leadT1ad

ভোটের অঙ্ক কি পুরোনোটাই আছে

আমীন আল রশীদ
আমীন আল রশীদ

প্রকাশ : ১৪ জানুয়ারি ২০২৬, ১৬: ২৭
স্ট্রিম গ্রাফিক

১৯৯১, ১৯৯৬ ও ২০০১ সালে অনুষ্ঠিত তুলনামূলক ভালো নির্বাচনগুলোর ফলাফলের ভিত্তিতে বিএনপির যে ৩০ থেকে ৩৫ শতাংশ ভোট আছে বলে মনে করা হয়, ওই বাস্তবতায় বিএনপি এ বছর অন্য দলগুলোর চেয়ে এগিয়ে আছে এটা যেমন ঠিক, তেমনি আওয়ামী লীগের ১৫ বছরে বিএনপির এই ভোট আরও বেড়েছে না কমেছে এবং তার সঙ্গে সঙ্গে জামায়াতের ভোট কী পরিমাণ বেড়েছে সেটি এখনও প্রমাণিত ও পরীক্ষিত নয়।

এই তিনটি নির্বাচন হয়েছিল নির্বাচনকালীন একধরনের বিশেষ ব্যবস্থায় নির্দলীয় সরকারের অধীনে। বলা হয়, নির্বাচনে কেন্দ্রীয় সরকারের হস্তক্ষেপ ছিল না এবং কোনো একটি দলকে জিতিয়ে আনার ব্যাপারে নির্বাচন কমিশন ও মাঠ প্রশাসন কাজ করেনি বলেই এই তিনটি নির্বাচন তুলনামূলক ভালো হয়েছে।

মজার ব্যাপার হলো, ২০০৮ সালের নির্বাচনও হয়েছিল নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে। কিন্তু সেই নির্বাচনে দেশের প্রধান দুটি দল আওয়ামী লীগ ও বিএনপির আসনের পার্থক্য ছিল ২০০। অর্থাৎ আওয়ামী লীগ পেয়েছিল ২৩০টি আর বিএনপি মাত্র ৩০টি। যদিও এই দুই দলের ভোটের ব্যবধান ছিল মাত্র ১৫ শতাংশ। এই নির্বাচনে আওয়ামী লীগ ভোট পেয়েছিল ৪৮.০৪ শতাংশ আর বিএনপি ৩২.৫০ শতাংশ। তার মানে অধিকাংশ আসনেই বিএনপি হেরেছে অল্প ব্যবধানে। কিন্তু বিএনপির মতো একটি দল জাতীয় নির্বাচনের মাত্র ৩০টি আসন পাবে, এটি যেমন ওই সময়ে বিশ্বাসযোগ্য হয়নি, এখনও নয়। বরং শুরু থেকেই নানা ফোরামে বিষয়টি কমবেশি আলোচিত হয়েছে।

এখন এটা অনেকেই বলছেন যে, ২০০৮ সালের নির্বাচনেও অতি উচ্চ মাত্রায় ‘ইঞ্জিনিয়ারিং’ হয়েছে। কিন্তু সেটা ঠিক কোন ধরনের, তা প্রমাণ ছাড়া বলা কঠিন। ফলে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে হলেই যে নির্বাচন অবাধ সুষ্ঠু গ্রহণযোগ্য এবং সর্বোপরি বিশ্বাসযোগ্য হয় বা হবে—এমনটা নাও হতে পারে। ২০০৮ সালের নির্বাচন তার বড় উদাহরণ। সে কারণে তুলনামূলক ভালো নির্বাচন এবং নির্বাচনের অঙ্ক বোঝার জন্য ১৯৯১, ১৯৯৬ ও ২০০১ সালে অনুষ্ঠিত পঞ্চম, সপ্তম ও অষ্টম জাতীয় সংসদ নির্বাচনকেই বিবেচনা করা হয়।

প্রশ্ন হলো, পঁচিশ বছর আগের হিসাব দিয়ে এ বছরের নির্বাচনের ফলাফল সম্পর্কে কোনো ধারণা করা বা কোনো উপসংহারে পৌঁছানো যৌক্তিক কি না। উপরন্তু আওয়ামী লীগবিহীন নির্বাচনে জামায়াত, ইসলামী আন্দোলন ও এনসিপির জোটবদ্ধ হওয়া যে বিএনপির ওপর বাড়তি চাপ তৈরি করেছে এবং দেশের জোটের রাজনীতিতে একটা নতুন মেরুকরণ ও সমীকরণ তৈরি করেছে, তাতে সন্দেহ নেই। বিশেষ করে পরপর পাঁচটি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী সংসদ নির্বাচনে জামায়াতের ছাত্র সংসদ ছাত্রশিবিরের যে জয়-জয়কার এবং বিএনপির ছাত্র সংগঠন ছাত্রদলের যে ভরাডুবি, সেটিও জাতীয় নির্বাচনের অঙ্ক জটিল করে দিয়েছে বলে মনে করা হয়।

রাষ্ট্রীয় আইন বা নির্বাহী আদেশ দিয়ে কোনো দলকে নির্বাচনের বাইরে রাখার এখতিয়ার সরকারের থাকলেও সেটি জনগণের ভেতরে এবং দেশের বাইরে কী প্রতিক্রিয়া তৈরি করে বা করবে, সেটিও ভোটের অঙ্ক মেলানোর ক্ষেত্রে ভূমিকা রাখে।

অনেকের মতে, ছাত্র সংসদ নির্বাচন দিয়ে জাতীয় সংসদ নির্বাচন বিচার করার সুযোগ নেই বা ছাত্র সংসদ নির্বাচনে শিবিরের জয় মানেই জাতীয় নির্বাচনেও জামায়াত বিপুল ভোটে জয় নিয়ে সরকার গঠন করবে, এমনটি হওয়ার সম্ভাবনা কম। কারণ এখানে জাতীয় রাজনীতির অনেক হিসাব-কিতাব যেমন আছে, তেমনি আছে আন্তর্জাতিক নানা ইকুয়েশন। তাছাড়া এবারের নির্বাচনে ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগের ভূমিকা কী হবে, সেটি এখনও স্পষ্ট নয়। তারা যদি নির্বাচন প্রতিহত করতে চায়, তাহলে যে সংঘাতপূর্ণ পরিস্থিতি তৈরি হবে, তাতে হয়তো নির্বাচনটাই অনিশ্চিত হয়ে যাবে। আর যদি তারা প্রতিহত করতে না চায়, তাহলে তাদের ভোটাররা কোন দলকে ভোট দেবেন, তার ওপর অনেক অঙ্কের ফলাফল নির্ভর করবে। অর্থাৎ বিএনপি ভোটে দাঁড়ালেই ৩৫ শতাংশ মানুষ তাদের ভোট দেবে—এই সরল হিসাবটি যদি এবার বহাল থাকেও, তারপরও বাকি ৬৫ শতাংশ ভোট কোন কোন দলের মধ্যে ভাগ হবে কিংবা এই ৬৫ শতাংশের কত শতাংশ বিএনপি পাবে—সেটি বড় প্রশ্ন।

আবার অতীতের নির্বাচনে বিএনপি ৩০ থেকে ৩৫ শতাংশ ভোট পেয়েছে মানেই যে এবারও এই সংখ্যক মানুষ তাদের ভোট দেবে, সেটিও কি নিশ্চিত? ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পরে গত দেড় বছরে মাঠ পর্যায়ে বিএনপির রাজনীতির যে হাল, তাদের বিরুদ্ধে চাঁদাবাজি এবং অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব সংঘাতের যেসব ঘটনা ঘটছে, সেগুলো কি বিএনপির ভোট বাড়িয়েছে না কমিয়েছে?

তবে এর বাইরে এবার বিএনপির জন্য কিছু ইতিবাচক ফ্যাক্টরও কাজ করছে। যেমন, তারেক রহমানের দেশে ফেরা; খালেদা জিয়ার মৃত্যুর মধ্য দিয়ে সাধারণ মানুষের বিরাট সিমপ্যাথি; বিভিন্ন উগ্রবাদী সংগঠনের তৎপরতায় বিএনপির মতো মধ্যপন্থি দলের ব্যাপারে মানুষের আগ্রহ বৃদ্ধি ইত্যাদি। কিন্তু এসব অঙ্ক দিন শেষে ভোটের বাক্সে কী প্রভাব ফেলবে, তা চট করে বলা কঠিন।

সম্প্রতি বেসরকারি সংস্থা এমিনেন্স অ্যাসোসিয়েটস ফর সোশ্যাল ডেভেলপমেন্ট (ইএএসডি)-এর একটি জনমত জরিপে বলা হয়েছে, দেশের ৭০ শতাংশ মানুষ বিএনপিকে ভোট দিতে চায়। তার বিপরীতে জামায়াতে ইসলামীর পক্ষে জনমত ১৯ শতাংশ। জরিপকারী সংস্থার পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, সারা দেশের ৩০০টি সংসদীয় আসন থেকে সশরীর ২০ হাজার ৪৯৫ জনের মতামত সংগ্রহ করা হয়েছে। ফলাফলে উঠে এসেছে, জরিপে অংশগ্রহণকারীদের ২ দশমিক ৬ শতাংশ মানুষ এনসিপিকে ভোট দিতে চান। তবে কিছু লোক ভোট না দেওয়ার কথাও বলেছেন।

বাস্তবতা হলো, এবার আওয়ামী লীগের অনেক ভোটারই ভোট দেবেন না বলে মনে হয়। তার পেছনে দুটি কারণ থাকতে পারে। ১. নিজের পছন্দের প্রতীক ব্যালট পেপারে না থাকা এবং ২. নির্বাচনের সহিংসতার আশঙ্কা। এই শঙ্কার কারণে অনেক নির্দলীয় নির্ঝঞ্ঝাট ভোটার এবার ভোটকেন্দ্রে যাবেন না বলেও শোনা যাচ্ছে। কিন্তু ভোটের সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণ পরিবেশ নিশ্চিত করতে সরকারের পদক্ষেপও খুব দৃশ্যমান ও বিশ্বাসযোগ্য নয়। বরং রাজনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ কিছু ব্যক্তির খুন হওয়ার মধ্য দিয়ে কিছু শঙ্কা তৈরি হয়েছে—যেগুলোকে বিচ্ছিন্ন ঘটনা মনে করার সুযোগ নেই। ফলে একটি বিরাট অংশের ভোটার যদি এবার সত্যিই ভোটকেন্দ্রে না যান, তাহলে সেই সুবিধা কার বাক্সে যাবে, তা বলা কঠিন।

এমিনেন্সের এই জরিপের আগে গত ডিসেম্বরের শুরুর দিকে প্রথম আলোর একটি জরিপের ফলাফলেও উঠে এসেছিল যে, আগামী নির্বাচনে বিএনপি জিতবে বলে মনে করেন ৭৪ শতাংশ মানুষ। ১৮ শতাংশ মানুষ মনে করেন জামায়াতে ইসলামী জিতবে। আর এনসিপি জিতবে বলে মনে করেন ১ দশমিক ৭ শতাংশ মানুষ।

অবশ্য মাস কয়েক আগে ব্র্যাক ইনস্টিটিউট অব গভর্ন্যান্স অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের (বিআইজিডি) একটি জরিপের ফলাফলে বিএনপি ও জামায়াতের জনপ্রিয়তা দেখা গেছে কাছাকাছি। এই জরিপের ফলাফলে বলা হয়েছে, আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপিকে ভোট দেবেন ১২ শতাংশ মানুষ। জামায়াতকে ১০ দশমিক ৪০ শতাংশ এবং জাতীয় নাগরিক পার্টি-এনসিপিকে ভোট দেবেন ২ দশমিক ৮০ শতাংশ মানুষ। আর যদি আওয়ামী লীগ ভোটে অংশ নিতে পারে তাহলে ৭ দশমিক ৩০ শতাংশ মানুষ তাদের ভোট দেবেন।

এটা অনেকেই বলছেন যে, ২০০৮ সালের নির্বাচনেও অতি উচ্চ মাত্রায় ‘ইঞ্জিনিয়ারিং’ হয়েছে। কিন্তু সেটা ঠিক কোন ধরনের, তা প্রমাণ ছাড়া বলা কঠিন। ফলে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে হলেই যে নির্বাচন অবাধ সুষ্ঠু গ্রহণযোগ্য এবং সর্বোপরি বিশ্বাসযোগ্য হয় বা হবে—এমনটা নাও হতে পারে। ২০০৮ সালের নির্বাচন তার বড় উদাহরণ। সে কারণে তুলনামূলক ভালো নির্বাচন এবং নির্বাচনের অঙ্ক বোঝার জন্য ১৯৯১, ১৯৯৬ ও ২০০১ সালে অনুষ্ঠিত পঞ্চম, সপ্তম ও অষ্টম জাতীয় সংসদ নির্বাচনকেই বিবেচনা করা হয়।

নির্বাচন কমিশনের তথ্য অনুযায়ী, এ মুহূর্তে দেশে ভোটারের সংখ্যা ১২ কোটি ৭৮ লাখ। আর অনানুষ্ঠানিকভাবে দেশের মোট জনসংখ্যা প্রায় ২০ কোটি। ফলে, ১০-২০ হাজার মানুষের ওপর জরিপে ১২ কোটি ভোটার এবং ২০ কোটি মানুষের মতামতের প্রতিফলন ঘটে কি না এবং জরিপে বাস্তবতার প্রকৃত প্রতিফলন ঘটে কি না, সেই প্রশ্ন বেশ পুরোনো। তারপরও বাস্তবতা বোঝার জন্য এসব জরিপের কিছু গুরুত্ব আছে বৈ কি।

অনেক সময় কিছু জরিপ করা হয় পারপাসিভলি বা উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে কোনো দলের জনপ্রিয়তা কমবেশি দেখানোর জন্য। ফলে জরিপের ফলাফল সব সময় সত্য নাও হতে পারে। বাস্তবতার সঙ্গে অনেক ফারাক থাকতে পারে। ফলে আগামী নির্বাচনে কোন দল কত ভোট পাবে, বা কোন দলের জনপ্রিয়তা কেমন, সেটি যাচাইয়ের একমাত্র উপায় হচ্ছে একটি অবাধ-সুষ্ঠু-গ্রহণযোগ্য ও বিশ্বাসযোগ্য নির্বাচন। বিতর্কিত, প্রশ্নবিদ্ধ এবং সাজানো নির্বাচনের মধ্য দিয়ে কখনোই কোনো দলের জনপ্রিয়তা যাচাই করা যায় না। অতএব আগামী জাতীয় নির্বাচনে জনগণের প্রত্যাশা হলো, সেই নির্বাচনটি বিগত তিনটি নির্বাচনের মতো হবে না। যদি না হয় তাহলেই কেবল বোঝা যাবে বিএনপি-জামায়াত-এনসিপি বা অন্য দলগুলোর জনসমর্থন কতটা আছে।

তবে প্রথম আলোর সাম্প্রতিক জরিপের একটা উল্লেখযোগ্য দিক হলো, শর্তহীন ও শর্তযুক্তভাবে চান ৬৯ শতাংশ মানুষ আওয়ামী লীগকে নির্বাচনে দেখতে চান। তার মানে দেশের অন্যতম প্রধান একটি দলকে নির্বাচনের বাইরে রেখে যে ভোটের আয়োজন করা হচ্ছে, তার পক্ষে যতই যুক্তি থাকুক না কেন; অভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত হয়েছে বলেই আওয়ামী লীগ নির্বাচনে অংশ নিতে পারবে বলে যে দাবি করা হোক না কেন, আখেরে কার কী জনসমর্থন ও জনপ্রিয়তা সেটি বিচারের ভার জনগণের। জনগণ যদি কোন দলকে গ্রহণ বা প্রত্যাখ্যান করছে সেটি নিরপেক্ষ ভোট ছাড়া বোঝার উপায় নেই।

রাষ্ট্রীয় আইন বা নির্বাহী আদেশ দিয়ে কোনো দলকে নির্বাচনের বাইরে রাখার এখতিয়ার সরকারের থাকলেও সেটি জনগণের ভেতরে এবং দেশের বাইরে কী প্রতিক্রিয়া তৈরি করে বা করবে, সেটিও ভোটের অঙ্ক মেলানোর ক্ষেত্রে ভূমিকা রাখে। সুতরাং যারা মনে করেন যে, ব্যালট পেপারে নৌকা থাকা দরকার, তাদের মতামতের প্রতিফলন কোথায় ঘটবে বা তাদের ভোট কারা পাবে; কারা এই ভোট ব্যাংক নিজেদের বাক্সে ভরতে পারবে—এটি যেমন এবার একটি বড় আলোচনা তেমনি আওয়ামী লীগের মতো একটি দলকে নির্বাচনে বাইরে রেখে এই ভোটের আয়োজনকে বাংলাদেশের উন্নয়ন সহযোগী ও বন্ধুপ্রতিম রাষ্ট্রগুলো কীভাবে মূল্যায়ন করবে, সেদিকেও দেশবাসীর নজর থাকবে।

আমীন আল রশীদ: সাংবাদিক ও লেখক

Ad 300x250

সম্পর্কিত