মতামত

বিহার থেকে পশ্চিমবঙ্গ: এসআইআরের গোলকধাঁধায় ভারতীয় নাগরিকত্ব

ভারতের পশ্চিমবঙ্গের বিধানসভা নির্বাচন নিয়ে স্ট্রিমে ধারাবাহিক বিশ্লেষণ লিখছেন ভারতীয় লেখক ও গবেষক মীর রাকেশ রৌশান। আজ ছাপা হলো দ্বিতীয় পর্ব।

মীর রাকেশ রৌশান
মীর রাকেশ রৌশান

স্ট্রিম গ্রাফিক

ভারতে এসআইআরের প্রথম পরীক্ষাগার বিহার। সেখানে নারী, আদিবাসী, দলিত ও মুসলিম সম্প্রদায়ের ওপর কোপ পড়েছে। এমনকি সেখান থেকেই রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশের বিদ্বেষ এসে পশ্চিমবঙ্গে প্রবেশ করেছে। যদিও পশ্চিমবঙ্গের ডিজিটাল মিডিয়া এবং প্রিন্ট মিডিয়া মিথ্যা প্রচার করে সত্যটাকে ঢেকে রেখেছিল। কারণ সত্য এই যে, বাংলাদেশি অনুপ্রবেশ বলুন বা রোহিঙ্গা সেই সংখ্যা সব মিলিয়ে তিন অঙ্কের সংখ্যায় পৌঁছায়নি। কিন্তু মিথ্যাচার থেমে থাকেনি।

বিহারে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে সমাজের পিছিয়ে পড়া নিম্নবর্গের খেটে খাওয়া মানুষ। ফলে পশ্চিমবঙ্গের মিডিয়াগুলোও ক্যামেরা হাতে বেরিয়ে পড়ল শহরের বস্তি অঞ্চলে এবং সীমান্তবর্তী গ্রামগুলোতে মিথ্যা প্রচার করতে। মিথ্যা প্রচার করতে করতে তারা মিথ্যার পাহাড় তৈরি করে ফেলল; যা একটা সাদা মনে প্রতিনিয়ত দেখলে ঘৃণা ও বিদ্বেষ তৈরি হবেই। হতাশা, আতঙ্কে প্রচুর মানুষ আত্মহত্যা করতে শুরু করল। এর দায় কার? এই পরিবারগুলো কী পরিস্থিতির মধ্যে দিন কাটিয়েছেন, তা কি আমরা জানি?

ক্যামেরা হাতে নিয়ে একটা ডিজিটাল মিডিয়ার নাগরিকত্ব যাচাই বা দেশের ভোটার কি না, তা যাচাই করার অধিকার কি আছে? দেশের গদি মিডিয়াগুলো যেন সমস্ত ক্ষমতার অধিকারী। দেশের আইন, বিচার, শাসন বিভাগ যেন তাদের হাতেই আছে। প্রসঙ্গত বলে রাখা জরুরি, দেশের বেশির ভাগ মিডিয়া এখন আদানি-আম্বানির হাতে। ফলে তাদের নিয়ে নতুন করে আলোচনা করার দরকার নেই। তারা মূলত হিন্দু-হিন্দি-হিন্দুস্থানীদের দালাল। বাঙালিদের মধ্যে বিভাজন তৈরি করার উদ্দেশ্যেই রিপাবলিক বাংলার মতো সংবাদ মাধ্যম তৈরি হয়েছে। পশ্চিমবঙ্গের সংখ্যাগরিষ্ঠের মধ্যে তারা প্রচার শুরু করে ঘুষপেটিয়া, রোহিঙ্গা তত্ত্ব।

থাক সে কথা। পশ্চিমবঙ্গে সমস্ত বিএলওদের ট্রেনিং দেওয়ার পর তাঁদের নিজ নিজ ভোট কেন্দ্রের ২০২৫ সালের তালিকা ধরিয়ে দেওয়া হলো। তাদেরকে অলিখিত নির্দেশ দেওয়া হলো, ভোটারদের বাড়ি বাড়ি না গিয়ে নিজ বাড়িতে প্রতিটি পরিবারের ফ্যামিলি ট্রি ম্যাপিং করতে। এখানে একক হিসেবে ধরা হলো ২০০২ সালের ভোটার লিস্ট। অর্থাৎ প্রতিটি বিএলওকে একটি করে নিজ বুথের ২০২৫ সালের ভোটার লিস্ট এবং একটি করে ২০০২ সালের ভোটার লিস্ট ধরিয়ে দিয়ে ফ্যামিলি ট্রি করতে বলা হলো। এক্ষেত্রে তিনটি পদ্ধতির কথা বলা হয়েছিল।

বিহারে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে সমাজের পিছিয়ে পড়া নিম্নবর্গের খেটে খাওয়া মানুষ। ফলে পশ্চিমবঙ্গের মিডিয়াগুলোও ক্যামেরা হাতে বেরিয়ে পড়ল শহরের বস্তি অঞ্চলে এবং সীমান্তবর্তী গ্রামগুলোতে মিথ্যা প্রচার করতে। মিথ্যা প্রচার করতে করতে তারা মিথ্যার পাহাড় তৈরি করে ফেলল; যা একটা সাদা মনে প্রতিনিয়ত দেখলে ঘৃণা ও বিদ্বেষ তৈরি হবেই।

১. সেলফ ম্যাপিং: যে ব্যক্তির সরাসরি ২০০২ সালের ভোটার লিস্টে নাম আছে, তারা সেলফ ম্যাপিং।

২. প্রোজেনি ম্যাপিং: যাদের নাম ২০০২ সালে নেই কিন্তু বাবা, মা, দাদু, দিদা, ঠাকুমা, ঠাকুরদার নাম আছে, তারা প্রোজেনি ম্যাপিং।

৩. নো ম্যাপিং: ২০০২ সালে যাদের কারোর নাম নেই। এমনকি দাদা, দিদি, কাকা, কাকি, মা, মাসি হলেও সে নো ম্যাপিং পর্যায়ে পড়বে।

বাকি কোনো বিষয়ে প্রান্তিক স্তরে কাজ করা বিএলওরা কিছুই জানত না। তাদের কোনো কিছুই জানানো হয়নি। বিএলওদের বিক্ষোভ, সমাবেশ, আন্দোলনে বারবার এই কথা উঠে এসছে। এই ম্যাপিং জমা দেওয়ার সময়সীমা ছিল অত্যন্ত কম। একদিকে তাদের স্কুল ডিউটি, অন্য দিকে এই কাজ বিএলওদের জর্জরিত করে তোলে।

ফ্যামিলি ট্রি ম্যাপিং যেহেতু বাড়িতে বসেই বিএলরা করেছিল, ফলে সেই কাজ বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই অসম্পূর্ণ ছিল। বিএলওরা বিভিন্ন সময় দাবি করেন, সেই ম্যাপিংয়ের কাজগুলো নির্বাচন কমিশন করেন এআই দিয়ে। ফলে এই ভুলে ভরা ম্যাপিং নিয়েই বিএলদের কাজ করতে হয়। প্রিন্ট কপিতে যে ভোটার নাম আছে সেই ভোটারকে বিএলও অ্যাপে ম্যাপিং করতে গিয়ে খুঁজে পাওয়া যায়নি। ফলে তাদের নো ম্যাপিংয়ে রাখতে বাধ্য হয়েছে।

এসআইআরের প্রাথমিক কাজ শেষ হওয়ার পর বিএলওরা পরের ট্রেনিং করে এবং নির্বাচন কমিশন প্রতিটি বিএলওদের জন্য তাদের প্রতিটি বুথের জন্য প্রতিটি ভোটারের জন্য দুটি করে এনুমারেশন ফর্ম এবং একটি করে গাইড লাইনের কপি দেওয়া হয়। গাইড লাইন কপিটা আসলে এসআইআর ঘোষণাপত্র; যেখানে ১৩টি প্রমাণ পত্রের কথা বলা হয়েছে।

সম্পর্কিত