গণভোট হওয়ার কথা ছিল জাতীয় ঐকমত্যের উৎসব। ফ্যাসিবাদবিরোধী রাজনীতির বিজয়গাথা। কিন্তু বাস্তবতা ভিন্ন। গণভোট এখন নতুন বিভাজনের নাম। প্রশ্ন উঠেছে। কে কার পক্ষে? কে কার বিপক্ষে? আরেকটি প্রশ্ন আরও গভীর। পরাজিত ফ্যাসিবাদী শক্তি এবং যারা নতুন ফ্যাসিবাদী শক্তি হয়ে উঠতে চায়-তারা কি সত্যিই ‘না’ ভোটকে কেন্দ্র করে এক ছাতার নিচে? সংক্ষিপ্ত উত্তর-হ্যাঁ। দীর্ঘ উত্তর-এই ঐক্য প্রকাশ্যে নয়। এটি স্বার্থের ঐক্য। এটি কৌশলগত ঐক্য। এটি জুলাই বিপ্লববিরোধী ঐক্য।
‘না’ শিবিরের সদস্য কারা? প্রথমত, কার্যক্রম নিষিদ্ধ ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগ। দ্বিতীয়ত, তাদের পুরনো দোসর জাতীয় পার্টি। তৃতীয়ত, রাষ্ট্রের ভেতরে থাকা সুবিধাভোগী আমলাতান্ত্রিক নেটওয়ার্কের অংশবিশেষ। চতুর্থত, নতুন করে কর্তৃত্ববাদী রাজনীতি গড়তে আগ্রহী কিছু শক্তি। তারা কিন্তু সবাই মুখে এক কথা বলে না। কিন্তু লক্ষ্য এক। গণভোট দুর্বল করা। সংস্কারের বৈধতা প্রশ্নবিদ্ধ করা। পরিবর্তনের গতিকে ধীর করা। তাদের অনেকেই রাজনীতিবিদ নন। তারা কথা বলেন রাজনৈতিক কৌশলবিদের ভাষায়। সাজেন রাজনৈতিক বিশ্লেষক। একজন রাষ্ট্রবিজ্ঞানী বলেন, ‘ফ্যাসিবাদীরা সরাসরি ক্ষমতায় ফেরার চেষ্টা করে না। তারা আগে গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়াকে অকার্যকর প্রমাণ করতে চায়।’
গণভোট ব্যর্থ হলে কী হবে? সংস্কার আটকে যাবে। অন্তর্বর্তী ব্যবস্থার বিশ্বাসযোগ্যতা ক্ষতিগ্রস্ত হবে। নতুন সাংবিধানিক বন্দোবস্ত বিলম্বিত হবে। এই শূন্যতাই ফ্যাসিবাদের অক্সিজেন। তাই যদি হয়, তাহলে ফ্যাসিস্টবিরোধী শিবিরে বিভাজন কেন? এটাই সবচেয়ে বড় প্রশ্ন। কারণ আদর্শ নয়। কারণ কৌশল।
কোনো রাজনৈতিক দল মনে করছে, গণভোটে ‘হ্যাঁ’ মানে নতুন সংস্কার কাঠামোর প্রতি পূর্ণ সমর্থন। তাদের আশঙ্কা-নতুন কাঠামোতে তাদের রাজনৈতিক প্রভাব কম।
অর্থাৎ, বিষয়টি সংস্কার বনাম সংস্কার নয়। বিষয়টি ক্ষমতার হিসাব। একটি বড় দল ভাবছে, গণভোট সফল হলে অন্তর্বর্তী বন্দোবস্ত শক্তিশালী হবে। তাতে তাদের দরকষাকষির ক্ষমতা কমবে। ‘হ্যাঁ’র পক্ষের দলগুলো ভাবনা হলো, গণভোটের মাধ্যমে নতুন রাজনৈতিক শক্তিগুলো বৈধতা পাবে। পুরনো দলগুলোর একচ্ছত্র আধিপত্য ভাঙবে। ‘না’র পক্ষের দলগুলোর এখানেই আসল ভয়। বাংলাদেশের রাজনীতিতে সবচেয়ে শক্তিশালী আদর্শ হলো ক্ষমতায় থাকার আদর্শ। সংস্কার হলে সেটির সম্ভাবনায় আঘাত আসতে পারে। কারণ ঠিকঠাক ভোট হলে অনেক কিছু পাল্টে যেতে পারে। পাল্টে যায়।
দীর্ঘদিন সংস্কার নিয়ে আলোচনা হলো। জুলাই সনদ হলো। সংস্কারের রূপরেখা দাঁড়ালো। বাস্তবায়ন নিয়েও ঐকমত্য হলো। গণভোটের সময় নিয়েও সমাধান হলো। তাহলে এখন হঠাৎ কেন ‘না’? দ্বন্দ্ব এখন কার হাতে সংস্কারের চাবি থাকবে। সংস্কার কে করবে? কার তত্ত্বাবধানে? কার রাজনৈতিক লাভ হবে? এই তিন প্রশ্নই আজকের রাজনীতির কেন্দ্র।
‘হ্যাঁ’ মানে কী? ‘হ্যাঁ’ মানে- সংবিধান ও রাষ্ট্রকাঠামোর মৌলিক সংস্কারে সম্মতি। ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণে সম্মতি। স্বাধীন নির্বাচন ব্যবস্থায় সম্মতি। স্বাধীন বিচারব্যবস্থা,ফ্যাসিবাদী শাসনব্যবস্থার অবসানে সম্মতি। ইনসাফের শাসন। দায় ও দরদের রাজনীতি। এগুলো নিয়ে তো আপত্তি থাকার কথা নয়। তবু আপত্তি আছে। কারণ ‘হ্যাঁ’ মানে একটি রাজনৈতিক সত্য মেনে নেওয়া- ফ্যাসিবাদ শেষ। ফিরে যাওয়ার রাস্তা নেই। কিছু দল এখনো এই বাক্যটি উচ্চারণে অস্বস্তি বোধ করে।
‘না’ভোটের পক্ষে দাঁড়ানোর পেছনে হিসাব কাজ করছে কি? হ্যাঁ। খুব খোলামেলা হিসাব। কোনো কোনো দল কি মনে করছে, তাদের নিজস্ব ভোটে ক্ষমতায় যাওয়া কঠিন হয়ে যাচ্ছে। ফলে পালিয়ে ফ্যাসিস্টের সমর্থকদের ভোট তাকে পেতে হবে। আর সেই ভোট পেতে হলে ‘না’র পক্ষে থাকতে হবে। কারণ ফ্যাসিস্ট ও তার দোসররা ‘না’র পক্ষে কঠিনভাবে নেমেছে। ‘না’-এ ‘না’-এ মিল হলে নির্বাচনে ভোট বাড়বে। তারা ফ্যাসিস্টের দোসরদের আশ্রয় দিতে চায়। ভোটের হিসাব মিলাতে চায়। ঝুঁকি নিতে চায় না। এটি রাজনৈতিক সুবিধাবাদ। রাষ্ট্রবিজ্ঞানীরা বলেন, ‘গণতন্ত্র ধ্বংস হয় যখন গণতন্ত্রপন্থীরা সাহস হারায়।’ বাংলাদেশে আজ সেটাই হচ্ছে।
এটি ‘হ্যাঁ’ বনাম ‘না’ নয়। এটি ভবিষ্যৎ বনাম অতীত। যারা ‘হ্যাঁ’ থেকে দূরে থাকছে, তারা হয়তো সরাসরি ফ্যাসিস্ট নয়, কিন্তু তারা ফ্যাসিবাদের পথ সহজ করছে। ইতিহাস এটাই মনে রাখবে।
‘না’ শিবিরের কৌশল কি? তারা তিন ধাপে কাজ করছে। এক. গণভোটের প্রয়োজনীয়তা প্রশ্নবিদ্ধ করা। দুই. সংস্কারের রূপরেখাকে অস্পষ্ট বলা। তিন. ফ্যাসিস্টবিরোধী শিবিরে সন্দেহ ছড়ানো। এই তিনটি কাজ সফল হলে গণভোট দুর্বল হবে। তারপর তারা বলবে-দেখুন, মানুষ আগ্রহী না। দেখুন, ঐকমত্য নেই। এটাই পুরনো কৌশল।
ফ্যাসিস্টবিরোধী ঐক্য কোথায় গেল? ঐক্য ছিল আন্দোলনের মাঠে। ঐক্য ছিল পতনের সময়। কিন্তু ক্ষমতার প্রশ্ন এলেই ঐক্য ভেঙে যায়। এটি বাংলাদেশের রাজনীতির পুরনো রোগ। সবাই পরিবর্তন চায়। কিন্তু কেউ নিজের জায়গা বদলাতে চায় না। ‘হ্যাঁ’র পক্ষে সবাই নামছে না কেন? কারণ-কিছু দল ভবিষ্যৎ নির্বাচন নিয়ে বেশি চিন্তিত। রাষ্ট্র সংস্কার নিয়ে কম। কিছু দল মনে করে, গণভোটে ‘হ্যা’র পক্ষে সক্রিয় হলে তারা নতুন শক্তির উত্থান ঠেকাতে পারবে না।
‘হ্যাঁ’র পক্ষে যারা থাকবে না, তারা কি জেনেশুনে ঝুঁকি নিচ্ছে, নাকি নিজের ক্ষতি বুঝতে পারছে না-এই প্রশ্নটি এখন কেন্দ্রে। একদল ভালোভাবেই জানে, ‘না’ জিতলে ফ্যাসিবাদী শক্তি রাজনৈতিক অক্সিজেন পাবে। জানে, সংস্কার থমকে যাবে। জানে, রাষ্ট্র কাঠামোর পরিবর্তন বিলম্বিত হবে। তবু তারা ঝুঁকি নিচ্ছে। কারণ তাদের চোখে তাৎক্ষণিক রাজনৈতিক লাভ বড়। তারা ভাবছে,‘হ্যাঁ’র পক্ষে না থাকলে তারা ফ্যাসিস্টের পক্ষের ভোট পাবে। তারা আসলে পরিস্থিতির গভীরতা বুঝতে পারছে না। তারা এটিকে কেবল দলীয় কৌশলের প্রশ্ন হিসেবে দেখছে। ভাবছে, ‘হ্যাঁ’ বললে তারা কারও পেছনে চলে যাবে। এই দৃষ্টিভঙ্গি স্বল্পদৃষ্টিসম্পন্ন। তারা বুঝতে পারছে না, গণভোটে নিরপেক্ষ থাকা মানে কার্যত ‘না’ শিবিরকে শক্তিশালী করা। সবচেয়ে বড় ক্ষতিটা হবে রাজনৈতিক বিশ্বাসযোগ্যতায়। আগামী দিনে জনগণ প্রশ্ন করবে-ফ্যাসিবাদ পতনের পর যখন রাষ্ট্র গঠনের সুযোগ এলো, তখন আপনারা কোথায় ছিলেন? ইতিহাস সাধারণত দ্বিধাগ্রস্তদের ক্ষমা করে না।
এটি ‘হ্যাঁ’ বনাম ‘না’ নয়। এটি ভবিষ্যৎ বনাম অতীত। যারা ‘হ্যাঁ’ থেকে দূরে থাকছে, তারা হয়তো সরাসরি ফ্যাসিস্ট নয়, কিন্তু তারা ফ্যাসিবাদের পথ সহজ করছে। ইতিহাস এটাই মনে রাখবে। রাজনীতি কৌশলের খেলা। কিন্তু কিছু সময় আসে যখন কৌশলের ঊর্ধ্বে উঠে অবস্থান নিতে হয়। বাংলাদেশ আজ সেই সময়েই দাঁড়িয়ে। ‘না’বলার আগে একবার আয়নায় তাকানো দরকার। পরিণতির কথা ভাবা দরকার। ফ্যাসিস্ট হাসিনার ভয়াবহ পতনের বিষয়টি ভাবা দরকার।
জুলাই বিপ্লব কোনো আকস্মিক বিস্ফোরণ ছিল না। এটি ছিল জমে থাকা ক্ষোভের বিস্ফোরণ। দীর্ঘদিনের দমন-পীড়নের বিরুদ্ধে মানুষের সম্মিলিত চিৎকার। এই বিপ্লবে ১৪০০’র বেশি মানুষ প্রাণ দিয়েছে। চল্লিশ হাজারেরও বেশি মানুষ আহত হয়েছে। অনেকে পঙ্গু হয়েছে। অনেকে চিরতরে চোখ হারিয়েছে। এই রক্ত কোনো শূন্যতার জন্য ঝরেনি। এই রক্ত একটি নতুন বাংলাদেশের দাবিতে ঝরেছে।
‘হ্যাঁ’ মানে সেই দাবিকে স্বীকৃতি দেওয়া। ‘হ্যাঁ’ মানে বলা-আমরা আর ফ্যাসিবাদী রাষ্ট্র চাই না। আমরা আর বন্দী গণতন্ত্র চাই না। আমরা আর ভুয়া নির্বাচন চাই না।
জুলাইয়ের মানুষ রাস্তায় নেমেছিল সংস্কারের জন্য। ন্যায়বিচারের জন্য। সমতার জন্য। রাষ্ট্রের চরিত্র বদলের জন্য। গণভোটে ‘হ্যাঁ’ সেই লড়াইয়ের সাংবিধানিক রূপ।
যারা বলেন, পরে দেখা যাবে, তারা আসলে বলতে চান, পরিবর্তন পিছিয়ে দেওয়া হোক। কিন্তু শহীদের রক্ত সময় চায় না। এটি জবাব চায়। ‘হ্যাঁ’ মানে শহীদদের প্রতি দায় স্বীকার। ‘হ্যাঁ’ মানে বলা- ‘তোমাদের রক্ত বৃথা যেতে দেব না’।
গণভোটে ‘হ্যাঁ’ জিতলে-ফ্যাসিবাদ রাজনৈতিকভাবে পরাজিত হবে। সংস্কার সাংবিধানিক ভিত্তি পাবে। নতুন বাংলাদেশের যাত্রা শুরু হবে। গণভোটে ‘না’ জিতলে-ফ্যাসিবাদ বলবে, মানুষ পরিবর্তন চায়নি। এই মিথ্যা প্রতিষ্ঠিত হতে দেওয়া যায় না। জুলাই বিপ্লব আমাদের ইতিহাস। ‘হ্যাঁ’তার স্বাভাবিক পরিণতি। যে পক্ষ জুলাইকে সম্মান করে, জুলাইয়ের জনআকাঙ্ক্ষাকে ধারণ করে, সে পক্ষের অবস্থান একটাই হতে পারে, ‘হ্যাঁ’।
লেখক: সাবেক সাধারণ সম্পাদক, ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়ন