ড. মোহাম্মাদ আনিসুর রহমান

একটি স্বাধীন, গণতান্ত্রিক ও সভ্য রাষ্ট্রের অন্যতম স্তম্ভ হলো তার আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। আর এই বাহিনীর মধ্যে সাধারণ মানুষের সবচেয়ে কাছাকাছি থাকে পুলিশ। সমকালীন বাংলাদেশে গত কয়েক দশকে নানামুখী সংস্কার, আধুনিকায়ন এবং প্রযুক্তির ছোঁয়া লেগেছে পুলিশ বাহিনীতে। সময়ের প্রয়োজনে এবং আন্তর্জাতিক মানদণ্ড বজায় রাখতে একাধিকবার পরিবর্তন করা হয়েছে পুলিশের ইউনিফর্ম বা পোশাকের রং, লোগো এবং পোশাকের বাহ্যিক অবয়ব।
গত ১৮ জুন ২০২৬ (বৃহস্পতিবার) পুলিশ সদর দপ্তর এ-সংক্রান্ত একটি প্রজ্ঞাপন জারি করে। প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী, পুলিশ অধ্যাদেশ, ১৮৬১-এর ১২ ধারায় অর্পিত ক্ষমতাবলে সরকারের অনুমোদনক্রমে মহাপরিদর্শক (আইজিপি) পুলিশ ড্রেস রুলস, ২০২৫–এ সংশোধনী আনেন। সংশোধিত বিধান অনুসারে পুলিশের পোশাকের কাপড় ও রং-সংক্রান্ত পূর্ববর্তী নিয়মাবলিতে পরিবর্তন আনা হয়েছে। পাশাপাশি পুলিশের পোশাক ও লোগো চূড়ান্ত করে গেজেট প্রকাশের মাধ্যমে দীর্ঘদিনের এই পোশাক পরিবর্তনের আনুষ্ঠানিকতা একটি আইনি রূপ পেয়েছে।
সংশোধিত ড্রেস রুলস অনুযায়ী, অন্তর্বর্তী সরকারের সময় নির্ধারিত আয়রন রঙের শার্টের পরিবর্তে এখন ডিপ ব্লু রঙের শার্ট এবং কফি (শেইল) রঙের প্যান্টের পরিবর্তে খাকি রঙের ট্রাউজার পরিধান করা হবে। পাশাপাশি জ্যাকেট, জার্সি, কার্ডিগান ও পুলওভারের রঙও ডিপ ব্লু নির্ধারণ করা হয়েছে। তবে মেট্রোপলিটন পুলিশ সদস্যদের জন্য শার্ট ও জ্যাকেটের রং লাইট অলিভ রাখা হয়েছে।
২০২৬ সালের এই জুনের তপ্ত বাস্তবতায় দাঁড়িয়ে যখন আমরা পুলিশের এই নতুন অবয়ব পোশাকের গেজেট কার্যকরের কথা শুনছি, তখন সাধারণ মানুষের মনের কোণে এক গভীর নাগরিক প্রশ্ন উঁকি দিচ্ছে। পোশাকের ফেব্রিক বা ডিজাইন হয়তো বদলেছে, কিন্তু সাধারণ মানুষের সাথে পুলিশের আচরণগত মানসিকতা কি আদৌ বদলেছে? ঔপনিবেশিক আমলের ‘শাসক’ বা ‘ভয়ের প্রতীক’ হওয়ার যে সংস্কৃতি, তা থেকে বের হয়ে পুলিশ কি সত্যিই ‘জনগণের সেবক’ হতে পেরেছে? এই চিরচেনা বাস্তবতায় আজ অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে খতিয়ে দেখা দরকার—পুলিশের পোশাক বদলালেও মন ও প্রাতিষ্ঠানিক মানসিকতা কেন বদলায় না?
বাংলাদেশ পুলিশের সমকালীন অগ্রযাত্রাকে পূর্ণতা দিতে হলে এর ঐতিহাসিক লিগ্যাসি বা উত্তরাধিকারের বিষয়টি ইতিবাচক দৃষ্টিকোণ থেকে মূল্যায়ন করা প্রয়োজন। ১৮৬১ সালের ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক আমলের পুলিশ আইনের ওপর ভিত্তি করে এই উপমহাদেশে যে পুলিশি ব্যবস্থার গোড়াপত্তন হয়েছিল, তার মূল লক্ষ্য ছিল ‘জনগণকে দমনের মাধ্যমে’ ঔপনিবেশিক শাসন ও নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখা।
স্বাধীনতার পর থেকে আজ ২০২৬ সালের এই আধুনিক যুগ পর্যন্ত বাংলাদেশ পুলিশ সেই পুরোনো 'দমন ও শাসনে’র বৃত্ত থেকে বেরিয়ে এসে একটি জনবান্ধব সেবা সংস্থায় রূপান্তরের জন্য নিরলস চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। তবে প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কৃতির এই মনস্তাত্ত্বিক পরিবর্তন একটি দীর্ঘমেয়াদি প্রক্রিয়া।
পোশাক পরিধান করার অর্থ যে ক্ষমতার প্রদর্শন নয়, বরং নাগরিক সুরক্ষার এক বিশাল দায়িত্ব—এই বোধটি বর্তমান প্রজন্মের পুলিশ সদস্যদের মাঝে ক্রমশ ছড়িয়ে পড়ছে। বাহ্যিক পোশাক ও লোগো পরিবর্তনের এই ইতিবাচক ক্ষণে অভ্যন্তরীণ মনস্তাত্ত্বিক রূপান্তরকে আরও বেগবান করা গেলে ঔপনিবেশিক আমলের অবশেষ পুরোপুরি মুছে ফেলে একটি শতভাগ পেশাদার বাহিনী গড়ে তোলা সম্ভব হবে।
একটি দেশের পুলিশি সেবার গুণগত মান ও জনবান্ধব চরিত্রের আসল প্রতিফলন ঘটে দেশের থানাগুলোতে। সাধারণ মানুষ যখন কোনো বিপদে পড়ে তখন প্রথমেই সৃষ্টিকর্তার সাহায্য কামনার পাশাপাশি শেষ আশ্রয় হিসেবে পুলিশকে সহায় ভেবে থানায় জিডি বা মামলা করতে যান, তখন তাঁদের আইনি সুরক্ষা প্রাপ্তির অভিজ্ঞতাকে আরও সহজ ও স্বস্তিদায়ক করার সুযোগ রয়েছে।
বর্তমান সময়ে দেশের থানাগুলোর ভৌত অবকাঠামো অনেক আধুনিক ও প্রযুক্তিনির্ভর করা হয়েছে। তবে এই বাহ্যিক উন্নয়নের পাশাপাশি ওয়ান-স্টপ সার্ভিসকে আরও কার্যকর করা এবং সাধারণ নাগরিকদের ওয়ান-টু-ওয়ান সেবা প্রাপ্তি নিশ্চিত করা জরুরি, যাতে থানায় যাওয়ার ক্ষেত্রে প্রথাগত ভীতি দূর হয়।
বিভিন্ন সময়ে গণমাধ্যমে দালাল সংস্কৃতি বা প্রাতিষ্ঠানিক জটিলতার যেসব খণ্ডচিত্র উঠে আসে, তা দূরীকরণে পুলিশ প্রশাসন এখন অত্যন্ত আন্তরিক। পোশাকের ফেব্রিক বা কাপড়ের আধুনিকায়নের সাথে সাথে থানার অভ্যন্তরীণ পরিবেশকে সম্পূর্ণ বৈরীমুক্ত, প্রীতিময় ও পেশাদার করে তোলার যে উদ্যোগ চলমান রয়েছে, তা সাধারণ মানুষের মনে পুলিশের প্রতি আস্থার জায়গাকে চিরস্থায়ী ও সুদৃঢ় করবে।
বাংলাদেশ পুলিশকে একটি স্বাবলম্বী ও যুগোপযোগী প্রতিষ্ঠান হিসেবে গড়ে তুলতে হলে এর অভ্যন্তরীণ পেশাদারত্বকে সর্বোচ্চ স্তরে নিয়ে যাওয়া জরুরি। একটি শক্তিশালী আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর মূল চালিকাশক্তি হলো তার অভ্যন্তরীণ জবাবদিহি। মাঠপর্যায়ে ক্ষমতার অপব্যবহার বা সাধারণ নাগরিকদের হয়রানির মতো যেসব অভিযোগ ওঠে, তা পুরো বাহিনীর অক্লান্ত পরিশ্রম ও অর্জনকে আড়াল করে দেয়।
এই ধরনের পরিস্থিতি এড়াতে প্রাতিষ্ঠানিক জবাবদিহি নিশ্চিত করা অত্যন্ত জরুরি। অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায়, অভিযুক্ত কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে কেবল ‘ক্লোজড’ করা বা ‘বদলি’র মতো সাময়িক প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়া হয়, যা সাধারণ মানুষের প্রত্যাশার সাথে পুরোপুরি সংগতিপূর্ণ হয় না। অতীতে বিভিন্ন সময়ে রাজনৈতিক ও সামাজিক বলয়ের নানামুখী প্রভাবের কারণে পুলিশের মূল দায়িত্ব পালনে কিছু প্রাতিষ্ঠানিক চ্যালেঞ্জ তৈরি হয়েছে। যখন কোনো পেশাদার বাহিনীর মূল্যায়ন ও পদায়ন সম্পূর্ণ মেধা, সততা, দক্ষতা ও মাঠপর্যায়ের যোগ্যতার ভিত্তিতে করার নিয়মটি আরও শক্তিশালী হয়, তখন সামগ্রিক বাহিনীর কাজের গতি বহুগুণ বেড়ে যায়।
২০২৬ সালের এই প্রতিযোগিতাপূর্ণ সময়ে এসেও বদলি, পদোন্নতি কিংবা গুরুত্বপূর্ণ পোস্টিংয়ের ক্ষেত্রে লবিং বা বাহ্যিক সংযোগের যে সংস্কৃতি পরিলক্ষিত হয়, তা সৎ ও নিবেদিতপ্রাণ কর্মকর্তাদের কাজের উৎসাহকে কিছুটা ম্লান করতে পারে। এই প্রাতিষ্ঠানিক চর্চাকে পেছনে ফেলে সম্পূর্ণ নিরপেক্ষ ও মেধাভিত্তিক মূল্যায়ন ব্যবস্থা জোরদার করা গেলে পুলিশ সদস্যদের মনস্তত্ত্ব জনগণের সেবায় আরও দৃঢ়ভাবে নিয়োজিত হবে।
পুলিশ বাহিনীর মানসিকতাকে সম্পূর্ণ জনমুখী করতে হলে এর প্রবেশপথ, অর্থাৎ নিয়োগপ্রক্রিয়ার শতভাগ স্বচ্ছতা ধরে রাখা জরুরি। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে কনস্টেবল বা সাব-ইন্সপেক্টর নিয়োগে ডিজিটাল প্রযুক্তি ব্যবহারের মাধ্যমে যে ইতিবাচক ও মেধাভিত্তিক পরিবর্তন আনা হয়েছে, তা নিঃসন্দেহে বড় একটি অর্জন এবং প্রশংসার দাবিদার। তবে মাঠপর্যায়ের বাস্তবতায় পোস্টিং বা দায়িত্ব বণ্টনের ক্ষেত্রে যে ধরনের অনৈতিক বা বাণিজ্যিক প্রভাবের গুঞ্জন শোনা যায়, তা পুরোপুরি নির্মূল করা প্রয়োজন।
একজন পুলিশ সদস্য যখন কোনো প্রকার লবিং বা আর্থিক লেনদেন ছাড়া নিজের যোগ্যতায় নিয়োগ ও পদায়ন পাবেন, তখন স্বাভাবিকভাবেই তাঁর কাজের মূল লক্ষ্য হবে নাগরিক সেবা। অনৈতিক প্রভাবের এই বাণিজ্যিক চক্র থেকে প্রতিষ্ঠানকে মুক্ত রাখতে পারলে প্রতিটি পুলিশ কর্মকর্তার মন ও কর্ম সুনির্দিষ্ট নিয়মে জনসেবামূলক এবং মানবিক হয়ে উঠবে।
পোশাকের আধুনিকায়ন এবং নতুন গেজেট প্রকাশের পেছনে রাষ্ট্র যে অর্থ ও শ্রম ব্যয় করছে, তার প্রকৃত সুফল তখনই মিলবে যখন সমপরিমাণ মনোযোগ পুলিশ সদস্যদের মনস্তাত্ত্বিক উন্নয়ন ও আচরণগত প্রশিক্ষণে দেওয়া হবে। বিশ্বের উন্নত গণতান্ত্রিক দেশগুলোর 'সার্ভিস ফার্স্ট' বা সেবা সর্বাগ্রে—এই মূল দর্শনকে ধারণ করে আমাদের পুলিশ একাডেমি বা প্রশিক্ষণ কেন্দ্রগুলোর সিলেবাসে শারীরিক কসরত ও কঠোর আইন শিক্ষার পাশাপাশি মানবাধিকার, জেন্ডার সংবেদনশীলতা, শিশু অধিকার এবং মনস্তাত্ত্বিক আচরণের ওপর গুরুত্ব আরও বৃদ্ধি করা প্রয়োজন।
চব্বিশ ঘণ্টার কঠিন ‘সার্ভিস অন ডিউটি’র কারণে পুলিশ সদস্যদের যে মানসিক চাপ তৈরি হয়, তা নিরসনে নিয়মিত স্ট্রেস ম্যানেজমেন্ট কোর্সের পাশাপাশি ‘কমিউনিটি পুলিশিং’ এবং ‘মনস্তাত্ত্বিক কাউন্সিলিং’ প্রাতিষ্ঠানিক স্তরে যুক্ত করা দরকার। কেবল চাকরিতে প্রবেশের সময়ই নয়, বরং চাকরি জীবনের প্রতিটি স্তরে এবং পদোন্নতির ক্ষেত্রে আচরণগত মূল্যায়নকে (Behavioral Assessment) অন্যতম প্রধান শর্ত হিসেবে বিবেচনা করা উচিত।
পুলিশ সদস্যদের শেখানো দরকার কীভাবে একজন ভুক্তভোগীর কথা মনোযোগ দিয়ে শুনতে হয়, কীভাবে জেন্ডার-সংবেদনশীল আচরণ করতে হয় এবং নারী, শিশু ও প্রবীণদের সাথে কেমন ব্যবহার করা উচিত। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র বা ইউরোপের উন্নত দেশগুলোতে পুলিশকে প্রথম দিন থেকেই ‘কমিউনিটি কেয়ারগিভার’ বা নাগরিক সহায়তাকারী হিসেবে গড়ে তোলা হয়। আচরণগত পরিবর্তন না এলে পোশাক যতই আকর্ষণীয় হোক না কেন, জনগণের সাথে পুলিশের এই মনস্তাত্ত্বিক দূরত্ব কখনোই কমবেশি হবে না।
রাষ্ট্র পুলিশ বাহিনীকে যে আইনি ক্ষমতা ও পোশাক প্রদান করেছে, তা মূলত নাগরিকদের জানমালের সুরক্ষা ও সমাজে শান্তি শৃঙ্খলা বজায় রাখার জন্য। এই পোশাক এবং আইনি ক্ষমতার ব্যবহার যখন গভীর মানবিক মূল্যবোধ ও মনস্তাত্ত্বিক প্রজ্ঞার দ্বারা পরিচালিত হয়, তখন তা একটি দেশের মানবাধিকারের চিত্রকে বিশ্বমঞ্চে উজ্জ্বল করে তোলে।
মনস্তাত্ত্বিক প্রশিক্ষণের মাধ্যমে পুলিশ সদস্যদের মনে এই চেতনাটি প্রতিনিয়ত জাগ্রত রাখা প্রয়োজন যে, আইনি ক্ষমতার প্রয়োগ যেন সর্বদা আইনগত কাঠামোর ভেতরে এবং অত্যন্ত সংবেদনশীলতার সাথে হয়। অপরাধ দমনের ক্ষেত্রে কঠোরতা এবং সাধারণ নিরপরাধ নাগরিকদের ক্ষেত্রে সহমর্মিতা—এই দুয়ের ভারসাম্য বজায় রাখাই হলো প্রকৃত পেশাদারত্ব। এই মনস্তাত্ত্বিক রূপান্তরই পুলিশ বাহিনীকে একটি সম্মানিত ও প্রশ্নাতীত জবাবদিহিমূলক প্রতিষ্ঠান হিসেবে টিকিয়ে রাখবে।
২০২৬ সালের এই তথ্যপ্রযুক্তির যুগে বাংলাদেশ পুলিশের প্রতিটি থানা ও সেবা কেন্দ্রকে ডিজিটালাইজড করা হচ্ছে, যার মধ্যে অন্যতম এক যুগান্তকারী ও ইতিবাচক পদক্ষেপ হলো 'অনলাইন জিডি' (Online GD) ব্যবস্থার প্রবর্তন। এই ডিজিটাল সেবার ফলে সাধারণ মানুষ এখন ঘরে বসেই অত্যন্ত সহজে এবং কম সময়ে ডায়েরি করার সুযোগ পাচ্ছেন, যা পুলিশের সেবাকে সরাসরি জনগণের দোরগোড়ায় পৌঁছে দিয়েছে। তবে প্রযুক্তির এই চমৎকার সুবিধার পাশাপাশি মাঠপর্যায়ের কনস্টেবল থেকে শুরু করে সাব-ইন্সপেক্টরদের আচরণে যদি পেশাদারিত্বের আধুনিক ছোঁয়া না লাগে, তবে সেবার পূর্ণাঙ্গ উদ্দেশ্য সফল হবে না।
অনলাইন জিডি বা প্রথাগত মামলা গ্রহণের ক্ষেত্রে শতভাগ সময়ানুবর্তিতা এবং স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা যে অন্যতম প্রধান পেশাগত দায়িত্ব, তা আচরণগত প্রশিক্ষণের মাধ্যমে তৃণমূল পর্যায়ের কর্মকর্তাদের মাঝে ছড়িয়ে দেওয়া জরুরি। যখন একজন সাধারণ নাগরিক প্রযুক্তির ব্যবহারের পাশাপাশি থানায় গিয়েও কোনো প্রকার হয়রানি ছাড়া আন্তরিক আইনি সহায়তা পাবেন, তখন পুলিশের বাহ্যিক পোশাকের রং কী, তা আর মুখ্য থাকবে না; বরং পুলিশের সেবার মান ও ডিজিটাল উৎকর্ষই হবে তাঁদের আসল ইউনিফর্ম।
পুলিশ একা কখনোই একটি সমাজের অপরাধ সম্পূর্ণ নির্মূল করতে পারে না, এর জন্য প্রয়োজন সামাজিক অংশীদারিত্ব বা 'কমিউনিটি পুলিশিং'। আর এই কমিউনিটি পুলিশিং ব্যবস্থার সফলতার প্রধান শর্তই হলো জনগণের সাথে পুলিশের চমৎকার আচরণগত সুসম্পর্ক। মনস্তাত্ত্বিক ও আচরণগত প্রশিক্ষণের মাধ্যমে পুলিশ কর্মকর্তাদের এমনভাবে তৈরি করতে হবে যাতে তাঁরা প্রতিটি এলাকার সাধারণ মানুষের সাথে একটি সখ্যর সম্পর্ক গড়ে তুলতে পারেন। সমাজের গণ্যমান্য ব্যক্তি, তরুণ সমাজ ও সাধারণ নাগরিকদের সাথে নিয়মিত মতবিনিময় এবং তাঁদের মতামতকে গুরুত্ব দেওয়ার মাধ্যমে অপরাধ দমনের কাজ অনেক সহজ হয়ে যায়। পুলিশ যখন সমাজের একটি অংশ হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করতে পারবে, তখন অপরাধীরা সমাজে আর মাথাচাড়া দিয়ে উঠতে পারবে না।
পরিশেষে বলা যায়, পোশাক পরিবর্তন একটি প্রাতিষ্ঠানিক প্রক্রিয়ার অংশ হতে পারে, কিন্তু একটি সুশৃঙ্খল বাহিনীর সত্যিকার সৌন্দর্য নিহিত থাকে তার সদস্যদের মানবিক মূল্যবোধ, সততা এবং জনবান্ধব আচরণের মধ্যে। ২০২৬ সালের এই আধুনিক অর্থনৈতিক অগ্রযাত্রার যুগে আমরা যখন ‘স্মার্ট বাংলাদেশ’ বা ‘স্মার্ট পুলিশিং’-এর রূপরেখা বাস্তবায়ন করছি, তখন আমাদের মনে রাখতে হবে যে—আসল স্মার্টনেস কেবল অত্যাধুনিক প্রযুক্তি বা রঙিন পোশাকে নয়, বরং তা প্রতিফলিত হয় দেশের একজন সাধারণ নাগরিকের মুখে ফুটিয়ে তোলা স্বস্তির হাসিতে।
পোশাক পরিবর্তনের এই সময়ে আমাদের রাষ্ট্রীয় ও প্রাতিষ্ঠানিক মনোযোগ এখন নিবদ্ধ হোক আমাদের পুলিশ সদস্যদের আচরণগত উন্নয়ন এবং মানসিক স্বাস্থ্যের দিকে। আমরা দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি, সঠিক মনস্তাত্ত্বিক রূপান্তর এবং যুগোপযোগী আচরণগত প্রশিক্ষণের মাধ্যমে বাংলাদেশ পুলিশ বিশ্বের অন্যতম সেরা ও জনবান্ধব বাহিনী হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করবে এবং গর্বের সাথে স্লোগানটি বাস্তবায়ন করবে—‘পুলিশই জনতা, জনতাই পুলিশ’।
লেখক: জনস্বাস্থ্য ও সমাজনীতি বিষয়ক গবেষক; শিক্ষক ও চেয়ারম্যান, সমাজবিজ্ঞান বিভাগ, গোপালগঞ্জ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, গোপালগঞ্জ।

একটি স্বাধীন, গণতান্ত্রিক ও সভ্য রাষ্ট্রের অন্যতম স্তম্ভ হলো তার আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। আর এই বাহিনীর মধ্যে সাধারণ মানুষের সবচেয়ে কাছাকাছি থাকে পুলিশ। সমকালীন বাংলাদেশে গত কয়েক দশকে নানামুখী সংস্কার, আধুনিকায়ন এবং প্রযুক্তির ছোঁয়া লেগেছে পুলিশ বাহিনীতে। সময়ের প্রয়োজনে এবং আন্তর্জাতিক মানদণ্ড বজায় রাখতে একাধিকবার পরিবর্তন করা হয়েছে পুলিশের ইউনিফর্ম বা পোশাকের রং, লোগো এবং পোশাকের বাহ্যিক অবয়ব।
গত ১৮ জুন ২০২৬ (বৃহস্পতিবার) পুলিশ সদর দপ্তর এ-সংক্রান্ত একটি প্রজ্ঞাপন জারি করে। প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী, পুলিশ অধ্যাদেশ, ১৮৬১-এর ১২ ধারায় অর্পিত ক্ষমতাবলে সরকারের অনুমোদনক্রমে মহাপরিদর্শক (আইজিপি) পুলিশ ড্রেস রুলস, ২০২৫–এ সংশোধনী আনেন। সংশোধিত বিধান অনুসারে পুলিশের পোশাকের কাপড় ও রং-সংক্রান্ত পূর্ববর্তী নিয়মাবলিতে পরিবর্তন আনা হয়েছে। পাশাপাশি পুলিশের পোশাক ও লোগো চূড়ান্ত করে গেজেট প্রকাশের মাধ্যমে দীর্ঘদিনের এই পোশাক পরিবর্তনের আনুষ্ঠানিকতা একটি আইনি রূপ পেয়েছে।
সংশোধিত ড্রেস রুলস অনুযায়ী, অন্তর্বর্তী সরকারের সময় নির্ধারিত আয়রন রঙের শার্টের পরিবর্তে এখন ডিপ ব্লু রঙের শার্ট এবং কফি (শেইল) রঙের প্যান্টের পরিবর্তে খাকি রঙের ট্রাউজার পরিধান করা হবে। পাশাপাশি জ্যাকেট, জার্সি, কার্ডিগান ও পুলওভারের রঙও ডিপ ব্লু নির্ধারণ করা হয়েছে। তবে মেট্রোপলিটন পুলিশ সদস্যদের জন্য শার্ট ও জ্যাকেটের রং লাইট অলিভ রাখা হয়েছে।
২০২৬ সালের এই জুনের তপ্ত বাস্তবতায় দাঁড়িয়ে যখন আমরা পুলিশের এই নতুন অবয়ব পোশাকের গেজেট কার্যকরের কথা শুনছি, তখন সাধারণ মানুষের মনের কোণে এক গভীর নাগরিক প্রশ্ন উঁকি দিচ্ছে। পোশাকের ফেব্রিক বা ডিজাইন হয়তো বদলেছে, কিন্তু সাধারণ মানুষের সাথে পুলিশের আচরণগত মানসিকতা কি আদৌ বদলেছে? ঔপনিবেশিক আমলের ‘শাসক’ বা ‘ভয়ের প্রতীক’ হওয়ার যে সংস্কৃতি, তা থেকে বের হয়ে পুলিশ কি সত্যিই ‘জনগণের সেবক’ হতে পেরেছে? এই চিরচেনা বাস্তবতায় আজ অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে খতিয়ে দেখা দরকার—পুলিশের পোশাক বদলালেও মন ও প্রাতিষ্ঠানিক মানসিকতা কেন বদলায় না?
বাংলাদেশ পুলিশের সমকালীন অগ্রযাত্রাকে পূর্ণতা দিতে হলে এর ঐতিহাসিক লিগ্যাসি বা উত্তরাধিকারের বিষয়টি ইতিবাচক দৃষ্টিকোণ থেকে মূল্যায়ন করা প্রয়োজন। ১৮৬১ সালের ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক আমলের পুলিশ আইনের ওপর ভিত্তি করে এই উপমহাদেশে যে পুলিশি ব্যবস্থার গোড়াপত্তন হয়েছিল, তার মূল লক্ষ্য ছিল ‘জনগণকে দমনের মাধ্যমে’ ঔপনিবেশিক শাসন ও নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখা।
স্বাধীনতার পর থেকে আজ ২০২৬ সালের এই আধুনিক যুগ পর্যন্ত বাংলাদেশ পুলিশ সেই পুরোনো 'দমন ও শাসনে’র বৃত্ত থেকে বেরিয়ে এসে একটি জনবান্ধব সেবা সংস্থায় রূপান্তরের জন্য নিরলস চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। তবে প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কৃতির এই মনস্তাত্ত্বিক পরিবর্তন একটি দীর্ঘমেয়াদি প্রক্রিয়া।
পোশাক পরিধান করার অর্থ যে ক্ষমতার প্রদর্শন নয়, বরং নাগরিক সুরক্ষার এক বিশাল দায়িত্ব—এই বোধটি বর্তমান প্রজন্মের পুলিশ সদস্যদের মাঝে ক্রমশ ছড়িয়ে পড়ছে। বাহ্যিক পোশাক ও লোগো পরিবর্তনের এই ইতিবাচক ক্ষণে অভ্যন্তরীণ মনস্তাত্ত্বিক রূপান্তরকে আরও বেগবান করা গেলে ঔপনিবেশিক আমলের অবশেষ পুরোপুরি মুছে ফেলে একটি শতভাগ পেশাদার বাহিনী গড়ে তোলা সম্ভব হবে।
একটি দেশের পুলিশি সেবার গুণগত মান ও জনবান্ধব চরিত্রের আসল প্রতিফলন ঘটে দেশের থানাগুলোতে। সাধারণ মানুষ যখন কোনো বিপদে পড়ে তখন প্রথমেই সৃষ্টিকর্তার সাহায্য কামনার পাশাপাশি শেষ আশ্রয় হিসেবে পুলিশকে সহায় ভেবে থানায় জিডি বা মামলা করতে যান, তখন তাঁদের আইনি সুরক্ষা প্রাপ্তির অভিজ্ঞতাকে আরও সহজ ও স্বস্তিদায়ক করার সুযোগ রয়েছে।
বর্তমান সময়ে দেশের থানাগুলোর ভৌত অবকাঠামো অনেক আধুনিক ও প্রযুক্তিনির্ভর করা হয়েছে। তবে এই বাহ্যিক উন্নয়নের পাশাপাশি ওয়ান-স্টপ সার্ভিসকে আরও কার্যকর করা এবং সাধারণ নাগরিকদের ওয়ান-টু-ওয়ান সেবা প্রাপ্তি নিশ্চিত করা জরুরি, যাতে থানায় যাওয়ার ক্ষেত্রে প্রথাগত ভীতি দূর হয়।
বিভিন্ন সময়ে গণমাধ্যমে দালাল সংস্কৃতি বা প্রাতিষ্ঠানিক জটিলতার যেসব খণ্ডচিত্র উঠে আসে, তা দূরীকরণে পুলিশ প্রশাসন এখন অত্যন্ত আন্তরিক। পোশাকের ফেব্রিক বা কাপড়ের আধুনিকায়নের সাথে সাথে থানার অভ্যন্তরীণ পরিবেশকে সম্পূর্ণ বৈরীমুক্ত, প্রীতিময় ও পেশাদার করে তোলার যে উদ্যোগ চলমান রয়েছে, তা সাধারণ মানুষের মনে পুলিশের প্রতি আস্থার জায়গাকে চিরস্থায়ী ও সুদৃঢ় করবে।
বাংলাদেশ পুলিশকে একটি স্বাবলম্বী ও যুগোপযোগী প্রতিষ্ঠান হিসেবে গড়ে তুলতে হলে এর অভ্যন্তরীণ পেশাদারত্বকে সর্বোচ্চ স্তরে নিয়ে যাওয়া জরুরি। একটি শক্তিশালী আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর মূল চালিকাশক্তি হলো তার অভ্যন্তরীণ জবাবদিহি। মাঠপর্যায়ে ক্ষমতার অপব্যবহার বা সাধারণ নাগরিকদের হয়রানির মতো যেসব অভিযোগ ওঠে, তা পুরো বাহিনীর অক্লান্ত পরিশ্রম ও অর্জনকে আড়াল করে দেয়।
এই ধরনের পরিস্থিতি এড়াতে প্রাতিষ্ঠানিক জবাবদিহি নিশ্চিত করা অত্যন্ত জরুরি। অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায়, অভিযুক্ত কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে কেবল ‘ক্লোজড’ করা বা ‘বদলি’র মতো সাময়িক প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়া হয়, যা সাধারণ মানুষের প্রত্যাশার সাথে পুরোপুরি সংগতিপূর্ণ হয় না। অতীতে বিভিন্ন সময়ে রাজনৈতিক ও সামাজিক বলয়ের নানামুখী প্রভাবের কারণে পুলিশের মূল দায়িত্ব পালনে কিছু প্রাতিষ্ঠানিক চ্যালেঞ্জ তৈরি হয়েছে। যখন কোনো পেশাদার বাহিনীর মূল্যায়ন ও পদায়ন সম্পূর্ণ মেধা, সততা, দক্ষতা ও মাঠপর্যায়ের যোগ্যতার ভিত্তিতে করার নিয়মটি আরও শক্তিশালী হয়, তখন সামগ্রিক বাহিনীর কাজের গতি বহুগুণ বেড়ে যায়।
২০২৬ সালের এই প্রতিযোগিতাপূর্ণ সময়ে এসেও বদলি, পদোন্নতি কিংবা গুরুত্বপূর্ণ পোস্টিংয়ের ক্ষেত্রে লবিং বা বাহ্যিক সংযোগের যে সংস্কৃতি পরিলক্ষিত হয়, তা সৎ ও নিবেদিতপ্রাণ কর্মকর্তাদের কাজের উৎসাহকে কিছুটা ম্লান করতে পারে। এই প্রাতিষ্ঠানিক চর্চাকে পেছনে ফেলে সম্পূর্ণ নিরপেক্ষ ও মেধাভিত্তিক মূল্যায়ন ব্যবস্থা জোরদার করা গেলে পুলিশ সদস্যদের মনস্তত্ত্ব জনগণের সেবায় আরও দৃঢ়ভাবে নিয়োজিত হবে।
পুলিশ বাহিনীর মানসিকতাকে সম্পূর্ণ জনমুখী করতে হলে এর প্রবেশপথ, অর্থাৎ নিয়োগপ্রক্রিয়ার শতভাগ স্বচ্ছতা ধরে রাখা জরুরি। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে কনস্টেবল বা সাব-ইন্সপেক্টর নিয়োগে ডিজিটাল প্রযুক্তি ব্যবহারের মাধ্যমে যে ইতিবাচক ও মেধাভিত্তিক পরিবর্তন আনা হয়েছে, তা নিঃসন্দেহে বড় একটি অর্জন এবং প্রশংসার দাবিদার। তবে মাঠপর্যায়ের বাস্তবতায় পোস্টিং বা দায়িত্ব বণ্টনের ক্ষেত্রে যে ধরনের অনৈতিক বা বাণিজ্যিক প্রভাবের গুঞ্জন শোনা যায়, তা পুরোপুরি নির্মূল করা প্রয়োজন।
একজন পুলিশ সদস্য যখন কোনো প্রকার লবিং বা আর্থিক লেনদেন ছাড়া নিজের যোগ্যতায় নিয়োগ ও পদায়ন পাবেন, তখন স্বাভাবিকভাবেই তাঁর কাজের মূল লক্ষ্য হবে নাগরিক সেবা। অনৈতিক প্রভাবের এই বাণিজ্যিক চক্র থেকে প্রতিষ্ঠানকে মুক্ত রাখতে পারলে প্রতিটি পুলিশ কর্মকর্তার মন ও কর্ম সুনির্দিষ্ট নিয়মে জনসেবামূলক এবং মানবিক হয়ে উঠবে।
পোশাকের আধুনিকায়ন এবং নতুন গেজেট প্রকাশের পেছনে রাষ্ট্র যে অর্থ ও শ্রম ব্যয় করছে, তার প্রকৃত সুফল তখনই মিলবে যখন সমপরিমাণ মনোযোগ পুলিশ সদস্যদের মনস্তাত্ত্বিক উন্নয়ন ও আচরণগত প্রশিক্ষণে দেওয়া হবে। বিশ্বের উন্নত গণতান্ত্রিক দেশগুলোর 'সার্ভিস ফার্স্ট' বা সেবা সর্বাগ্রে—এই মূল দর্শনকে ধারণ করে আমাদের পুলিশ একাডেমি বা প্রশিক্ষণ কেন্দ্রগুলোর সিলেবাসে শারীরিক কসরত ও কঠোর আইন শিক্ষার পাশাপাশি মানবাধিকার, জেন্ডার সংবেদনশীলতা, শিশু অধিকার এবং মনস্তাত্ত্বিক আচরণের ওপর গুরুত্ব আরও বৃদ্ধি করা প্রয়োজন।
চব্বিশ ঘণ্টার কঠিন ‘সার্ভিস অন ডিউটি’র কারণে পুলিশ সদস্যদের যে মানসিক চাপ তৈরি হয়, তা নিরসনে নিয়মিত স্ট্রেস ম্যানেজমেন্ট কোর্সের পাশাপাশি ‘কমিউনিটি পুলিশিং’ এবং ‘মনস্তাত্ত্বিক কাউন্সিলিং’ প্রাতিষ্ঠানিক স্তরে যুক্ত করা দরকার। কেবল চাকরিতে প্রবেশের সময়ই নয়, বরং চাকরি জীবনের প্রতিটি স্তরে এবং পদোন্নতির ক্ষেত্রে আচরণগত মূল্যায়নকে (Behavioral Assessment) অন্যতম প্রধান শর্ত হিসেবে বিবেচনা করা উচিত।
পুলিশ সদস্যদের শেখানো দরকার কীভাবে একজন ভুক্তভোগীর কথা মনোযোগ দিয়ে শুনতে হয়, কীভাবে জেন্ডার-সংবেদনশীল আচরণ করতে হয় এবং নারী, শিশু ও প্রবীণদের সাথে কেমন ব্যবহার করা উচিত। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র বা ইউরোপের উন্নত দেশগুলোতে পুলিশকে প্রথম দিন থেকেই ‘কমিউনিটি কেয়ারগিভার’ বা নাগরিক সহায়তাকারী হিসেবে গড়ে তোলা হয়। আচরণগত পরিবর্তন না এলে পোশাক যতই আকর্ষণীয় হোক না কেন, জনগণের সাথে পুলিশের এই মনস্তাত্ত্বিক দূরত্ব কখনোই কমবেশি হবে না।
রাষ্ট্র পুলিশ বাহিনীকে যে আইনি ক্ষমতা ও পোশাক প্রদান করেছে, তা মূলত নাগরিকদের জানমালের সুরক্ষা ও সমাজে শান্তি শৃঙ্খলা বজায় রাখার জন্য। এই পোশাক এবং আইনি ক্ষমতার ব্যবহার যখন গভীর মানবিক মূল্যবোধ ও মনস্তাত্ত্বিক প্রজ্ঞার দ্বারা পরিচালিত হয়, তখন তা একটি দেশের মানবাধিকারের চিত্রকে বিশ্বমঞ্চে উজ্জ্বল করে তোলে।
মনস্তাত্ত্বিক প্রশিক্ষণের মাধ্যমে পুলিশ সদস্যদের মনে এই চেতনাটি প্রতিনিয়ত জাগ্রত রাখা প্রয়োজন যে, আইনি ক্ষমতার প্রয়োগ যেন সর্বদা আইনগত কাঠামোর ভেতরে এবং অত্যন্ত সংবেদনশীলতার সাথে হয়। অপরাধ দমনের ক্ষেত্রে কঠোরতা এবং সাধারণ নিরপরাধ নাগরিকদের ক্ষেত্রে সহমর্মিতা—এই দুয়ের ভারসাম্য বজায় রাখাই হলো প্রকৃত পেশাদারত্ব। এই মনস্তাত্ত্বিক রূপান্তরই পুলিশ বাহিনীকে একটি সম্মানিত ও প্রশ্নাতীত জবাবদিহিমূলক প্রতিষ্ঠান হিসেবে টিকিয়ে রাখবে।
২০২৬ সালের এই তথ্যপ্রযুক্তির যুগে বাংলাদেশ পুলিশের প্রতিটি থানা ও সেবা কেন্দ্রকে ডিজিটালাইজড করা হচ্ছে, যার মধ্যে অন্যতম এক যুগান্তকারী ও ইতিবাচক পদক্ষেপ হলো 'অনলাইন জিডি' (Online GD) ব্যবস্থার প্রবর্তন। এই ডিজিটাল সেবার ফলে সাধারণ মানুষ এখন ঘরে বসেই অত্যন্ত সহজে এবং কম সময়ে ডায়েরি করার সুযোগ পাচ্ছেন, যা পুলিশের সেবাকে সরাসরি জনগণের দোরগোড়ায় পৌঁছে দিয়েছে। তবে প্রযুক্তির এই চমৎকার সুবিধার পাশাপাশি মাঠপর্যায়ের কনস্টেবল থেকে শুরু করে সাব-ইন্সপেক্টরদের আচরণে যদি পেশাদারিত্বের আধুনিক ছোঁয়া না লাগে, তবে সেবার পূর্ণাঙ্গ উদ্দেশ্য সফল হবে না।
অনলাইন জিডি বা প্রথাগত মামলা গ্রহণের ক্ষেত্রে শতভাগ সময়ানুবর্তিতা এবং স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা যে অন্যতম প্রধান পেশাগত দায়িত্ব, তা আচরণগত প্রশিক্ষণের মাধ্যমে তৃণমূল পর্যায়ের কর্মকর্তাদের মাঝে ছড়িয়ে দেওয়া জরুরি। যখন একজন সাধারণ নাগরিক প্রযুক্তির ব্যবহারের পাশাপাশি থানায় গিয়েও কোনো প্রকার হয়রানি ছাড়া আন্তরিক আইনি সহায়তা পাবেন, তখন পুলিশের বাহ্যিক পোশাকের রং কী, তা আর মুখ্য থাকবে না; বরং পুলিশের সেবার মান ও ডিজিটাল উৎকর্ষই হবে তাঁদের আসল ইউনিফর্ম।
পুলিশ একা কখনোই একটি সমাজের অপরাধ সম্পূর্ণ নির্মূল করতে পারে না, এর জন্য প্রয়োজন সামাজিক অংশীদারিত্ব বা 'কমিউনিটি পুলিশিং'। আর এই কমিউনিটি পুলিশিং ব্যবস্থার সফলতার প্রধান শর্তই হলো জনগণের সাথে পুলিশের চমৎকার আচরণগত সুসম্পর্ক। মনস্তাত্ত্বিক ও আচরণগত প্রশিক্ষণের মাধ্যমে পুলিশ কর্মকর্তাদের এমনভাবে তৈরি করতে হবে যাতে তাঁরা প্রতিটি এলাকার সাধারণ মানুষের সাথে একটি সখ্যর সম্পর্ক গড়ে তুলতে পারেন। সমাজের গণ্যমান্য ব্যক্তি, তরুণ সমাজ ও সাধারণ নাগরিকদের সাথে নিয়মিত মতবিনিময় এবং তাঁদের মতামতকে গুরুত্ব দেওয়ার মাধ্যমে অপরাধ দমনের কাজ অনেক সহজ হয়ে যায়। পুলিশ যখন সমাজের একটি অংশ হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করতে পারবে, তখন অপরাধীরা সমাজে আর মাথাচাড়া দিয়ে উঠতে পারবে না।
পরিশেষে বলা যায়, পোশাক পরিবর্তন একটি প্রাতিষ্ঠানিক প্রক্রিয়ার অংশ হতে পারে, কিন্তু একটি সুশৃঙ্খল বাহিনীর সত্যিকার সৌন্দর্য নিহিত থাকে তার সদস্যদের মানবিক মূল্যবোধ, সততা এবং জনবান্ধব আচরণের মধ্যে। ২০২৬ সালের এই আধুনিক অর্থনৈতিক অগ্রযাত্রার যুগে আমরা যখন ‘স্মার্ট বাংলাদেশ’ বা ‘স্মার্ট পুলিশিং’-এর রূপরেখা বাস্তবায়ন করছি, তখন আমাদের মনে রাখতে হবে যে—আসল স্মার্টনেস কেবল অত্যাধুনিক প্রযুক্তি বা রঙিন পোশাকে নয়, বরং তা প্রতিফলিত হয় দেশের একজন সাধারণ নাগরিকের মুখে ফুটিয়ে তোলা স্বস্তির হাসিতে।
পোশাক পরিবর্তনের এই সময়ে আমাদের রাষ্ট্রীয় ও প্রাতিষ্ঠানিক মনোযোগ এখন নিবদ্ধ হোক আমাদের পুলিশ সদস্যদের আচরণগত উন্নয়ন এবং মানসিক স্বাস্থ্যের দিকে। আমরা দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি, সঠিক মনস্তাত্ত্বিক রূপান্তর এবং যুগোপযোগী আচরণগত প্রশিক্ষণের মাধ্যমে বাংলাদেশ পুলিশ বিশ্বের অন্যতম সেরা ও জনবান্ধব বাহিনী হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করবে এবং গর্বের সাথে স্লোগানটি বাস্তবায়ন করবে—‘পুলিশই জনতা, জনতাই পুলিশ’।
লেখক: জনস্বাস্থ্য ও সমাজনীতি বিষয়ক গবেষক; শিক্ষক ও চেয়ারম্যান, সমাজবিজ্ঞান বিভাগ, গোপালগঞ্জ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, গোপালগঞ্জ।

একজন নারী কখন সবচেয়ে নিঃশব্দে কাঁদেন? যখন প্রতারণাটা বোঝার ভাষা থাকে না, অভিযোগ করার জায়গা থাকে না, আর সংসারটা টিকিয়ে রাখার দায় থেকেও মুক্তি নেই। যখন তিনি জানতে পারেন যাঁকে একমাত্র ভেবে এসেছেন এত বছর, জীবনের সবচেয়ে সুন্দর সময়গুলো উৎসর্গ করেছেন, তিনি আসলে গোপনে আরেকটি সংসার পেতে রেখেছেন।
৩ ঘণ্টা আগে
দেশের অন্যতম শীর্ষস্থানীয় শিল্পগোষ্ঠী সিটি গ্রুপের চলমান আর্থিক সংকট ও সাড়ে ২৬ হাজার কোটি টাকার ঋণ পুনর্গঠনের উদ্যোগ দেশের সার্বিক অর্থনীতির জন্য একটি বড় সতর্কবার্তা। এই প্রতিষ্ঠানটির বর্তমান দশা কেবল তাদের নিজস্ব সংকট নয়, বরং এটি দেশের সামগ্রিক ব্যবসা-বাণিজ্য এবং অর্থনীতির একটি ‘টেস্ট কেস’।
৪ ঘণ্টা আগে
গত ১৩ জুন দিনভর সোশ্যাল মিডিয়ায় একটি ভিডিও এবং কয়েকটি ছবি অনেকেই শেয়ার করেন। সেখানে দেখা যাচ্ছে, নদী খননের মাটিতে ঢাকা পড়েছে একটি আশ্রয়ণ প্রকল্পের বেশ কিছু ঘর। ২০ থেকে ৩০ ফুট উঁচু কাদামাটির স্তূপ তৈরি হয়েছে।
৭ ঘণ্টা আগে
একটি রক্তক্ষয়ী গণঅভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে অর্জিত নতুন বাংলাদেশে মানুষ রাষ্ট্র পরিচালনার প্রতিটি ক্ষেত্রে ইতিবাচক পরিবর্তন দেখতে চায়। বিশেষ করে সরকারি অর্থ ও ক্ষমতায় ব্যক্তিস্বার্থ বা পারিবারিকীকরণের যে সংস্কৃতি কয়েক দশকে জেঁকে বসেছিল, তার অবসান জরুরি।
৭ ঘণ্টা আগে