বাণিজ্যের আড়ালে দেশ থেকে পাচার বিলিয়ন ডলার, রক্তক্ষরণে বাংলাদেশের অর্থনীতি

স্ট্রিম গ্রাফিক

গণঅভ্যুত্থানের মুখে পালিয়ে যাওয়া সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার শাসনামলে বাংলাদেশের বৈদেশিক অর্থনীতির হিসাব এক দ্বৈত বাস্তবতার চিত্র তুলে ধরেছিল। এর উপরিভাগে ছিল রপ্তানিনির্ভর প্রবৃদ্ধি এবং বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ শক্তিশালী হওয়ার সরকারি বর্ণনা।

কিন্তু এর নিচে ছিল বাণিজ্য জালিয়াতি (ট্রেড মিসইনভয়েসিং) এবং রাজনৈতিকভাবে প্রভাবশালী ব্যবসায়িক নেটওয়ার্কের মাধ্যমে গত এক দশকে পদ্ধতিগতভাবে দেশের বাইরে ১০ বিলিয়ন ডলারেরও বেশি অর্থ পাচার। ওয়াশিংটনভিত্তিক গবেষণা সংস্থা গ্লোবাল ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেগ্রিটির (জিএফআই) তথ্য ও বিভিন্ন তদন্তে বিষয়টি ধীরে ধীরে স্পষ্ট হয়েছে।

জিএফআই-এর সর্বশেষ মূল্যায়ন অনুযায়ী, বাংলাদেশের বাণিজ্যভিত্তিক এ অবৈধ অর্থপ্রবাহ বিশ্বের সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ অর্থনীতিগুলোর একটি হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। পদ্ধতিটি নতুন বা জটিল নয়। আমদানিকার করা তাঁদের পণ্যের মূল্য বেশি দেখিয়ে অর্থ বিদেশে সরিয়ে নেয় আর রপ্তানিকারকরা প্রকৃত আয় কম দেখিয়ে বিদেশে অর্থ রেখে দেয়। তবে এর পরিমাণ অনেক বড়।

অনুমান করা হয়, শুধু পণ্যের মূল্যে মিথ্যা ঘোষণার মাধ্যমেই গত ১০ বছরে বাংলাদেশ থেকে প্রায় ৬৮ বিলিয়ন ডলার পাচার হয়েছে। কখনো বছরে ৮ বিলিয়ন ডলারেরও বেশি অর্থ পাচার হয়েছে। যা কোনো কোনো বছরের মোট রপ্তানি আয়ের একটি বড় অংশের সমান।

বৈশ্বিকভাবেও এই ধরনের প্রবণতার লক্ষ করা যায়। ১৩৪টি উন্নয়নশীল দেশে জিএফআই প্রায় ১ দশমিক ৬ ট্রিলিয়ন ডলারের সম্ভাব্য বাণিজ্য জালিয়াতির হিসাব দিয়েছে।

বাণিজ্যক অংশীদার দেশগুলোর সঙ্গে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক তথ্যের দীর্ঘমেয়াদি অসামঞ্জস্য এই ইঙ্গিত দেয় যে, এটি কেবল পরিসংখ্যানগত ত্রুটি নয়, বরং একটি কাঠামোগত কারসাজি।

এই অনৈতিক বাণিজ্য ব্যবস্থার ভেতরে কাস্টমস নজরদারি, ব্যাংকিং নিয়ন্ত্রণ ও রাজনৈতিক অর্থনীতির মধ্যে ঘনিষ্ঠ যোগসূত্র রয়েছে। বাংলাদেশের ক্ষেত্রে এর বিশেষ দিক হলো, এই অর্থপ্রবাহ বড় কর্পোরেট গোষ্ঠী ও রাজনৈতিক নেটওয়ার্কের সঙ্গে নিবিড়ভাবে সম্পর্কিত।

আওয়ামী সরকারের পতনের পর শুরু হওয়া তদন্তে অন্তত ১০টি বড় শিল্পগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে অর্থ পাচারের অভিযোগ উঠে এসেছে। এর মধ্যে রয়েছে এস আলম গ্রুপ, বেক্সিমকো গ্রুপ, বসুন্ধরা গ্রুপ, সামিট গ্রুপসহ আরও কয়েকটি প্রতিষ্ঠান।

দেশীয় তদন্তকারীরা জিএফআইয়ের চেয়েও বড় পরিমাণে অর্থ পাচারের সন্ধান পেয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর আহসান এইচ মনসুর জানিয়েছেন, বড় শিল্পগোষ্ঠী ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মাধ্যমে প্রায় ২ দশমিক ৫ থেকে ৩ ট্রিলিয়ন টাকা অর্থাৎ প্রায় ২৩ থেকে ২৭ বিলিয়ন ডলার বিদেশে পাচার হতে পারে।

এই অঙ্কে শুধু বাণিজ্য জালিয়াতিই নয়, ঋণ আত্মসাৎ, কর ফাঁকি এবং অফশোর সম্পদ সঞ্চয়ও অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।

অর্থ পাচার হয়েছে প্রাতিষ্ঠানিক রূপে

এস আলম গ্রুপ অর্থ পাচারকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিয়েছে। তদন্তকারীদের অভিযোগ, প্রতিষ্ঠানটি অন্তত ১১টি ব্যাংক থেকে ২ ট্রিলিয়ন টাকার বেশি সরিয়েছে। যার বড় অংশই খেলাপি ঋণে পরিণত হয়েছে।

এই অর্থের উল্লেখযোগ্য অংশ বিদেশে পাঠিয়ে অন্তত ছয়টি দেশে রিয়েল এস্টেট ও হসপিটালিটি খাতে বিনিয়োগ করা হয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

বেক্সিমকো গ্রুপের বিরুদ্ধে প্রায় ৫০০ বিলিয়ন টাকা পাচারের অভিযোগ রয়েছে। তদন্তে লন্ডন ও সিঙ্গাপুরে গ্রুপ সংশ্লিষ্ট পরিবারের সম্পদের সন্ধান পাওয়া গেছে।

বসুন্ধরা গ্রুপের ক্ষেত্রেও একই ধরনের চিত্র দেখা গেছে। প্রতিষ্ঠানটির বিরুদ্ধে ৩৫০ বিলিয়ন টাকার বেশি ঋণের তথ্য পাওয়া গেছে। যার কিছু ইতোমধ্যে খেলাপি। সিঙ্গাপুর, সুইজারল্যান্ড, যুক্তরাজ্য, সংযুক্ত আরব আমিরাত, সাইপ্রাস এবং ভার্জিন দ্বীপপুঞ্জসহ বিভিন্ন অফশোর এলাকায় তাঁদের সম্পদের সন্ধান মিলেছে।

আদালত গ্রুপগুলোর দেশি-বিদেশি সম্পদ জব্দের নির্দেশ দিলেও এগুলো ফেরত আনা আইনত জটিল।

আন্তর্জাতিক সম্পদ উদ্ধারে আইনি সহযোগিতা, প্রমাণের মানদণ্ড এবং রাজনৈতিক ইচ্ছার ওপর নির্ভর করে। বাংলাদেশ ইতিমধ্যেই বিদেশি ল ফার্ম ও আন্তর্জাতিক সংস্থার সঙ্গে কাজ শুরু করেছে। তবে অভিজ্ঞতা বলে, অবৈধ অর্থের মাত্র একটি অংশই সাধারণত ফেরত আসে।

অন্যান্য গোষ্ঠীর বিরুদ্ধেও একই ধরনের অভিযোগ রয়েছে। সিকদার গ্রুপের বিরুদ্ধে ভুয়া পরিচয় ব্যবহার করে ৩০০ বিলিয়নের বেশি টাকা পাচারের অভিযোগ রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, সিঙ্গাপুর ও থাইল্যান্ডে তাঁদের সম্পদের সন্ধান পাওয়া গেছে।

নাবিল গ্রুপের বিরুদ্ধে ১৫০ বিলিয়নের বেশি এবং সামিট ও ওরিয়ন গ্রুপের বিরুদ্ধেও বিদেশে অর্থ পাচারের অভিযোগে সম্পদ জব্দের আদেশ দিয়েছে আদালত।

সবার ক্ষেত্রেই একটি সাধারণ দিক লক্ষ্য করা যায়—দেশের অভ্যন্তরে খেলাপি ঋণ বৃদ্ধি এবং অর্থ পাচারে তাঁদের মধ্যে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রয়েছে।

এই নেটওয়ার্কগুলোর সঙ্গে শেখ হাসিনা সরকারের ঘনিষ্ঠ ব্যক্তিদের সংশ্লিষ্টতার অভিযোগও উঠে এসেছে। তদন্তে যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্র ও উপসাগরীয় অঞ্চলে তাঁদের সম্পদের সন্ধান পাওয়া গেছে। একই সঙ্গে রাজনৈতিক প্রভাবশালী ব্যক্তি ও সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়িক গোষ্ঠীর শত শত সম্পত্তি ও বহু ব্যাংক হিসাব জব্দের নির্দেশ দিয়েছে আদালত।

ভয়াবহ প্রভাব

এই অর্থপাচারের কাঠামো বহুস্তরবিশিষ্ট। বাণিজ্য জালিয়াতির অর্থ বের করার প্রাথমিক মাধ্যম, ব্যাংক খাত সরবরাহ করে অর্থ, আর অফশোর এলাকা ও রিয়েল এস্টেট বাজার সেই অর্থ শোষণ করে। ফলে দেশের আর্থিক দুর্বলতা এবং বৈদেশিক মূলধন পাচারের মধ্যে একটি চক্র তৈরি হয়েছে।

অর্থনীতির ওপর এর প্রভাব স্পষ্ট। অতিমূল্যায়িত আমদানি বৈদেশিক মুদ্রার চাহিদা বাড়ায়, আর কম দেখানো রপ্তানি আয় বাণিজ্য ভারসাম্য ও রাজস্বকে বিকৃত করে। ফলে ঘোষিত অর্থনৈতিক চিত্র এবং প্রকৃত বাস্তবতার মধ্যে একটি বড় ফাঁক তৈরি হয়।

এই বিপুল অর্থপাচার দেশের উন্নয়নকেও বাধাগ্রস্ত করছে। মধ্যম আয়ের দেশে উন্নীত হতে অবকাঠামো ও শিল্প খাতে যে বিনিয়োগ প্রয়োজন, তার বড় অংশই অবৈধভাবে বাইরে চলে গেছে। এই ক্ষতির প্রভাব বাস্তব—অপর্যাপ্ত বিনিয়োগ, বিলম্বিত প্রকল্প এবং দুর্বল সেবা খাতে তা প্রতিফলিত হচ্ছে।

অন্যদিকে, পাচার হওয়া অর্থ পুনরুদ্ধার করা কঠিন ও সময়সাপেক্ষ। আন্তর্জাতিক সহযোগিতা, আইনি প্রক্রিয়া এবং বিভিন্ন দেশের সমন্বয় প্রয়োজন হয়, যার ফলে সাধারণত অল্প অংশই ফেরত আনা সম্ভব হয়।

বাংলাদেশ ইতিমধ্যে বিদেশি আইন সংস্থা ও আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানের সহায়তায় অর্থ ফেরত আনার উদ্যোগ নিয়েছে। তবে বিশ্লেষকদের মতে, সমস্যাটি চিহ্নিত করাই যথেষ্ট নয়—এটি টিকিয়ে রাখার প্রণোদনাগুলো ভাঙতে হবে। কাস্টমস, ব্যাংকিং ব্যবস্থা ও রাজনৈতিক জবাবদিহিতায় কাঠামোগত সংস্কার ছাড়া এই মূলধন পাচার বন্ধ করা কঠিন।

বাংলাদেশের সাম্প্রতিক অর্থনৈতিক সাফল্যের পাশাপাশি এই অদৃশ্য অর্থপ্রবাহ ভবিষ্যৎ অর্থনীতির গতিপথ নির্ধারণে সমান গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।

ভয়াবহ প্রভাব

বিশ্লেষণে দেখা যাচ্ছে, দেশের অর্থ পাচার একটি বিভিন্ন স্তরে হচ্ছে। প্রথম ধাপে ট্রেড মিস-ইনভয়েসিং (অসত্য মূল্য দেখিয়ে আমদানি-রপ্তানি) অর্থ বিদেশে রপ্তানি নিশ্চিত করছে। এরপর ব্যাংকিং সেক্টর, বিশেষ করে রাষ্ট্র প্রভাবিত ঋণ ব্যবস্থার মাধ্যমে প্রয়োজনীয় নগদ অর্থ সরবরাহ করা হয়।

পরবর্তী ধাপে, অফশোর প্রতিষ্ঠান ও রিয়েল এস্টেট মার্কেটে মূলধন বিনিয়োগ করা হচ্ছে। প্রায়শই এসব এমন মালিকানা কাঠামোর মাধ্যমে হচ্ছে যা চূড়ান্ত নিয়ন্ত্রণ অদৃশ্য রাখে। এই সব স্তর একে অপরকে শক্তিশালী করছে। ফলে, দেশের ভেতরের আর্থিক ব্যবস্থায় ফিডব্যাক লুপ তৈরি হয়েছে।

সামষ্টিক অর্থনৈতিক দৃষ্টিতে এর প্রভাব পরিমাপযোগ্য। অতিরিক্ত মূল্যায়িত আমদানি বৈদেশিক মুদ্রার চাহিদা বাড়ায়, যা রিজার্ভের ওপর চাপ দেয়। অন্যদিকে, কম দেখানো রপ্তানি আয় বাণিজ্য ঘাটতি এবং সরকারি রাজস্বের হিসাব বিকৃত করে। ফলে রিপোর্টকৃত অর্থনৈতিক কর্মক্ষমতা ও প্রকৃত আর্থিক বাস্তবতার মধ্যে একটি বড় ফাঁক দেখা দেয়।

এই ধরনের টাকা পাচার বাংলাদেশের উন্নয়নের পথে বড় বাধা সৃষ্টি করছে। মধ্যম আয়ের দেশ থেকে উত্তরণের জন্য অবকাঠামো ও শিল্পে ধারাবাহিক বিনিয়োগ অপরিহার্য। কিন্তু বহু বছরের সরকারি উন্নয়ন বাজেটের সমতুল্য বিলিয়ন ডলার অবৈধ চ্যানেলে বিদেশে চলে গেছে। এর প্রভাব কেবল তাত্ত্বিক নয়, প্রকল্পগুলোর অর্থসংকট ও সীমিত তহবিলের ব্যবস্থাতেও এটি প্রতিফলিত হয়েছে।

আন্তর্জাতিক সম্পদ উদ্ধারে আইনি সহযোগিতা, প্রমাণের মানদণ্ড এবং রাজনৈতিক ইচ্ছার ওপর নির্ভর করে। বাংলাদেশ ইতিমধ্যেই বিদেশি ল ফার্ম ও আন্তর্জাতিক সংস্থার সঙ্গে কাজ শুরু করেছে। তবে অভিজ্ঞতা বলে, অবৈধ অর্থের মাত্র একটি অংশই সাধারণত ফেরত আসে।

এখন মূল চ্যালেঞ্জ সমস্যা চিহ্নিত করা নয়, বরং যেসব প্রণোদনা এই অর্থপাচারকে টিকিয়ে রেখেছে সেগুলো ভেঙে ফেলা। কাস্টমস ব্যবস্থাপনা, ব্যাংকিং খাতের শাসনব্যবস্থা এবং রাজনৈতিক জবাবদিহিতায় কাঠামোগত পরিবর্তন না এলে অর্থ পাচারের প্রক্রিয়া আগের মতোই চলতে থাকবে।

বাংলাদেশের সাম্প্রতিক অর্থনৈতিক গল্প গড়ে উঠেছে দৃশ্যমান সাফল্যের ওপর ভিত্তি করে। তবে যে অর্থগুলো নীরবে দেশ থেকে বেরিয়ে যাচ্ছে, সেগুলোই ভবিষ্যতে দেশের অর্থনীতির গতিপথ নির্ধারণে সমানভাবে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

  • ফয়সাল মাহমুদ: সংবাদিক ও বিশ্লেষক

(এশিয়া টাইমস থেকে অনুবাদ করেছেন আব্দুর রহমান সার্জিল)

সম্পর্কিত