জানুয়ারির শেষ দিকের এক দুপুর। ঢাকার ব্যস্ত যানজটের ভেতর দিয়ে অটোরিকশা চালাতে চালাতে রুবেল চাকলাদারের কণ্ঠে ক্ষোভের চেয়ে যেন এক ধরনের অসহায়ত্বই বেশি ঝরে পড়ছিল।
৫০ বছর বয়সী রুবেল বলছিলেন, গণ-অভ্যুত্থানের মাধ্যমে শেখ হাসিনাকে হঠানোর পর বাংলাদেশিরা বিরল সুযোগ পেয়েছিল। এই সুযোগ তারা হেলায় হারিয়েছে।
ছাত্র-জনতার গণ-আন্দোলনে হাসিনার পদত্যাগের তিন দিন পর, দেশের একমাত্র নোবেলজয়ী ড. মুহাম্মদ ইউনূস অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান হিসেবে দায়িত্ব নেন। ১,৪০০-এর বেশি মানুষের প্রাণের বিনিময়ে ঘটা এক রক্তক্ষয়ী অভ্যুত্থানের পর ভেঙে পড়া একটি দেশকে স্থিতিশীল করাই ছিল তাঁর প্রধান চ্যালেঞ্জ।
এখন ৮৫ বছর বয়সী ইউনূসের। তাঁর লক্ষ্য ছিল সীমিত পরিসরে কিন্তু উচ্চাভিলাষী। আর তা হল—একটি গ্রহণযোগ্য নির্বাচন উপহার দেওয়া এবং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে ক্ষমতার ভারসাম্য এনে এমনভাবে সংস্কার করা যাতে দেশ আর কখনোই স্বৈরতন্ত্রের দিকে ফিরে না যায়।
কিন্তু রুবেল চাকলাদারের মতে, প্রশাসনের ভেতরের কায়েমী স্বার্থান্বেষী মহল আর চরম মেরুকরণে বিভক্ত রাজনৈতিক দলগুলো ড. ইউনূসকে যথেষ্ট সমর্থন দেয়নি। ফলে ১৮ মাসের শাসনামলে তিনি আরও বড় ধরনের পরিবর্তন আনতে পারেননি।
চাকলাদার আল জাজিরাকে বলেন, ‘আমরা সুযোগটা হাতছাড়া করেছি। আমরা ড. ইউনূসকে ঠিকমতো কাজ করতেই দিইনি। অযৌক্তিক দাবি নিয়ে রাস্তায় নামেনি কে নামেনি রাস্তায়? এই দেশ আর কখনোই ভালো হবে না। জুলাই মাসে মানুষ শুধু শুধুই জীবন দিল।’
এই বিষণ্ণ মূল্যায়ন এমন এক সময়ে এলো যখন ড. ইউনূস দীর্ঘ এক দশকেরও বেশি সময়ের মধ্যে প্রথম একটি অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন পরিচালনা করে ক্ষমতা ছাড়ার প্রস্তুতি নিচ্ছেন। এর মাধ্যমে দেশের ইতিহাসের অন্যতম এক ব্যতিক্রমী রাজনৈতিক উত্তরণের সমাপ্তি ঘটতে যাচ্ছে।
১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনকে সামনে রেখে ড. ইউনূসের কর্মকাণ্ড নিয়ে এখন মানুষের মধ্যে ব্যাপক তর্ক-বিতর্ক চলছে। যারা একসময় তাঁর ওপর আকাশচুম্বী আশা নিয়ে তাকিয়ে ছিল, এখন তাদের মধ্যেও নানা রকম মেরুকরণ দেখা দিচ্ছে।
এই বিতর্কের মূলে রয়েছে একটি প্রশ্ন: ড. ইউনূস কি সেই কাণ্ডারি যিনি একটি ভঙ্গুর রাষ্ট্রকে ভেঙে পড়ার হাত থেকে রক্ষা করেছেন, নাকি তিনি সেই নেতা যিনি ২০২৪-এর বিপ্লবের মূলে থাকা সেই কাঠামোগত পরিবর্তনগুলো আনতে ব্যর্থ হয়েছেন?
‘সবার কাছে গ্রহণযোগ্য’
ছাত্র আন্দোলনের নেতাদের কাছে ড. ইউনূসের বিশ্বজোড়া পরিচিতি এবং দেশের ভেতরে সুশীল সমাজের প্রতিনিধি হিসেবে তাঁর ভাবমূর্তি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ছিল। তৈরি পোশাক রপ্তানিতে শক্তিশালী অবস্থানে থাকা বাংলাদেশ অভ্যুত্থানের পর যখন চরম অর্থনৈতিক পতনের শঙ্কায় ছিল, তখন বহির্বিশ্বকে আশ্বস্ত করার জন্য তাঁর কোনো বিকল্প ছিল না।
ছাত্র আন্দোলনের অন্যতম প্রধান নেতা নাহিদ ইসলাম বলেন, ‘সেই মুহূর্তে আমাদের এমন একজনকে দরকার ছিল যিনি সবার কাছে গ্রহণযোগ্য।’ নাহিদ বর্তমানে সাবেক ছাত্র নেতাদের গড়া নতুন রাজনৈতিক দল ‘জাতীয় নাগরিক কমিটি’ (এনসিপি)-র নেতৃত্বে আছেন। আগামী সপ্তাহের নির্বাচনে এনসিপি বাংলাদেশের বৃহত্তম ইসলামপন্থী দল জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গে জোটবদ্ধ হয়ে লড়ছে।
নাহিদ আরও যোগ করেন, ‘বিকল্পের কথা যখন চিন্তা করলাম, তখন ড. ইউনূস ছাড়া আর কাউকেই আমাদের যোগ্য মনে হয়নি।’
হাসিনার পতনের কয়েক দিন আগে ইউনূসের সাথে যোগাযোগ করা আরেক ছাত্র নেতা আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়াও একই কথা বলেন। তাদের হিসাব ছিল সোজা—রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের ধস ঠেকানো এবং বৈশ্বিক অনিশ্চয়তা কাটিয়ে উঠতে একজন নৈতিক কর্তৃত্বসম্পন্ন মানুষের প্রয়োজন ছিল।
৮ আগস্ট দেশে ফেরার পর বিমানবন্দরে শিক্ষার্থীদের সঙ্গে ড. মুহাম্মদ ইউনূস। ছবি: সংগৃহীতআসিফ মাহমুদের মতে, ড. ইউনূসের নিয়োগটা যে সব রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান খুব স্বতঃস্ফূর্তভাবে মেনে নিয়েছিল, তা নয়। তিনি দাবি করেন, সে সময় ছাত্র নেতা ও কর্মকর্তাদের মধ্যকার আলোচনায় সেনাবাহিনীর ভেতরে থাকা কিছু দ্বিধাদ্বন্দ্বের কথা উঠে এসেছিল। অবশ্য আল জাজিরা স্বাধীনভাবে এই দাবির সত্যতা যাচাই করতে পারেনি। সেনাবাহিনীও ড. ইউনূসের নিয়োগ নিয়ে তাদের অভ্যন্তরীণ আলোচনার বিষয়ে প্রকাশ্যে কিছু জানায়নি। উল্লেখ্য, হাসিনার নিয়োগ দেওয়া সেনাপ্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের আমলেও নিজ পদে বহাল ছিলেন।
শোনা যায়, ড. ইউনূস নিজেও শুরুতে বেশ দ্বিধায় ছিলেন এবং বারবার বলছিলেন যে তিনি ‘রাজনৈতিক ব্যক্তি নন’। কিন্তু রাজনৈতিক বিশ্লেষক আলী রীয়াজের ভাষায়, প্রতিবাদ যখন তুঙ্গে আর লাশের মিছিল যখন দীর্ঘ হচ্ছে, তখন স্রেফ ‘দায়বদ্ধতার জায়গা থেকে’ ড. ইউনূস এগিয়ে আসেন।
আলী রীয়াজ বলেন, ‘তিনি দায়িত্ব নেওয়ার ক্ষেত্রে এক ধরনের অঙ্গীকার অনুভব করেছিলেন।’ উল্লেখ্য, ২০২৪-এর অভ্যুত্থানের অন্যতম প্রধান দাবি ‘সংবিধান সংস্কার’ কমিটির প্রধান হিসেবে আলী রীয়াজকে খোদ ড. ইউনূস বেছে নিয়েছিলেন।
তবে ১৮ মাস পর, যারা ইউনূসকে সমর্থন দিয়েছিলেন তাদের অনেকের মধ্যেই এখন এক ধরনের হতাশা আর সুযোগ হারানোর আক্ষেপ কাজ করছে।
আসিফ মাহমুদ বলেন, ‘আমরা একটা জাতীয় ঐক্যের সরকার চেয়েছিলাম। সেটা সম্ভব হয়নি। তবুও আমরা আশা করেছিলাম যে রাষ্ট্রব্যবস্থার আমূল পরিবর্তন বা খোলনলচে বদলে ফেলা হবে।’
বিচারের দাবিতে অনড়
তবে এ কথা স্বীকার করতেই হবে যে, বাংলাদেশের ইতিহাসে যেকোনো অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের মধ্যে ড. ইউনূসই সবচেয়ে বড় এবং বিতর্কিত সংস্কারের উদ্যোগ নিয়েছিলেন। নির্বাচিত সংসদ না থাকায় তাঁর প্রশাসন সাধারণ নির্বাচনের আগে সুশাসন নিশ্চিত করা, ক্ষমতার অপব্যবহারের নথিপত্র তৈরি এবং কাঠামোগত সমাধানের পথ খোঁজার জন্য বিশেষজ্ঞদের ওপর নির্ভর করেছিল।
সমর্থকরা একে দীর্ঘদিন ধরে আটকে থাকা ‘সত্য উদঘাটন’ হিসেবে দেখলেও সমালোচকরা মনে করেন, একটি অনির্বাচিত সরকার খুব অল্প সময়ে অনেক বেশি কিছু করার চেষ্টা করেছে।
ইউনূস প্রশাসন নির্বাচন, সংবিধান, বিচার বিভাগ ও পুলিশের সংস্কার এবং হাসিনা আমলে সমালোচকদের গ্রেপ্তার, বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড ও গুমের মতো মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনা তদন্তে একাধিক কমিশন গঠন করে।
হাসিনা আমলে যে বিচার বিভাগের বিরুদ্ধে নিয়মতান্ত্রিক দমনের অভিযোগ ছিল, তা এখন আরও স্বাধীন ভূমিকা পালন করতে শুরু করে। অতীতে মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগে অভিযুক্ত বেশ কয়েকজন রাজনীতিবিদ, সেনা জেনারেল, পুলিশ ও নিরাপত্তা কর্মকর্তাদের বিচারের নির্দেশ দেয় আদালত। গত বছরের শেষের দিকে মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে হাসিনার অনুপস্থিতিতেই তাকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয় এবং আরও কয়েকটি মামলায় তাকে দোষী সাব্যস্ত করা হয়। পাশাপাশি হাসিনা-ঘনিষ্ঠ আরও কয়েকজন কর্মকর্তা আইনের রোষানলে পড়েন।
ইউনূসের সবচেয়ে সংবেদনশীল উদ্যোগগুলোর একটি ছিল ২০০৯ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত হাসিনা সরকারের আমলে হওয়া ‘গুম’ এবং গোপন বন্দিশালার রহস্য উন্মোচন করা।
তাঁর গঠিত ‘গুম সংক্রান্ত তদন্ত কমিশন’ ১,৯১৩টি অভিযোগের নথি তৈরি করে। এর মধ্যে ১,৫৬৯টি ঘটনা যাচাই করা হয়েছে। তারা ২৮৭ জন ভুক্তভোগীকে নিখোঁজ বা মৃত হিসেবে চিহ্নিত করেছে এবং এসব ঘটনার অধিকাংশের দায় পুলিশ, র্যাব (যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞা পাওয়া আধাসামরিক বাহিনী) এবং সামরিক গোয়েন্দা সংস্থার ওপর চাপানো হয়েছে।
২০১৭ সালে ঢাকা থেকে অপহৃত হয়ে ৪৪ দিন পর চোখ বাঁধা অবস্থায় মহাসড়কে ফিরে আসা গবেষক মুবাশার হাসান এই কমিশনকে ইউনূসের ‘সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ কাজ’ বলে অভিহিত করেছেন।
তিনি বলেন, ‘এটি প্রমাণ করেছে যে শেখ হাসিনার আমলে অপরাধগুলো ছিল সুপরিকল্পিত।’ নিরাপত্তা বাহিনীর ভেতর থেকে বাধা আসা সত্ত্বেও হাসিনা আমলের গোপন বন্দিশালা ‘আয়নাঘর’-এর অস্তিত্ব স্বীকার করা এবং সন্দেহভাজন জায়গাগুলো পরিদর্শন করার জন্য তিনি ইউনূসকে কৃতিত্ব দেন।
তবে হাসান মনে করেন, এই কমিশনের পরিধি আরও বড় হতে পারত। যেমনটা হয়েছিল একনায়কতন্ত্র পরবর্তী আর্জেন্টিনার ‘ট্রুথ অ্যান্ড রিকনসিলিয়েশন’ কমিশনের ক্ষেত্রে। তিনি বলেন, ‘এটি সফল কিন্তু আরও বড় সফলতার সুযোগ ছিল।’
ইউনূসের অন্তর্বর্তীকালীন সরকার জাতিসংঘ মানবাধিকার দপ্তরের সঙ্গেও কাজ করেছে। জাতিসংঘ নিশ্চিত করেছে যে, ২০২৪ সালের জুলাইয়ের গণ-আন্দোলনে নিরাপত্তা বাহিনী অতিরিক্ত শক্তি প্রয়োগ করেছিল, যা গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘনের দাবিগুলোকে আন্তর্জাতিকভাবে জোরালো করেছে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষক দিলারা চৌধুরী মনে করেন, আমলাতান্ত্রিক সংস্কারের ক্ষেত্রে ইউনূসের শাসনামলে প্রত্যাশা অনুযায়ী ফল আসেনি।
তিনি আল জাজিরাকে বলেন, ‘মানুষের আশা ছিল ইউনূস নিয়মিত জনগণের ওপর খবরদারি করা জেঁকে বসা আমলাতন্ত্রের মুখোমুখি দাঁড়াবেন। কিন্তু কাঠামোগত বাধা এবং অনির্বাচিত সরকারের সীমাবদ্ধতার কারণে তিনি সেটি করতে ব্যর্থ হয়েছেন।’
সংস্কার নিয়ে গণভোট
ড. ইউনূস ১২ ফেব্রুয়ারির ভোটকে ব্যবহার করে বাংলাদেশের ইতিহাসে নজিরবিহীন কিছু করার চেষ্টা করছেন। আর তা হল গুরুত্বপূর্ণ সংস্কার প্রস্তাবগুলো নিয়ে রাজনৈতিক ঐকমত্য তৈরি করা এবং সাধারণ নির্বাচনের পাশাপাশি একটি দেশব্যাপী গণভোটের মাধ্যমে সেগুলো সরাসরি ভোটারদের সামনে পেশ করা।
ইউনূসের সমর্থকদের যুক্তি হলো, হাসিনার আমলের বিচার বিভাগের দলীয়করণ থেকে শুরু করে নিরাপত্তা বাহিনীর জবাবদিহিহীনতা যদি পরবর্তী সরকারকে উপড়ে ফেলতে হয়, তবে তাতে জনমতের সরাসরি সমর্থন প্রয়োজন।
ভোটাররা যদি এই সংস্কার প্রস্তাবগুলো অনুমোদন করেন, তবে পরবর্তী সংসদ ঠিক করবে সেগুলো কীভাবে কার্যকর করা হবে। আর যদি জনমত বিপক্ষে যায়, তবে এই সংস্কার উদ্যোগগুলো হয়তো চিরতরে ফাইলবন্দি হয়ে যাবে।
বিশ্লেষকদের মতে, এই অনিশ্চয়তাই ইউনূসের শাসনামলের মূল পরিচয়। সিডনি-ভিত্তিক রাজনৈতিক বিশ্লেষক মুবাশার হাসান বলেন, ‘বাংলাদেশ যখন পুরোপুরি ভেঙে পড়ার উপক্রম হয়েছিল, তখন তিনি হাল ধরেছিলেন। তিনি বিদায় নেওয়ার পর তাঁর যে কাজগুলো টিকে থাকবে ইতিহাস তা দিয়েই তাঁকে বিচার করবে।’
তবে দিলারা চৌধুরী ভিন্ন মত পোষণ করেন। তিনি বলেন,’তাঁর নেওয়া উদ্যোগগুলো সফল হবে কি হবে না, শুধু তা দিয়েই তাকে মাপা ঠিক হবে না। তিনি এই জাতির ইতিহাসে এক চিরস্থায়ী চরিত্র হয়ে থাকবেন।’
চলতি মাসের শেষে একটি নির্বাচিত সরকার গঠনের অপেক্ষায় থাকা রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে অবশ্য ইউনূসকে নিয়ে মতভেদ স্পষ্ট।
নির্বাচনের দৌড়ে এগিয়ে থাকা বিএনপি হাসিনার পতনের পর থেকেই দ্রুত নির্বাচনের দাবি জানিয়ে আসছিল। অনির্বাচিত একটি সরকারের দীর্ঘ মেয়াদে শাসন তারা খুব একটা পছন্দ করেনি। অন্যদিকে, এনসিপি এবং তাদের মিত্র জামায়াতে ইসলামী চেয়েছিল নির্বাচনের আগে রাষ্ট্র সংস্কারের কাজগুলো যেন আরও গভীরভাবে শেষ করা হয়।
অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান হিসেবে শপথ নিচ্ছেন ড. মুহাম্মদ ইউনূস। ছবি: সংগৃহীতবিএনপি নেতা সালাহউদ্দিন আহমেদ দেশ স্থিতিশীল করার ক্ষেত্রে ইউনূসের ভূমিকার প্রশংসা করলেও, একটি অনির্বাচিত সরকারের কতটুকু কাজ করা উচিত ছিল তা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। আল জাজিরাকে তিনি বলেন, ‘খুব অল্প সময়ে সব কাজ একবারে গুছিয়ে ফেলার একটা প্রবণতা ছিল। এগুলোর অনেক কিছুই নির্বাচিত সরকার আসার পর সংসদের মাধ্যমে সমাধান করা যেত।’
তিনি আরও বলেন, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি ‘মোটা দাগে নিয়ন্ত্রণে থাকলেও তা প্রত্যাশা অনুযায়ী ছিল না’। পাশাপাশি অন্তর্বর্তীকালীন সময়ে বিদেশি বিনিয়োগ থমকে থাকায় অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতাও ভঙ্গুর অবস্থায় ছিল।
অর্থনীতিবিদদের মতে, ইউনূসের আমলে সামষ্টিক অর্থনীতির সূচকগুলো কিছুটা স্থিতিশীল হলেও সাধারণ মানুষের কষ্ট কমেনি। বেকারত্ব, থমকে থাকা মজুরি আর মন্থর বিনিয়োগের কারণে বেসরকারি খাতের আত্মবিশ্বাস তলানিতে ছিল। এগুলো প্রবৃদ্ধি ও কর্মসংস্থান তৈরিতে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
তা সত্ত্বেও ১২ ফেব্রুয়ারি নির্বাচন দেওয়ার সিদ্ধান্তকে ইউনূসের এক ‘বিরাট সাফল্য’ হিসেবে দেখছেন বিএনপি নেতা সালাহউদ্দিন। তিনি যোগ করেন, ‘তিনি যেসব সংস্কার শুরু করেছেন, তার কতটুকু পরবর্তী সংসদ গ্রহণ বা বাস্তবায়ন করবে, সেটা এখনো বড় প্রশ্ন।’
হাসিনার পতনের পর ইউনূসের নিয়োগকে সমর্থন জানানো জামায়াতে ইসলামীও অনেকটা একই সুরে কথা বলছে। দলটির নেতা আব্দুল হালিম বলেন, ‘তিনি সংস্কার প্রক্রিয়া শুরু করেছিলেন এবং এতে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়েছে। কিন্তু সংস্কারের জন্য সময়ের প্রয়োজন। এই সরকারের সাফল্যকে সব রাজনৈতিক শক্তির সম্মিলিত প্রচেষ্টার ফল হিসেবে দেখা উচিত।’
‘অন্ধের দেশ’
যেসব ছাত্রনেতা ড. ইউনূসকে ক্ষমতায় বসাতে মূল ভূমিকা রেখেছিলেন, তাদের মূল্যায়নে শ্রদ্ধার পাশাপাশি কিছুটা হতাশাও মিশে আছে।
নাহিদ ইসলাম এক বছর আগে এনসিপি গঠনের আগে ইউনূস সরকারের তথ্য মন্ত্রণালয়ের অন্তর্বর্তীকালীন দায়িত্বে ছিলেন। তিনি বলেন যে ড. ইউনূসের উদ্দেশ্য পরিষ্কার থাকলেও রাজনৈতিক বাস্তবতা ছিল বড়ই নিষ্ঠুর। নাহিদ বলেন, ‘তিনি একটা ঐক্য গড়ার চেষ্টা করেছিলেন। কিন্তু রাজনৈতিক দর কষাকষির ক্ষেত্রে তাঁর সরকার দুর্বল ছিল।’
আসিফ মাহমুদও একই মত পোষণ করেন। তিনি বলেন, ইউনূস আন্তর্জাতিকভাবে সফল হলেও দেশের ভেতর লড়াই করতে হয়েছে তাঁকে। তিনি আল জাজিরাকে বলেন, ‘আমাদের আরও কঠোর অবস্থান নেওয়া প্রয়োজন ছিল।’
তবে সানজিদা খান দীপ্তির কাছে ড. ইউনূস চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবেন ২০২৪-এর অভ্যুত্থানের শহীদদের বিচার নিশ্চিত করার প্রচেষ্টার জন্য। ২০২৪ সালের আগস্টের শুরুতে আন্দোলনের উত্তাল সময়ে দীপ্তির ১৭ বছর বয়সী ছেলে আনাস পুলিশের গুলিতে নিহত হয়।
গত মাসে একটি আদালত ঢাকার সাবেক পুলিশ প্রধান হাবিবুর রহমানসহ আরও কয়েকজনকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছে এবং বিক্ষোভকারীদের ওপর দমন-পীড়নের দায়ে বেশ কয়েকজন পুলিশ কর্মকর্তাকে কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে।
দীপ্তি আল জাজিরাকে বলেন, ‘আমরা আমাদের সন্তানদের জীবন দিয়েছি ন্যাবিচারের আশায়।’ তিনি জোর দিয়ে বলেন যে, ইউনূসকে ইতিবাচকভাবেই মনে রাখা উচিত। তাঁর ভাষায়, ‘অন্ধের দেশে আয়নার কোনো দাম নেই। একা একজন মানুষ এত অল্প সময়ে কত কাজই বা শেষ করতে পারতেন?’
এদিকে ঢাকার সেই যানজটে ধীরগতিতে চলে বসুন্ধরা আবাসিক এলাকার কাছে নিজের অটোরিকশাটি থামালেন রুবেল চাকলাদার। পেছনে ঘুরে নিজের পরিবারের একটি গোপন কথা জানালেন—তাঁর স্ত্রী এবং মেয়ে এখনো নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের কট্টর সমর্থক। তিনি শত চেষ্টা করেও তাদের মন বদলাতে পারেননি।
আর এই কারণেই ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচন নিয়ে তার মনে খুব একটা আশা নেই।
রুবেল আল জাজিরাকে বলেন, ‘আমি তাও ভোট দেব। পরিবর্তনের আশা করি না। কিন্তু এছাড়া আর কিছুই করার নেই বলে। আমি বিশ্বাস করি না এই নির্বাচন আমার জীবনে বা দেশের ভাগ্যে খুব বড় কোনো পরিবর্তন নিয়ে আসবে।’