রাজীব নন্দী

দায়িত্ব নেওয়ার পর বিএনপি সরকারের তিন মাস পেরিয়েছে। রাজনৈতিক যোগাযোগের ভাষায় নতুন সরকারের প্রথম ১০০ দিনকে সাধারণত ‘মধুচন্দ্রিমা সময়’ হিসেবে বিবেচনা করা হয়—যে সময়ে জনগণ নতুন নেতৃত্বকে বাড়তি আস্থা, রাজনৈতিক সুযোগ এবং প্রত্যাশার সুবিধা দেয়। বাংলাদেশের রাজনীতির এক অস্থির সন্ধিক্ষণে ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে নিরঙ্কুশ বিজয়ের মধ্য দিয়ে সরকার গঠন করে বিএনপি।
তবে ক্ষমতায় আসার পর থেকেই প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন সরকারকে অর্থনৈতিক চাপ, আইনশৃঙ্খলার অবনতি, জ্বালানি সংকট, হাম পরিস্থিতি ও রাজনৈতিক মেরুকরণের মতো একাধিক সংকট মোকাবিলা করতে হয়েছে। এখন প্রশ্ন হলো—এই ‘মধুচন্দ্রিমা সময়ে’ সরকার বাস্তব সংকট মোকাবিলায় কতটা কার্যকর ক্রাইসিস কমিউনিকেশন করতে পেরেছে, আর কতটা আটকে থেকেছে ইমেজ ম্যানেজমেন্ট ও প্রতীকী রাজনৈতিক যোগাযোগে।
বাংলাদেশের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক বাস্তবতাকে যোগাযোগবিদ্যা, রাষ্ট্রীয় জনসংযোগ ও ক্রাইসিস কমিউনিকেশনের বিভিন্ন বিদ্যায়তনিক প্রেক্ষিত থেকে বিশ্লেষণ করা যাক।
আমরা জানি, একটি সরকার কেবল প্রশাসনিক দক্ষতা দিয়েই টিকে থাকে না; জনগণের সঙ্গে তার বিশ্বাসযোগ্য সম্পর্ক, সংকটকালে বার্তা ব্যবস্থাপনা এবং রাজনৈতিক বয়ান নির্মাণও সমানভাবে গুরুত্বপূর্ণ। আধুনিক রাষ্ট্রে পিআর কৌশল এখন আর কেবল প্রচারণা নয়, বরং শাসনব্যবস্থার অংশ। কিন্তু সংকটকে যদি বাস্তব নীতিগত চ্যালেঞ্জ হিসেবে না দেখে শুধুমাত্র “ইমেজ ম্যানেজমেন্ট” হিসেবে দেখা হয়, তখন সেই পিআর উল্টো সরকারের জন্যই বুমেরাং হয়ে দাঁড়ায়।
বাংলাদেশে সাম্প্রতিক সময়ে আমরা এমন কিছু প্রতীকী রাজনৈতিক যোগাযোগ বা সিম্বলিক কমিউনিকেশন দেখেছি, যা মূলত জনমনে ইতিবাচক আবেগ তৈরির উদ্দেশ্যে ব্যবহৃত হয়েছে। কখনো প্রধানমন্ত্রীকে সাদা রঙের সাধারণ শার্ট বা পোশাকে দেখা যাচ্ছে, কখনো নিজের গাড়ি নিজে চালাতে দেখা যাচ্ছে, আবার কখনো ফ্যামিলি ম্যান হিসেবে সপরিবারে সপ্রতিভ দৃশ্য সামনে আনা হচ্ছে। এই ধরনের ভিজ্যুয়াল কমিউনিকেশন মূলত নেতাকে ‘মানুষের কাছের মানুষ’ হিসেবে উপস্থাপন করার কৌশল। রাজনৈতিক যোগাযোগ তত্ত্বে একে বলা হয় নেতৃত্বের মানবিকীকরণ বা ‘হিউম্যানাইজেশন অফ লিডারশিপ’। বিশ্বের বহু রাষ্ট্রনায়কই এই কৌশল ব্যবহার করেছেন। তবে এর কার্যকারিতা নির্ভর করে বাস্তব নীতিগত পদক্ষেপের ওপর। কেবল আবেগনির্ভর প্রতীকী বার্তা দীর্ঘমেয়াদে জনগণের আস্থা ধরে রাখতে পারে না।
এখানেই ক্রাইসিস কমিউনিকেশনের মৌলিক প্রশ্নটি সামনে আসে। ‘পরিস্থিতিভিত্তিক সংকট-যোগাযোগ তত্ত্ব’ অনুযায়ী, কোনো রাষ্ট্র বা প্রতিষ্ঠানের সংকট মোকাবিলার প্রথম শর্ত হলো দায় স্বীকার, স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা এবং ক্ষতিগ্রস্ত জনগোষ্ঠীর প্রতি দৃশ্যমান সহমর্মিতা প্রদর্শন করা। সংকটের সময় জনগণ সরকারের কাছ থেকে তথ্য গোপন বা আবেগী নাটকীয়তা নয়, বরং নির্ভরযোগ্য তথ্য ও কার্যকর সমাধান প্রত্যাশা করে। অথচ বাংলাদেশের রাজনৈতিক বাস্তবতায় বহু সময় দেখা যায়, বাস্তব সংকটকে নীতিগতভাবে সমাধান না করে সেটিকে ‘ন্যারেটিভ’ দিয়ে নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করা হয়।
চট্টগ্রামের জলাবদ্ধতার ঘটনাকে কেন্দ্র করে এআই-সৃষ্ট ছবি বিতর্ক তার একটি বড় উদাহরণ। চট্টগ্রাম নগরের সাম্প্রতিক (৩০ এপ্রিল ২০২৬) জলাবদ্ধতা পরিস্থিতি নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ‘অতিরঞ্জিত’ প্রচার চালানো হয়েছে বলে মন্তব্য করেছেন স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম। বাস্তব দুর্ভোগের পরিবর্তে জনগণকে ধারণা ব্যবস্থাপনা বা পারসেপশন ম্যানেজমেন্ট দিয়ে বোঝানোর চেষ্টা জনমনে অবিশ্বাস তৈরি করে। তবে একইসঙ্গে আমরা বিপরীত উদাহরণও দেখেছি। চট্টগ্রামের মেয়র গ্রাফিতি বিতর্কের সময় আন্দোলনকারীদের বিপরীতে অবস্থান না নিয়ে নিজেই তাদের সঙ্গে যুক্ত হন, রাস্তায় নেমে গ্রাফিতি আঁকেন। চট্টগ্রাম নগরীতে জুলাই আন্দোলনের গ্রাফিতি মুছে ফেলা ও পুনরায় অঙ্কনকে কেন্দ্র করে টানা দুই দিন ধরে উত্তেজনা, ধস্তাধস্তি এবং রাজনৈতিক মুখোমুখি অবস্থান তৈরি হয়। ১৯ মে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে শেষ পর্যন্ত নিজে গিয়ে পুনরায় গ্রাফিতি একেছিলেন চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেন। এই পদক্ষেপটি সফল ক্রাইসিস কমিউনিকেশনের একটি গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ। কারণ তিনি সংঘাতকে দমন না করে অংশগ্রহণমূলক যোগাযোগ বা পার্টিসিপেটরি কমিউনিকেশন মডেল ব্যবহার করেছেন। ফলে সম্ভাব্য ক্ষোভ দ্রুত প্রশমিত হয়েছে।
বর্তমান সরকারের প্রথম ১০০ দিনের কার্যক্রম বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, তারা একদিকে জনকল্যাণমূলক কর্মসূচি বাস্তবায়নের চেষ্টা করেছে—যেমন ফ্যামিলি কার্ড, কৃষক কার্ড, ইমাম-মুয়াজ্জিন ও পুরোহিতদের ভাতা, মেয়েদের বিনা বেতনে স্নাতক শিক্ষা ইত্যাদি। এগুলো সরকারের পলিসি কমিউনিকেশন-এর ইতিবাচক উদাহরণ। অর্থাৎ সরকার কেবল প্রতীকী বার্তা নয়, কিছু দৃশ্যমান নীতিগত পদক্ষেপও সামনে এনেছে।
কিন্তু একই সময়ে হাম পরিস্থিতি, জ্বালানি সংকট, দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি, আইনশৃঙ্খলার অবনতি এবং মব ভায়োলেন্সের মতো ইস্যুতে সরকারের বার্তা ব্যবস্থাপনায় অসংগতি দেখা গেছে। সংকটের দায় পূর্ববর্তী সরকারের ওপর চাপিয়ে দেওয়ার প্রবণতা স্বল্পমেয়াদে রাজনৈতিকভাবে সুবিধাজনক মনে হলেও দীর্ঘমেয়াদে এটি রাষ্ট্রের বিশ্বাসযোগ্যতা ক্ষতিগ্রস্ত করে। কারণ ক্রাইসিস কমিউনিকেশনের সবচেয়ে বড় মূলধন হলো “ট্রাস্ট” বা জনআস্থা। জনগণ যখন বাস্তবতার সঙ্গে সরকারি ভাষ্যের অসামঞ্জস্য খুঁজে পায়, তখন এমনকি সত্য বার্তাও সন্দেহের চোখে দেখা শুরু করে।
এখানে বিশ্বের সফল রাষ্ট্রনায়কদের উদাহরণ গুরুত্বপূর্ণ। নিউজিল্যান্ডের সাবেক প্রধানমন্ত্রী জেসিন্ডা আর্ডার্ন ক্রাইসিস কমিউনিকেশনের একটি আদর্শ মডেল তৈরি করেছিলেন। ক্রাইস্টচার্চ মসজিদে হামলার পর তিনি কেবল প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেননি, বরং শোকাহত মানুষের পাশে সরাসরি দাঁড়িয়েছিলেন। তার বার্তায় ছিল সহমর্মিতা, স্বচ্ছতা এবং দ্রুত নীতিগত পদক্ষেপ। তিনি ‘তারা আমাদেরই মানুষ’ বলে জাতিকে একত্রিত করেছিলেন। ফলাফল হিসেবে জনগণের আস্থা বহুগুণ বেড়ে যায়।
অন্যদিকে কোভিড-১৯ সংকটে জার্মান চ্যান্সেলর অ্যাঙ্গেলা মের্কেল বৈজ্ঞানিক তথ্যভিত্তিক যোগাযোগকে অগ্রাধিকার দিয়েছিলেন। তিনি আবেগী নাটকীয়তার পরিবর্তে যুক্তি, তথ্য এবং স্বচ্ছ ব্যাখ্যার মাধ্যমে জনগণকে বোঝানোর চেষ্টা করেন। ফলে জার্মান জনগণের বড় অংশ সরকারের নির্দেশনা মেনে চলেছিল। এটি ছিল তথ্যনির্ভর সংকট-যোগাযোগ—যাকে যোগাযোগ ও জনসংযোগবিদ্যার আলোকে বলা যায় তথ্যপ্রমাণভিত্তিক সংকট-যোগাযোগের সফল উদাহরণ।
বারাক ওবামার যোগাযোগ কৌশলও উল্লেখযোগ্য। ওবামা জানতেন, রাজনৈতিক নেতৃত্বে কেবল বক্তব্য নয়, ন্যারেটিভ ওনারশিপ বা রাজনৈতিক বয়ানের কর্তৃত্ব অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। অর্থনৈতিক মন্দা ও স্বাস্থ্যনীতি সংস্কারের সময় তিনি ডিজিটাল মিডিয়া, টাউনহল মিটিং এবং ব্যক্তিগত গল্প ব্যবহার করে জনগণের সঙ্গে সরাসরি সংযোগ স্থাপন করেন। ফলে তার প্রশাসনের বার্তা জনগণের কাছে মানবিক ও গ্রহণযোগ্য হয়ে ওঠে।
অন্তর্বর্তীকালীন ইউনূস সরকারের একটি বড় ব্যর্থতা ছিল—রাষ্ট্রীয় সংকটকে বাস্তব নীতিগত ও কাঠামোগত চ্যালেঞ্জ হিসেবে না দেখে সেটিকে ‘ইমেজ ম্যানেজমেন্ট ইভেন্ট’-এ পরিণত করা। দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি, মব ভায়োলেন্স, অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা কিংবা জনআতঙ্ক যখন তীব্র হচ্ছিল, তখন রাষ্ট্রীয় বাসভবন যমুনা কার্যত রাজনৈতিক ফটোসেশনের মঞ্চে পরিণত হয়েছিল।
বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতাদের সঙ্গে বৈঠকের দৃশ্য প্রচার করা হলেও জনগণ সেখানে কোনো কার্যকর সংকট-সমাধানের রূপরেখা দেখেনি। একইভাবে শেখ হাসিনার শাসনামলেও আমরা দেখেছি—সংকটের সময় জনতার সঙ্গে সরাসরি সংলাপে না গিয়ে তিনি ব্যবসায়ী, অনুগত বুদ্ধিজীবী ও সুবিধাভোগী এলিটদের নিয়ে পরামর্শ বৈঠক করেছেন। এই দুই ক্ষেত্রেই রাষ্ট্র ক্ষমতা জনগণের বাস্তব অভিজ্ঞতা থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে একটি ক্ষমতানির্ভর আত্মতুষ্টির বলয় তৈরি করেছে। আধুনিক ক্রাইসিস কমিউনিকেশনের দৃষ্টিতে এটি যোগাযোগ কৌশলের একটি ধ্রুপদি ব্যর্থতা; কারণ সংকটকালে জনগণ চায় স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা ও অংশগ্রহণমূলক সংলাপ; কিন্তু তারা পেয়েছে পরিকল্পিত দৃশ্যমানতা, সাজানো পরামর্শ বৈঠক এবং ক্ষমতাকেন্দ্রিক প্রতীকী প্রদর্শন। ফলত রাষ্ট্রীয় বার্তা বিশ্বাসযোগ্যতা হারিয়েছে এবং জনগণের কাছে সরকার ক্রমশ বাস্তবতা-বিচ্ছিন্ন এক প্রদর্শননির্ভর কর্তৃত্বে পরিণত হয়েছে।
বাংলাদেশের নিকট অতীতের রাজনৈতিক বাস্তবতায় আমরা এক ধরনের ভিজুয়েল পপুলিজম বা দৃশ্যনির্ভর রাজনৈতিক যোগাযোগের বিস্তার দেখতে পেয়েছিলাম। ওসমান হাদির রক্তাক্ত স্মৃতিকে ধারণ করে হেলমেট পরে আশিক চৌধুরীর প্যারাগ্লাইডিং জাম্প ছিলো তার সবচেয়ে শক্তিশালী উদাহরণগুলোর একটি।
রাষ্ট্রীয় বিপর্যয়, সহিংসতা ও সামাজিক অনিশ্চয়তার পটভূমিতে এই ভিজ্যুয়াল উপস্থাপন মূলত এক ধরনের বীরত্বকেন্দ্রিক রাজনৈতিক উপস্থাপন—যেখানে সংকটকে সমাধানের বিষয় হিসেবে নয়, বরং আবেগময় রাজনৈতিক প্রতীকে রূপান্তর করা হয়। এটি ছিলো এমন এক পিআর কৌশল, যেখানে বাস্তব ব্যর্থতার পরিবর্তে ক্যারিশম্যাটিক ইমেজকে সামনে আনা হয়েছে। কিন্তু আধুনিক ক্রাইসিস কমিউনিকেশনের ভাষায় এটিকে বলা হয় প্রতীকী প্রদর্শনের মাধ্যমে বাস্তব ঘাটতি ঢাকার চেষ্টা—অর্থাৎ নীতিগত সক্ষমতার ঘাটতি ভিজ্যুয়াল শক্তি দিয়ে ঢেকে ফেলার চেষ্টা।
একই প্রবণতা আমরা শেখ হাসিনার কর্তৃত্ববাদী ও জনতুষ্টি শাসনের সময় ‘জয় বাংলা কনসার্ট’-এর মতো রাষ্ট্রঘনিষ্ঠ সাংস্কৃতিক আয়োজনেও দেখেছি। সেখানে দেশপ্রেম, সংগীত, সেলিব্রিটি উপস্থিতি ও আবেগী জাতীয়তাবাদকে একত্র করে রাজনৈতিক বৈধতা তৈরির চেষ্টা করা হয়েছিল। যেন সাংস্কৃতিক চামড়া দিয়ে জনরোষের রক্তপ্লাবন নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব। কিন্তু রাজনৈতিক যোগাযোগের ইতিহাস বলে— কনসার্ট পলিটিক্স কখনো শাসনব্যবস্থার সংকট-এর বিকল্প হতে পারে না।
ফরাসি দার্শনিক ও গণমাধ্যমতাত্ত্বিক গাই ডেবোর তাঁর বিখ্যাত গ্রন্থ দ্য সোসাইটি অব দ্য স্পেকট্যাকল –এ দেখিয়েছিলেন, আধুনিক পুঁজিবাদী ও ক্ষমতাকেন্দ্রিক সমাজে বাস্তব অভিজ্ঞতার জায়গা ক্রমশ দখল করে নেয় নির্মিত দৃশ্য, প্রতীক ও প্রদর্শন। তাঁর ভাষায়, রাষ্ট্র ও ক্ষমতা অনেক সময় বাস্তব সংকট সমাধানের বদলে এমন এক দৃশ্যনির্ভর আবেগ তৈরি করে, যাতে জনগণ বাস্তবতা নয়, বরং তার ভিজ্যুয়াল উপস্থাপন নিয়েই ব্যস্ত থাকে।
বাংলাদেশের রাজনৈতিক বাস্তবতায় ‘জয় বাংলা কনসার্ট’, আবেগনির্ভর ভিজ্যুয়াল আয়োজন কিংবা সংকটকালীন অতিরঞ্জিত প্রতীকী প্রদর্শন সেই ‘দৃশ্যনির্ভর সমাজ’-এরই প্রতিফলন। কিন্তু অর্থনৈতিক চাপ, নিরাপত্তাহীনতা, দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি কিংবা রাজনৈতিক বঞ্চনার মতো বাস্তব সংকট কোনো স্টেজ, আলো, কনসার্ট বা সেলিব্রিটি উপস্থিতি দিয়ে দীর্ঘমেয়াদে আড়াল করা যায় না। কারণ শেষ পর্যন্ত জনগণ রাজনৈতিক প্রচারণার ভাষা নয়, নিজেদের জীবনের বাস্তব অভিজ্ঞতাকেই সত্য হিসেবে বিবেচনা করে। এ কারণেই জনপ্রিয় সেলিব্রিটিদের সম্পৃক্ত করেও শেষ পর্যন্ত সতেরো বছরের সরকারের রাজনৈতিক বৈধতা ধরে রাখা সম্ভব হয়নি। আরেফিন শুভ, চঞ্চল চৌধুরী, নায়ক রিয়াজ, জলের গানসহ সাংস্কৃতিক ব্যক্তি ও দলকে রাষ্ট্রীয় ন্যারেটিভের সঙ্গে যুক্ত করার চেষ্টা হয়েছিল, কিন্তু জনগণের বাস্তব অভিজ্ঞতা যখন সরকারি প্রচারণার বিপরীত দিকে দাঁড়ায়, তখন তারকাখ্যাতি থেকে ধারকরা বৈধতা তৈরির চেষ্টা-ও অকার্যকর হয়ে পড়ে। কারণ রাজনৈতিক আস্থার মূল ভিত্তি হলো বাস্তবতায় বসবাস করা মানুষের প্রতিদিনের জীবন অভিজ্ঞতা। ফলে অতিরিক্ত আবেগনির্ভর, ভিজ্যুয়ালনির্ভর পিআর কৌশল শেষ পর্যন্ত উল্টো রাষ্ট্রের বিশ্বাসযোগ্যতাকেই ক্ষতিগ্রস্ত করে। তখন রাষ্ট্র পরিচালনা আর নীতিনির্ধারণের প্রক্রিয়া থাকে না; সেটি ধীরে ধীরে প্রদর্শনবাদী শাসনব্যবস্থাতে পরিণত হয়, যেখানে বাস্তব সমাধানের চেয়ে ক্যামেরার ফ্রেম বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।
আধুনিক রাজনৈতিক যোগাযোগের সবচেয়ে বড় শিক্ষা হলো—পিআর কখনো বাস্তব শাসনের বিকল্প নয়। কার্যকর পিআর সেই সরকারই করতে পারে, যার নীতিগত ভিত্তি দৃঢ় এবং যার সংকট মোকাবিলায় বাস্তব পদক্ষেপ আছে। অন্যথায় পিআর কৌশল ধীরে ধীরে ‘প্রোপাগান্ডা’ হিসেবে চিহ্নিত হয় এবং জনগণের আস্থাহীনতা বাড়িয়ে তোলে। রাষ্ট্র পরিচালনা তখন নীতিনির্ধারণের পরিবর্তে ‘পোস্টার ডিজাইন’-এ পরিণত হয়।
বাংলাদেশের বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতায় নতুন সরকারের সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ তাই শুধু উন্নয়নমূলক কর্মসূচি বাস্তবায়ন নয়; বরং জনগণের সঙ্গে বিশ্বাসযোগ্য যোগাযোগ তৈরি করা। যদি সরকার বাস্তব সংকটকে স্বীকার করে, তথ্যভিত্তিক ও স্বচ্ছ যোগাযোগ বজায় রাখে এবং জনগণের অংশগ্রহণমূলক আস্থা অর্জন করতে পারে, তবে তাদের রাজনৈতিক ‘মধুচন্দ্রিমা’ দীর্ঘস্থায়ী হয়ে তা ‘মধুরেণ সমাপয়েৎ’ হতে পারে। নয়তো অতিরিক্ত প্রতীকী পিআর এবং ভিজ্যুয়াল স্টান্ট দীর্ঘমেয়াদে সরকারের জন্য নতুন সংকটই তৈরি করবে। জনগণ সরকারি ভিজ্যুয়াল নয়, বাস্তবতাকেই সত্য হিসেবে বিবেচনা করে। তাই সংকটকে আড়াল করে তৈরি করা অতিরিক্ত পিআর-নির্ভর রাষ্ট্রচর্চা সাময়িক মোহ তৈরি করলেও দীর্ঘমেয়াদে সেটি ‘মধু হই হই, আরে বিষ হাবাইলা’-র রাজনৈতিক বাস্তবতায় রূপ নেয়।
*মতামত লেখকের নিজস্ব
লেখক: চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের যোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক, নিউ মিডিয়া ও রাজনৈতিক যোগাযোগ বিষয়ে গবেষক। ই-মেইল: [email protected]

দায়িত্ব নেওয়ার পর বিএনপি সরকারের তিন মাস পেরিয়েছে। রাজনৈতিক যোগাযোগের ভাষায় নতুন সরকারের প্রথম ১০০ দিনকে সাধারণত ‘মধুচন্দ্রিমা সময়’ হিসেবে বিবেচনা করা হয়—যে সময়ে জনগণ নতুন নেতৃত্বকে বাড়তি আস্থা, রাজনৈতিক সুযোগ এবং প্রত্যাশার সুবিধা দেয়। বাংলাদেশের রাজনীতির এক অস্থির সন্ধিক্ষণে ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে নিরঙ্কুশ বিজয়ের মধ্য দিয়ে সরকার গঠন করে বিএনপি।
তবে ক্ষমতায় আসার পর থেকেই প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন সরকারকে অর্থনৈতিক চাপ, আইনশৃঙ্খলার অবনতি, জ্বালানি সংকট, হাম পরিস্থিতি ও রাজনৈতিক মেরুকরণের মতো একাধিক সংকট মোকাবিলা করতে হয়েছে। এখন প্রশ্ন হলো—এই ‘মধুচন্দ্রিমা সময়ে’ সরকার বাস্তব সংকট মোকাবিলায় কতটা কার্যকর ক্রাইসিস কমিউনিকেশন করতে পেরেছে, আর কতটা আটকে থেকেছে ইমেজ ম্যানেজমেন্ট ও প্রতীকী রাজনৈতিক যোগাযোগে।
বাংলাদেশের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক বাস্তবতাকে যোগাযোগবিদ্যা, রাষ্ট্রীয় জনসংযোগ ও ক্রাইসিস কমিউনিকেশনের বিভিন্ন বিদ্যায়তনিক প্রেক্ষিত থেকে বিশ্লেষণ করা যাক।
আমরা জানি, একটি সরকার কেবল প্রশাসনিক দক্ষতা দিয়েই টিকে থাকে না; জনগণের সঙ্গে তার বিশ্বাসযোগ্য সম্পর্ক, সংকটকালে বার্তা ব্যবস্থাপনা এবং রাজনৈতিক বয়ান নির্মাণও সমানভাবে গুরুত্বপূর্ণ। আধুনিক রাষ্ট্রে পিআর কৌশল এখন আর কেবল প্রচারণা নয়, বরং শাসনব্যবস্থার অংশ। কিন্তু সংকটকে যদি বাস্তব নীতিগত চ্যালেঞ্জ হিসেবে না দেখে শুধুমাত্র “ইমেজ ম্যানেজমেন্ট” হিসেবে দেখা হয়, তখন সেই পিআর উল্টো সরকারের জন্যই বুমেরাং হয়ে দাঁড়ায়।
বাংলাদেশে সাম্প্রতিক সময়ে আমরা এমন কিছু প্রতীকী রাজনৈতিক যোগাযোগ বা সিম্বলিক কমিউনিকেশন দেখেছি, যা মূলত জনমনে ইতিবাচক আবেগ তৈরির উদ্দেশ্যে ব্যবহৃত হয়েছে। কখনো প্রধানমন্ত্রীকে সাদা রঙের সাধারণ শার্ট বা পোশাকে দেখা যাচ্ছে, কখনো নিজের গাড়ি নিজে চালাতে দেখা যাচ্ছে, আবার কখনো ফ্যামিলি ম্যান হিসেবে সপরিবারে সপ্রতিভ দৃশ্য সামনে আনা হচ্ছে। এই ধরনের ভিজ্যুয়াল কমিউনিকেশন মূলত নেতাকে ‘মানুষের কাছের মানুষ’ হিসেবে উপস্থাপন করার কৌশল। রাজনৈতিক যোগাযোগ তত্ত্বে একে বলা হয় নেতৃত্বের মানবিকীকরণ বা ‘হিউম্যানাইজেশন অফ লিডারশিপ’। বিশ্বের বহু রাষ্ট্রনায়কই এই কৌশল ব্যবহার করেছেন। তবে এর কার্যকারিতা নির্ভর করে বাস্তব নীতিগত পদক্ষেপের ওপর। কেবল আবেগনির্ভর প্রতীকী বার্তা দীর্ঘমেয়াদে জনগণের আস্থা ধরে রাখতে পারে না।
এখানেই ক্রাইসিস কমিউনিকেশনের মৌলিক প্রশ্নটি সামনে আসে। ‘পরিস্থিতিভিত্তিক সংকট-যোগাযোগ তত্ত্ব’ অনুযায়ী, কোনো রাষ্ট্র বা প্রতিষ্ঠানের সংকট মোকাবিলার প্রথম শর্ত হলো দায় স্বীকার, স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা এবং ক্ষতিগ্রস্ত জনগোষ্ঠীর প্রতি দৃশ্যমান সহমর্মিতা প্রদর্শন করা। সংকটের সময় জনগণ সরকারের কাছ থেকে তথ্য গোপন বা আবেগী নাটকীয়তা নয়, বরং নির্ভরযোগ্য তথ্য ও কার্যকর সমাধান প্রত্যাশা করে। অথচ বাংলাদেশের রাজনৈতিক বাস্তবতায় বহু সময় দেখা যায়, বাস্তব সংকটকে নীতিগতভাবে সমাধান না করে সেটিকে ‘ন্যারেটিভ’ দিয়ে নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করা হয়।
চট্টগ্রামের জলাবদ্ধতার ঘটনাকে কেন্দ্র করে এআই-সৃষ্ট ছবি বিতর্ক তার একটি বড় উদাহরণ। চট্টগ্রাম নগরের সাম্প্রতিক (৩০ এপ্রিল ২০২৬) জলাবদ্ধতা পরিস্থিতি নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ‘অতিরঞ্জিত’ প্রচার চালানো হয়েছে বলে মন্তব্য করেছেন স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম। বাস্তব দুর্ভোগের পরিবর্তে জনগণকে ধারণা ব্যবস্থাপনা বা পারসেপশন ম্যানেজমেন্ট দিয়ে বোঝানোর চেষ্টা জনমনে অবিশ্বাস তৈরি করে। তবে একইসঙ্গে আমরা বিপরীত উদাহরণও দেখেছি। চট্টগ্রামের মেয়র গ্রাফিতি বিতর্কের সময় আন্দোলনকারীদের বিপরীতে অবস্থান না নিয়ে নিজেই তাদের সঙ্গে যুক্ত হন, রাস্তায় নেমে গ্রাফিতি আঁকেন। চট্টগ্রাম নগরীতে জুলাই আন্দোলনের গ্রাফিতি মুছে ফেলা ও পুনরায় অঙ্কনকে কেন্দ্র করে টানা দুই দিন ধরে উত্তেজনা, ধস্তাধস্তি এবং রাজনৈতিক মুখোমুখি অবস্থান তৈরি হয়। ১৯ মে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে শেষ পর্যন্ত নিজে গিয়ে পুনরায় গ্রাফিতি একেছিলেন চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেন। এই পদক্ষেপটি সফল ক্রাইসিস কমিউনিকেশনের একটি গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ। কারণ তিনি সংঘাতকে দমন না করে অংশগ্রহণমূলক যোগাযোগ বা পার্টিসিপেটরি কমিউনিকেশন মডেল ব্যবহার করেছেন। ফলে সম্ভাব্য ক্ষোভ দ্রুত প্রশমিত হয়েছে।
বর্তমান সরকারের প্রথম ১০০ দিনের কার্যক্রম বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, তারা একদিকে জনকল্যাণমূলক কর্মসূচি বাস্তবায়নের চেষ্টা করেছে—যেমন ফ্যামিলি কার্ড, কৃষক কার্ড, ইমাম-মুয়াজ্জিন ও পুরোহিতদের ভাতা, মেয়েদের বিনা বেতনে স্নাতক শিক্ষা ইত্যাদি। এগুলো সরকারের পলিসি কমিউনিকেশন-এর ইতিবাচক উদাহরণ। অর্থাৎ সরকার কেবল প্রতীকী বার্তা নয়, কিছু দৃশ্যমান নীতিগত পদক্ষেপও সামনে এনেছে।
কিন্তু একই সময়ে হাম পরিস্থিতি, জ্বালানি সংকট, দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি, আইনশৃঙ্খলার অবনতি এবং মব ভায়োলেন্সের মতো ইস্যুতে সরকারের বার্তা ব্যবস্থাপনায় অসংগতি দেখা গেছে। সংকটের দায় পূর্ববর্তী সরকারের ওপর চাপিয়ে দেওয়ার প্রবণতা স্বল্পমেয়াদে রাজনৈতিকভাবে সুবিধাজনক মনে হলেও দীর্ঘমেয়াদে এটি রাষ্ট্রের বিশ্বাসযোগ্যতা ক্ষতিগ্রস্ত করে। কারণ ক্রাইসিস কমিউনিকেশনের সবচেয়ে বড় মূলধন হলো “ট্রাস্ট” বা জনআস্থা। জনগণ যখন বাস্তবতার সঙ্গে সরকারি ভাষ্যের অসামঞ্জস্য খুঁজে পায়, তখন এমনকি সত্য বার্তাও সন্দেহের চোখে দেখা শুরু করে।
এখানে বিশ্বের সফল রাষ্ট্রনায়কদের উদাহরণ গুরুত্বপূর্ণ। নিউজিল্যান্ডের সাবেক প্রধানমন্ত্রী জেসিন্ডা আর্ডার্ন ক্রাইসিস কমিউনিকেশনের একটি আদর্শ মডেল তৈরি করেছিলেন। ক্রাইস্টচার্চ মসজিদে হামলার পর তিনি কেবল প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেননি, বরং শোকাহত মানুষের পাশে সরাসরি দাঁড়িয়েছিলেন। তার বার্তায় ছিল সহমর্মিতা, স্বচ্ছতা এবং দ্রুত নীতিগত পদক্ষেপ। তিনি ‘তারা আমাদেরই মানুষ’ বলে জাতিকে একত্রিত করেছিলেন। ফলাফল হিসেবে জনগণের আস্থা বহুগুণ বেড়ে যায়।
অন্যদিকে কোভিড-১৯ সংকটে জার্মান চ্যান্সেলর অ্যাঙ্গেলা মের্কেল বৈজ্ঞানিক তথ্যভিত্তিক যোগাযোগকে অগ্রাধিকার দিয়েছিলেন। তিনি আবেগী নাটকীয়তার পরিবর্তে যুক্তি, তথ্য এবং স্বচ্ছ ব্যাখ্যার মাধ্যমে জনগণকে বোঝানোর চেষ্টা করেন। ফলে জার্মান জনগণের বড় অংশ সরকারের নির্দেশনা মেনে চলেছিল। এটি ছিল তথ্যনির্ভর সংকট-যোগাযোগ—যাকে যোগাযোগ ও জনসংযোগবিদ্যার আলোকে বলা যায় তথ্যপ্রমাণভিত্তিক সংকট-যোগাযোগের সফল উদাহরণ।
বারাক ওবামার যোগাযোগ কৌশলও উল্লেখযোগ্য। ওবামা জানতেন, রাজনৈতিক নেতৃত্বে কেবল বক্তব্য নয়, ন্যারেটিভ ওনারশিপ বা রাজনৈতিক বয়ানের কর্তৃত্ব অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। অর্থনৈতিক মন্দা ও স্বাস্থ্যনীতি সংস্কারের সময় তিনি ডিজিটাল মিডিয়া, টাউনহল মিটিং এবং ব্যক্তিগত গল্প ব্যবহার করে জনগণের সঙ্গে সরাসরি সংযোগ স্থাপন করেন। ফলে তার প্রশাসনের বার্তা জনগণের কাছে মানবিক ও গ্রহণযোগ্য হয়ে ওঠে।
অন্তর্বর্তীকালীন ইউনূস সরকারের একটি বড় ব্যর্থতা ছিল—রাষ্ট্রীয় সংকটকে বাস্তব নীতিগত ও কাঠামোগত চ্যালেঞ্জ হিসেবে না দেখে সেটিকে ‘ইমেজ ম্যানেজমেন্ট ইভেন্ট’-এ পরিণত করা। দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি, মব ভায়োলেন্স, অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা কিংবা জনআতঙ্ক যখন তীব্র হচ্ছিল, তখন রাষ্ট্রীয় বাসভবন যমুনা কার্যত রাজনৈতিক ফটোসেশনের মঞ্চে পরিণত হয়েছিল।
বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতাদের সঙ্গে বৈঠকের দৃশ্য প্রচার করা হলেও জনগণ সেখানে কোনো কার্যকর সংকট-সমাধানের রূপরেখা দেখেনি। একইভাবে শেখ হাসিনার শাসনামলেও আমরা দেখেছি—সংকটের সময় জনতার সঙ্গে সরাসরি সংলাপে না গিয়ে তিনি ব্যবসায়ী, অনুগত বুদ্ধিজীবী ও সুবিধাভোগী এলিটদের নিয়ে পরামর্শ বৈঠক করেছেন। এই দুই ক্ষেত্রেই রাষ্ট্র ক্ষমতা জনগণের বাস্তব অভিজ্ঞতা থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে একটি ক্ষমতানির্ভর আত্মতুষ্টির বলয় তৈরি করেছে। আধুনিক ক্রাইসিস কমিউনিকেশনের দৃষ্টিতে এটি যোগাযোগ কৌশলের একটি ধ্রুপদি ব্যর্থতা; কারণ সংকটকালে জনগণ চায় স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা ও অংশগ্রহণমূলক সংলাপ; কিন্তু তারা পেয়েছে পরিকল্পিত দৃশ্যমানতা, সাজানো পরামর্শ বৈঠক এবং ক্ষমতাকেন্দ্রিক প্রতীকী প্রদর্শন। ফলত রাষ্ট্রীয় বার্তা বিশ্বাসযোগ্যতা হারিয়েছে এবং জনগণের কাছে সরকার ক্রমশ বাস্তবতা-বিচ্ছিন্ন এক প্রদর্শননির্ভর কর্তৃত্বে পরিণত হয়েছে।
বাংলাদেশের নিকট অতীতের রাজনৈতিক বাস্তবতায় আমরা এক ধরনের ভিজুয়েল পপুলিজম বা দৃশ্যনির্ভর রাজনৈতিক যোগাযোগের বিস্তার দেখতে পেয়েছিলাম। ওসমান হাদির রক্তাক্ত স্মৃতিকে ধারণ করে হেলমেট পরে আশিক চৌধুরীর প্যারাগ্লাইডিং জাম্প ছিলো তার সবচেয়ে শক্তিশালী উদাহরণগুলোর একটি।
রাষ্ট্রীয় বিপর্যয়, সহিংসতা ও সামাজিক অনিশ্চয়তার পটভূমিতে এই ভিজ্যুয়াল উপস্থাপন মূলত এক ধরনের বীরত্বকেন্দ্রিক রাজনৈতিক উপস্থাপন—যেখানে সংকটকে সমাধানের বিষয় হিসেবে নয়, বরং আবেগময় রাজনৈতিক প্রতীকে রূপান্তর করা হয়। এটি ছিলো এমন এক পিআর কৌশল, যেখানে বাস্তব ব্যর্থতার পরিবর্তে ক্যারিশম্যাটিক ইমেজকে সামনে আনা হয়েছে। কিন্তু আধুনিক ক্রাইসিস কমিউনিকেশনের ভাষায় এটিকে বলা হয় প্রতীকী প্রদর্শনের মাধ্যমে বাস্তব ঘাটতি ঢাকার চেষ্টা—অর্থাৎ নীতিগত সক্ষমতার ঘাটতি ভিজ্যুয়াল শক্তি দিয়ে ঢেকে ফেলার চেষ্টা।
একই প্রবণতা আমরা শেখ হাসিনার কর্তৃত্ববাদী ও জনতুষ্টি শাসনের সময় ‘জয় বাংলা কনসার্ট’-এর মতো রাষ্ট্রঘনিষ্ঠ সাংস্কৃতিক আয়োজনেও দেখেছি। সেখানে দেশপ্রেম, সংগীত, সেলিব্রিটি উপস্থিতি ও আবেগী জাতীয়তাবাদকে একত্র করে রাজনৈতিক বৈধতা তৈরির চেষ্টা করা হয়েছিল। যেন সাংস্কৃতিক চামড়া দিয়ে জনরোষের রক্তপ্লাবন নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব। কিন্তু রাজনৈতিক যোগাযোগের ইতিহাস বলে— কনসার্ট পলিটিক্স কখনো শাসনব্যবস্থার সংকট-এর বিকল্প হতে পারে না।
ফরাসি দার্শনিক ও গণমাধ্যমতাত্ত্বিক গাই ডেবোর তাঁর বিখ্যাত গ্রন্থ দ্য সোসাইটি অব দ্য স্পেকট্যাকল –এ দেখিয়েছিলেন, আধুনিক পুঁজিবাদী ও ক্ষমতাকেন্দ্রিক সমাজে বাস্তব অভিজ্ঞতার জায়গা ক্রমশ দখল করে নেয় নির্মিত দৃশ্য, প্রতীক ও প্রদর্শন। তাঁর ভাষায়, রাষ্ট্র ও ক্ষমতা অনেক সময় বাস্তব সংকট সমাধানের বদলে এমন এক দৃশ্যনির্ভর আবেগ তৈরি করে, যাতে জনগণ বাস্তবতা নয়, বরং তার ভিজ্যুয়াল উপস্থাপন নিয়েই ব্যস্ত থাকে।
বাংলাদেশের রাজনৈতিক বাস্তবতায় ‘জয় বাংলা কনসার্ট’, আবেগনির্ভর ভিজ্যুয়াল আয়োজন কিংবা সংকটকালীন অতিরঞ্জিত প্রতীকী প্রদর্শন সেই ‘দৃশ্যনির্ভর সমাজ’-এরই প্রতিফলন। কিন্তু অর্থনৈতিক চাপ, নিরাপত্তাহীনতা, দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি কিংবা রাজনৈতিক বঞ্চনার মতো বাস্তব সংকট কোনো স্টেজ, আলো, কনসার্ট বা সেলিব্রিটি উপস্থিতি দিয়ে দীর্ঘমেয়াদে আড়াল করা যায় না। কারণ শেষ পর্যন্ত জনগণ রাজনৈতিক প্রচারণার ভাষা নয়, নিজেদের জীবনের বাস্তব অভিজ্ঞতাকেই সত্য হিসেবে বিবেচনা করে। এ কারণেই জনপ্রিয় সেলিব্রিটিদের সম্পৃক্ত করেও শেষ পর্যন্ত সতেরো বছরের সরকারের রাজনৈতিক বৈধতা ধরে রাখা সম্ভব হয়নি। আরেফিন শুভ, চঞ্চল চৌধুরী, নায়ক রিয়াজ, জলের গানসহ সাংস্কৃতিক ব্যক্তি ও দলকে রাষ্ট্রীয় ন্যারেটিভের সঙ্গে যুক্ত করার চেষ্টা হয়েছিল, কিন্তু জনগণের বাস্তব অভিজ্ঞতা যখন সরকারি প্রচারণার বিপরীত দিকে দাঁড়ায়, তখন তারকাখ্যাতি থেকে ধারকরা বৈধতা তৈরির চেষ্টা-ও অকার্যকর হয়ে পড়ে। কারণ রাজনৈতিক আস্থার মূল ভিত্তি হলো বাস্তবতায় বসবাস করা মানুষের প্রতিদিনের জীবন অভিজ্ঞতা। ফলে অতিরিক্ত আবেগনির্ভর, ভিজ্যুয়ালনির্ভর পিআর কৌশল শেষ পর্যন্ত উল্টো রাষ্ট্রের বিশ্বাসযোগ্যতাকেই ক্ষতিগ্রস্ত করে। তখন রাষ্ট্র পরিচালনা আর নীতিনির্ধারণের প্রক্রিয়া থাকে না; সেটি ধীরে ধীরে প্রদর্শনবাদী শাসনব্যবস্থাতে পরিণত হয়, যেখানে বাস্তব সমাধানের চেয়ে ক্যামেরার ফ্রেম বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।
আধুনিক রাজনৈতিক যোগাযোগের সবচেয়ে বড় শিক্ষা হলো—পিআর কখনো বাস্তব শাসনের বিকল্প নয়। কার্যকর পিআর সেই সরকারই করতে পারে, যার নীতিগত ভিত্তি দৃঢ় এবং যার সংকট মোকাবিলায় বাস্তব পদক্ষেপ আছে। অন্যথায় পিআর কৌশল ধীরে ধীরে ‘প্রোপাগান্ডা’ হিসেবে চিহ্নিত হয় এবং জনগণের আস্থাহীনতা বাড়িয়ে তোলে। রাষ্ট্র পরিচালনা তখন নীতিনির্ধারণের পরিবর্তে ‘পোস্টার ডিজাইন’-এ পরিণত হয়।
বাংলাদেশের বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতায় নতুন সরকারের সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ তাই শুধু উন্নয়নমূলক কর্মসূচি বাস্তবায়ন নয়; বরং জনগণের সঙ্গে বিশ্বাসযোগ্য যোগাযোগ তৈরি করা। যদি সরকার বাস্তব সংকটকে স্বীকার করে, তথ্যভিত্তিক ও স্বচ্ছ যোগাযোগ বজায় রাখে এবং জনগণের অংশগ্রহণমূলক আস্থা অর্জন করতে পারে, তবে তাদের রাজনৈতিক ‘মধুচন্দ্রিমা’ দীর্ঘস্থায়ী হয়ে তা ‘মধুরেণ সমাপয়েৎ’ হতে পারে। নয়তো অতিরিক্ত প্রতীকী পিআর এবং ভিজ্যুয়াল স্টান্ট দীর্ঘমেয়াদে সরকারের জন্য নতুন সংকটই তৈরি করবে। জনগণ সরকারি ভিজ্যুয়াল নয়, বাস্তবতাকেই সত্য হিসেবে বিবেচনা করে। তাই সংকটকে আড়াল করে তৈরি করা অতিরিক্ত পিআর-নির্ভর রাষ্ট্রচর্চা সাময়িক মোহ তৈরি করলেও দীর্ঘমেয়াদে সেটি ‘মধু হই হই, আরে বিষ হাবাইলা’-র রাজনৈতিক বাস্তবতায় রূপ নেয়।
*মতামত লেখকের নিজস্ব
লেখক: চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের যোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক, নিউ মিডিয়া ও রাজনৈতিক যোগাযোগ বিষয়ে গবেষক। ই-মেইল: [email protected]

র্যাডক্লিফ লাইনের দুই পারে এখন একই সুতোয় বাঁধা দুটি সংকট। একদিকে পশ্চিমবঙ্গে নতুন করে জারি হওয়া পশু জবাই নিয়ন্ত্রণ বিধি, অন্যদিকে বাংলাদেশের ধুঁকতে থাকা চামড়াশিল্প। সাদা চোখে এ দুটি সমস্যা দেখতে আলাদা মনে হলেও আদতে এরা পরস্পরের সঙ্গে সম্পর্কিত।
৪ ঘণ্টা আগে
ঈদযাত্রা নিরাপদ করতে সরকারের পক্ষ থেকে সব ধরনের ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা হচ্ছে। সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী শেখ রবিউল আলম এই দাবি করেছিলেন গত ১০ মে ঢাকা লেডিস ক্লাবে নৌ নিরাপত্তা সপ্তাহের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে। এর ঠিক ১৫ দিনের মাথায় গত ২৫ মে টাঙ্গাইলে যমুনা সেতুর পূর্ব প্রান্তে ট্রাক উল্টে নিহত হন ১৫ জন।
৭ ঘণ্টা আগে
চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডে জঙ্গল সলিমপুর দীর্ঘ তিন দশক ধরে বাংলাদেশের বুকে সমান্তরাল ও স্বৈরতান্ত্রিক অপরাধ সাম্রাজ্যের জীবন্ত প্রতীক হয়ে উঠেছিল। ভৌগোলিক দুর্গমতা, প্রশাসনিক শিথিলতা এবং রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতাকে ঢাল বানিয়ে ‘ছিন্নমূল বস্তিবাসী সমাজ কল্যাণ সমিতি’র আড়ালে এখানে গড়ে তোলা হয়েছিল নিজস্ব প্রশাসন,
১২ ঘণ্টা আগে
এম হুমায়ুন কবীর সাবেক রাষ্ট্রদূত ও বাংলাদেশ এন্টারপ্রাইজেস ইনস্টিটিউটের (বিইআই) সভাপতি। কাজ করেছেন কলকাতায় বাংলাদেশের ডেপুটি হাইকমিশনার হিসেবে। সেপ্টেম্বর-২০১০ সালে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে সচিব পদে অবসর গ্রহণ করেন।
১২ ঘণ্টা আগে