২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের গণঅভ্যুত্থান-পরবর্তী বাংলাদেশে রাষ্ট্রকাঠামো পুনর্গঠনের যে গণআকাঙ্ক্ষা তৈরি হয়েছে, তার একটি পলিসি-নির্ভর প্রতিফলন ঘটেছে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) ২০২৬ সালের নির্বাচনী ইশতেহারে। প্রকাশিত ইশতেহারে দলটি চিরাচরিত রাজনৈতিক স্লোগানের খোলস ভেঙে বেশকিছু আধুনিক ও কাঠামোগত পরিভাষা ব্যবহার করেছে। ‘রাষ্ট্র মেরামত’, ‘ট্রুথ অ্যান্ড হিলিং’ কিংবা ‘সৃজনশীল অর্থনীতি’র মতো শব্দবন্ধের ব্যবহার দলটির রাজনৈতিক দর্শনে গুণগত পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিলেও, এর বাস্তবায়ন নিয়ে রাজনৈতিক মহলে নানামুখী প্রশ্ন ও বিশ্লেষণ রয়েছে।
রাজনৈতিক দর্শন ও ‘রাষ্ট্র মেরামত’: কতটা সম্ভব
বিএনপির ইশতেহারে সবচেয়ে শক্তিশালী রাজনৈতিক দর্শন হিসেবে যে পরিভাষাটি বারবার উঠে এসেছে, তা হলো ‘রাষ্ট্র মেরামত’। দলটির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের ‘৩১ দফা’ এবং ‘জুলাই জাতীয় সনদ’-এর ভিত্তিতে তারা এই মেরামত প্রক্রিয়ার কথা বলছে। তবে সমালোচকদের মতে, দীর্ঘদিনের দলীয়করণের শিকার রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে কেবল ইশতেহারের ভাষা দিয়ে মেরামত করা সম্ভব নয়। এই ‘মেরামত’ কি রাজনৈতিক সদিচ্ছার প্রতিফলন হবে, নাকি এটি কেবলই ভোটার টানার কৌশল—সেটি একটি বড় প্রশ্ন।
জাতীয় নিরাময় ও প্রশাসনিক আধুনিকায়ন
ইশতেহারের সবচেয়ে ব্যতিক্রমী শব্দটি হলো ‘ট্রুথ অ্যান্ড হিলিং কমিশন’। গত দেড় দশকের রাজনৈতিক প্রতিহিংসা ও বিভাজন দূর করতে দক্ষিণ আফ্রিকার আদলে এই ‘হিলিং’ বা নিরাময় প্রক্রিয়ার ধারণাটি একটি বড় ‘প্যারাডাইম শিফট’। তবে বাংলাদেশের মেরুকরণ হওয়া রাজনীতিতে এই কমিশন কতটা নিরপেক্ষভাবে কাজ করতে পারবে, তা নিয়ে যথেষ্ট সংশয় রয়েছে। কারণ, অতীতে এই ধরনের কমিশনগুলো অনেক সময় রাজনৈতিক প্রতিহিংসার হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে। এছাড়া ‘রিয়েল-টাইম অডিট’-এর মতো আধুনিক পরিভাষাগুলো শুনতে ভালো শোনালেও, বাংলাদেশের সনাতন আমলাতান্ত্রিক কাঠামো এই ডিজিটাল রূপান্তর কত দ্রুত গ্রহণ করবে, তা নিয়ে বড় চ্যালেঞ্জ রয়ে গেছে।
অর্থনীতির গণতন্ত্রায়ণ ও অলিগার্কি মুক্তি
অর্থনৈতিক পরিকল্পনায় বিএনপি ‘অর্থনীতির গণতন্ত্রায়ণ’ নামক একটি সুদূরপ্রসারী শব্দ ব্যবহার করেছে। এর মাধ্যমে তারা মুষ্টিমেয় অলিগার্ক বা সিন্ডিকেটের হাত থেকে অর্থনীতিকে মুক্ত করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। দলটির লক্ষ্য ২০৩৪ সালের মধ্যে বাংলাদেশকে একটি ‘ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতি’-তে রূপান্তর করা। এই লক্ষ্য অর্জনে তারা ‘ব্লু ইকোনমি’ ও ‘ক্রিয়েটিভ ইকোনমি’র কথা বলেছে। তবে বাস্তবতা হলো, গত কয়েক দশকে গড়ে ওঠা শক্তিশালী আর্থিক সিন্ডিকেট ভাঙা যেকোনো সরকারের জন্য কঠিন পরীক্ষা।
ইশতেহারের সবচেয়ে ব্যতিক্রমী শব্দটি হলো ‘ট্রুথ অ্যান্ড হিলিং কমিশন’। গত দেড় দশকের রাজনৈতিক প্রতিহিংসা ও বিভাজন দূর করতে দক্ষিণ আফ্রিকার আদলে এই ‘হিলিং’ বা নিরাময় প্রক্রিয়ার ধারণাটি একটি বড় ‘প্যারাডাইম শিফট’। তবে বাংলাদেশের মেরুকরণ হওয়া রাজনীতিতে এই কমিশন কতটা নিরপেক্ষভাবে কাজ করতে পারবে, তা নিয়ে যথেষ্ট সংশয় রয়েছে।
এছাড়া ভেঞ্চার ক্যাপিটাল বা স্টার্ট-আপ ফান্ডের মতো উচ্চাভিলাষী প্রজেক্টগুলোর জন্য যে ব্যাংকিং সংস্কার প্রয়োজন, তার সুনির্দিষ্ট রূপরেখা এখানে আরও স্পষ্ট হওয়া প্রয়োজন ছিল।
সামাজিক নিরাপত্তা ও স্বাস্থ্যসেবায় ডিজিটালাইজেশন
সামাজিক নিরাপত্তা খাতে বিএনপি ‘ফ্যামিলি কার্ড’ এবং ‘কৃষক কার্ড’-এর মতো ডিজিটাল পরিভাষা ব্যবহার করেছে। স্বাস্থ্যখাতে জিডিপির ৫ শতাংশ বরাদ্দের পাশাপাশি ‘হেলথ কার্ড’ চালু করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। কিন্তু প্রশ্ন উঠেছে অর্থায়ন নিয়ে। বর্তমান অর্থনৈতিক সংকট এবং উচ্চ মূল্যস্ফীতির বাজারে জিডিপির ৫ শতাংশ স্বাস্থ্যখাতে বরাদ্দ করা কতটা বাস্তবসম্মত, তা নিয়ে অর্থনীতিবিদদের মধ্যে বিতর্ক রয়েছে।
পরিবেশ ও কর্মসংস্থানের আধুনিক ভাষা
নারীর ক্ষমতায়নে ‘পিংক বাস’ এবং পরিবেশ রক্ষায় ‘সার্কুলার ফিউচার মডেল’ বা ‘থ্রি-আর নীতি’ (রিডিউস, রিইউজ ও রিসাইকেল)-এর মতো বৈজ্ঞানিক পরিভাষা ব্যবহারের মাধ্যমে বিএনপি মূলত তরুণ ও সচেতন ভোটারদের বার্তা দিতে চেয়েছে। তরুণ প্রজন্মের কর্মসংস্থানে ‘গিগ ইকোনমি’ বা ‘ফ্রিল্যান্সিং’-কে প্রাধান্য দেওয়া হয়েছে। কিন্তু ফ্রিল্যান্সিং খাতের জন্য প্রয়োজনীয় নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ এবং ইন্টারনেটের নিশ্চয়তা দেওয়ার ক্ষেত্রে দলটির অতীত রেকর্ড ও বর্তমান পরিকল্পনা নিয়ে আলোচনার অবকাশ রয়েছে।
আন্তর্জাতিক সম্পর্ক ও পররাষ্ট্রনীতি
আন্তর্জাতিক বিশ্বের সাথে তাল মেলাতে তাদের পররাষ্ট্রনীতির মূলমন্ত্র— ‘সবার আগে বাংলাদেশ’। এখানে ‘কানেক্টিভিটি মাস্টারপ্ল্যান’-এর মাধ্যমে আঞ্চলিক যোগাযোগ বৃদ্ধির কথা বলা হয়েছে। ভূ-রাজনৈতিক জটিলতায় ভারসাম্য রক্ষা করে এই ‘মাস্টারপ্ল্যান’ কার্যকর করা হবে দলটির জন্য একটি বড় কূটনৈতিক পরীক্ষা।
শব্দচয়ন বনাম বাস্তবায়ন
বিএনপির ২০২৬ সালের ইশতেহার বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, এটি অনেক বেশি গবেষণা ও আধুনিক চিন্তার বহিঃপ্রকাশ। ‘ইনসাফ-ভিত্তিক’ সমাজ থেকে শুরু করে ‘জাস্ট ট্রানজিশন ফ্রেমওয়ার্ক’— এসব নতুন পরিভাষা প্রমাণ করে যে, দলটি রাষ্ট্র পরিচালনায় একটি গুণগত পরিবর্তনের প্রস্তুতি নিচ্ছে। তবে সাধারণ মানুষের অভিজ্ঞতা বলে, ইশতেহারের বাহারি শব্দ আর মাঠের রাজনীতির বাস্তবতার মধ্যে আকাশ-পাতাল ব্যবধান থাকে। এই আধুনিক পরিভাষাগুলো কেবলই শব্দের কারসাজি হয়ে থাকবে, নাকি আগামীর বাংলাদেশ গঠনে প্রকৃত কোনো পথ দেখাতে পারবে—তা নির্ভর করবে দলটির রাজনৈতিক সদিচ্ছা এবং জনগণের আস্থার ওপর।