জন্মদিনে স্মরণ

লাকী আখান্দ: সুরের রাজপুত্র, আমাদের হৃদয়ের ধ্রুবতারা

স্ট্রিম ডেস্ক
স্ট্রিম ডেস্ক

প্রকাশ : ০৭ জুন ২০২৬, ২১: ০৬
লাকী আখান্দ। ছবি: এআই কোলাজ/স্ট্রিম গ্রাফিক

বাংলা গানের আকাশের ধ্রুবতারা, কণ্ঠযোদ্ধা এবং সুরের জাদুকর লাকী আখান্দ। সুরের মূর্ছনায় যিনি বাঙালির হৃদয়ে অমর হয়ে আছেন। আজ তাঁর জন্মদিনে ফিরে দেখা যাক কিংবদন্তি শিল্পীর জীবনের অজানা কিছু অধ্যায়।

লাকী আখান্দের পারিবারিক পরিচয়টি বেশ কৌতুহলোদ্দীপক। তাঁদের আদি পুরুষ ছিলেন পার্সিয়ান। সেই সূত্রে পারিবারিক পদবি ছিল ‘আখান্দজাদে’। তবে সময়ের স্রোতে তা সংকুচিত হয়ে দাঁড়ায় ‘আখান্দ’-এ। সংগীতের নেশাটা তাঁদের রক্তেই ছিল। বাবা আবদুল আলী আখান্দ নিজে ছিলেন একজন তুখোড় সুরকার ও সংগীতপ্রেমী মানুষ।

কোনো প্রথাগত ওস্তাদের কাছে নয়, বরং বাবার হারমোনিয়ামের সুর শুনেই লাকী আখান্দের হাতেখড়ি হয়েছিল। সন্ধ্যা গড়িয়ে রাত তিনটে পর্যন্ত চলত তাঁদের বাড়ির সংগীতের আসর। সেই সুরের জাদুকরী আবহে বেড়ে ওঠা ছেলেটি ১৩ বছর বয়সে আধুনিক গানে পাকিস্তান আর্ট কাউন্সিলের পুরস্কার জেতেন। ১৪ বছর বয়সে এইচএমভি পাকিস্তান কোম্পানির সুরকার আর ১৬ বছর বয়সে এইচএমভি ইন্ডিয়ার তালিকাভুক্ত সুরকার হিসেবে নিজের নাম লেখান।

হ্যাপী আখান্দ্‌ ও লাকী আখান্দ। সংগৃহীত ছবি
হ্যাপী আখান্দ্‌ ও লাকী আখান্দ। সংগৃহীত ছবি

লাকীর নাম পরিবর্তনের ইতিহাসটাও বেশ চমকপ্রদ। জন্মগত নাম এ টি আমিনুল হক হলেও মা পরে নাম রাখেন এ টি এম আমিনুল হাসান। তবে ১৯৭১ সালে মহান মুক্তিযুদ্ধের সময় যখন তিনি ভারতে আশ্রয় নেন, তখন পরিবারের নিরাপত্তার কথা ভেবে নাম বদলে রাখেন ‘লাকী আনাম’।

দেশ স্বাধীন হওয়ার পর পূর্বপুরুষের পদবিকে আঁকড়ে ধরে তিনি নিজের নাম চিরস্থায়ী করেন ‘লাকী আখান্দ’। কণ্ঠযোদ্ধা হিসেবে স্বাধীন বাংলা বিপ্লবী বেতারকেন্দ্রে তাঁর গাওয়া গানগুলো সেই সময়ে মুক্তিযোদ্ধাদের দিয়েছিল অদম্য সাহস ও প্রেরণা।

ব্যক্তিজীবনে সুরের আরাধনা আর ছোট ভাই হ্যাপি আখান্দের সঙ্গে ছিল তাঁর আত্মার সম্পর্ক। ভাইয়ের সঙ্গে গান তৈরির সেই সোনালী দিনগুলো ছিল লাকী আখান্দের জীবনের সবচেয়ে সুখের স্মৃতি। নব্বইয়ের দশকের শুরুতে ভাইয়ের অকালপ্রয়াণ যেন তাঁর জীবনের সুরকে সাময়িকভাবে থামিয়ে দিয়েছিল। ‘শেষ উপহার’ অ্যালবামের মাধ্যমে তিনি ভাইকে স্মরণ করেছিলেন, তৈরি করেছিলেন ‘হ্যাপি টাচ’ ব্যান্ড। তবে ভাইয়ের মৃত্যুশোক তাঁকে দীর্ঘদিন সংগীত থেকে অনেকটা দূরে সরিয়ে রেখেছিল। গানে ফেরেন দীর্ঘ বিরতির পর।

ব্যক্তিজীবনে সুরের আরাধনা আর ছোট ভাই হ্যাপি আখান্দের সঙ্গে ছিল তাঁর আত্মার সম্পর্ক। ভাইয়ের সঙ্গে গান তৈরির সেই সোনালী দিনগুলো ছিল লাকী আখান্দের জীবনের সবচেয়ে সুখের স্মৃতি। নব্বইয়ের দশকের শুরুতে ভাইয়ের অকালপ্রয়াণ যেন তাঁর জীবনের সুরকে সাময়িকভাবে থামিয়ে দিয়েছিল।

লাকী আখান্দের সুরের কারিকুরি ছিল তৎকালীন বাংলা গানের চেয়ে কয়েক ধাপ এগিয়ে। সুরকে কেবল বাদ্যযন্ত্রে আটকে না রেখে তিনি তাকে এক অনন্য রূপ দিয়েছিলেন। হামিং কিংবা শেকারের ব্যবহারে তিনি ছিলেন পথিকৃৎ। পানির গ্লাস, চিরুনি বা দেশলাই বক্সের গায়ে টোকা দিয়ে তিনি যে ছন্দ তৈরি করতেন, তা ছিল তৎকালীন সময়ে এক বৈপ্লবিক নিরীক্ষা। তাঁর সুরের বড় জাদু ছিল একই গানের বিভিন্ন সংগীতে ভিন্ন মাত্রা যোগ করা। কুমার বিশ্বজিতের গাওয়া ‘যেখানে সীমান্ত তোমার’ কিংবা ফেরদৌস ওয়াহিদের কণ্ঠে ‘মামুনিয়া’ গানে সংগীতায়োজন শ্রোতাদের দিয়েছিল নতুনত্বের স্বাদ।

পাশ্চাত্য ও স্প্যানিশ সুরের প্রতি লাকীর আজন্ম দুর্বলতা থাকলেও দেশীয় ধ্রুপদী সংগীত বা ঠুমরির প্রতি ছিল তাঁর গভীর টান। মায়ের অনুরোধে তিনি ঠুমরি ধাঁচে সুর করে পুরস্কার হিসেবে মায়ের কাছ থেকে ১০ হাজার টাকা উপহার পেয়েছিলেন। কাওসার আহমেদ চৌধুরী, এস এম হেদায়েত কিংবা গোলাম মোরশেদের মতো গীতিকারদের সঙ্গে তাঁর রসায়ন ছিল অপ্রতিদ্বন্দ্বী।

আজ লাকী আখান্দ আমাদের মাঝে নেই, কিন্তু ‘আবার এল যে সন্ধ্যা’, ‘এই নীল মণিহার’, ‘কবিতা পড়ার প্রহর’—এমন অসংখ্য কালজয়ী সুরের মাঝে তিনি বেঁচে আছেন প্রতিটি বাঙালির হৃদয়ে। জন্মদিনে সুরের এই জাদুকরের প্রতি জানাই গভীর শ্রদ্ধা।

সম্পর্কিত