leadT1ad

আইএমএফ নির্ভরতা কি বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ দুর্বল করছে

প্রকাশ : ০৯ জানুয়ারি ২০২৬, ১২: ১২
কারও কাছে আইএমএফ অপরিহার্য, আবার কারও কাছে তা দেশের স্বার্থের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ। স্ট্রিম গ্রাফিক

বাংলাদেশের অর্থনীতি এখন এমন এক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছে, যেখানে দ্রুত অগ্রগতির আকাঙ্ক্ষার পাশাপাশি বৈদেশিক ঋণনির্ভরতা ও বৈশ্বিক অস্থিরতার চাপ একসঙ্গে কাজ করছে। এই বাস্তবতায় আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল গুরুত্বপূর্ণ এক ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছে। একদিকে তারা আর্থিক সহায়তার উৎস, অন্যদিকে কঠোর শর্ত আরোপকারী নীতিনির্ধারক। কারও কাছে আইএমএফ অপরিহার্য, আবার কারও কাছে তা দেশের স্বার্থের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ। বাস্তবতা হলো, সত্যটি এই দুই অবস্থানের মাঝামাঝি।

২০২৩ সালে বাংলাদেশ আইএমএফ থেকে প্রায় ৪ দশমিক ৭ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের ঋণ গ্রহণ করে। এই ঋণের লক্ষ্য ছিল বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ স্থিতিশীল করা, বাজেট ঘাটতি নিয়ন্ত্রণ, আর্থিক খাতে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনা এবং বিনিয়োগকারীদের আস্থা পুনরুদ্ধার করা। কোভিড-পরবর্তী ধাক্কা, জ্বালানি সংকট এবং রাশিয়া–ইউক্রেন যুদ্ধের প্রভাবে তখন দেশের অর্থনীতি চাপে ছিল। ডলার বাজারের অস্থিরতা, আমদানিতে বাধা, উচ্চ মুদ্রাস্ফীতি ও অনিয়মিত রেমিট্যান্স প্রবাহ পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তোলে। এই প্রেক্ষাপটেই আইএমএফ সহায়তার প্রতিশ্রুতি নিয়ে আসে, যা কেবল অর্থ নয়, বরং নীতিগত সংস্কারের দিকনির্দেশনাও বহন করে।

আইএমএফ মূলত চায় অর্থনীতিতে স্থিতিশীলতা। তারা মনে করে, ভর্তুকি কমাতে হবে, করজাল বাড়াতে হবে, মুদ্রানীতি বাজারভিত্তিক করতে হবে, বিনিময় হার বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্য রাখতে হবে এবং রাষ্ট্রীয় ব্যয়ে শৃঙ্খলা আনতে হবে। তাদের মতে, এই নীতিগুলো মানলে দেশের অর্থনীতি টেকসই পথে চলবে। আসলে বিশ্বব্যাপী আইএমএফ একই মডেল অনুসরণ করে, যেখানে আগে হিসাবের শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠা করা হয় এবং পরে মানুষের কল্যাণের দিকে নজর দেওয়া হয়।

এই পর্যায়েই বাংলাদেশের বাস্তব অবস্থার সঙ্গে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের তত্ত্বের স্পষ্ট সংঘাত দেখা দেয়। বাংলাদেশের অর্থনীতি প্রধানত শ্রমভিত্তিক, আমদানিনির্ভর এবং ক্ষুদ্র ও মাঝারি ব্যবসাকেন্দ্রিক। দেশের মানুষের জীবিকা অনেকাংশে ছোট ব্যবসা, কৃষি খাত ও প্রবাসী আয়ের ওপর দাঁড়িয়ে আছে। এই প্রতিষ্ঠানের শর্ত অনুযায়ী যখন জ্বালানি খাতে ভর্তুকি হ্রাস করা হয়, তখন গ্যাস ও বিদ্যুতের মূল্য বৃদ্ধি পায়। এর ফলে শিল্প খাতে উৎপাদন ব্যয় বেড়ে যায়, ক্ষুদ্র উদ্যোক্তারা আর্থিক চাপে পড়ে এবং কৃষকদের ব্যয়ও বৃদ্ধি পায়। এর সামগ্রিক পরিণতিতে বাজারে পণ্যমূল্য ঊর্ধ্বমুখী হয়, কর্মসংস্থানের সুযোগ কমে আসে এবং সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতা হ্রাস পায়।

অনেক বিশেষজ্ঞ মনে করেন, আইএমএফের সংস্কার নীতি মানবিক হলে তা দেশের জন্য আশীর্বাদ হতে পারে, কিন্তু যান্ত্রিকভাবে প্রয়োগ করলে তা মানুষের কষ্ট বাড়ায়। সংস্কার মানে শুধু কাটছাঁট নয়, বরং কৃষি ও খাদ্য নিরাপত্তার মতো সংবেদনশীল খাতে সহায়তা বজায় রেখে ভারসাম্য রক্ষা করা

তবুও আইএমএফের কিছু দিক নিঃসন্দেহে ইতিবাচক। প্রথমত, তারা অর্থনীতিতে স্বচ্ছতা আনে। রিজার্ভের হিসাব, রাজস্ব ঘাটতি এবং বাজেট পরিকল্পনায় তারা জবাবদিহি নিশ্চিত করতে চায়। দ্বিতীয়ত, তাদের কারণে সরকারকে কিছু কাঠামোগত সংস্কারের পথে যেতে হয়, যেমন কর প্রশাসন আধুনিক করা, ব্যাংকিং খাতের খেলাপি ঋণ কমানো এবং সুদের হার বাজারভিত্তিক করা। তৃতীয়ত, আন্তর্জাতিক বাজারে আইএমএফের উপস্থিতি বিনিয়োগকারীদের কাছে একটি আস্থার সংকেত হিসেবে কাজ করে। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, আইএমএফের ঋণ অনুমোদনের পর বিশ্বব্যাংক, এডিবি এবং জাইকার মতো সংস্থাগুলো নতুন করে সহযোগিতায় আগ্রহ দেখায়। এতে বাজেটে টাকার প্রবাহ কিছুটা বাড়ে এবং স্থিতিশীলতার বার্তা ছড়ায়।

তবে নেতিবাচক দিকও কম নয়। ভর্তুকি হ্রাসের ফলে জ্বালানি ও নিত্যপণ্যের দাম বাড়লেও মানুষের আয় সেই হারে বাড়েনি। এতে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে নিম্ন-মধ্যবিত্ত শ্রেণি, যারা সামাজিক সুরক্ষার আওতার বাইরে থেকেও বাজারের বাড়তি দামের বোঝা বহন করছে। পাশাপাশি সুদের হার বাজারভিত্তিক হওয়ায় ঋণের খরচ বেড়েছে। ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা ও নতুন ব্যবসায়ীরা ঋণ পেতে হিমশিম খাচ্ছেন, শিল্পখাতে বিনিয়োগ ও নতুন কর্মসংস্থানের গতি মন্থর হয়ে পড়ছে। কাগজে অর্থনীতি স্থিতিশীল মনে হলেও বাস্তবে তা কিছুটা স্থবির।

আইএমএফের আরেকটি বড় মনোযোগের জায়গা হলো রাজস্ব আদায়। তারা চায় বাংলাদেশ কর-জিডিপি অনুপাত বাড়াক। হার্ভার্ড কেনেডি স্কুল রাজাওয়ালি ফাউন্ডেশনের বিশ্লেষণ অনুযায়ী বাংলাদেশের কর-জিডিপি অনুপাত দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যে সবচেয়ে কম, প্রায় ৯ শতাংশ। তাই করজাল সম্প্রসারণ জরুরি। কিন্তু যদি এটি কেবল চাপ প্রয়োগের মাধ্যমে করা হয়, তবে তা উল্টো ফল দিতে পারে। কারণ বাংলাদেশের কর-ব্যবস্থা এখনও জটিল এবং করদাতাদের সেবা কাঠামো দুর্বল।

বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ অনেকটাই নির্ভর করছে আমরা কতটা দক্ষতার সঙ্গে এই সূক্ষ্ম ভারসাম্য বজায় রাখতে পারি তার ওপর। অর্থনীতিতে স্থিতিশীলতা প্রয়োজন, তবে সেই স্থিতিশীলতা যেন জীবনের স্বাভাবিক গতি থামিয়ে না দেয়।

এই কারণেই অনেক বিশেষজ্ঞ মনে করেন, আইএমএফের সংস্কার নীতি মানবিক হলে তা দেশের জন্য আশীর্বাদ হতে পারে, কিন্তু যান্ত্রিকভাবে প্রয়োগ করলে তা মানুষের কষ্ট বাড়ায়। সংস্কার মানে শুধু কাটছাঁট নয়, বরং কৃষি ও খাদ্য নিরাপত্তার মতো সংবেদনশীল খাতে সহায়তা বজায় রেখে ভারসাম্য রক্ষা করা। একইভাবে ব্যাংকিং খাতে খেলাপি ঋণ কমানো, সুশাসন ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা অত্যন্ত প্রয়োজনীয়। এই ক্ষেত্রে আইএমএফের উদ্যোগ ইতিবাচক হতে পারে, যদি তা বাস্তবে কার্যকরভাবে বাস্তবায়িত হয়।

প্রশ্ন থেকেই যায়, আইএমএফ ছাড়া কি বাংলাদেশের বিকল্প নেই? বিকল্প আছে, তবে তা সহজ নয়। নিজস্ব রাজস্ব আদায় বাড়ানো, কর-ব্যবস্থা সহজ করা, রেমিট্যান্সে টেকসই প্রণোদনা দেওয়া, রপ্তানি খাতকে বহুমুখী করা এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে বিনিয়োগ বাড়ানো—এসব পথেই আইএমএফনির্ভরতা কমানো সম্ভব। পাশাপাশি বৈদেশিক ঋণ নিলে তা অবশ্যই উৎপাদনশীল ও আয়ের সম্ভাবনাযুক্ত প্রকল্পে ব্যয় করতে হবে, নইলে ঋণ বাড়বে কিন্তু আয় বাড়বে না।

এও বিবেচনা করা দরকার—আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলকে শত্রু হিসেবে দেখার যেমন সুযোগ নেই, তেমনি একে নিখুঁত বন্ধু ভাবাও বাস্তবসম্মত নয়। এটি এমন এক প্রতিষ্ঠান, যা আমাদের ভুলত্রুটি স্পষ্টভাবে চোখের সামনে তুলে ধরে, তবে সেই আয়না পরিষ্কার রাখার দায়িত্ব আমাদের নিজেদেরই নিতে হয়। এই প্রতিষ্ঠানের অর্থ সহায়তা বাংলাদেশের জন্য প্রয়োজন হতে পারে, কিন্তু তাদের শর্ত মানার ক্ষেত্রে চাই সুপরিকল্পনা, দূরদর্শিতা এবং যথাযথ সময় নির্বাচন। অতিরিক্ত তাড়াহুড়ো করলে ক্ষতির আশঙ্কা থাকে, আবার অযথা দেরি করলে সম্ভাবনার দরজা বন্ধ হয়ে যেতে পারে।

বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ অনেকটাই নির্ভর করছে আমরা কতটা দক্ষতার সঙ্গে এই সূক্ষ্ম ভারসাম্য বজায় রাখতে পারি তার ওপর। অর্থনীতিতে স্থিতিশীলতা প্রয়োজন, তবে সেই স্থিতিশীলতা যেন জীবনের স্বাভাবিক গতি থামিয়ে না দেয়। কারণ উন্নয়ন কেবল হিসাবের শৃঙ্খলায় সীমাবদ্ধ নয়, উন্নয়ন তখনই অর্থবহ হয়, যখন সাধারণ মানুষের মুখে হাসি ফুটে ওঠে।

লেখক: ব্যাংকার ও অর্থনৈতিক বিশ্লেষক

Ad 300x250

সম্পর্কিত