leadT1ad

বিশ্ব রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে স্বর্ণের অর্থনৈতিক সম্ভাবনা

জাহিরুল ইসলাম
জাহিরুল ইসলাম

প্রকাশ : ২৭ জানুয়ারি ২০২৬, ২০: ২৪
ছবি: সংগৃহীত

আন্তর্জাতিক বাজারে স্বর্ণের দাম যে আউন্স প্রতি ৫০০০ ডলার ছাড়িয়ে যাবে, এমন ভবিষ্যৎবাণী আগে থেকেই ছিল বিশ্লেষকদের। ধারণার চেয়ে অনেকটা আগেভাগে হলেও তা সত্য হয়েছে। স্বভাবতই এর প্রভাব পড়েছে দেশের স্বর্ণবাজারে। সংবাদ মাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, সর্বশেষ বৃদ্ধির পর দেশের বাজারে ভালো মানের (২২ ক্যারেট) এক ভরি সোনার দাম এখন দুই লাখ সাতান্ন হাজার টাকা; আর ২১ ক্যারেট স্বর্ণ মিলছে কিছুটা কম দামে—ভরি দুই লাখ ৪৫ হাজারে।

মনে পড়ে, দশ বছর আগে বিয়ের সময় কিনেছিলাম এর পাঁচ ভাগের এক ভাগ দামে। চোখের সামনে সেই দাম এখন ছাড়িয়ে গেছে আড়াই লাখ। গত এক দশকে অস্থাবর অন্য কোনো সম্পদের ভ্যালু এই রেটে অ্যাপ্রিসিয়েট করেছে কি? অর্থনীতি সম্পর্কে হালনাগাদ খোঁজখবর যারা রাখেন, তাদের কাছে এর পেছনের কারণগুলো অবশ্য স্পষ্ট হয়েছে এরই মধ্যে। ধারণা করা যায়, অর্থনীতি সম্পর্কে বেশি ওয়াকিবহাল না হলেও স্বর্ণের দাম বৃদ্ধির খবরটি এখন কারও অজানা নয়।

আমি কোনো অর্থনীতিবিদ নই। এ শাস্ত্র সম্পর্কে প্রাথমিক ধারণা থেকে বলতে পারি, কোনো জিনিসের দাম বাড়ে চাহিদা ও যোগানের ভিত্তিতে। এ দুইয়ের কোনো একটি বৃদ্ধি বা হ্রাসের প্রভাব পড়ে সংশ্লিষ্ট বস্তুর দামে। এ দুই অনুঘটকের প্রভাব যে স্বর্ণের দামেও পড়ে, সে ব্যাপারে সন্দেহ নেই। তবে প্রশ্ন হলো, শুধু চাহিদা ও যোগানই কি প্রভাব ফেলে স্বর্ণের দামে? উত্তরে যাওয়ার আগে একটি বিষয় মনে রাখা দরকার, সাধারণ ভোক্তাদের সৃষ্ট সামষ্টিক চাহিদা আন্তর্জাতিক বাজারে স্বর্ণের দাম হ্রাস বা বৃদ্ধিতে খুব বেশি প্রভাব ফেলতে পারে না। এও বলে রাখা ভালো, অব্যাহত দাম বৃদ্ধির ফলে ধাতুটির ক্রয়-ক্ষমতা সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে চলে যাওয়ায় চাহিদা বৃদ্ধিতে তাদের অংশগ্রহণ ক্রমে আরও গৌণ হয়ে আসছে।

স্বভাবতই প্রশ্ন ওঠে, স্বর্ণের দাম বৃদ্ধিতে তাহলে সবচেয়ে বেশি ভূমিকা রাখে কারা? সাম্প্রতিক দাম বৃদ্ধির পেছনে কাদের ভূমিকাই বা সবচেয়ে বেশি? আর স্বর্ণকে তারা ব্যবহার করে কী কাজে? বস্তুত আন্তর্জাতিক বাজারে স্বর্ণের চাহিদা বৃদ্ধিতে ভোক্তার তুলনায় সরকারি বা নীতিগত চাহিদার অবদান অনেক বেশি। এর পাশাপাশি ভূমিকা রাখেন কমোডিটি মার্কেটের বিনিয়োগকারীরা।

আরও স্পষ্টভাবে বললে, স্বর্ণের চাহিদা মূলত আসে বড় বড় ব্যাংক ও রাষ্ট্রীয় কোষাগার থেকে। মুদ্রার নাম ধরে রাখার জন্য সরকারগুলো নীতিগত সিদ্ধান্ত নিয়ে স্বর্ণ ক্রয় করে। উদ্দেশ্য আর কিছু নয়, শুধু স্বর্ণের মজুত বৃদ্ধি। চাহিদা বৃদ্ধিতে এটা এক ধরনের ভূমিকা রাখে। অর্থাৎ এর মূলে রয়েছে সরকারের নীতিগত সিদ্ধান্ত বা রাজনীতি। অন্যদিকে, কমোডিটি মার্কেটের বিনিয়োগকারীরা অর্থনৈতিক বিভিন্ন উপাদানের বিশ্লেষণের ভিত্তিতে যখন অনুমান করেন—ধাতুটির দাম আরও বাড়বে, তখন তারা এতে বিনিয়োগ করেন। এর দাম বৃদ্ধির পেছনে এটাও কাজ করে বড় অনুঘটক হিসেবে।

প্রসঙ্গত রাশিয়ার উদাহরণটি এখানে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। দেশটি বর্তমানে রয়েছে কঠোর আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞার মুখে। তাদের অর্থনীতি এখন টিকে রয়েছে মূলত তেল রপ্তানি থেকে প্রাপ্ত অর্থে। ইউক্রেন যুদ্ধের খরচ মেটাতে স্বর্ণের মজুত ব্যবহার করছে তারা। বলা যায়, অর্থনীতি টিকিয়ে রাখার জন্য স্বর্ণকে দেশটি ব্যবহার করছে এক ধরনের হাতিয়ার হিসেবে।

অন্যদিকে চীনের ব্যাপারটি পুরো উল্টো। দেশটি চায়, মার্কিন ডলারের বদলে তাদের ইউয়ান বিশ্বমুদ্রা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হোক। সে লক্ষ্যে তারা প্রচুর স্বর্ণ জমা করছে। ধারণা করা হয়, যদি চীনের কাছে যথেষ্ট স্বর্ণ থাকে, তাহলে বিশ্বব্যাপী ব্যবসায়ীরা ডলারের বদলে ইউয়ানে লেনদেনে আগ্রহী হবে। এতে আন্তর্জাতিক বাজারে ডলারের প্রভাব কিছুটা হলেও কমে আসবে। কিন্তু বাস্তবতা হলো, স্বর্ণ মজুতের দিক থেকে চীন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে পাল্লা দিতে পারে না। দেশ দুটিতে ধাতুটির বর্তমান মজুতের দিকে দৃষ্টি দিলেই বিষয়টি স্পষ্ট হয়। যুক্তরাষ্ট্রে বর্তমান স্বর্ণের মজুত ৮০০০ টনেরও বেশি। সেখানে চীনের আছে মাত্র ২,৩০০ টন। এমনকি চীনের চেয়েও বেশি স্বর্ণ মজুত রয়েছে জার্মানি, ইতালি ও ফ্রান্সের কাছে। তাহলে ডলারকে টিক্কা দেওয়ার জন্য স্বর্ণ মজুতের যে নীতি চীন গ্রহণ করেছে, তার সফলতা দেখতে হলে আরও বেশ কিছু সময় যে অপেক্ষা করতে হবে, তা বলাই বাহুল্য। এ ক্ষেত্রেও প্রশ্ন থাকে। প্রতিপক্ষ চীন স্বর্ণের মজুত ক্রমাগত বৃদ্ধি করতে থাকলে যুক্তরাষ্ট্র কি বসে থাকবে?

অনেকের হয়তো জানা, মুদ্রা হিসেবে ডলার সম্প্রতি কিছুটা দুর্বল হয়ে পড়েছে। আর মুদ্রাটি দুর্বল হয়ে পড়ার অর্থ হলো দেশটিতে মূল্যস্ফীতি বৃদ্ধি। আর মূল্যস্ফীতি মানে হলো জনসাধারণের জীবনযাত্রার ব্যয় বাড়বে; অথবা সামর্থের মধ্যে জীবনযাত্রায় নির্বাহ করার জন্য তাদেরকে কিছু খরচ কমাতে হবে। এমন পরিস্থিতি অনেক সময় ডেকে আনে মন্দার মতো ঘটনা। আর মন্দার কারণে স্বর্ণের দাম যদি নেতিবাচকভাবে প্রভাবিত হয়, সেখান থেকে ফায়দা নেবে চীন। যুক্তরাষ্ট্র অবশ্য এমন পরিস্থিতি সৃষ্টির সুযোগ দিতে চাইবে না। আর কোমোডিটি মার্কেটে যারা স্বর্ণে বিনিয়োগ করেছেন, বিশেষত যাদের বিনিয়োগ অংক অনেক বড়, তারাও চেষ্টা করবেন যে কোনো পরিস্থিতিতে কম লভ্য পণ্যটির দাম যাতে কোনোভাবেই না কমে। কারণ স্বর্ণের মতো দুষ্প্রাপ্য সম্পদের দাম কমে গেলে তা অন্যান্য সম্পদের দামকেও খুব দ্রুত প্রভাবিত করে।

অনেকে বিশ্লেষকই মনে করেন, আমরা হয়তো ‘পিক গোল্ড’-এর কাছাকাছি পৌঁছে যাচ্ছি। বিশ্ব হয়তো স্বর্ণ উত্তোলনের সর্বোচ্চ সীমায় পৌঁছে গেছে। অর্থাৎ ভূগর্ভে মূল্যবান এ ধাতুর যে মজুত রয়েছে, তার উত্তোলন আর হয়তো খুব বেশি বাড়ানো সম্ভব হবে না। যদি সেটাই সত্য হয়, তাহলে আগামী দিনগুলোয় স্বর্ণের দাম নির্ধারিত হবে ইতোমধ্যে উত্তোলিত স্বর্ণের বাজারে যোগান ও নতুনভাবে সৃষ্ট চাহিদার ভিত্তিতে।

এ প্রেক্ষিতে স্বভাবতই মনে প্রশ্ন জাগে, বর্তমান দামে স্বর্ণ কিনে রাখা কি ঠিক হবে? এর উত্তর প্রাপ্তির জন্য তাদের আরও কিছু বিষয় বিবেচনায় রাখা দরকার। স্বর্ণ একটি অউৎপাদনশীল সম্পদ অর্থাৎ চাইলেই এ সম্পদ উৎপাদন বা উত্তোলন করা সম্ভব নয়। এটি প্রায় ধ্বংস অযোগ্য ধাতু। বলা হয়, ইতিহাসে যত স্বর্ণ উত্তোলন করা হয়েছে তার সর্বমোট পরিমাণ প্রায় ২,১৬,০০০ টন। সব যদি গলিয়ে একটি ঘনক বানানো হয়, তাহলে সেটি মাত্র ২২ মিটার দৈর্ঘ্যের হবে। এর মধ্যে প্রায় ২০,০০০ টন স্বর্ণ হয়তো সমুদ্রে হারিয়ে গেছে বা প্রাচীন কবরের নিচে চাপা পড়ে আছে।

বর্তমান বিশ্বে প্রতিবছর স্বর্ণের চাহিদা ঠিক কত, তা নিয়ে ওয়ার্ল্ড গোল্ড কাউন্সিলসহ (WGC) বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থা নিয়মিত পরিসংখ্যান প্রকাশ করে। স্বর্ণে যারা বিনিয়োগ করতে চান কিংবা এ বিষয়ে যাদের আগ্রহ আছে, তাদের এসব সংস্থার প্রকাশিত হালনাগাদ তথ্যগুলো জানা থাকার কথা। সাম্প্রতিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৪ সালে বিশ্বব্যাপী স্বর্ণের মোট বার্ষিক চাহিদা প্রায় ৪,৯৭৪ টন, যা পূর্ববর্তী সব রেকর্ডকে অতিক্রম করেছে।

এ পরিমাণটি আরও সহজভাবে বুঝতে গেলে দেখা যায়, ৪,৯৭৪ টন মানে প্রায় ৪৯ লাখ ৭৪ হাজার কেজি স্বর্ণ। অর্থাৎ ২০২৪ সালে গড়ে প্রতিদিন বিশ্বজুড়ে প্রায় ১,৩৪,০০০ কেজিরও বেশি স্বর্ণের ব্যবহার বা চাহিদা তৈরি হয়েছে, যা স্বর্ণের বৈশ্বিক গুরুত্ব ও চাহিদার ব্যাপকতা স্পষ্টভাবে তুলে ধরে।

এ বিপুল চাহিদার মধ্যে সবচেয়ে বড় অংশ এসেছে জুয়েলারি বা গয়না খাত থেকে, যেখানে প্রায় ১,৮৭৭ টন স্বর্ণ ব্যবহৃত হয়েছে। এর পরেই রয়েছে বিনিয়োগ খাত—যেখানে স্বর্ণবার, কয়েন ও গোল্ড ETF–এর মাধ্যমে প্রায় ১,১৮০ টন স্বর্ণের চাহিদা তৈরি হয়েছে। একই সময়ে বিভিন্ন দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো রিজার্ভ শক্তিশালী করার লক্ষ্যে প্রায় ১,০৪৫ টন স্বর্ণ কিনেছে। এছাড়া ইলেকট্রনিক্স, চিকিৎসা ও অন্যান্য আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহারে প্রযুক্তি খাতে স্বর্ণের চাহিদা ছিল প্রায় ৩২৬ টন। সব মিলিয়ে, এ চারটি প্রধান খাতের সম্মিলিত চাহিদার ফলেই ২০২৪ সালে বিশ্বব্যাপী স্বর্ণের মোট ব্যবহার দাঁড়িয়েছে প্রায় ৪,৯৭৪ টনে, যা বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা এবং অব্যাহত মুদ্রাস্ফীতির কারণে নিরাপদ সম্পদ হিসেবে স্বর্ণের গুরুত্বকে আরও সুস্পষ্ট করেছে।

এও মনে রাখা দরকার, বর্তমানে বিশ্বজুড়ে প্রতিবছর যে পরিমাণ স্বর্ণ উত্তোলন করা হয়, তার মোট পরিমাণ প্রায় ৩,৩০০ টন। অর্থাৎ বিশ্বজুড়ে যে চাহিদা সৃষ্টি হয়, উৎপাদন হয় তার মোট তিন ভাগের দুই ভাগ। উত্তোলিত স্বর্ণের বেশিরভাগই আসে চীন, রাশিয়া, অস্ট্রেলিয়া, কানাডা ও যুক্তরাষ্ট্র থেকে। বলাবাহুল্য, চাহিদা ও যোগানের এ ঘাটতি চাইলেই পূরণ করা সম্ভব নয়। আর স্বর্ণ উৎপাদনকারী দেশগুলো যদি তাদের উত্তোলন ক্ষমতার সর্বোচ্চটুকুও প্রয়োগ করে, বলা যায় তারপরও চাহিদা ও যোগানের মধ্যে বড় একটা ফারাক থাকবে শুধু রাষ্ট্রগুলোর নীতিগত সিদ্ধান্ত এবং আন্তর্জাতিক রাজনীতি ও মুদ্রানীতির বিভিন্ন উপাদানের কারণে।

আরো জরুরি তথ্য হলো, অনেকে বিশ্লেষকই মনে করেন, আমরা হয়তো ‘পিক গোল্ড’-এর কাছাকাছি পৌঁছে যাচ্ছি। বিশ্ব হয়তো স্বর্ণ উত্তোলনের সর্বোচ্চ সীমায় পৌঁছে গেছে। অর্থাৎ ভূগর্ভে মূল্যবান এ ধাতুর যে মজুত রয়েছে, তার উত্তোলন আর হয়তো খুব বেশি বাড়ানো সম্ভব হবে না। যদি সেটাই সত্য হয়, তাহলে আগামী দিনগুলোয় স্বর্ণের দাম নির্ধারিত হবে ইতোমধ্যে উত্তোলিত স্বর্ণের বাজারে যোগান ও নতুনভাবে সৃষ্ট চাহিদার ভিত্তিতে।

এ পরিস্থিতিতে খুব স্বাভাবিক প্রশ্ন হলো, কোনো রাষ্ট্র কি চাইবে তার স্বর্ণের মজুত কমিয়ে মুদ্রাকে দুর্বল করতে? আর যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের মতো প্রতিদ্বন্দ্বী অর্থনীতিগুলো কি চাইবে—দুষ্প্রাপ্য এ ধাতুর দাম কমাতে ভূমিকা রেখে অপর প্রতিদ্বন্দ্বীকে মজুদ বৃদ্ধির সুযোগ দিতে? যদিও রাজনৈতিক বিষয়ে ভবিষ্যৎবাণী করা মুশকিল, তারপরও বলা যায়, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে চীনের মতো উদীয়মান অর্থনৈতিক সুপার পাওয়ার যে খেলায় যুক্ত, ওই খেলায় কেউ কি কাউকে ছাড় দিতে চাইবে? তাই স্বর্ণের দাম আপাতত অস্থিতিশীল হওয়ার সঙ্গত কারণ আছে বলে মনে হয় না। ব্যক্তি হিসেবে যার স্বর্ণে বিনিয়োগ করেছেন এবং বর্তমানে বিনিয়োগ করতে চান, তাদের জন্যও এটা হতে পারে আশার একটা দিক।

  • লেখক: ব্যাংক কর্মকর্তা
Ad 300x250

সম্পর্কিত