বাংলাদেশের বর্তমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে ‘জনতার দল’ নিয়ে জনমনে একটি সাধারণ ভুল ধারণা প্রচলিত রয়েছে। অনেকেই মনে করেন, এটি সম্ভবত কেবলই সামরিক বাহিনীর অবসরপ্রাপ্তদের একটি দল। তবে এই ধারণাটি একেবারেই অমূলক। এটি সত্য যে, এই দলের প্রাথমিক সংগঠকদের কয়েকজন এবং নেতৃত্বে অবসরপ্রাপ্ত সামরিক বাহিনীর অফিসাররা রয়েছেন। কিন্তু দলটির মূল চালিকাশক্তি এবং মালিকানা প্রকৃতপক্ষে আপামর জনগণের।
রাজনীতিতে আসার পেছনে আমাদের অনুপ্রেরণা ক্ষমতার মোহ নয়, বরং গভীর দেশপ্রেম ও দায়বদ্ধতা। আমরা মনে করি, বাংলাদেশ একটি উন্নয়নশীল দেশ হলেও এ দেশ আমাদের দুহাত ভরে দিয়েছে। আজ আমরা যারা সামরিক বা বেসামরিক জীবনে প্রতিষ্ঠিত, তা সম্ভব হয়েছে দেশের গরিব মানুষের ট্যাক্সের টাকায়। আমরা প্রশিক্ষিত হয়েছি, কিন্তু বিনিময়ে আমরা দেশকে কতটুকু দিতে পেরেছি—সেই প্রশ্নটি আমাদের বিবেককে নাড়া দেয়। রাষ্ট্র বা সরকার আমাদের যে ‘অবসর’ দিয়েছে, সেই অবসরকে আমরা মানসিকভাবে প্রত্যাখ্যান করেছি। জীবনের এই পর্যায়ে এসে আমাদের ব্যক্তিগত কোনো চাওয়া-পাওয়া নেই, নতুন প্রাপ্তিরও সম্ভাবনা নেই। কিন্তু আমরা বিশ্বাস করি, দেশের জন্য আমাদের এখনো অনেক কিছু দেওয়ার আছে। সেই দায়বদ্ধতা থেকেই রাজনীতিতে একটি ইতিবাচক পরিবর্তনের ল্যান্ডমার্ক স্থাপন করার লক্ষ্যে আমরা সংঘবদ্ধ হয়েছি।
পরিসংখ্যানের দিকে তাকালে আমাদের দল সম্পর্কে ‘সামরিক দল’ হওয়ার ভুল ধারণাটি নিমিষেই ভেঙে যায়। এবারের নির্বাচনে আমরা এককভাবে অংশগ্রহণ করছি। আমাদের ২১ জন প্রার্থীর মধ্যে ১৮ জনই এসেছেন সম্পূর্ণ অসামরিক ব্যাকগ্রাউন্ড থেকে। মাত্র তিনজন সামরিক ব্যাকগ্রাউন্ডের। এটি সুস্পষ্টভাবে প্রমাণ করে যে, নেতৃত্বে সাবেক সেনা কর্মকর্তারা থাকলেও দলটি মূলত সকল পেশা, ধর্ম ও গোত্রের মানুষের। আমরা এমন একটি রাজনৈতিক সংস্কৃতি গড়ে তুলতে চাইছি যেখানে সৎ, শিক্ষিত, সাহসী এবং দেশপ্রেমিক মানুষ একত্রিত হবেন। নেতৃত্বের প্রশ্নে আমরা কোনো ধরনের আপোষ করছি না। অনেক বর্ণাঢ্য ক্যারিয়ারের অধিকারী ও সামাজিকভাবে প্রভাবশালী ব্যক্তি আমাদের সাথে যুক্ত হতে চেয়েছেন। কিন্তু আমাদের দলের কঠোর নৈতিক মাপকাঠিতে যখন দেখেছি তাদের অতীত বিতর্কিত, তখন আমরা সবিনয়ে তাদের ফিরিয়ে দিয়েছি। আমরা সংখ্যায় নয়, মানে বিশ্বাসী।
আমাদের নেতৃত্বের দর্শন প্রচলিত রাজনৈতিক দলগুলোর চেয়ে সম্পূর্ণ আলাদা। দলের আত্মপ্রকাশের দিনই আমরা ঘোষণা করেছিলাম যে, আমাদের সাংগঠনিক কাঠামো ও নেতৃত্বের ধারাবাহিকতা ফিলিস্তিনের স্বাধীনতা আন্দোলন দ্বারা কিছুটা অনুপ্রাণিত। ফিলিস্তিনে ইসমাইল হানিয়া নিহত হওয়ার পরদিন সকালেই যেমন নতুন নেতৃত্ব দায়িত্ব গ্রহণ করেছে, ঠিক তেমনি একটি রাজনৈতিক দলে নিরবচ্ছিন্ন নেতৃত্বের প্রবাহ থাকা উচিত। বাংলাদেশে দুর্ভাগ্যজনকভাবে পরিবারতন্ত্র এবং ওলিগার্কি জেঁকে বসেছে। যে পরিবারের প্রধান দল চালান, সেই পরিবারের সদস্যরাই কেবল সর্বোচ্চ নেতৃত্বে যান—রাজনীতির এই বৃত্তায়ন বা দুর্বৃত্তায়ন আমরা ভাঙতে চাই। আমি প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান মানে এই নয় যে, আমার সন্তানই পরবর্তী চেয়ারম্যান হবে।
আমাদের দলে একটি অত্যন্ত শক্তিশালী ‘নৈতিক কমিটি’ রয়েছে। এই কমিটি এতটাই ক্ষমতাবান যে, চেয়ারম্যান বা মহাসচিব যদি বড় ধরনের কোনো অনিয়ম, দুর্নীতি বা অপকর্মের সাথে জড়িত হন, তবে তাদের দল থেকে বহিষ্কার করার ক্ষমতা এই কমিটির রয়েছে। আমাদের নীতি হলো—নেতৃত্বের গুণাবলীতে যিনি এগিয়ে থাকবেন, তিনিই পরবর্তী হাল ধরবেন।
অনেকে প্রশ্ন করেন, সেনাবাহিনী চলে ‘চেইন অব কমান্ড’ বা আদেশের মাধ্যমে, কিন্তু গণতন্ত্রে থাকে দ্বিমত ও বিতর্ক। এই সামরিক মানসিকতা কি জনতার দলের গণতন্ত্রায়নের পথে বাধা হবে? সামরিক পদ্ধতি সবসময় সঠিক বা বেঠিক বিচার করে না, সেখানে আদেশ পালনই মুখ্য। যতদিন আমরা ইউনিফর্মে ছিলাম, আমাদের কোনো চয়েস ছিল না; আমরা জীবন দিতে প্রস্তুত ছিলাম। কিন্তু অবসরে আসার পর আমরা সেই ‘মিলিটারি পথ’ পরিহার করেছি। এখন আমাদের হাতে অস্ত্র নেই, আছে কলম। রাজনীতিতে আমরা যে প্রক্রিয়ায় কাজ করছি, তা শতভাগ গণতান্ত্রিক। আমি এককভাবে কোনো সিদ্ধান্ত নিই না। আমাদের নৈতিক কমিটি আলোচনার মাধ্যমে যে সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত করে, সেটাই আমরা মেনে চলি।
বাংলাদেশের রাজনীতিতে বর্তমানে যে দুটি বৃহৎ জোট বা মেরুকরণ রয়েছে, তার বাইরেও সাধারণ মানুষের একটি বিশাল অংশ রয়েছে, যারা বঞ্চনার শিকার এবং একটি ভিন্ন বক্তব্য শুনতে চায়। গত কিছুদিন ধরে প্রায় ৪২টি নিবন্ধিত-অনিবন্ধিত রাজনৈতিক দল এবং প্রায় ২০০ জন স্বতন্ত্র প্রার্থী আমাদের সাথে যোগাযোগ করেছেন। তারা দেশের জন্য কাজ করতে চান কিন্তু বিদ্যমান দুই প্রধান রাজনৈতিক মঞ্চে যেতে আগ্রহী নন। তারা আমাদের স্পষ্ট জানিয়েছেন, তারা জনতার দলের কাছে কিছুই চান না, শুধু সঠিক নেতৃত্ব চান। গত ১০ মাসে আমাদের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড প্রমাণ করেছে যে, আমরা কোনো অনৈতিক, রাষ্ট্রবিরোধী বা জন-আকাঙ্ক্ষা বিরোধী কাজ করিনি। এই আস্থার জায়গা থেকেই তারা আমাদের অনুরোধ করেছেন তাদের সংগঠিত করার সুযোগ দেওয়ার জন্য। তবে জোট করলেও আমরা মানের সাথে আপোষ করিনি। দুর্নীতিবাজ, চাঁদাবাজ বা মাস্তানদের আমরা সাফ জানিয়ে দিয়েছি—এখানে আপনাদের কোনো স্থান নেই।
জীবনের এই পর্যায়ে এসে আমাদের ব্যক্তিগত কোনো চাওয়া-পাওয়া নেই, নতুন প্রাপ্তিরও সম্ভাবনা নেই। কিন্তু আমরা বিশ্বাস করি, দেশের জন্য আমাদের এখনো অনেক কিছু দেওয়ার আছে। সেই দায়বদ্ধতা থেকেই রাজনীতিতে একটি ইতিবাচক পরিবর্তনের ল্যান্ডমার্ক স্থাপন করার লক্ষ্যে আমরা সংঘবদ্ধ হয়েছি।
আমরা শুরু থেকেই বলেছি, আমাদের উত্তর, দক্ষিণ, পূর্ব বা পশ্চিম—কোনো বিদেশি শক্তির দিকে তাকানোর সুযোগ নেই। আমাদের একমাত্র ধ্যান-জ্ঞান হলো বাংলাদেশ। আমরা ‘বাংলাদেশপন্থী’ নীতি আঁকড়ে ধরে দল গঠন করেছি। রাজনীতিতে অনৈতিকতার সবচেয়ে বড় জায়গা হলো অর্থ। কালো টাকা সাদা করার সংস্কৃতি আমাদের দলে শূন্যের কোঠায়। দল গঠনের সময় অনেক জায়গা থেকে অনৈতিক প্রস্তাব এলেও আমরা তা প্রত্যাখ্যান করেছি। কোনো বড় জোটে যাওয়ার আগ্রহ আমরা দেখাইনি, কারণ জোটে গেলে এবং আর্থিক নির্ভরতা তৈরি হলে মেরুদণ্ড সোজা করে দাঁড়ানো যায় না। আমরা কথা দিয়েছিলাম আমাদের দলের অ্যাকাউন্ট পাবলিক করব, এবং আজ যে কেউ জানতে চাইলে আমরা সুস্পষ্টভাবে জানাতে পারব আমাদের ফান্ডে কত টাকা আছে এবং তার উৎস কী।
গত ৫৪ বছরে বাংলাদেশের রাজনীতিতে সৎ ও দেশপ্রেমিক নেতৃত্বের প্রচণ্ড ঘাটতি পরিলক্ষিত হয়েছে। ১৮ কোটি মানুষের এই দেশে একজন লি কুয়ান ইউ, একজন মাহাথির মোহাম্মদ বা একজন হিরোহিতোর জন্ম হলো না—এটি আমাদের জাতির দুর্ভাগ্য। বিখ্যাত বই ‘হোয়াই নেশনস ফেইল’-এ বলা হয়েছে, একটি জাতি তার ভৌগোলিক অবস্থান বা সংস্কৃতির জন্য গরিব হয় না, গরিব হয় নেতৃত্বের ব্যর্থতার কারণে। প্লেটো বলেছিলেন, “রাজনীতি না করার শাস্তি হলো নিচু এবং নিকৃষ্ট মানুষ দ্বারা শাসিত হওয়া।” আমাদের দেশে অসংখ্য পিএইচডি হোল্ডার ও শিক্ষিত মানুষ রয়েছেন, কিন্তু তারা রাজনীতিতে আসছেন না। ফলে আমরা মেধাহীন ও অসৎ মানুষ দ্বারা শাসিত হচ্ছি। আমরা এই ধারার পরিবর্তন চাই।
প্রশ্ন আসে রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব পেলে আমাদের অগ্রাধিকার কী হবে? আমি বলব, বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী হওয়া যতটা সুখবর, তার চেয়ে বেশি চ্যালেঞ্জ। আমাদের রাজনীতির লক্ষ্য কেবল নির্বাচন নয়, আমাদের লক্ষ্য পরবর্তী প্রজন্ম। আমাদের তিনটি মূল অগ্রাধিকার রয়েছে। প্রথমত, রাজনৈতিকভাবে সৎ ও সাহসী নেতৃত্ব তৈরি করা। দ্বিতীয়ত, পরবর্তী প্রজন্মের জন্য একটি বাসযোগ্য দেশ গড়ে তোলা এবং প্রতি বছর ৫ লক্ষ শিক্ষিত বেকারের কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করা। তৃতীয়ত, শিক্ষা ব্যবস্থার আমূল সংস্কার। বিশেষ করে ‘নৈতিক শিক্ষা’ বা মোরাল এডুকেশনকে আমরা সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে চাই। ১৯৫৪ সালে যুদ্ধবিধ্বস্ত দক্ষিণ কোরিয়া সম্পর্কে বলা হয়েছিল তাদের ঘুরে দাঁড়াতে ১০০ বছর লাগবে, কিন্তু ‘কোয়ালিটি এডুকেশন’-এর জোরে তারা মাত্র ২০ বছরেই ঘুরে দাঁড়িয়েছিল। বাংলাদেশে অনৈতিকতা চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছেছে। আমরা যদি নৈতিক শিক্ষা চালু করতে পারি, তবে এ দেশ ঘুরে দাঁড়াতে বাধ্য।
আসন্ন নির্বাচন প্রসঙ্গে বলতে হয়, একটি ভালো নির্বাচন হবে কি না, তা নির্ভর করছে সরকারের সদিচ্ছার ওপর। তৃণমূল পর্যায়ে কাজ করতে গিয়ে দেখেছি, ভোটারদের একটি বড় অংশ, বিশেষ করে হিন্দু সম্প্রদায় এবং সাধারণ ভোটাররা অনেকে প্রচণ্ড ভীতির মধ্যে আছেন। যারা অপরাধ করেছে, তাদের বিচার হোক—এতে আমাদের আপত্তি নেই। কিন্তু সাধারণ ভোটাররা কেন বাড়িতে ঘুমাতে পারবেন না? তাদের নামে মিথ্যা মামলা ও হামলা অব্যাহত রয়েছে। মানুষের মনে এই আতঙ্ক দূর করতে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার অনেকাংশেই ব্যর্থ হয়েছে। সরকার যদি দ্রুত এই ভয়ের সংস্কৃতি দূর করতে না পারে, তবে আগামী নির্বাচন নিয়ে প্রশ্ন থেকে যাবে।
সবশেষে বলি, আমরা ক্ষমতার জন্য আসিনি, এসেছি ইতিহাসের পাতায় একটি দৃষ্টান্ত স্থাপনের জন্য। কলম হাতে আমরা দেশের জন্য যে লড়াই শুরু করেছি, তা একটি সমৃদ্ধ, বৈষম্যহীন ও নৈতিক বাংলাদেশ গড়ার মাধ্যমেই পূর্ণতা পাবে। জনগণ যদি আমাদের ডাকে সাড়া দেয়, তবে আমরা বিশ্বাস করি, বাংলাদেশ তার কাঙ্ক্ষিত গন্তব্যে পৌঁছাবেই।
(সাক্ষাৎকার থেকে অনুলিখিত)
- শামীম কামাল: ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.), চেয়ারম্যান, জনতার দল