leadT1ad

ভারতের কংগ্রেসেও পরিবারতন্ত্র আছে, তারেক রহমান কেন নয়: আল জাজিরায় মির্জা ফখরুল

বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান প্রায় দুই দশক পর লন্ডন থেকে দেশে ফিরে নিজেকে পরিবর্তনের দূত হিসেবে তুলে ধরছেন। কিন্তু তিনি এবং বিএনপির অতীত রেকর্ড প্রশ্নবিদ্ধ। এই বিষয়গুলো নিয়েই আল জাজিরার সাংবাদিক শ্রীনিবাসন জৈন প্রশ্ন করেন বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল আলমগীরকে।

স্ট্রিম ডেস্ক
স্ট্রিম ডেস্ক

প্রকাশ : ০৫ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ১৭: ৫১
মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। ছবি: ভিডিও থেকে নেওয়া

১২ ফেব্রুয়ারির জাতীয় নির্বাচনের দিকে যাচ্ছে দেশ। ২০২৪ সালের আগস্টে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ক্ষমতাচ্যুতির পর এটিই প্রথম নির্বাচন। আওয়ামী লীগকে এই নির্বাচনে অংশ নিতে দেওয়া হচ্ছে না। এর সরাসরি সুবিধাভোগীদের একটি দল হলো বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি), যারা এখন নির্বাচনের অন্যতম প্রধান দল হিসেবে বিবেচিত।

বিএনপির শীর্ষ নেতা তারেক রহমান প্রায় দুই দশক নির্বাসনে থাকার পর লন্ডন থেকে দেশে ফিরে বিশাল সংবর্ধনা পান। কয়েকদিন পর তাঁর মা ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার জানাজাতেও একই রকম দৃশ্য দেখা যায়।

তারেক রহমান নিজেকে পরিবর্তনের দূত হিসেবে তুলে ধরছেন। কিন্তু তিনি এবং বিএনপির অতীত রেকর্ড প্রশ্নবিদ্ধ। এই বিষয়গুলো নিয়েই আল জাজিরার সাংবাদিক শ্রীনিবাসন জৈন প্রশ্ন করেন বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল আলমগীরকে।

আল জাজিরা: আমাদের সঙ্গে কথা বলার জন্য ধন্যবাদ। লাখো বাংলাদেশি যারা আওয়ামী লীগকে ক্ষমতা থেকে সরিয়েছে, তারা চায় দুর্নীতি শেষ হোক, রাজনৈতিক সহিংসতা বন্ধ হোক, রাজনীতিতে পরিবারতন্ত্রের অবসান হোক। যদি বিএনপি জেতে এবং তারেক রহমান প্রধানমন্ত্রী হন, তিনি কীভাবে এই পরিবর্তন আনবেন?

মির্জা ফখরুল: তারেক রহমান ইতিমধ্যেই জাতির সামনে তাঁর পরিকল্পনা তুলে ধরেছেন। আপনি নিশ্চয়ই দেখেছেন, তিনি লন্ডন থেকে ফিরে আসার দিন বিমানবন্দর ও রাস্তায় হাজার হাজার মানুষ ছিল। সেদিন তিনি স্পষ্টভাবে বলেছিলেন, তিনি পরিবর্তন আনবেন। বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ নিয়ে তাঁর একটি সুস্পষ্ট পরিকল্পনা আছে।

আল জাজিরা: কিন্তু দুর্নীতিমুক্ত রাজনীতির কথা বললে প্রশ্ন আসে, এক সময় তারেক রহমানের বিরুদ্ধে ৮০টিরও বেশি মামলা ছিল, বেশিরভাগই দুর্নীতির অভিযোগ। এই কারণেই তিনি প্রায় দুই দশক দেশের বাইরে ছিলেন। এটা কি পরিবর্তনের প্রতীক হতে পারে?

মির্জা ফখরুল: যদি খুব সোজাসাপ্টা করে বলি, এই সব মামলা করেছে ফ্যাসিস্ট শেখ হাসিনার সরকার। সব মামলাই রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত ছিল। অনেক মামলার তদন্ত হয়েছে, বিচার হয়েছে। কিন্তু একটিও অভিযোগ প্রমাণিত হয়নি।

আল জাজিরার সাংবাদিক শ্রীনিবাসন জৈনকে সাক্ষাৎকার দিয়েছেন মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। ছবি: ভিডিও থেকে নেওয়া
আল জাজিরার সাংবাদিক শ্রীনিবাসন জৈনকে সাক্ষাৎকার দিয়েছেন মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। ছবি: ভিডিও থেকে নেওয়া

আল জাজিরা: কিন্তু সরকার পরিবর্তনের ছয় মাসের মধ্যেই সব মামলা উঠে গেল। এটা কি আইনি নির্দোষ প্রমাণ, নাকি রাজনৈতিকভাবে দায়মুক্তি?

মির্জা ফখরুল: আপনি ভুল বলছেন। ১৫ বছর ধরে তদন্ত হয়েছে, কিন্তু কিছুই পাওয়া যায়নি। যখন কিছুই পাওয়া যায়নি, তখনই মামলা বন্ধ হয়েছে। এটাই প্রমাণ করে যে তিনি দুর্নীতিতে জড়িত ছিলেন না।

আল জাজিরা: কিন্তু অন্তত দুটি মামলায় এফবিআই তদন্তকারী সাক্ষ্য দিয়েছিলেন। তারা বলেছিলেন, ঘুষ নেওয়ার প্রমাণ পাওয়া গেছে।

মির্জা ফখরুল: আমরা সেটাও বিশ্বাস করি না। এফবিআই হোক বা অন্য কোনো সংস্থা—আমরা সেগুলোকে নিরপেক্ষ মনে করি না।

আল জাজিরা: তাহলে এফবিআই, জাতিসংঘ, মানবাধিকার সংস্থা—সবাই পক্ষপাতদুষ্ট?

মির্জা ফখরুল: হ্যাঁ, অবশ্যই। আমরা ১৫ বছর জেল খেটেছি, নির্যাতিত হয়েছি। আমরা জানি কীভাবে ষড়যন্ত্র হয়েছে।

আল জাজিরা: এই মুহূর্তে বিএনপির তৃণমূল কর্মীদের বিরুদ্ধে চাঁদাবাজি, ধর্ষণ, হত্যার অভিযোগ রয়েছে। ডেইলি স্টারে রিপোর্ট হয়েছে।

মির্জা ফখরুল: এসব রাজনৈতিকভাবে সাজানো অভিযোগ। আমাদের মানুষের জমি, দোকান ১৫ বছর দখল করে রাখা হয়েছিল। সেগুলো ফেরত নেওয়ার পর এসব মামলা করা হচ্ছে।

আল জাজিরা: তাহলে চাঁদাবাজি হচ্ছে না?

মির্জা ফখরুল: আমি বলছি না একেবারেই হয় না। ক্ষমতা বদলের সময় কিছু ঘটনা ঘটে—সব দেশেই হয়।

আল জাজিরা: নিঃসন্দেহে আপনার দল অনেক কষ্ট সহ্য করেছে। কিন্তু তাই বলে এটা তো নিশ্চিত হয় না যে দল পুরোনো অভ্যাসে ফিরে যাবে না।

মির্জা ফখরুল: কারণ দলটা অনেক কষ্টের মধ্য দিয়ে গেছে। গত ১৫ বছর দল ভীষণভাবে নির্যাতিত হয়েছে। এখন নতুন নেতৃত্ব এসেছে। তারেক রহমান এখানে নতুন নেতা হিসেবে উঠে এসেছেন এবং তিনি ইতিমধ্যেই জনগণের কাছে গ্রহণযোগ্য হয়েছেন।

আল জাজিরা: ঠিক সেখানেই প্রশ্নটা আসে। আপনি বলছেন তিনি নতুন নেতা হিসেবে উঠে এসেছেন। কিন্তু এতে পরিবারতন্ত্রের অভিযোগও উঠে আসে। কারণ তারেক রহমান তাঁর মা, প্রয়াত বেগম খালেদা জিয়ার কাছ থেকেই বিএনপির নেতৃত্ব নিয়েছেন। যদিও দলই তাঁকে দিয়েছে। কিন্তু এটা কি বাংলাদেশের সেই পুরোনো ধারার মধ্যেই পড়ে না, যেখানে দুটো পরিবারই সব ক্ষমতা ধরে রাখে—একদিকে আওয়ামী লীগ, অন্যদিকে বিএনপি?

মির্জা ফখরুল: আমি খুব খোলাখুলি বলি। ভারতের কংগ্রেসেও একই জিনিস হয়। পুরো উপমহাদেশেই এমনটা দেখা যায়। আমি একটা বিষয় বুঝি না, যদি একজন মানুষ রাজনৈতিক দলকে নেতৃত্ব দেওয়ার যোগ্য হন, তাহলে শুধুমাত্র এই কারণে যে তিনি দলের নেতার সন্তান, তাঁকে কেন নেতৃত্ব দেওয়া যাবে না? এটা কোনো যুক্তি হতে পারে না। তারেক রহমান দলের নেতৃত্ব দেওয়ার জন্য পুরোপুরি সক্ষম। আর পুরো দলই চায় যে তারেক রহমান দলের চেয়ারম্যান হন।

আল জাজিরা: কিন্তু ব্যাপারটা এমন নয় যে দলে আর কোনো যোগ্য নেতা নেই। ধরুন, আপনার কথাই বলি। আপনি নিজে এই দুই দশক বাংলাদেশেই ছিলেন। আপনি মাঠে ছিলেন, আন্দোলনে ছিলেন, দলকে নেতৃত্ব দিয়েছেন, সব চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হয়েছেন। তাহলে আপনি কেন বিএনপির নেতা হলেন না?

মির্জা ফখরুল: আমাদের নেতা তারেক রহমান। তিনি নির্বাসনে থেকেও আমাদের নির্দেশনা দিয়েছেন। আমরা সবসময় তাঁর সঙ্গে যোগাযোগে ছিলাম।

আল জাজিরা: এটা আমার প্রশ্নের উত্তর নয়।

মির্জা ফখরুল: না, আমি উত্তর দিচ্ছি।

আল জাজিরা: আমার প্রশ্ন হলো, আপনি কেন নন?

মির্জা ফখরুল: আমার নেতা তারেক রহমান। আমি তাঁকে নেতা হিসেবে মেনে নিয়েছি। তিনি সবচেয়ে যোগ্য মানুষ। বাস্তবে আমি দলকে এমনভাবে নিয়ন্ত্রণ বা পরিচালনা করতে পারব না।

আল জাজিরা: কিন্তু এটিই তো আসলে নেপোটিজমের সংজ্ঞা, তাই না? আর মানুষ কি আসলে বাংলাদেশে এটিই চায়?

মির্জা ফখরুল: দুঃখের সঙ্গে বলছি, আপনি যেভাবে প্রশ্নটা তুলছেন, সেটা পুরোপুরি পক্ষপাতদুষ্ট। আমার মনে হচ্ছে আপনি ইচ্ছাকৃতভাবে তারেক রহমান এবং বিএনপিকে অপমান বা হেয় করতে চাইছেন। এটা মোটেও ন্যায্য নয়।

আল জাজিরা: না, না। আমি অপমান করছি না। আমি প্রশ্ন করছি। কারণ আমার ধারণা ছিল মানুষ পরিবারতন্ত্র থেকে বেরিয়ে আসতে চায়।

মির্জা ফখরুল: সেই পরিবর্তন অন্য দিকে হবে। মানুষ সেই পরিবর্তনের পক্ষেই ভোট দেবে।

আল জাজিরা: তারেক রহমান বলেছেন—বাংলাদেশ মুসলমান, হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিস্টান সবার। কিন্তু বিএনপির সেক্যুলারিজম রেকর্ড ভালো নয়।

মির্জা ফখরুল: বিএনপিই সংখ্যালঘুদের সবচেয়ে ভালো সুরক্ষা দিয়েছে।

আল জাজিরার সাংবাদিক শ্রীনিবাসন জৈনকে সাক্ষাৎকার দিচ্ছেন মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। ছবি: ভিডিও থেকে নেওয়া
আল জাজিরার সাংবাদিক শ্রীনিবাসন জৈনকে সাক্ষাৎকার দিচ্ছেন মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। ছবি: ভিডিও থেকে নেওয়া

আল জাজিরা: আপনি যদি ইতিহাসের দিকে তাকান, তাহলে দেখবেন—সাবেক রাষ্ট্রপতি জেনারেল জিয়াউর রহমান ১৯৭৭ সালে বাংলাদেশের সংবিধান থেকে ‘ধর্মনিরপেক্ষতা’ শব্দটি বাদ দিয়েছিলেন।

মির্জা ফখরুল: হ্যাঁ। ঠিক আছে। কারণ তখন ওই দলের দর্শনই ছিল এমন। তাই ধর্মনিরপেক্ষতা আমাদের লক্ষ্য নয়।

আল জাজিরা: ধর্মনিরপেক্ষতা আপনাদের লক্ষ্য নয়?

মির্জা ফখরুল: না, এটা আমাদের লক্ষ্য নয়। আমি আপনাকে খুব খোলাখুলি বলছি—আমাদের লক্ষ্য হলো সব ধর্মের, সব বিশ্বাসের মানুষের অধিকার নিশ্চিত করা। এখানে সব সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের সমান অধিকার থাকবে। হিন্দু, খ্রিস্টান বা মুসলমান—সবাই সমান অধিকার পাবে।

আল জাজিরা: কিন্তু তবুও পরিষ্কার নয় কেন তিনি তখন ওই শব্দটি বাদ দিয়েছিলেন? কারণ অনেকেই বলেন, ধর্মনিরপেক্ষতাই আসলে সবার ধর্ম পালনের স্বাধীনতা নিশ্চিত করে।

মির্জা ফখরুল: না, না, না। আপনি একেবারেই ভুল ব্যাখ্যা দিচ্ছেন। ‘ধর্মনিরপেক্ষতা’ শব্দটি মোটেও বাংলাদেশের নীতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।

আল জাজিরা: আওয়ামী লীগকে নিষিদ্ধ করে নির্বাচন—এটা কি গণতান্ত্রিক?

মির্জা ফখরুল: আমি ব্যক্তিগতভাবে কোনো দল নিষিদ্ধের পক্ষে নই। জামায়াতে ইসলামীকে আওয়ামী লীগ যখন নিষিদ্ধ করেছিল, আমি প্রতিবাদ করেছিলাম। তবে দোষী ব্যক্তিদের বিচার হওয়া উচিত।

আল জাজিরা: ভারত শেখ হাসিনাকে ফেরত দিচ্ছে না। বিএনপি ক্ষমতায় এলে কী করবে?

মির্জা ফখরুল: আমরা কূটনৈতিকভাবে চেষ্টা করব। আন্তর্জাতিক মহলেও বিষয়টি তুলব।

আল জাজিরা: কিন্তু তারেক রহমানও তো বিদেশে নিরাপদে ছিলেন।

মির্জা ফখরুল: দুটো এক নয়। পুরো বিশ্ব দেখেছে ২০২৪ সালে শেখ হাসিনা কী করেছে।

আল জাজিরা: দুই দশক বাইরে থাকা একজন নেতা—তারেক রহমান কি এই কঠিন সময়ে দেশ চালাতে পারবেন?

মির্জা ফখরুল: অবশ্যই পারবেন। তিনি সব সময় দলের সঙ্গে যোগাযোগে ছিলেন। তার অভিজ্ঞতা আছে।

আল জাজিরা: ধন্যবাদ, সময় দেওয়ার জন্য।

আল জাজিরার ভিডিও সাক্ষাৎকার থেকে অনুবাদ করেছেন আব্দুর রহমান খান সার্জিল

সর্বাধিক পঠিত
এই মুহূর্তে
Ad 300x250

সম্পর্কিত