আমীন আল রশীদ

রাজধানীর বেইলি রোড, মিন্টো রোড ও হেয়ার রোড মন্ত্রিপাড়া হিসেবে পরিচিত। এসব এলাকার আবাসিক ভবনগুলোয় মন্ত্রীরা বসবাস করেন। বর্তমানে সেখানে আছেন অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টাসহ প্রজাতন্ত্রের কর্মে নিয়োজিত গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিরা। বাড়িগুলো বনেদি। বিশাল জায়গাজুড়ে। খোলামেলা। কিন্তু তারপরও ভবিষ্যৎ সরকারের মন্ত্রীদের জন্য এখানে তিনটি ভবন নির্মাণের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। এসব ভবনে থাকবে ৭২টি ফ্ল্যাট, যার আয়তন হবে ৮ হাজার ৫০০ থেকে ৯ হাজার ৩০ বর্গফুট। এ জন্য নেওয়া হচ্ছে ৭৮৬ কোটি টাকার একটি প্রকল্প। যেখানে থাকবেন মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী, উপমন্ত্রী এবং সাংবিধানিক সংস্থার প্রধানসহ সরকারের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিরা।
সংবাদমাধ্যমের খবর বলছে, মন্ত্রিপাড়ায় এখন মন্ত্রীদের জন্য বাংলোবাড়ি আছে ১৫টি। আর বেইলি রোডে মিনিস্টার্স অ্যাপার্টমেন্ট নামে তিনটি ভবন রয়েছে। প্রতিটি ভবনে ১০টি করে ৩০টি ফ্ল্যাট রয়েছে। প্রতিটি ফ্ল্যাটের আয়তন সাড়ে ৫ হাজার বর্গফুট। মন্ত্রিপাড়া ছাড়াও গুলশান ও ধানমন্ডিতে মন্ত্রীদের জন্য আবাসনের ব্যবস্থা রয়েছে। কিন্তু এর মধ্যেই আবার নতুন বাড়ি নির্মাণের এই উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
জনগণের করের পয়সায় মন্ত্রী ও আমলাদের এই ধরনের ফুটানি নতুন কিছু নয়। জনগণের ট্যাক্সের পয়সায় তাঁদের বেতন হয়, আবার সেই জনগণকেই কোনো সার্ভিস দেওয়ার বিনিময়ে তাঁদের কাছ থেকে জনকর্মচারীরা ঘুষ নেন। যে জনগণের করের পয়সায় তাঁদের বেতন হয়, তাঁরা সেই জনগণকেই নিজেদের অধীন মনে করেন। ‘স্যার’ না ডাকলে মন খারাপ করেন। অনেকে বাজে আচরণও করেন। সেই জনগণের পয়সার শ্রাদ্ধ করতে ঘাস চাষ কিংবা পুকুর কাটার মতো অদ্ভুত সব কাজে জ্ঞান অর্জনের নামে বিদেশে গিয়ে তাঁরা প্রমোদ ভ্রমণ করেন। তার ওপর সরকারি বিভিন্ন প্রকল্প থেকে শত শত কোটি টাকা লুটপাট তো আছেই।
প্রশ্ন হলো, মন্ত্রীদের জন্য বাড়ি ও ফ্ল্যাট থাকার পরেও নতুন করে কেন ভবন বানাতে হবে—যার একেকটি ফ্ল্যাটের আয়তন হবে ৯ হাজার বর্গফুট? একটি পরিবারের বসবাসের জন্য সর্বোচ্চ কত বর্গফুটের ফ্ল্যাট দরকার? তা ছাড়া আগের বাড়ি ও ফ্ল্যাটগুলো কি সেকেলে হয়ে গেছে? প্রধানমন্ত্রীর বাসভবন গণভবনকে না হয় জাদুঘর বানানো হয়েছে। কিন্তু অন্য মন্ত্রীদের বাড়ি তো জাদুঘর বা চিড়িয়াখানা হয়নি। তাহলে মন্ত্রীদের জন্য ৯ হাজার বর্গফুটের ফ্ল্যাট বানাতে হবে কেন? সরকারের হাতে কি উদ্বৃত্ত টাকা আছে নাকি সরকার টাকা খরচ করার জায়গা পাচ্ছে না? বরিশালে একটা প্রবাদ আছে: ‘টাকায় কামড়ায়’। অর্থাৎ যখন কেউ অপচয় করে বা অযৌক্তিক খাতে পয়সা খরচ করে, তখন এই প্রবাদটি ব্যবহৃত হয়। কিন্তু এই মুহূর্তে বাংলাদেশের অর্থনীতির যে হাল, তাতে বিলাসিতা দেখানোর কি কোনো সুযোগ আছে? কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সাম্প্রতিক তথ্য বলছে, গত বছরের সেপ্টেম্বর প্রান্তিক শেষে বাংলাদেশের ব্যাংকগুলোর খেলাপি ঋণের স্থিতি প্রায় সাড়ে ৬ লাখ কোটি টাকা। এই মুহূর্তে দেশের খেলাপি ঋণের হার এখন বিশ্বের মধ্যে সর্বোচ্চ।
শোনা যাচ্ছে, মন্ত্রীদের জন্য নতুন ফ্ল্যাট নির্মাণের প্রকল্প নিতে বেশি আগ্রহী আমলারা। কেননা মন্ত্রীদের নতুন ভবনে বাসা দেওয়া গেলে এখনকার বড় বড় ফ্ল্যাটগুলোয় আমলারা উঠতে পারবেন।
আমলাদের এই চাতুর্য নতুন কিছু নয়। তাঁরা বরাবরই রাজনীতিবিদদের ঘাড়ে বন্দুক রেখে গুলি করেন। আমলারা মোটামুটি সব আমলেই বহাল তবিয়তে থাকেন। আবার সরকারি প্রকল্প নয়ছয় করে মন্ত্রী-এমপিদের শত শত কোটি টাকা কামানোর রাস্তা যেহেতু আমলারাই বাৎলে দেন, ফাঁকফোকর তৈরি করে দেন। ফলে আমলারা যখন যা চান, মন্ত্রীরা তার বাইরে খুব একটা যেতে পারেন না। এটা রাজনৈতিক সরকারের বেলায় তো বটেই, অনির্বাচিত নির্দলীয় সরকারের বেলায়ও তা-ই।
নানা সুযোগ-সুবিধা দিয়ে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সন্তুষ্ট রাখা বা তাঁদের ‘হাতে রাখার’ কৌশল নতুন কিছু নয়। কারণ রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ কাজগুলো তাঁদের মাধ্যমেই সম্পাদিত হয়। জাতীয় সংসদে যে আইন ও অন্যান্য নীতিমালা পাস হয়, সেগুলোর প্রাথমিক খসড়া সাধারণত সরকারি কর্মকর্তারাই প্রণয়ন করে থাকেন। আবার বিরোধী রাজনৈতিক দলকে নিয়ন্ত্রণ, নির্বাচন পরিচালনাসহ অন্যান্য জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ কাজেও সরকারের বিভিন্ন বাহিনীকে সরকার কাজে লাগায়। ফলে তাঁদের খুশি রাখার চেষ্টা সব আমলেই দেখা যায়। শুধু বাংলাদেশ নয়, বিশ্বের অন্যান্য দেশেও এই রকম ঘটনা ঘটে।
অন্তর্বর্তী সরকারের মেয়াদ আর এক মাসও নেই। যদি ১২ ফেব্রুয়ারি নির্বাচন হয় তাহলে ধারণা করা যায়, আগামী এক মাসের মধ্যেই নতুন সরকার গঠিত হবে। অথচ অন্তর্বর্তী সরকারের একেবারে শেষ সময়ে এসে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন দ্বিগুণ থেকে প্রায় আড়াই গুণ পর্যন্ত বাড়ানোর সুপারিশ করে নবম জাতীয় বেতন কমিশন প্রতিবেদন পেশ করেছে। এতে ২০টি গ্রেড অপরিবর্তিত রেখে সর্বনিম্ন বেতন ২০ হাজার টাকা এবং সর্বোচ্চ ১ লাখ ৬০ হাজার টাকায় উন্নীতের প্রস্তাব করা হয়েছে। গত বছরের ২৭ জুলাই অন্তর্বর্তী সরকার ২৩ সদস্যবিশিষ্ট নবম জাতীয় বেতন কমিশন গঠন করে এবং ছয় মাসের মধ্যে প্রতিবেদন দাখিলের সময়সীমা নির্ধারণ করে।
কিন্তু বাস্তবতা হলো, দেশের অর্থনৈতিক অবস্থা ভালো নয়। উচ্চ মূল্যস্ফীতিতে মানুষ দিশাহারা। বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান পরিস্থিতি স্বস্তিদায়ক নয়। সংবাদমাধ্যমের খবর বলছে, চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথম ছয় মাসে (জুলাই-ডিসেম্বর) শুল্ক-কর আদায়ে ঘাটতি প্রায় ৪৬ হাজার কোটি টাকা। তা ছাড়া ক্রমবর্ধমান মূল্যস্ফীতি, স্থবির মজুরি, কর্মসংস্থানের সংকট ও ব্যাংকিং খাতের ভয়াবহ বিপর্যয়ে দেশের অর্থনীতি এখন গভীর সংকটে। সরকারি পরিসংখ্যানে কিছু উন্নতির ইঙ্গিত মিললেও বাস্তবে নিম্ন ও মধ্যম আয়ের লাখ লাখ পরিবার প্রতিদিন টিকে থাকার লড়াই করছে।
বেতন কমিশনের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের মূল্য বহুগুণ বেড়েছে। সময়োপযোগী ও যথাযথ বেতনকাঠামো নির্ধারণ না হওয়ায় সরকারি কর্মচারীদের জন্য জীবনযাত্রার ব্যয় নির্বাহ ক্রমেই কঠিন হয়ে পড়েছে। এই প্রেক্ষাপটে সুস্পষ্ট কার্যপরিধি নির্ধারণপূর্বক বিদ্যমান বেতন, ভাতা ও অন্যান্য সুবিধা পর্যালোচনা এবং প্রয়োজনীয় সুপারিশ প্রণয়নের লক্ষ্যে কমিশন কাজ করে।
পরিহাসের বিষয় হলো, বাংলাদেশে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন নিয়ে যত বেশি কথা হয় বা তাঁদের বেতন ও অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা যে হারে বাড়ানো হয়, সেই তুলনায় সরকারি অফিসগুলোয় নাগরিকের সেবার মান নিয়ে কথা হয় না। সরকারি অফিসগুলোয় প্রতিদিন কত শত কোটি টাকার ঘুষ লেনদেন হয়। দ্বিতীয় শ্রেণির চাকরি করে কী করে একজন সরকারি কর্মচারী রাজধানীতে বেতনের দুই গুণ ভাড়া দিয়ে বিলাসবহুল ফ্ল্যাটে থাকেন এবং দামি গাড়িতে চড়েন; কী করে এখানে-ওখানে ফ্ল্যাট ও জমি কেনেন; সন্তানদের বিদেশে পড়াশোনা করান, এমনকি বিভিন্ন দেশে ‘সেকেন্ড হোম’ গড়ে তোলেন—সেসব নিয়ে আলোচনা কম।
কালেভদ্রে দু-একজন ধরা পড়েন। তখন মিডিয়া ও সোশ্যাল মিডিয়ায় তোলপাড় হয়। অথচ শুধু ঢাকা শহরের আলিশান ফ্ল্যাটগুলোর মালিক কারা—এর একটি নির্মোহ তদন্ত হলেই বেরিয়ে আসবে যে, এগুলোর বিরাট অংশের মালিক সরকারি কর্মচারীরা। তাঁদের সারা জীবনের সঞ্চয় দিয়েও এই রকম একটি ফ্ল্যাট কিনতে পারার কথা নয়। অর্থাৎ একদিকে সাধারণ মানুষ সরকারি অফিসগুলোয় গিয়ে হয়রানি ও সময়ক্ষেপণ ছাড়া সম্মানের সাথে কোনো সেবা পাবে না, অন্যদিকে সরকারি অফিসের লোকজন ঘুষ ও দুর্নীতির মাধ্যমে আঙুল ফুলে কলাগাছ হবেন। আবার তাঁদের বেতন ও অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা বাড়ানোর দাবিতে তাঁরা আন্দোলন করবেন। সরকারও তাঁদের দাবি মেনে নেবে। এই রকম অদ্ভুত নিয়ম পৃথিবীর খুব কম দেশেই আছে।
প্রশ্ন হলো, বর্তমানে যেখানে ১৪ লাখ সরকারি কর্মচারী ও ৯ লাখ পেনশনভোগীর জন্য বছরে সরকারের ব্যয় হচ্ছে ১ লাখ ৩১ হাজার কোটি টাকা, সেখানে নতুন বেতন কাঠামো বাস্তবায়ন করতে গেলে যে আরও ১ লাখ ৬ হাজার কোটি টাকার প্রয়োজন হবে, সেটা কোথা থেকে আসবে? সাধারণ মানুষের ওপর করের বোঝা বাড়ানো হবে?
যখনই সরকারি কর্মচারীদের বেতন বাড়ে, সাথে সাথে বাড়িওয়ালারা বাড়িভাড়া বাড়িয়ে দেন। জিনিসপত্রের দাম বাড়ে। তখন এর প্রধান ভিকটিম হয় সাধারণ মানুষ এবং বেসরকারি চাকরিজীবীরা। কারণ সরকারি কর্মচারীদের সাথে তাল মিলিয়ে তাঁদের বেতন বাড়ে না। এর মধ্য দিয়ে একটি দারুণ বৈষম্য সমাজে ও রাষ্ট্রে স্থায়ী হয়। অথচ চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানের মূল স্পিরিট ছিল বৈষম্যহীন বাংলাদেশ। কিন্তু গত দেড় বছরে রাষ্ট্রের কোনো একটি জায়গা থেকে বৈষম্য দূর হয়েছে—এ কথা বলার সুযোগ নেই। বরং দেশের নাজুক অর্থনৈতিক অবস্থার মধ্যেও মন্ত্রীদের জন্য বিলাসবহুল ফ্ল্যাট বানানো আর সরকারি কর্মচারীদের বেতন দ্বিগুণের বেশি বাড়ানোর উদ্যোগ বৈষম্য আরও বাড়াবে।
বস্তুত এসব বড় প্রকল্পের বড় কেনাকাটা এবং সেই কেনাকাটা থেকে টাকাপয়সা ভাগ-বাটোয়ারা নিয়ে আলোচনা তো নতুন কিছু নয়। অতীতে সরকারি বিভিন্ন প্রকল্পের কেনাকাটায় ভৌতিক সব অঙ্ক দেখা গেছে। পর্দাকাণ্ড বা বালিশকাণ্ডের কথা দেশের মানুষ ভুলে যায়নি। মন্ত্রীদের এই বিলাসবহুল ফ্ল্যাট নির্মাণ থেকে শুরু করে ফ্ল্যাটের আসবাব এমনকি পর্দা কেনাকাটায়ও যে শত শত কোটি টাকার দুর্নীতি হবে না এবং দুর্নীতির ভাগ যে সংশ্লিষ্ট সকলেই কমবেশি পাবেন না—এমন কিছু হবার মতো পরিবর্তন কি এসেছে এই দেশে? কিন্তু অন্তর্বর্তী সরকারও এই দুর্নীতির সুযোগ করে দিয়ে যাচ্ছে কেন সেটিই প্রশ্ন।
মন্ত্রীদের জন্য বিলাসবহুল ভবন নির্মাণ এবং সরকারি কর্মচারীদের বেতন দ্বিগুণের বেশি বাড়ানোর এই উদ্যোগগুলো পরবর্তী সরকারের জন্য একটা বড় চাপ তৈরি করবে। কেননা নতুন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পরপরই নতুন বেতন কাঠামো বাস্তবায়নের দাবিতে সরকারি কর্মচারীরা আন্দোলন শুরু করবেন। তাঁরা হয়তো সচিবালয় অচল করে দেওয়ার মতো কর্মসূচি দেবেন। ‘মব’ তৈরি করে দাবি আদায়ের যে চর্চা গত দেড় বছর ধরে চলছে, সেই ধারাবাহিকতা হয়তো এই ইস্যুতেও চলবে। সুতরাং পরবর্তী নির্বাচিত সরকার দেশ পরিচালনা করতে গিয়ে চাপে পড়বে—এমন কোনো উদ্যোগ অন্তর্বর্তী সরকার শেষ সময়ে এসে কেন গ্রহণ করল—তা পরিষ্কার নয়।
আমীন আল রশীদ: সাংবাদিক ও লেখক।

রাজধানীর বেইলি রোড, মিন্টো রোড ও হেয়ার রোড মন্ত্রিপাড়া হিসেবে পরিচিত। এসব এলাকার আবাসিক ভবনগুলোয় মন্ত্রীরা বসবাস করেন। বর্তমানে সেখানে আছেন অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টাসহ প্রজাতন্ত্রের কর্মে নিয়োজিত গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিরা। বাড়িগুলো বনেদি। বিশাল জায়গাজুড়ে। খোলামেলা। কিন্তু তারপরও ভবিষ্যৎ সরকারের মন্ত্রীদের জন্য এখানে তিনটি ভবন নির্মাণের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। এসব ভবনে থাকবে ৭২টি ফ্ল্যাট, যার আয়তন হবে ৮ হাজার ৫০০ থেকে ৯ হাজার ৩০ বর্গফুট। এ জন্য নেওয়া হচ্ছে ৭৮৬ কোটি টাকার একটি প্রকল্প। যেখানে থাকবেন মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী, উপমন্ত্রী এবং সাংবিধানিক সংস্থার প্রধানসহ সরকারের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিরা।
সংবাদমাধ্যমের খবর বলছে, মন্ত্রিপাড়ায় এখন মন্ত্রীদের জন্য বাংলোবাড়ি আছে ১৫টি। আর বেইলি রোডে মিনিস্টার্স অ্যাপার্টমেন্ট নামে তিনটি ভবন রয়েছে। প্রতিটি ভবনে ১০টি করে ৩০টি ফ্ল্যাট রয়েছে। প্রতিটি ফ্ল্যাটের আয়তন সাড়ে ৫ হাজার বর্গফুট। মন্ত্রিপাড়া ছাড়াও গুলশান ও ধানমন্ডিতে মন্ত্রীদের জন্য আবাসনের ব্যবস্থা রয়েছে। কিন্তু এর মধ্যেই আবার নতুন বাড়ি নির্মাণের এই উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
জনগণের করের পয়সায় মন্ত্রী ও আমলাদের এই ধরনের ফুটানি নতুন কিছু নয়। জনগণের ট্যাক্সের পয়সায় তাঁদের বেতন হয়, আবার সেই জনগণকেই কোনো সার্ভিস দেওয়ার বিনিময়ে তাঁদের কাছ থেকে জনকর্মচারীরা ঘুষ নেন। যে জনগণের করের পয়সায় তাঁদের বেতন হয়, তাঁরা সেই জনগণকেই নিজেদের অধীন মনে করেন। ‘স্যার’ না ডাকলে মন খারাপ করেন। অনেকে বাজে আচরণও করেন। সেই জনগণের পয়সার শ্রাদ্ধ করতে ঘাস চাষ কিংবা পুকুর কাটার মতো অদ্ভুত সব কাজে জ্ঞান অর্জনের নামে বিদেশে গিয়ে তাঁরা প্রমোদ ভ্রমণ করেন। তার ওপর সরকারি বিভিন্ন প্রকল্প থেকে শত শত কোটি টাকা লুটপাট তো আছেই।
প্রশ্ন হলো, মন্ত্রীদের জন্য বাড়ি ও ফ্ল্যাট থাকার পরেও নতুন করে কেন ভবন বানাতে হবে—যার একেকটি ফ্ল্যাটের আয়তন হবে ৯ হাজার বর্গফুট? একটি পরিবারের বসবাসের জন্য সর্বোচ্চ কত বর্গফুটের ফ্ল্যাট দরকার? তা ছাড়া আগের বাড়ি ও ফ্ল্যাটগুলো কি সেকেলে হয়ে গেছে? প্রধানমন্ত্রীর বাসভবন গণভবনকে না হয় জাদুঘর বানানো হয়েছে। কিন্তু অন্য মন্ত্রীদের বাড়ি তো জাদুঘর বা চিড়িয়াখানা হয়নি। তাহলে মন্ত্রীদের জন্য ৯ হাজার বর্গফুটের ফ্ল্যাট বানাতে হবে কেন? সরকারের হাতে কি উদ্বৃত্ত টাকা আছে নাকি সরকার টাকা খরচ করার জায়গা পাচ্ছে না? বরিশালে একটা প্রবাদ আছে: ‘টাকায় কামড়ায়’। অর্থাৎ যখন কেউ অপচয় করে বা অযৌক্তিক খাতে পয়সা খরচ করে, তখন এই প্রবাদটি ব্যবহৃত হয়। কিন্তু এই মুহূর্তে বাংলাদেশের অর্থনীতির যে হাল, তাতে বিলাসিতা দেখানোর কি কোনো সুযোগ আছে? কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সাম্প্রতিক তথ্য বলছে, গত বছরের সেপ্টেম্বর প্রান্তিক শেষে বাংলাদেশের ব্যাংকগুলোর খেলাপি ঋণের স্থিতি প্রায় সাড়ে ৬ লাখ কোটি টাকা। এই মুহূর্তে দেশের খেলাপি ঋণের হার এখন বিশ্বের মধ্যে সর্বোচ্চ।
শোনা যাচ্ছে, মন্ত্রীদের জন্য নতুন ফ্ল্যাট নির্মাণের প্রকল্প নিতে বেশি আগ্রহী আমলারা। কেননা মন্ত্রীদের নতুন ভবনে বাসা দেওয়া গেলে এখনকার বড় বড় ফ্ল্যাটগুলোয় আমলারা উঠতে পারবেন।
আমলাদের এই চাতুর্য নতুন কিছু নয়। তাঁরা বরাবরই রাজনীতিবিদদের ঘাড়ে বন্দুক রেখে গুলি করেন। আমলারা মোটামুটি সব আমলেই বহাল তবিয়তে থাকেন। আবার সরকারি প্রকল্প নয়ছয় করে মন্ত্রী-এমপিদের শত শত কোটি টাকা কামানোর রাস্তা যেহেতু আমলারাই বাৎলে দেন, ফাঁকফোকর তৈরি করে দেন। ফলে আমলারা যখন যা চান, মন্ত্রীরা তার বাইরে খুব একটা যেতে পারেন না। এটা রাজনৈতিক সরকারের বেলায় তো বটেই, অনির্বাচিত নির্দলীয় সরকারের বেলায়ও তা-ই।
নানা সুযোগ-সুবিধা দিয়ে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সন্তুষ্ট রাখা বা তাঁদের ‘হাতে রাখার’ কৌশল নতুন কিছু নয়। কারণ রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ কাজগুলো তাঁদের মাধ্যমেই সম্পাদিত হয়। জাতীয় সংসদে যে আইন ও অন্যান্য নীতিমালা পাস হয়, সেগুলোর প্রাথমিক খসড়া সাধারণত সরকারি কর্মকর্তারাই প্রণয়ন করে থাকেন। আবার বিরোধী রাজনৈতিক দলকে নিয়ন্ত্রণ, নির্বাচন পরিচালনাসহ অন্যান্য জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ কাজেও সরকারের বিভিন্ন বাহিনীকে সরকার কাজে লাগায়। ফলে তাঁদের খুশি রাখার চেষ্টা সব আমলেই দেখা যায়। শুধু বাংলাদেশ নয়, বিশ্বের অন্যান্য দেশেও এই রকম ঘটনা ঘটে।
অন্তর্বর্তী সরকারের মেয়াদ আর এক মাসও নেই। যদি ১২ ফেব্রুয়ারি নির্বাচন হয় তাহলে ধারণা করা যায়, আগামী এক মাসের মধ্যেই নতুন সরকার গঠিত হবে। অথচ অন্তর্বর্তী সরকারের একেবারে শেষ সময়ে এসে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন দ্বিগুণ থেকে প্রায় আড়াই গুণ পর্যন্ত বাড়ানোর সুপারিশ করে নবম জাতীয় বেতন কমিশন প্রতিবেদন পেশ করেছে। এতে ২০টি গ্রেড অপরিবর্তিত রেখে সর্বনিম্ন বেতন ২০ হাজার টাকা এবং সর্বোচ্চ ১ লাখ ৬০ হাজার টাকায় উন্নীতের প্রস্তাব করা হয়েছে। গত বছরের ২৭ জুলাই অন্তর্বর্তী সরকার ২৩ সদস্যবিশিষ্ট নবম জাতীয় বেতন কমিশন গঠন করে এবং ছয় মাসের মধ্যে প্রতিবেদন দাখিলের সময়সীমা নির্ধারণ করে।
কিন্তু বাস্তবতা হলো, দেশের অর্থনৈতিক অবস্থা ভালো নয়। উচ্চ মূল্যস্ফীতিতে মানুষ দিশাহারা। বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান পরিস্থিতি স্বস্তিদায়ক নয়। সংবাদমাধ্যমের খবর বলছে, চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথম ছয় মাসে (জুলাই-ডিসেম্বর) শুল্ক-কর আদায়ে ঘাটতি প্রায় ৪৬ হাজার কোটি টাকা। তা ছাড়া ক্রমবর্ধমান মূল্যস্ফীতি, স্থবির মজুরি, কর্মসংস্থানের সংকট ও ব্যাংকিং খাতের ভয়াবহ বিপর্যয়ে দেশের অর্থনীতি এখন গভীর সংকটে। সরকারি পরিসংখ্যানে কিছু উন্নতির ইঙ্গিত মিললেও বাস্তবে নিম্ন ও মধ্যম আয়ের লাখ লাখ পরিবার প্রতিদিন টিকে থাকার লড়াই করছে।
বেতন কমিশনের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের মূল্য বহুগুণ বেড়েছে। সময়োপযোগী ও যথাযথ বেতনকাঠামো নির্ধারণ না হওয়ায় সরকারি কর্মচারীদের জন্য জীবনযাত্রার ব্যয় নির্বাহ ক্রমেই কঠিন হয়ে পড়েছে। এই প্রেক্ষাপটে সুস্পষ্ট কার্যপরিধি নির্ধারণপূর্বক বিদ্যমান বেতন, ভাতা ও অন্যান্য সুবিধা পর্যালোচনা এবং প্রয়োজনীয় সুপারিশ প্রণয়নের লক্ষ্যে কমিশন কাজ করে।
পরিহাসের বিষয় হলো, বাংলাদেশে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন নিয়ে যত বেশি কথা হয় বা তাঁদের বেতন ও অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা যে হারে বাড়ানো হয়, সেই তুলনায় সরকারি অফিসগুলোয় নাগরিকের সেবার মান নিয়ে কথা হয় না। সরকারি অফিসগুলোয় প্রতিদিন কত শত কোটি টাকার ঘুষ লেনদেন হয়। দ্বিতীয় শ্রেণির চাকরি করে কী করে একজন সরকারি কর্মচারী রাজধানীতে বেতনের দুই গুণ ভাড়া দিয়ে বিলাসবহুল ফ্ল্যাটে থাকেন এবং দামি গাড়িতে চড়েন; কী করে এখানে-ওখানে ফ্ল্যাট ও জমি কেনেন; সন্তানদের বিদেশে পড়াশোনা করান, এমনকি বিভিন্ন দেশে ‘সেকেন্ড হোম’ গড়ে তোলেন—সেসব নিয়ে আলোচনা কম।
কালেভদ্রে দু-একজন ধরা পড়েন। তখন মিডিয়া ও সোশ্যাল মিডিয়ায় তোলপাড় হয়। অথচ শুধু ঢাকা শহরের আলিশান ফ্ল্যাটগুলোর মালিক কারা—এর একটি নির্মোহ তদন্ত হলেই বেরিয়ে আসবে যে, এগুলোর বিরাট অংশের মালিক সরকারি কর্মচারীরা। তাঁদের সারা জীবনের সঞ্চয় দিয়েও এই রকম একটি ফ্ল্যাট কিনতে পারার কথা নয়। অর্থাৎ একদিকে সাধারণ মানুষ সরকারি অফিসগুলোয় গিয়ে হয়রানি ও সময়ক্ষেপণ ছাড়া সম্মানের সাথে কোনো সেবা পাবে না, অন্যদিকে সরকারি অফিসের লোকজন ঘুষ ও দুর্নীতির মাধ্যমে আঙুল ফুলে কলাগাছ হবেন। আবার তাঁদের বেতন ও অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা বাড়ানোর দাবিতে তাঁরা আন্দোলন করবেন। সরকারও তাঁদের দাবি মেনে নেবে। এই রকম অদ্ভুত নিয়ম পৃথিবীর খুব কম দেশেই আছে।
প্রশ্ন হলো, বর্তমানে যেখানে ১৪ লাখ সরকারি কর্মচারী ও ৯ লাখ পেনশনভোগীর জন্য বছরে সরকারের ব্যয় হচ্ছে ১ লাখ ৩১ হাজার কোটি টাকা, সেখানে নতুন বেতন কাঠামো বাস্তবায়ন করতে গেলে যে আরও ১ লাখ ৬ হাজার কোটি টাকার প্রয়োজন হবে, সেটা কোথা থেকে আসবে? সাধারণ মানুষের ওপর করের বোঝা বাড়ানো হবে?
যখনই সরকারি কর্মচারীদের বেতন বাড়ে, সাথে সাথে বাড়িওয়ালারা বাড়িভাড়া বাড়িয়ে দেন। জিনিসপত্রের দাম বাড়ে। তখন এর প্রধান ভিকটিম হয় সাধারণ মানুষ এবং বেসরকারি চাকরিজীবীরা। কারণ সরকারি কর্মচারীদের সাথে তাল মিলিয়ে তাঁদের বেতন বাড়ে না। এর মধ্য দিয়ে একটি দারুণ বৈষম্য সমাজে ও রাষ্ট্রে স্থায়ী হয়। অথচ চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানের মূল স্পিরিট ছিল বৈষম্যহীন বাংলাদেশ। কিন্তু গত দেড় বছরে রাষ্ট্রের কোনো একটি জায়গা থেকে বৈষম্য দূর হয়েছে—এ কথা বলার সুযোগ নেই। বরং দেশের নাজুক অর্থনৈতিক অবস্থার মধ্যেও মন্ত্রীদের জন্য বিলাসবহুল ফ্ল্যাট বানানো আর সরকারি কর্মচারীদের বেতন দ্বিগুণের বেশি বাড়ানোর উদ্যোগ বৈষম্য আরও বাড়াবে।
বস্তুত এসব বড় প্রকল্পের বড় কেনাকাটা এবং সেই কেনাকাটা থেকে টাকাপয়সা ভাগ-বাটোয়ারা নিয়ে আলোচনা তো নতুন কিছু নয়। অতীতে সরকারি বিভিন্ন প্রকল্পের কেনাকাটায় ভৌতিক সব অঙ্ক দেখা গেছে। পর্দাকাণ্ড বা বালিশকাণ্ডের কথা দেশের মানুষ ভুলে যায়নি। মন্ত্রীদের এই বিলাসবহুল ফ্ল্যাট নির্মাণ থেকে শুরু করে ফ্ল্যাটের আসবাব এমনকি পর্দা কেনাকাটায়ও যে শত শত কোটি টাকার দুর্নীতি হবে না এবং দুর্নীতির ভাগ যে সংশ্লিষ্ট সকলেই কমবেশি পাবেন না—এমন কিছু হবার মতো পরিবর্তন কি এসেছে এই দেশে? কিন্তু অন্তর্বর্তী সরকারও এই দুর্নীতির সুযোগ করে দিয়ে যাচ্ছে কেন সেটিই প্রশ্ন।
মন্ত্রীদের জন্য বিলাসবহুল ভবন নির্মাণ এবং সরকারি কর্মচারীদের বেতন দ্বিগুণের বেশি বাড়ানোর এই উদ্যোগগুলো পরবর্তী সরকারের জন্য একটা বড় চাপ তৈরি করবে। কেননা নতুন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পরপরই নতুন বেতন কাঠামো বাস্তবায়নের দাবিতে সরকারি কর্মচারীরা আন্দোলন শুরু করবেন। তাঁরা হয়তো সচিবালয় অচল করে দেওয়ার মতো কর্মসূচি দেবেন। ‘মব’ তৈরি করে দাবি আদায়ের যে চর্চা গত দেড় বছর ধরে চলছে, সেই ধারাবাহিকতা হয়তো এই ইস্যুতেও চলবে। সুতরাং পরবর্তী নির্বাচিত সরকার দেশ পরিচালনা করতে গিয়ে চাপে পড়বে—এমন কোনো উদ্যোগ অন্তর্বর্তী সরকার শেষ সময়ে এসে কেন গ্রহণ করল—তা পরিষ্কার নয়।
আমীন আল রশীদ: সাংবাদিক ও লেখক।

লাশের কি কোনো রাজনীতি আছে? ৯ মাসের শিশুর লাশের গায়ে কি দলীয় লেবেল সাঁটা সম্ভব? বাগেরহাটের মর্মান্তিক ঘটনা ও কারাবন্দীর প্যারোল অধিকার প্রসঙ্গে লিখেছেন কথাসাহিত্যিক ও সাংবাদিক মারুফ ইসলাম।
১ দিন আগে
একসময় যা ছিল উগ্রবাদী প্রচারপুস্তকের স্লোগান, আজ তা আমেরিকার রাষ্ট্রীয় ভাষ্য। ট্রাম্প প্রশাসনের বিরুদ্ধে নাৎসি মতাদর্শ লালন ও প্রচারের অভিযোগ ক্রমেই জোরালো হচ্ছে।
১ দিন আগে
আজকের সমাজে আমরা এমন এক বাস্তবতায় দাঁড়িয়ে আছি, যেখানে ক্ষণিকের আনন্দ আমাদের জীবনের কেন্দ্রবিন্দু হয়ে উঠছে। মোবাইল স্ক্রলের তৃপ্তি, ফেসবুক বা রিলসের অন্তহীন প্রবাহ, কিংবা ভার্চুয়াল বিনোদনের সাময়িক স্বস্তি—এসবই আমাদের ক্লান্ত মনকে মুহূর্তের জন্য আরাম দেয়।
১ দিন আগে
কৃষি নির্ভর মেহেরপুর-মুজিবনগরের খেটে খাওয়া মানুষ এখন আর শুধু দল বদলের কথা বলছে না, তাদের চিন্তা বদলের কথা বলছে।
২ দিন আগে