ড. মো. শামছুল আলম

তৃতীয় বিশ্বের জনবহুল ও দারিদ্র্যপীড়িত একটি দেশ হিসেবে বাংলাদেশে সামাজিক সুরক্ষা নিয়ে আলোচনা নতুন নয়। স্বাধীনতার পর থেকেই দরিদ্র, অসহায়, এতিম, দুস্থ, ঝুঁকিপূর্ণ ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর জন্য বিভিন্ন ধরনের সহায়তা কর্মসূচি চালু হয়েছে। আর্থিক অনুদান, ভাতা, খাদ্য সহায়তা, কর্মসংস্থানভিত্তিক প্রকল্প কিংবা শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে নানা প্রণোদনা ইত্যাদি মিলিয়ে সামাজিক সুরক্ষার একটি বিস্তৃত কাঠামো গড়ে উঠেছে। কিন্তু দীর্ঘদিন ধরে একটি সমন্বিত ও কার্যকর সামাজিক সুরক্ষা ব্যবস্থা তৈরির প্রশ্নটি রয়েই গেছে। কারণ, বাংলাদেশের সামাজিক সুরক্ষা ব্যবস্থার একটি বড় বৈশিষ্ট্য হলো এর ব্যাপক বিস্তৃতি।
বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও সংস্থার অধীনে বহু কর্মসূচি পরিচালিত হচ্ছে, যেগুলোর লক্ষ্য দরিদ্রতা কমানো, সামাজিক ঝুঁকি মোকাবিলা করা এবং দুর্বল জনগোষ্ঠীকে সহায়তা দেওয়া। কিন্তু এই বিস্তৃত ব্যবস্থার মধ্যেই রয়েছে একটি বড় সমস্যা, সমন্বয়ের অভাব।
একই পরিবার একাধিক কর্মসূচির সুবিধা পাচ্ছে, আবার অনেক প্রকৃত দরিদ্র পরিবার কোনো সহায়তাই পাচ্ছে না। ফলে প্রশাসনিক ব্যয় বাড়ছে, তথ্যের পুনরাবৃত্তি হচ্ছে এবং স্থানীয় পর্যায়ে কখনো কখনো পৃষ্ঠপোষকতার রাজনীতি কাজ করার সুযোগ তৈরি হচ্ছে। কিন্তু সামাজিক সুরক্ষা আর নিশ্চিত হচ্ছে না। তবে বিএনপি সরকারের প্রতিশ্রুত ‘ফ্যামিলি কার্ড’ উদ্যোগটি শুরু হওয়ায় নতুন করে সামাজিক সুরক্ষার বিষয়টি আলোচনায় এসেছে এবং কল্যাণ রাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ নিয়ে ভাবনার ক্ষেত্র তৈরি হয়েছে।
বাংলাদেশ সরকারের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী জনাব তারেক রহমান গত ১০ মার্চ সকালে রাজধানীর বনানীতে ফ্যামিলি কার্ড কর্মসূচির আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করেছেন। কড়াইল বস্তির সংলগ্ন টিঅ্যান্ডটি খেলার মাঠে আয়োজিত অনুষ্ঠানে অংশ নিয়ে তিনি এই জনকল্যাণমূলক প্রকল্পের সূচনা করেন।
প্রাথমিক পর্যায়ে পরীক্ষামূলকভাবে দেশের ১৩ জেলার সিটি করপোরেশন, পৌরসভা এবং বিভিন্ন ইউনিয়নের ১৫টি ওয়ার্ডে এই কর্মসূচি বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। এ কর্মসূচির আওতায় উপকারভোগী পরিবারগুলো প্রতি মাসে ২,৫০০ টাকা করে ভাতা পাবেন। এই ভাতার টাকা তারা নিজের পছন্দ অনুযায়ী মোবাইল ওয়ালেট বা ব্যাংক হিসাবের মাধ্যমে ঘরে বসেই গ্রহণ করতে পারবেন।
সরকারি তথ্য অনুযায়ী, আপাতত ৩৭ হাজার ৫৬৭টি নারীপ্রধান পরিবারকে ভাতা প্রদানের জন্য নির্বাচিত করা হয়েছে। পরীক্ষামূলক পর্যায়ে কর্মসূচি বাস্তবায়নের জন্য আগামী জুন পর্যন্ত চার মাসের জন্য ৩৮ কোটি ৭ লাখ টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে। ইতোমধ্যে ৬৪৫১টি পরিবার মোবাইল ব্যাংকিং ‘নগদ’ এর মাধ্যমে এক কোটি ৬২ লাখ চার হাজার ২৬৫ টাকা পেয়েছেন। কর্মসূচির সুষ্ঠু পরিচালনা নিশ্চিত করতে জেলা, উপজেলা ও ওয়ার্ড পর্যায়ে সরকারি প্রতিনিধিদের সমন্বয়ে ইতিমধ্যে বিশেষ কমিটিও গঠন করা হয়েছে।
বর্তমানে বাংলাদেশে প্রায় ২৫টি মন্ত্রণালয়ের অধীনে ১০০টিরও বেশি সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি পরিচালিত হচ্ছে। এ খাতে মোট বাজেট বরাদ্দ দেশের জিডিপির আনুমানিক ১ দশমিক ৯ শতাংশ। কর্মসূচির এই বিস্তৃতি প্রথম দৃষ্টিতে শক্তিশালী সামাজিক সুরক্ষা ব্যবস্থার ইঙ্গিত দিলেও বাস্তবে তা সব সময় কার্যকারিতা নিশ্চিত করতে পারছে না।
সংখ্যায় বিস্তৃত হলেও সামাজিক সুরক্ষা ব্যবস্থার কাঙ্ক্ষিত দক্ষতা ও সমন্বয় অনেক সময় অর্জিত হয় না। এতে করে দেশের দরিদ্র জনগোষ্ঠীর প্রকৃত উপকার সাধিত হচ্ছে না। কিন্তু, ফ্যামিলি কার্ডকে অনেকেই একটি সম্ভাবনাময় সংস্কার উদ্যোগ হিসেবে দেখছেন। এর মূল ধারণা হলো পরিবারকে সামাজিক সুরক্ষার কেন্দ্রীয় একক হিসেবে বিবেচনা করা। বাস্তবে সামাজিক ও অর্থনৈতিক ঝুঁকি সাধারণত ব্যক্তিগতভাবে নয়, বরং পারিবারিকভাবে অনুভূত হয়। পরিবারের একজন সদস্য কাজ হারালে, অসুস্থ হলে বা আয় কমে গেলে তার প্রভাব পুরো পরিবারকে বহন করতে হয়। তাই পরিবারভিত্তিক সুরক্ষা কাঠামো অনেক ক্ষেত্রে বাস্তবতার সঙ্গে বেশি সামঞ্জস্যপূর্ণ। এতে করে পরিবারের সুরক্ষা নিশ্চিত করার মাধ্যমে রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে সামাজিক সুরক্ষা নিশ্চিত করা সহজতর হবে।
ফ্যামিলি কার্ড উদ্যোগের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো নারীদের অগ্রাধিকার দেওয়া। পরিকল্পনা অনুযায়ী, এই কার্ডটি পরিবারের নারীপ্রধানের নামে ইস্যু করা হচ্ছে। এর বেশ কয়েকটি ভাল দিক রয়েছে। পরিবারের আর্থিক সহায়তা নারীদের হাতে পৌঁছালে তা খাদ্য, স্বাস্থ্য এবং সন্তানের শিক্ষায় বেশি ব্যয় হয়। এর মাধ্যমে নারীদেরকে যেমন স্বাবলম্বী করে তোলা সম্ভব হবে, তেমনি পরিবারেরও খাদ্য ও স্বাস্থ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত হবে।
অর্থাৎ, এটি পরিবারের মানবসম্পদ গঠনে ও দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। একই সঙ্গে, এই পদক্ষেপ পরিবারে নারীর সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতাকেও শক্তিশালী করবে, যা সামাজিক ও অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার জন্য বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ।
স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন জাগে, এই কার্ড প্রকৃত সুবিধাভোগীর হাতে পৌঁছাবে কি না, নাকি কেউ অন্যের জন্য সুযোগ হাতিয়ে নেবে? এক্ষেত্রে বলা যায়, ফ্যামিলি কার্ড কার্যক্রমে পূর্বের তুলনায় অনেক বেশি স্পষ্ট লক্ষ্য ও নির্দেশনা তৈরি করা হয়েছে।
সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, ফ্যামিলি কার্ডের জন্য নির্বাচিত নারী গৃহপ্রধান যদি ইতিমধ্যে অন্য কোনো সরকারি ভাতা বা সহায়তা পান, তাহলে সেই সুবিধাগুলো বাতিল হিসেবে গণ্য হবে। তবে পরিবারের অন্যান্য সদস্য চলমান ভাতা চালিয়ে নিতে পারবেন। আবার কোনো পরিবারের কোনো সদস্য যদি সরকারি, স্বায়ত্তশাসিত বা রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান থেকে বেতন, ভাতা, অনুদান বা পেনশন পান, কিংবা নারী পরিবারপ্রধান এমপিওভুক্ত প্রতিষ্ঠানে চাকরিতে থাকেন, তবে সেই পরিবার ভাতার জন্য অযোগ্য হবে।
এছাড়া কোনো পরিবারের নামে বাণিজ্যিক লাইসেন্স, বড় ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান, বিলাসবহুল সম্পদ যেমন গাড়ি, এসি অথবা ৫ লাখ টাকার সঞ্চয়পত্র থাকলেও তারা ভাতা পাবেন না। অর্থাৎ প্রকৃতভাবে যাদের প্রয়োজন, শুধুমাত্র তারাই সুবিধাভোগী হবেন। আরো একটি গুরুত্বপূর্ণ ব্যবস্থা হলো অর্থের সরাসরি স্থানান্তর। উপকারভোগীর মোবাইল ওয়ালেট বা পছন্দের ব্যাংক একাউন্টে সরাসরি পাঠানো হবে, ফলে মধ্যবর্তী কোনো ধরণের অব্যবস্থাপনা বা তছরুপের সুযোগ থাকছে না। এই ধরনের ব্যবস্থা নিশ্চিত করছে যে, সুবিধা ঠিকঠাক এবং নির্ভরযোগ্যভাবে প্রকৃত উপকারভোগীর কাছে পৌঁছাবে।
বাংলাদেশ সরকার ফ্যামিলি কার্ড কর্মসূচিকে খুব গুরুত্ব দিয়েই দেখছে। সরকার ২০৩০ সালের মধ্যে ফ্যামিলি কার্ডকে বাংলাদেশের প্রত্যেক নাগরিকের জন্য একটি ‘সর্বজনীন সোশ্যাল আইডি কার্ড’ হিসেবে রূপান্তরের দীর্ঘমেয়াদি লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে। একই সঙ্গে ২০২৮ সালের মধ্যে সামাজিক সুরক্ষা বাজেট জিডিপির ৩ শতাংশে উন্নীত করার কথাও ভাবছে। যদি এসব লক্ষ্য সুশৃঙ্খলভাবে ও কার্যকরভাবে বাস্তবায়িত হয়, তবে বাংলাদেশ বহু বছর ধরে ভোগা সমস্যাগুলো, যেমন খণ্ডিত ও অসংলগ্ন সামাজিক সুরক্ষা ব্যবস্থা তা সমাধানের পথে এগোতে পারবে।
বলা বাহুল্য, ফ্যামিলি কার্ড নিঃসন্দেহে বাংলাদেশের সামাজিক সুরক্ষার ক্ষেত্রকে নতুন মাত্রা দিতে পারে। মাত্র এক মাসের মধ্যে সরকার ফ্যামিলি কার্ড ইশতেহারের বাস্তবায়ন করেছে। ভোটের কালি হাত থেকে মুছে যাওয়ার আগেই হাজার হাজার পরিবার ফ্যামিলি কার্ড হাতে পেয়েছে।
সরকার এরপর কৃষক কার্ড নিয়ে কাজ শুরু করবে। কৃষির উন্নয়নের মাধ্যমে রাষ্ট্রীয় উন্নয়ন টেকসই করতে এই উদ্যোগও কার্যকরী হবে বলেই বিশ্বাস রাখি। তবে এর জন্য কতকগুলো আশু পদক্ষেপ নিতে হবে। বাস্তবায়নের গুণগত মানই শেষ পর্যন্ত এর সফলতা নির্ধারণ করবে। উপকারভোগী নির্বাচনের প্রক্রিয়া, তথ্যের স্বচ্ছতা, আন্তঃমন্ত্রণালয় সমন্বয় ইত্যাদি দিক একত্রে শক্তিশালী হলে প্রকল্প সত্যিকারের সমন্বিত সামাজিক সুরক্ষা ব্যবস্থা হিসেবে কাজ করতে পারবে বলে আশা করা যায়।
পাশাপাশি আরও গুরুত্বপূর্ণ হলো অর্থায়নের স্থায়িত্ব ও পরিকল্পিত ব্যবস্থাপনা। সামাজিক সুরক্ষা শুধুমাত্র সহায়তার নগদ প্রদান নয়; এটি একটি দীর্ঘমেয়াদি নীতিগত প্রক্রিয়া যা মানবসম্পদ গঠন, বৈষম্য হ্রাস এবং সমাজে স্থিতিশীলতা প্রতিষ্ঠায় ভূমিকা রাখে। ফ্যামিলি কার্ডের মাধ্যমে যদি সুবিধা প্রকৃত দরিদ্র ও ঝুঁকিপূর্ণ পরিবারে পৌঁছায়, তা কেবল তাদের জীবনযাত্রা উন্নত করবে না, বরং সমাজে ন্যায্যতা ও আস্থার সংস্কৃতিও গড়ে তুলবে। রাজনৈতিক সদিচ্ছা, প্রশাসনিক দক্ষতা এবং নিয়মিত জনজবাবদিহিতার ওপর এই প্রকল্পের সফলতা নির্ভর করছে।
দীর্ঘমেয়াদি লক্ষ্য হিসেবে যদি ফ্যামিলি কার্ডকে দেশের প্রত্যেক দরিদ্র নাগরিকের জন্য সর্বজনীন সামাজিক পরিচয়পত্রে রূপান্তর করা যায় এবং বাজেট ও সম্পদের ব্যবহার সুশৃঙ্খলভাবে পরিচালিত হয়, তাহলে এটি বাংলাদেশের সামাজিক সুরক্ষা ব্যবস্থার এক যুগান্তকারী সংস্কার হিসেবে ইতিহাসে স্থান করে নিতে পারবে। এটি হতে পারে একটি শক্তিশালী কল্যাণ রাষ্ট্রের দৃষ্টান্তমূলক রূপ, যা মানুষকে মর্যাদাপূর্ণ জীবন, নিরাপত্তা ও সমান সুযোগ নিশ্চিত করার পথে একটি দৃষ্টান্ত স্থাপন করবে।

তৃতীয় বিশ্বের জনবহুল ও দারিদ্র্যপীড়িত একটি দেশ হিসেবে বাংলাদেশে সামাজিক সুরক্ষা নিয়ে আলোচনা নতুন নয়। স্বাধীনতার পর থেকেই দরিদ্র, অসহায়, এতিম, দুস্থ, ঝুঁকিপূর্ণ ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর জন্য বিভিন্ন ধরনের সহায়তা কর্মসূচি চালু হয়েছে। আর্থিক অনুদান, ভাতা, খাদ্য সহায়তা, কর্মসংস্থানভিত্তিক প্রকল্প কিংবা শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে নানা প্রণোদনা ইত্যাদি মিলিয়ে সামাজিক সুরক্ষার একটি বিস্তৃত কাঠামো গড়ে উঠেছে। কিন্তু দীর্ঘদিন ধরে একটি সমন্বিত ও কার্যকর সামাজিক সুরক্ষা ব্যবস্থা তৈরির প্রশ্নটি রয়েই গেছে। কারণ, বাংলাদেশের সামাজিক সুরক্ষা ব্যবস্থার একটি বড় বৈশিষ্ট্য হলো এর ব্যাপক বিস্তৃতি।
বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও সংস্থার অধীনে বহু কর্মসূচি পরিচালিত হচ্ছে, যেগুলোর লক্ষ্য দরিদ্রতা কমানো, সামাজিক ঝুঁকি মোকাবিলা করা এবং দুর্বল জনগোষ্ঠীকে সহায়তা দেওয়া। কিন্তু এই বিস্তৃত ব্যবস্থার মধ্যেই রয়েছে একটি বড় সমস্যা, সমন্বয়ের অভাব।
একই পরিবার একাধিক কর্মসূচির সুবিধা পাচ্ছে, আবার অনেক প্রকৃত দরিদ্র পরিবার কোনো সহায়তাই পাচ্ছে না। ফলে প্রশাসনিক ব্যয় বাড়ছে, তথ্যের পুনরাবৃত্তি হচ্ছে এবং স্থানীয় পর্যায়ে কখনো কখনো পৃষ্ঠপোষকতার রাজনীতি কাজ করার সুযোগ তৈরি হচ্ছে। কিন্তু সামাজিক সুরক্ষা আর নিশ্চিত হচ্ছে না। তবে বিএনপি সরকারের প্রতিশ্রুত ‘ফ্যামিলি কার্ড’ উদ্যোগটি শুরু হওয়ায় নতুন করে সামাজিক সুরক্ষার বিষয়টি আলোচনায় এসেছে এবং কল্যাণ রাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ নিয়ে ভাবনার ক্ষেত্র তৈরি হয়েছে।
বাংলাদেশ সরকারের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী জনাব তারেক রহমান গত ১০ মার্চ সকালে রাজধানীর বনানীতে ফ্যামিলি কার্ড কর্মসূচির আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করেছেন। কড়াইল বস্তির সংলগ্ন টিঅ্যান্ডটি খেলার মাঠে আয়োজিত অনুষ্ঠানে অংশ নিয়ে তিনি এই জনকল্যাণমূলক প্রকল্পের সূচনা করেন।
প্রাথমিক পর্যায়ে পরীক্ষামূলকভাবে দেশের ১৩ জেলার সিটি করপোরেশন, পৌরসভা এবং বিভিন্ন ইউনিয়নের ১৫টি ওয়ার্ডে এই কর্মসূচি বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। এ কর্মসূচির আওতায় উপকারভোগী পরিবারগুলো প্রতি মাসে ২,৫০০ টাকা করে ভাতা পাবেন। এই ভাতার টাকা তারা নিজের পছন্দ অনুযায়ী মোবাইল ওয়ালেট বা ব্যাংক হিসাবের মাধ্যমে ঘরে বসেই গ্রহণ করতে পারবেন।
সরকারি তথ্য অনুযায়ী, আপাতত ৩৭ হাজার ৫৬৭টি নারীপ্রধান পরিবারকে ভাতা প্রদানের জন্য নির্বাচিত করা হয়েছে। পরীক্ষামূলক পর্যায়ে কর্মসূচি বাস্তবায়নের জন্য আগামী জুন পর্যন্ত চার মাসের জন্য ৩৮ কোটি ৭ লাখ টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে। ইতোমধ্যে ৬৪৫১টি পরিবার মোবাইল ব্যাংকিং ‘নগদ’ এর মাধ্যমে এক কোটি ৬২ লাখ চার হাজার ২৬৫ টাকা পেয়েছেন। কর্মসূচির সুষ্ঠু পরিচালনা নিশ্চিত করতে জেলা, উপজেলা ও ওয়ার্ড পর্যায়ে সরকারি প্রতিনিধিদের সমন্বয়ে ইতিমধ্যে বিশেষ কমিটিও গঠন করা হয়েছে।
বর্তমানে বাংলাদেশে প্রায় ২৫টি মন্ত্রণালয়ের অধীনে ১০০টিরও বেশি সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি পরিচালিত হচ্ছে। এ খাতে মোট বাজেট বরাদ্দ দেশের জিডিপির আনুমানিক ১ দশমিক ৯ শতাংশ। কর্মসূচির এই বিস্তৃতি প্রথম দৃষ্টিতে শক্তিশালী সামাজিক সুরক্ষা ব্যবস্থার ইঙ্গিত দিলেও বাস্তবে তা সব সময় কার্যকারিতা নিশ্চিত করতে পারছে না।
সংখ্যায় বিস্তৃত হলেও সামাজিক সুরক্ষা ব্যবস্থার কাঙ্ক্ষিত দক্ষতা ও সমন্বয় অনেক সময় অর্জিত হয় না। এতে করে দেশের দরিদ্র জনগোষ্ঠীর প্রকৃত উপকার সাধিত হচ্ছে না। কিন্তু, ফ্যামিলি কার্ডকে অনেকেই একটি সম্ভাবনাময় সংস্কার উদ্যোগ হিসেবে দেখছেন। এর মূল ধারণা হলো পরিবারকে সামাজিক সুরক্ষার কেন্দ্রীয় একক হিসেবে বিবেচনা করা। বাস্তবে সামাজিক ও অর্থনৈতিক ঝুঁকি সাধারণত ব্যক্তিগতভাবে নয়, বরং পারিবারিকভাবে অনুভূত হয়। পরিবারের একজন সদস্য কাজ হারালে, অসুস্থ হলে বা আয় কমে গেলে তার প্রভাব পুরো পরিবারকে বহন করতে হয়। তাই পরিবারভিত্তিক সুরক্ষা কাঠামো অনেক ক্ষেত্রে বাস্তবতার সঙ্গে বেশি সামঞ্জস্যপূর্ণ। এতে করে পরিবারের সুরক্ষা নিশ্চিত করার মাধ্যমে রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে সামাজিক সুরক্ষা নিশ্চিত করা সহজতর হবে।
ফ্যামিলি কার্ড উদ্যোগের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো নারীদের অগ্রাধিকার দেওয়া। পরিকল্পনা অনুযায়ী, এই কার্ডটি পরিবারের নারীপ্রধানের নামে ইস্যু করা হচ্ছে। এর বেশ কয়েকটি ভাল দিক রয়েছে। পরিবারের আর্থিক সহায়তা নারীদের হাতে পৌঁছালে তা খাদ্য, স্বাস্থ্য এবং সন্তানের শিক্ষায় বেশি ব্যয় হয়। এর মাধ্যমে নারীদেরকে যেমন স্বাবলম্বী করে তোলা সম্ভব হবে, তেমনি পরিবারেরও খাদ্য ও স্বাস্থ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত হবে।
অর্থাৎ, এটি পরিবারের মানবসম্পদ গঠনে ও দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। একই সঙ্গে, এই পদক্ষেপ পরিবারে নারীর সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতাকেও শক্তিশালী করবে, যা সামাজিক ও অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার জন্য বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ।
স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন জাগে, এই কার্ড প্রকৃত সুবিধাভোগীর হাতে পৌঁছাবে কি না, নাকি কেউ অন্যের জন্য সুযোগ হাতিয়ে নেবে? এক্ষেত্রে বলা যায়, ফ্যামিলি কার্ড কার্যক্রমে পূর্বের তুলনায় অনেক বেশি স্পষ্ট লক্ষ্য ও নির্দেশনা তৈরি করা হয়েছে।
সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, ফ্যামিলি কার্ডের জন্য নির্বাচিত নারী গৃহপ্রধান যদি ইতিমধ্যে অন্য কোনো সরকারি ভাতা বা সহায়তা পান, তাহলে সেই সুবিধাগুলো বাতিল হিসেবে গণ্য হবে। তবে পরিবারের অন্যান্য সদস্য চলমান ভাতা চালিয়ে নিতে পারবেন। আবার কোনো পরিবারের কোনো সদস্য যদি সরকারি, স্বায়ত্তশাসিত বা রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান থেকে বেতন, ভাতা, অনুদান বা পেনশন পান, কিংবা নারী পরিবারপ্রধান এমপিওভুক্ত প্রতিষ্ঠানে চাকরিতে থাকেন, তবে সেই পরিবার ভাতার জন্য অযোগ্য হবে।
এছাড়া কোনো পরিবারের নামে বাণিজ্যিক লাইসেন্স, বড় ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান, বিলাসবহুল সম্পদ যেমন গাড়ি, এসি অথবা ৫ লাখ টাকার সঞ্চয়পত্র থাকলেও তারা ভাতা পাবেন না। অর্থাৎ প্রকৃতভাবে যাদের প্রয়োজন, শুধুমাত্র তারাই সুবিধাভোগী হবেন। আরো একটি গুরুত্বপূর্ণ ব্যবস্থা হলো অর্থের সরাসরি স্থানান্তর। উপকারভোগীর মোবাইল ওয়ালেট বা পছন্দের ব্যাংক একাউন্টে সরাসরি পাঠানো হবে, ফলে মধ্যবর্তী কোনো ধরণের অব্যবস্থাপনা বা তছরুপের সুযোগ থাকছে না। এই ধরনের ব্যবস্থা নিশ্চিত করছে যে, সুবিধা ঠিকঠাক এবং নির্ভরযোগ্যভাবে প্রকৃত উপকারভোগীর কাছে পৌঁছাবে।
বাংলাদেশ সরকার ফ্যামিলি কার্ড কর্মসূচিকে খুব গুরুত্ব দিয়েই দেখছে। সরকার ২০৩০ সালের মধ্যে ফ্যামিলি কার্ডকে বাংলাদেশের প্রত্যেক নাগরিকের জন্য একটি ‘সর্বজনীন সোশ্যাল আইডি কার্ড’ হিসেবে রূপান্তরের দীর্ঘমেয়াদি লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে। একই সঙ্গে ২০২৮ সালের মধ্যে সামাজিক সুরক্ষা বাজেট জিডিপির ৩ শতাংশে উন্নীত করার কথাও ভাবছে। যদি এসব লক্ষ্য সুশৃঙ্খলভাবে ও কার্যকরভাবে বাস্তবায়িত হয়, তবে বাংলাদেশ বহু বছর ধরে ভোগা সমস্যাগুলো, যেমন খণ্ডিত ও অসংলগ্ন সামাজিক সুরক্ষা ব্যবস্থা তা সমাধানের পথে এগোতে পারবে।
বলা বাহুল্য, ফ্যামিলি কার্ড নিঃসন্দেহে বাংলাদেশের সামাজিক সুরক্ষার ক্ষেত্রকে নতুন মাত্রা দিতে পারে। মাত্র এক মাসের মধ্যে সরকার ফ্যামিলি কার্ড ইশতেহারের বাস্তবায়ন করেছে। ভোটের কালি হাত থেকে মুছে যাওয়ার আগেই হাজার হাজার পরিবার ফ্যামিলি কার্ড হাতে পেয়েছে।
সরকার এরপর কৃষক কার্ড নিয়ে কাজ শুরু করবে। কৃষির উন্নয়নের মাধ্যমে রাষ্ট্রীয় উন্নয়ন টেকসই করতে এই উদ্যোগও কার্যকরী হবে বলেই বিশ্বাস রাখি। তবে এর জন্য কতকগুলো আশু পদক্ষেপ নিতে হবে। বাস্তবায়নের গুণগত মানই শেষ পর্যন্ত এর সফলতা নির্ধারণ করবে। উপকারভোগী নির্বাচনের প্রক্রিয়া, তথ্যের স্বচ্ছতা, আন্তঃমন্ত্রণালয় সমন্বয় ইত্যাদি দিক একত্রে শক্তিশালী হলে প্রকল্প সত্যিকারের সমন্বিত সামাজিক সুরক্ষা ব্যবস্থা হিসেবে কাজ করতে পারবে বলে আশা করা যায়।
পাশাপাশি আরও গুরুত্বপূর্ণ হলো অর্থায়নের স্থায়িত্ব ও পরিকল্পিত ব্যবস্থাপনা। সামাজিক সুরক্ষা শুধুমাত্র সহায়তার নগদ প্রদান নয়; এটি একটি দীর্ঘমেয়াদি নীতিগত প্রক্রিয়া যা মানবসম্পদ গঠন, বৈষম্য হ্রাস এবং সমাজে স্থিতিশীলতা প্রতিষ্ঠায় ভূমিকা রাখে। ফ্যামিলি কার্ডের মাধ্যমে যদি সুবিধা প্রকৃত দরিদ্র ও ঝুঁকিপূর্ণ পরিবারে পৌঁছায়, তা কেবল তাদের জীবনযাত্রা উন্নত করবে না, বরং সমাজে ন্যায্যতা ও আস্থার সংস্কৃতিও গড়ে তুলবে। রাজনৈতিক সদিচ্ছা, প্রশাসনিক দক্ষতা এবং নিয়মিত জনজবাবদিহিতার ওপর এই প্রকল্পের সফলতা নির্ভর করছে।
দীর্ঘমেয়াদি লক্ষ্য হিসেবে যদি ফ্যামিলি কার্ডকে দেশের প্রত্যেক দরিদ্র নাগরিকের জন্য সর্বজনীন সামাজিক পরিচয়পত্রে রূপান্তর করা যায় এবং বাজেট ও সম্পদের ব্যবহার সুশৃঙ্খলভাবে পরিচালিত হয়, তাহলে এটি বাংলাদেশের সামাজিক সুরক্ষা ব্যবস্থার এক যুগান্তকারী সংস্কার হিসেবে ইতিহাসে স্থান করে নিতে পারবে। এটি হতে পারে একটি শক্তিশালী কল্যাণ রাষ্ট্রের দৃষ্টান্তমূলক রূপ, যা মানুষকে মর্যাদাপূর্ণ জীবন, নিরাপত্তা ও সমান সুযোগ নিশ্চিত করার পথে একটি দৃষ্টান্ত স্থাপন করবে।

গত মাসে ভারতের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় দেশের প্রথম আনুষ্ঠানিক জাতীয় সন্ত্রাসবিরোধী নীতি ও কৌশল প্রকাশ করেছে। এর নাম দেওয়া হয়েছে ‘প্রহার’। এই ঐতিহাসিক দলিলটি প্রতিক্রিয়াশীল ও খণ্ডিত নিরাপত্তা কাঠামো থেকে সুসংগঠিত আইন-ভিত্তিক কাঠামোতে রূপান্তরের ইঙ্গিত—যা ভারতের বৈচিত্র্যময় নিরাপত্তা সংস্থাগুলোর জন্
৪ ঘণ্টা আগে
ইরানের বিরুদ্ধে চলমান যুদ্ধ নিয়ে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প নাকি ইলন মাস্কের এআই প্ল্যাটফর্ম ‘গ্রোক’—কে বেশি ঘোরের মধ্যে বাস করছেন, তা বলা মুশকিল। গ্রোক সম্প্রতি গ্লাসগোর একটি অগ্নিকাণ্ডের ভিডিওকে তেল আবিবের ঘটনা বলে চালিয়েছে।
১৮ ঘণ্টা আগে
দুনিয়ার এত এত ভাষায় কবিতাচর্চা হচ্ছে। কিন্তু আমরা ঘুরেফিরে চেনাপরিচিত কয়েকটি ভাষার কবিতার সঙ্গেই তুলনামূলক আলোচনা করে বিশ্বসাহিত্য বিষয়ক বোধের ঢেঁকুর তুলি। একদেড়শো বছর আগেকার বিশ্বকবিতার সমান্তরালে আমরা বাংলা কবিতাকে প্রায়শই তুলনা করি এবং সিদ্ধান্তে আসি।
২০ ঘণ্টা আগে
২৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৬। রাতের আঁধার তখনো পুরোপুরি কাটেনি। আমেরিকা আর ইসরাইলের যুদ্ধবিমান একসঙ্গে ঢুকে পড়ে ইরানের আকাশে। অপারেশন 'এপিক ফিউরি'। মিসাইল আর বোমার আঘাত হতে থাকে ইরানের পরমাণু স্থাপনাগুলোতে। বোমা পড়ে স্কুলে। নিহত হয় শত শত শিশু। সর্বোচ্চ নেতা আলি খামেনিও নিহত হন। পরদিন সকালে বিশ্বের মানুষ চোখ
১ দিন আগে