সার নিয়ে ভজকটে ফাঁকা কৃষকের পকেট

স্ট্রিম প্রতিবেদক
স্ট্রিম প্রতিবেদক
ঢাকা

প্রকাশ : ৩০ আগস্ট ২০২৬, ১২: ৫৫
স্ট্রিম গ্রাফিক
স্ট্রিম গ্রাফিক

দেশে সারের কোনো সংকট নেই। সরকার এই দাবি করে বলেছে, চলতি জুলাই-সেপ্টেম্বর প্রান্তিকে চাহিদার চেয়ে ৪৪ হাজার টন বেশি সার সরবরাহ করা হয়েছে। হিসাব ঠিক থাকলে কৃষক স্বস্তিতে থাকার কথা। কিন্তু মাঠের বাস্তবতা ভিন্ন।

আমনের ভরা মৌসুমে রাজবাড়ী, যশোরের মতো জেলার কৃষকেরা ঠিকমতো সার পাচ্ছেন না। তাদের অভিযোগ, সরবরাহ সংকট দেখিয়ে ডিলাররা প্রতি বস্তায় সরকার নির্ধারিত দরের চেয়ে ৫০০ থেকে ১ হাজার টাকা বেশি নিচ্ছেন। এতে উৎপাদন খরচ বেড়ে লোকসান গুণতে হবে।

চলতি জুলাই-সেপ্টেম্বর প্রান্তিকে সারের চাহিদা ১৩ লাখ ২১ হাজার টন। বিপরীতে সরকার সরবরাহ করেছে ১৩ লাখ ৬৫ হাজার টন। গ্যাস-সংকটে দেশীয় উৎপাদন তলানিতে নামলেও, সারের পর্যাপ্ত মজুত নিশ্চিত করার দাবি সরকারের। এরপরও সার নিয়ে কৃষকের হাহাহারের পেছনে সরবরাহে ভজকট, নতুন নীতিমালার কারণে ডিলাররা অসহযোগিতা ও সিন্ডিকেটকে দায়ী করছেন বিশেষজ্ঞরা।

বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের কৃষি অর্থনীতি বিভাগের শিক্ষক এএসএম সাইফুল ইসলাম স্ট্রিমকে বলেছেন, নীতিমালায় পরিবর্তন এবং আন্তর্জাতিক বাজারের অস্থিরতায় এখানে ধারণা তৈরি হয়েছে– সামনে সারের সংকট হতে পারে। আতঙ্কে কৃষকেরা ভাবছেন, যতটুকু দরকার, তা এখনই কিনে রাখি। আগাম কেনার প্রবণতায় বাজারে বাড়তি চাপ তৈরি করছে।

তাঁর আশঙ্কা, সাব-ডিলার প্রথা বাতিল হলে মুষ্টিমেয় ডিলারের হাতে সারের বাজার জিম্মি হয়ে পড়তে পারে। এতে কৃষকের পরিবহন খরচ এবং ভোগান্তি দুটিই বাড়বে।

বরাদ্দে ফাঁরাক, দামের খড়গ

মাঠের চিত্র বলছে, সারের সরবরাহ প্রক্রিয়ায় বড় ধরনের গলদ রয়েছে। রাজবাড়ী জেলায় চলতি মৌসুমে টিএসপির চাহিদা ৬ হাজার ১১ টন। বিপরীতে বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে ৩ হাজার ১ টন, যা চাহিদার প্রায় অর্ধেক। ডিএপি এবং ইউরিয়া সারের ক্ষেত্রেও চাহিদার তুলনায় বরাদ্দ অনেক কম। এই সুযোগে অসাধু সাব-ডিলাররা অন্য জেলা থেকে লুকিয়ে সার এনে পরিবহন খরচের অজুহাতে কৃষকদের পকেট কাটছেন।

কৃষকের অভিযোগ, পরিচিত দোকান ছাড়া সার মিলছে না। দামও দিতে হচ্ছে বস্তাপ্রতি অন্তত ৪৫০ থেকে ৫০০ টাকা বেশি।

যশোরের চিত্র আবার ভিন্ন। বাফার গুদামে সারের পর্যাপ্ত মজুত থাকার পরও ডিলাররা সংকট দেখাচ্ছেন। ভ্রাম্যমাণ আদালত অভিযানে সরকার নির্ধারিত দামের চেয়ে হাজার টাকা বেশি দামে বিক্রির তথ্য পেয়েছেন। জরিমানা করেও সিন্ডিকেট থামাতে পারছে না প্রশাসন।

চলতি জুলাই-সেপ্টেম্বর প্রান্তিকে সারের চাহিদা ১৩ লাখ ২১ হাজার টন। বিপরীতে সরকার সরবরাহ করেছে ১৩ লাখ ৬৫ হাজার টন। গ্যাস-সংকটে দেশীয় উৎপাদন তলানিতে নামলেও, সারের পর্যাপ্ত মজুত নিশ্চিত করার দাবি সরকারের।

অবশ্য সংকটের দায় নিতে নারাজ স্থানীয় কৃষি বিভাগ। রাজবাড়ী কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের জেলা প্রশিক্ষণ কর্মকর্তা গোলাম রসুল বলেন, জেলায় সারের সংকট নেই। কিন্তু জমিতে কৃষক অনেক বেশি রাসায়নিক সার ব্যবহার করেন। এই কারণে সংকট দেখা দেয়।

যশোর কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা তরিকুল ইসলামের দাবিও একই। তিনি বলেন, জেলায় সারের সংকট নেই। ডিলাররা কৃত্রিম সংকট তৈরি করছেন।

তবে কৃষকেরা বলছেন ভিন্ন কথা। যশোর চৌগাছার কৃষক শহিদুল ইসলাম বলেন, সার পাওয়া যাচ্ছে না। দুই বস্তা চাইলে মিলছে একটি। এরপরও সরকার নির্ধারিত দামের চেয়ে দ্বিগুণ দিতে হচ্ছে।

রাজবাড়ীর পাংশার কৃষক অমল মন্ডলের অভিযোগ, ইউরিয়া সারের নির্ধারিত দাম ১ হাজার ৩৫০ টাকা। ১ হাজার ৮০০ টাকার নিচে তা পাওয়া যাচ্ছে না। নগদে ৫০ কেজির টিএসপির বস্তা কিনতে হচ্ছে বাড়তি দামে।

গ্যাস সংকট ও নীতিমালার ‘ভুল সময়’

কৃষি মন্ত্রণালয় ও বাংলাদেশ ফার্টিলাইজার অ্যাসোসিয়েশনের তথ্যে, দেশে বছরে সারের চাহিদা প্রায় ৭০ লাখ টন। রাষ্ট্রায়ত্ত সাতটি কারখানার উৎপাদন সক্ষমতা ৩৭ লাখ টনের বেশি হলেও, চলমান গ্যাস সংকটে গত অর্থবছরে উৎপাদন হয়েছে মাত্র ১১ লাখ ৬ হাজার টন (সক্ষমতার ৩০ শতাংশ)। ফলে বিশাল চাহিদার প্রায় ৮০ থেকে ৮৪ শতাংশ আমদানি করতে হচ্ছে।

এমন বাস্তবতার মধ্যে সরকার ‘সার ব্যবস্থাপনা নীতিমালা ২০২৫’ বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেয়। এই নীতিমালায় সাব-ডিলার ও খুচরা বিক্রেতা প্রথা পুরোপুরি বাতিলের কথা বলা হয়েছে। কৃষকের কাছে সঠিক দামে সার পৌঁছানো এবং ডিলারদের মনোপলি ভাঙতে সরকার এই উদ্যোগ নিলেও, সময় নির্ধারণ নিয়ে উঠেছে প্রশ্ন।

বিশ্লেষকেরা বলছেন, যুগ যুগ ধরে চলে আসা একটি সরবরাহ ব্যবস্থা হুট করে ভরা মৌসুমে বদলাতে গেলে বিশৃঙ্খলা হবেই। নতুন নীতিমালায় নাখোশ হয়ে ডিলারেরা নীরব প্রতিবাদ করছেন। তাঁরা ইচ্ছে করেই সার উত্তোলন বা বিতরণে ধীরগতি দেখাচ্ছেন।

সার পাওয়া যাচ্ছে না। দুই বস্তা চাইলে মিলছে একটি। এরপরও সরকার নির্ধারিত দামের চেয়ে দ্বিগুণ দিতে হচ্ছে। শহিদুল ইসলাম, যশোর চৌগাছার কৃষক

রাজবাড়ী সার ডিলার অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক রেজাউল হক বাদশা বলেন, ‘আমার বরাদ্দের ৫০ ভাগ রেখে বাকিটা ৯ সাব-ডিলারের মধ্যে ভাগ করে দিতে হয়।’ তবে রাজবাড়ী সদরের আলীপুর ইউনিয়নের এক সাব-ডিলার নাম প্রকাশ না করে বলেন, আগস্টে মূল ডিলারের কাছ থেকে যে পরিমাণ সার পেয়েছি, তা মাসের প্রথম ১০ দিনেই শেষ হয়ে গেছে। এই অবস্থায় যে জেলায় চাহিদা কম, সেখান থেকে আমরা সার এনে বিক্রি করছে। এটি অন্যায়, তারপরও ব্যবসার স্বার্থে করতে হচ্ছে। সেখানকার ডিলারকে বাড়তি টাকা দিতে হচ্ছে বলে দাম বেশি নিচ্ছি।

সরকারের উদ্যোগ

কৃষক ও ডিলারদের শঙ্কা কাটাতে প্রান্তিক পর্যায়ে কাজ শুরুর কথা জানিয়েছে সরকার। সার ব্যবস্থাপনা সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটির সদস্য ও স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম ২৬ আগস্ট বগুড়ায় সাংবাদিকদের জানান, পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত বর্তমান ডিলাররাই সার উত্তোলন ও বিক্রি চালিয়ে যাবেন; কাউকে বাতিল করা হচ্ছে না।

এ ছাড়া মজুত সন্তোষজনক রাখতে সরকার এরই মধ্যে ৩ লাখ ৬৫ হাজার টন সার কেনার অনুমোদন দিয়েছে। আগে আরও ১ লাখ ১৫ হাজার টন সার আমদানির অনুমোদন দেওয়া হয়।

সরকার জানিয়েছে, গত ২৩ আগস্ট পর্যন্ত ডিলারদের কাছে ৭ লাখ ৯৯ হাজার টন বিভিন্ন ধরনের সার সরবরাহ করা হয়েছে। সেপ্টেম্বরের জন্য আরও ৪ লাখ ৪২ হাজার টনের বেশি সার বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে।

(প্রতিবেদন তৈরিতে তথ্য দিয়েছেন সংশ্লিষ্ট জেলার সংবাদদাতা)

Ad 300x250
লেটেস্ট
সর্বাধিক পঠিত

সম্পর্কিত