কৃষি শ্রমিক ও সংশ্লিষ্টদের জন্য চাই কল্যাণমূলক পদক্ষেপ

লেখা:
লেখা:
জাহিরুল ইসলাম

স্ট্রিম গ্রাফিক

বাংলা নববর্ষের দিন ভোরে কুমিল্লার দাউদকান্দিতে এক চালবোঝাই ট্রাক খাদে পড়ে নিহত হন সাতজন শ্রমিক। বর্ষবরণ উৎসবের ব্যস্ততায় এই দুর্ঘটনা থেকে গেছে দৃষ্টির আড়ালে। অন্য সময়ে এমন দুর্ঘটনা সংবাদমাধ্যমে আরও ‘বেটার ট্রিটমেন্ট’ পেত বলে মনে হয়। অবশ্য সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণহানি এখন এতটাই ‘স্বাভাবিক’ যে, সংবাদমাধ্যমের কাছে এ ধরনের খবর এখন কম গুরুত্ব পায়। আর পত্রিকার পাতায় এসব খবর পড়তে পড়তে কিংবা টিভির স্ক্রলে দুর্ঘটনায় মানুষের মৃত্যুর সংবাদ দেখতে দেখতে আমরাও হয়ে পড়েছি যেন অভ্যস্ত। তাই সড়ক দুর্ঘটনায় মর্মান্তিক প্রাণহানির খবরও প্রায় সময়ই আমাদের হৃদয় স্পর্শ করে না। কী অদ্ভুত এক পরিস্থিতির মধ্যে দিন অতিবাহিত করছি!

বোরো মৌসুমের ধান কাটার জন্য দিনাজপুর থেকে নোয়াখালী যাচ্ছিলেন তারা। চালবোঝাই ট্রাকে উঠেছিলেন ভাড়ার কিছু টাকা বাঁচানোর জন্য। শুধু কৃষি শ্রমিক নয়; উত্তরাঞ্চল থেকে নিম্ন আয়ের আরও যেসব মানুষ ভাগ্যান্বেষণে বিভিন্ন সময়ে দেশের দক্ষিণাঞ্চলে আসেন– একই প্রবণতা দেখা যায় তাদের মধ্যেও। স্বল্প খরচে এসব মানুষের যাতায়াতে সরকারি উদ্যোগ থাকলে এমন ঘটনা কিছুটা হলেও কমানো যেত। কৃষকদের সহায়তায় ‘কৃষক কার্ড’ চালুর ব্যবস্থা করেছে নতুন সরকার। মজুর খেটে যারা এ খাতে সক্রিয় অবদান রাখছেন, তাদের জন্য কি কোনো পরিকল্পনা রয়েছে সরকারের? আমরা চাইব, সংশ্লিষ্টদের ব্যাপারে যে পদক্ষেপই নেওয়া হোক; তারা যাতে স্বল্প খরচে ও নিরাপদে গন্তব্যে যাতায়াত করতে পারে, সেদিকে রাখা হবে বিশেষ দৃষ্টি।

তারা ঠিক কোন জায়গা থেকে চালবোঝাই ট্রাকে উঠেছিলেন, সে ব্যাপারে সুস্পষ্ট তথ্য পাওয়া যায়নি। নিয়মবিধি অনুযায়ী, পণ্যবোঝাই ট্রাকে যাত্রী পরিবহনে নিষেধাজ্ঞা রয়েছে। ট্রাফিক পুলিশের চোখ ফাঁকি দিয়ে কীভাবে তারা এতটা পথ অতিক্রম করতে পারলেন, সেটাও প্রশ্ন। জানা নেই, মহাসড়কে দায়িত্বরতরা চালকের কাছ থেকে উৎকোচ নিয়ে ‘ম্যানেজড’ হয়েছিলেন কিনা। নাকি কোনো ‘বিশেষ বিবেচনা’য় চালককে পণ্যবোঝাই ট্রাকে যাত্রী পরিবহনের অনুমতি দেওয়া হয়েছিল? এত প্রাণহানির পর সে ব্যাপারে কি কোনো তদন্ত হবে?

আমরা আশা করব, জড়িতদের চিহ্নিত করতে তদন্তের উদ্যোগ নেওয়া হবে। চলমান বোরো মৌসুমে আরও অনেক মানুষ বের হবেন কাজের উদ্দেশ্যে। তাদের মধ্যে ওই বিষয়ে সচেতনতা তৈরির উদ্যোগ নেওয়া জরুরি। উচ্চপর্যায় থেকে ট্রাফিক আইন বাস্তবায়নে কঠোর মনোভাব দেখানো হলেও এমন ঘটনার পুনরাবৃত্তি কিছুটা কমানো যাবে।


নিহতদের পরিবারের জন্য ২৫ হাজার টাকা করে ক্ষতিপূরণের ঘোষণা দিয়েছে স্থানীয় প্রশাসন। বর্তমান পরিস্থিতিতে এই টাকায় কুমিল্লা থেকে দিনাজপুরের গ্রামে লাশ নিয়ে যাওয়া এবং দাফন কার্যক্রম সম্পন্ন করা সম্ভব কিনা, সে ব্যাপারে রয়েছে সন্দেহ। গুরুতর প্রশ্ন– তারা যদি একমাত্র উপার্জনক্ষম হন, তাহলে পরিবারের অন্য সদস্যদের উপায় কী? সড়ক দুর্ঘটনায় নিহতদের ক্ষতিপূরণ দেওয়ার জন্য একটি সরকারি ট্রাস্ট নাকি রয়েছে। নিহতদের পরিবারের কাছে এসব তথ্য রয়েছে বলে মনে হয় না।

প্রশ্ন জাগে, তথ্য জানা না থাকলে নিহতদের পরিবার সাহায্য দাবি করবে কীভাবে? এমন তহবিলের ব্যাপারে প্রচারণাটা এ কারণেও জরুরি যে, তাতে অন্য দুর্ঘটনায় ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারও এখান থেকে সহায়তা নেওয়ার সুযোগ পাবে। জানা যায়, সেখান থেকে টাকা উত্তোলনে রয়েছে নানা জটিলতা। সড়ক দুর্ঘটনায় পরিবারের একমাত্র কিংবা প্রধান উপার্জনক্ষম ব্যক্তি প্রাণ হারালে অন্য সদস্যদের মানসিক অবস্থা স্বাভাবিক থাকে না। এ অবস্থায় নিয়মের কথা বলে সরকারি সাহায্যে পথ কঠিন করা হলে দুর্দশা আরও বাড়ে। আশা করব, বিদ্যমান নিয়মে যদি জটিলতা থাকেও– আর্থিক সংকট কাটিয়ে সংশ্লিষ্টদের পরিবারকে স্বাভাবিক জীবনে ফেরানোর স্বার্থে তা দূর করা হবে ।

এটাও ঠিক, ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারকে শুধু এককালীন আর্থিক ক্ষতিপূরণ দিয়ে সরকারের দায়িত্ব শেষ হতে পারে না। বরং সরকারের উচিত সংশ্লিষ্ট পরিবারের কর্মক্ষম ব্যক্তির যোগ্যতা অনুযায়ী কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করা। আর যেসব পরিবারে কর্মক্ষম কেউ নেই, তাদের ক্ষতিপূরণের পরিমাণও এমন হওয়া উচিত– যেন ওই অর্থ থেকে অর্জিত মুনাফা দিয়ে চলতে পারে সংসার। যেসব গৃহস্থের কাজ করতে গিয়ে শ্রমিকরা এমন ক্ষতির সম্মুখীন হন, তাদেরকেও কি আনা যায় না ক্ষতিপূরণ প্রদানের প্রক্রিয়ায়? কৃষি আমাদের অর্থনীতির অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি। অথচ এ খাত ঘিরে এ ধরনের প্রাতিষ্ঠানিকতা গড়ে ওঠেনি এখনো। এমনিতেই নানা কারণে উদ্যোক্তারা মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছেন এ খাত থেকে; তেমনি মুখ ফেরাচ্ছেন মজুররাও। কৃষিতে মানুষের আগ্রহ ধরে রাখতে হলে এ খাতে প্রাতিষ্ঠানিকতা প্রতিষ্ঠা করতে হবে সঙ্গত কারণেই।

প্রাতিষ্ঠানিক খাতের কর্মীদের অসুস্থতায় চিকিৎসা এবং দুর্ঘটনায় ক্ষতিপূরণ প্রাপ্তি নিশ্চিত করতে ইন্স্যুরেন্সের ব্যবস্থা থাকে। কৃষি খাতে সংশ্লিষ্টদের জন্য এমন কিছুই আমরা এখনো গড়ে তুলতে পারিনি। এটা ইঙ্গিত দেয়, কৃষি খাতের শ্রমিকরা এখনো রয়ে গেছেন নীতিনির্ধারকদের চিন্তার বাইরে। আমাদের কর্মক্ষম জনগোষ্ঠীর উল্লেখযোগ্য অংশ যেহেতু কৃষিকাজে যুক্ত, তাই তাদের নীতি-কাঠামোর বাইরে রাখা উচিত হবে না। বরং কল্যাণমূলক নীতি প্রণয়ন এবং তার যথাযথ বাস্তবায়ন করা গেলে কৃষির প্রতি মানুষের আগ্রহ ধরে রাখা সহজ হবে। শুধু এমন সড়ক দুর্ঘটনা নয়; কৃষিসংশ্লিষ্ট আরও নানা কাজে অঙ্গহানি ও প্রাণহানি ঘটে। নীতি প্রণয়নে সেসব বিষয়ও রাখা দরকার বিবেচনায়।

দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে কৃষকদের মোকাবিলা করতে হয় বিভিন্ন বাস্তবতা। বিশেষত হাওর ও উপকূলীয় অঞ্চলের কৃষকদের থাকতে হয় প্রকৃতির প্রতিকূল আচরণ নিয়ে নানা দুশ্চিন্তায়। প্রাকৃতিক কারণে ফল, ফসল ও পশুসম্পদের ক্ষয়ক্ষতি এবং মানুষের প্রাণহানির জন্য ক্ষতিপূরণের ব্যবস্থা থাকা দরকার। মনে রাখা চাই, কৃষি উদ্যোক্তাদের উৎসাহ দিতে ইতিমধ্যে স্বল্প সুদে ঋণ, সার ও ডিজেলে ভর্তুকিসহ নানা পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। কিন্তু যাদের সক্রিয় অংশগ্রহণে জমিতে চাষ, সেচ, ফসল সংগ্রহসহ গোটা কর্মকাণ্ড পরিচালিত হয়, তাদের জন্য কল্যাণমূলক পদক্ষেপ গ্রহণে অনাগ্রহী থাকা সুবিবেচনার পরিচয় নয়।

মনে রাখতে হবে, ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ডের যে সুবিধা আমরা পাচ্ছি– ২০৪০ সালের পর তা আর থাকবে না। অর্থাৎ ১৫ বছর পর কর্মক্ষম জনসংখ্যার চিত্রটি ভিন্নতর হতে থাকবে। এই স্বল্প সময়ে আমাদের অর্থনীতির গতি-প্রকৃতিতে বড় পরিবর্তন আসবে বলেই মনে হচ্ছে। বাস্তবতা হলো, কৃষি শ্রমঘন একটি খাত। এ খাতে প্রয়োজন দৈহিক বলসম্পন্ন জনগোষ্ঠী। দেশে তরুণের সংখ্যা কমে গেলে এ খাতে শ্রমের জোগান আসবে কোত্থেকে, সে ব্যাপারেও আমাদের চিন্তাভাবনা শুরু করা দরকার এখনই। অন্যান্য দেশের মতো আমাদের কৃষিও কি আগামীতে হবে এআই-নির্ভর? সেটা করতে গেলেও প্রয়োজন প্রযুক্তি সচেতনতা; প্রয়োজনীয় জ্ঞান ও দক্ষতা। কৃষি খাত নিয়ে নীতি-নির্ধারণের ক্ষেত্রে এসব দিক বিবেচনা করা না হলে চূড়ান্ত বিচারে আমাদের অর্থনীতিই ক্ষতিগ্রস্ত হবে।

লেখক: ব্যাংক কর্মকর্তা

সম্পর্কিত