বাংলাদেশের ধান থেকে ভবিষ্যতের কৃষি

আনুশেহ আনাদিল
আনুশেহ আনাদিল

প্রকাশ : ০৭ জুন ২০২৬, ১৭: ২৯
স্ট্রিম গ্রাফিক

হাজার হাজার বছর ধরে বাংলা কেবল ধান উৎপাদনের একটি ভূখণ্ড ছিল না; এটি ছিল বিশ্বের অন্যতম মহান ধানসভ্যতা। হিমালয় থেকে নেমে আসা নদীগুলো উর্বর পলি বয়ে আনত। বর্ষার জল প্রতি বছর মাটিকে পুনর্জীবিত করত। কৃষকেরা স্থানীয় পরিবেশের উপযোগী বীজ যত্নসহকারে নির্বাচন করতেন। বন্যাপ্রবণ অঞ্চল, খরাপ্রবণ এলাকা, উপকূলীয় লবণাক্ত জমি কিংবা গভীর জলাভূমি—বাংলার বুকে জন্ম নিয়েছিল অসংখ্য ধানের জাত, যেগুলো নিজ নিজ পরিবেশের সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিয়েছিল প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে। শিল্পায়িত কৃষির যুগ আসার বহু আগেই বাংলা গড়ে তুলেছিল ভূমি, জল, ঋতু ও মানুষের মধ্যে এক গভীর এবং পরিণত সম্পর্ক।

কিন্তু আজ আমাদের সামনে একটি অস্বস্তিকর প্রশ্ন দাঁড়িয়ে আছে—পৃথিবীর অন্যতম উর্বর কৃষিভূমির অধিকারী হয়েও কেন বাংলাদেশ তার নিজস্ব দেশীয় ধানের জাতগুলো নিয়ে বিশ্ববাজারে সুপরিচিত একটি রপ্তানিকারক দেশে পরিণত হতে পারেনি?

প্রচলিত উত্তর হলো—বাংলাদেশে উৎপাদিত অধিকাংশ ধান দেশের মানুষই ভোগ করে। এটি সত্য। সতেরো কোটিরও বেশি মানুষের খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিত করা অবশ্যই রাষ্ট্রের প্রথম দায়িত্ব। কিন্তু এই উত্তর সম্পূর্ণ নয়। বরং প্রকৃত প্রশ্নটি আরও গভীরে নিহিত—কৃষিপণ্যের মূল্য কে নির্ধারণ করে, আন্তর্জাতিক বাজারে প্রবেশের দরজা কারা নিয়ন্ত্রণ করে, এবং কোন খাদ্যকে “গ্রহণযোগ্য” বলা হবে, সেই মানদণ্ড স্থির করার ক্ষমতা কার হাতে?

আজকের বিশ্বে কৃষিপণ্য রপ্তানি ক্রমশ নির্ভরশীল হয়ে উঠছে অসংখ্য সনদ, পরীক্ষাগার, নিয়ন্ত্রক কাঠামো এবং অনুমোদন ব্যবস্থার উপর। কোনো কৃষিপণ্য আন্তর্জাতিক বাজারে প্রবেশ করতে চাইলে তাকে উত্তীর্ণ হতে হয় কীটনাশকের অবশিষ্টাংশ, দূষণ, প্যাকেজিং, অনুসরণযোগ্যতা এবং গুণগত মান সম্পর্কিত নানা পরীক্ষার মধ্য দিয়ে। নীতিগতভাবে এসব ব্যবস্থা ভোক্তাদের সুরক্ষার জন্য প্রতিষ্ঠিত।

কিন্তু দীর্ঘদিন ধরেই উন্নয়নশীল বিশ্বের বহু কৃষক, গবেষক ও কৃষি-অধিকারকর্মী প্রশ্ন তুলেছেন—এই ব্যবস্থাগুলোকে কি সমালোচনার ঊর্ধ্বে রাখা যায়?

মূল প্রশ্নটি অত্যন্ত সরল—বিশ্ববাসীর খাদ্য কেমন হবে, সেই সিদ্ধান্ত নেওয়ার অধিকার কার?

এই মানদণ্ডগুলোর অধিকাংশই নির্ধারিত হয় অর্থনৈতিকভাবে শক্তিশালী শিল্পোন্নত রাষ্ট্রগুলোর প্রতিষ্ঠান, নিয়ন্ত্রক সংস্থা, আন্তর্জাতিক সার্টিফিকেশন ব্যবস্থা, বহুজাতিক করপোরেশন এবং বৃহৎ আমদানিকারকদের প্রভাবের মধ্যে। ফলে বাংলাদেশের মতো দেশের ক্ষুদ্র কৃষকরা প্রায়ই এমন একটি ব্যবস্থার মুখোমুখি হন, যার নিয়ম তারা তৈরি করেননি এবং যার উপর তাদের প্রভাবও অত্যন্ত সীমিত।

এ কথা বলার অর্থ এই নয় যে খাদ্যনিরাপত্তার মানদণ্ড অপ্রয়োজনীয় বা অবৈধ। ভোক্তার নিরাপত্তা গুরুত্বপূর্ণ। খাদ্যদূষণ বাস্তব সমস্যা। জনস্বাস্থ্য রক্ষা অপরিহার্য। কিন্তু কোনো ব্যবস্থার উদ্দেশ্য মহৎ হলেই তা সমালোচনার ঊর্ধ্বে চলে যায় না। বরং আধুনিক কৃষিব্যবস্থার অন্যতম বড় বৈপরীত্য হলো—অত্যন্ত শিল্পায়িত ও প্রক্রিয়াজাত খাদ্যপণ্য সহজেই নিয়ন্ত্রক অনুমোদন লাভ করতে পারে, অথচ শতাব্দীপ্রাচীন প্রাকৃতিক কৃষিচর্চা ও দেশীয় বীজভিত্তিক উৎপাদন একই স্বীকৃতি বা বাজারসুবিধা পায় না।

বিশ্বজুড়ে পরিবেশবান্ধব, জৈব এবং ঐতিহ্যনির্ভর খাদ্যের বাজার ক্রমশ বিস্তৃত হচ্ছে। মানুষ এখন কেবল খাদ্য নয়, খাদ্যের গল্পও খুঁজছে। বাংলাদেশের কাছে সেই গল্প আছে। আমাদের কাছে আছে বীজ। আছে নদী ও মাটি। আছে কৃষকের জ্ঞান এবং হাজার বছরের কৃষিসভ্যতার উত্তরাধিকার।

বিশ্বের ধনী দেশগুলোর সুপারমার্কেটগুলোতে তাকালে দেখা যায়, অগণিত প্রক্রিয়াজাত খাদ্যপণ্য—যেগুলোর উৎপাদনব্যবস্থা অত্যন্ত শিল্পনির্ভর—সহজেই অনুমোদন লাভ করছে। অথচ কোনো ক্ষুদ্র কৃষক যদি স্থানীয় জাতের ধান পরিবেশবান্ধব উপায়ে উৎপাদন করেন, তবে আন্তর্জাতিক বাজারে প্রবেশের জন্য তাকে বহুস্তরীয় বাধা অতিক্রম করতে হয়।

এই বৈপরীত্য আমাদের অস্বস্তিকর কিছু প্রশ্নের সামনে দাঁড় করায়—নিয়ম মেনে চলাই কি সবসময় প্রজ্ঞার পরিচয়? কোনো পণ্য অনুমোদিত হলেই কি তা পরিবেশগতভাবে টেকসই হয়ে যায়? আইনগত অনুমোদন কি মাটির স্বাস্থ্য, জীববৈচিত্র্য এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কল্যাণের নিশ্চয়তা দেয়? উত্তর হলো: স্পষ্টতই না।

আধুনিক নিয়ন্ত্রক কাঠামো মূলত তাৎক্ষণিক ভোক্তা-ঝুঁকি মূল্যায়নের জন্য নির্মিত। এগুলো সবসময় মাটির দীর্ঘমেয়াদি উর্বরতা, জীববৈচিত্র্যের ক্ষয়, রাসায়নিক নির্ভরতা বা পরিবেশগত স্থিতিশীলতা পরিমাপ করার জন্য তৈরি হয়নি। বাংলাদেশের সামনে তাই কেবল আন্তর্জাতিক মানদণ্ড পূরণের প্রশ্ন নয়; বরং তার চেয়েও বড় প্রশ্ন হলো—আমরা কেমন কৃষিভবিষ্যৎ নির্মাণ করতে চাই?

দীর্ঘদিন ধরে বিশ্বের কৃষিনীতি একটি ধারণাকে কেন্দ্র করে আবর্তিত হয়েছে—অধিক ফলনই সর্বোচ্চ লক্ষ্য। নিঃসন্দেহে এই ধারণা খাদ্য উৎপাদন বৃদ্ধি করেছে। কিন্তু এর মূল্যও কম নয়। মাটি ক্রমশ রাসায়নিক সারের উপর নির্ভরশীল হয়েছে, উপকারী পোকামাকড় বিলুপ্তির পথে গেছে, জলাশয় দূষিত হয়েছে, অসংখ্য দেশীয় বীজ হারিয়ে গেছে, কৃষিভূমি বৈচিত্র্য হারিয়ে একরূপ ও ভঙ্গুর হয়ে উঠেছে এবং অতিরিক্ত উৎপাদনের দৌড়ে আমরা প্রায়ই স্থিতিস্থাপকতাকে বিসর্জন দিয়েছি।

বাংলাদেশের উচিত নিজেকে প্রশ্ন করা—এর বাইরে কি আর কোনো পথ আছে? জাপানি কৃষক ও দার্শনিক মাসানোবু ফুকুওকা সেই বিকল্প পথের এক গুরুত্বপূর্ণ দিকনির্দেশনা দিয়ে গেছেন। ফুকুওকা বিশ্বাস করতেন, মানুষ যত বেশি প্রকৃতিকে নিয়ন্ত্রণ করতে চায়, তত বেশি নতুন সমস্যার জন্ম দেয়। তাঁর পর্যবেক্ষণে প্রকৃতির নিজস্ব এক প্রজ্ঞা আছে। সেখানে একটি উদ্ভিদ অন্যটিকে রক্ষা করে, ভূমির আবরণ মাটিকে সুরক্ষা দেয়, বৈচিত্র্য কীটপতঙ্গের বিস্তার রোধ করে, এবং জৈব পদার্থ নিজেই পুষ্টির চক্র সম্পন্ন করে।

তাঁর শিক্ষা ছিল না যে কৃষক কিছুই করবেন না; বরং কৃষিকে এমনভাবে গড়ে তুলতে হবে, যাতে তা প্রকৃতির বিরুদ্ধে নয়, প্রকৃতির সঙ্গে সহযোগিতার সম্পর্ক স্থাপন করে।

বাংলাদেশের জন্য এই দর্শনের তাৎপর্য গভীর। এই দেশের হাজার বছরের কৃষি-ঐতিহ্য রয়েছে। দেশীয় ধানের জাতগুলো স্থানীয় জলবায়ু, মাটি, পোকামাকড়, বন্যা ও ঋতুচক্রের সঙ্গে অভিযোজিত হয়েছে শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে। এসব জাত কেবল বীজ নয়, এগুলো প্রকৃতির স্মৃতি। এগুলো আমাদের ভূখণ্ডের জীবন্ত উত্তরাধিকার। এগুলো হারিয়ে গেলে কেবল একটি ফসল হারায় না; হারিয়ে যায় শত শত বছরের সঞ্চিত জ্ঞান।

জলবায়ু পরিবর্তনের যুগে এই বৈচিত্র্য হয়তো আমাদের সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদে পরিণত হতে পারে। লবণাক্ততা, খরা আর বন্যা-সহনশীল কিংবা স্থানীয় পরিবেশে অভিযোজিত ধানের জাত ভবিষ্যতের খাদ্যনিরাপত্তার ভিত্তি হয়ে উঠতে পারে। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনকভাবে, এসব দেশীয় জাত প্রায়ই এমন একটি বাজারব্যবস্থার সঙ্গে প্রতিযোগিতা করতে বাধ্য হয়, যা বৈচিত্র্যের চেয়ে একরূপতাকে বেশি মূল্য দেয়।

বাংলাদেশের সামনে আজ একটি ঐতিহাসিক সুযোগ রয়েছে। অন্যদের অনুকরণ না করে আমরা নিজেরাই একটি স্বতন্ত্র কৃষি-পরিচয় নির্মাণ করতে পারি।

কল্পনা করুন, বাংলাদেশ বিশ্বে পরিচিত হচ্ছে কেবল ধান উৎপাদনকারী দেশ হিসেবে নয়, বরং পরিবেশবান্ধব, বিষমুক্ত, দেশীয় জাতের ধানের এক অনন্য উৎস হিসেবে। যে ধান অপ্রয়োজনীয় কীটনাশক নির্ভর নয় বরং স্থানীয় মাটি ও জীববৈচিত্র্যের সঙ্গে সহাবস্থানে উৎপন্ন হয়। যে ধান একটি নির্দিষ্ট ভূখণ্ড, সংস্কৃতি এবং ইতিহাসের প্রতিনিধিত্ব করে। যে ধানের মূল্য কেবল তার পরিমাণে নয়, তার চরিত্রে।

বিশ্বজুড়ে পরিবেশবান্ধব, জৈব এবং ঐতিহ্যনির্ভর খাদ্যের বাজার ক্রমশ বিস্তৃত হচ্ছে। মানুষ এখন কেবল খাদ্য নয়, খাদ্যের গল্পও খুঁজছে। বাংলাদেশের কাছে সেই গল্প আছে। আমাদের কাছে আছে বীজ। আছে নদী ও মাটি। আছে কৃষকের জ্ঞান এবং হাজার বছরের কৃষিসভ্যতার উত্তরাধিকার। প্রয়োজন কেবল আত্মবিশ্বাসের। নিজস্ব বীজের উপর আত্মবিশ্বাস। নিজস্ব কৃষকের উপর আত্মবিশ্বাস। নিজস্ব কৃষিজ্ঞান ও পরিবেশগত প্রজ্ঞার উপর আত্মবিশ্বাস।

প্রকৃত উন্নয়ন মানে নিজের শিকড় ভুলে যাওয়া নয়। প্রকৃত উন্নয়ন মানে নিজের শক্তিকে চিনতে শেখা। একটি জাতি যখন তার বীজের উপর নিয়ন্ত্রণ হারায়, তখন ধীরে ধীরে তার কৃষির উপর নিয়ন্ত্রণ হারায়। কৃষির উপর নিয়ন্ত্রণ হারালে খাদ্যের উপর নিয়ন্ত্রণ দুর্বল হয়। আর খাদ্যের উপর নিয়ন্ত্রণ দুর্বল হলে জাতীয় স্বাধীনতাও ভঙ্গুর হয়ে ওঠে।

বাংলাদেশ বিশ্বের অন্যতম উর্বর বদ্বীপের উপর দাঁড়িয়ে আছে। তার সবচেয়ে বড় সম্পদ বিদেশি প্রযুক্তি নয়, বিদেশি রাসায়নিক নয়, বিদেশি অনুমোদনও নয়। তার সবচেয়ে বড় সম্পদ তার মাটি, তার জীববৈচিত্র্য, তার নদী, তার কৃষক, এবং প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে সঞ্চিত সেই প্রজ্ঞা, যা শিখিয়েছে—প্রকৃতির বিরুদ্ধে নয়, প্রকৃতির সঙ্গে মিলেই প্রকৃত সমৃদ্ধি অর্জন করা যায়।

বাংলাদেশের কৃষিভবিষ্যৎ নিয়ে আলোচনার সূচনা সেখান থেকেই হওয়া উচিত। বিদেশি বাজার কী চায়, সেই প্রশ্ন থেকে নয় বরং এই প্রশ্ন থেকে—আমরা কেমন কৃষিসভ্যতা হয়ে উঠতে চাই?

  • আনুশেহ আনাদিল: সংগীতশিল্পী ও লেখক

সম্পর্কিত