ্যমগুলো মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধে কেবল একজন নিরপেক্ষ পর্যবেক্ষকের ভূমিকা পালন করছে না, বরং তারা একটি পক্ষ নিয়ে নিজেদের এজেন্ডা বাস্তবায়ন করছে। সুনির্দিষ্ট শব্দচয়ন, তথ্যের সিলেক্টিভ উপস্থাপনা এবং ঘটনার প্রেক্ষাপট বিকৃতির মাধ্যমে তারা দর্শক-পাঠকদের একটি নির্দিষ্ট ছকে ভাবতে বাধ্য করছে।

এই একপেশে সাংবাদিকতা শুধু অনৈতিকই নয়, এটি বিশ্বজুড়ে শান্তি ও ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার পথে একটি বড় অন্তরায়। তাই যেকোনো সংবাদ গ্রহণের আগে পাঠকের জন্য জরুরি হলো এর পেছনের উদ্দেশ্য এবং উৎস সম্পর্কে সচেতন থাকা।

সম্পর্কিত