জুলাই গণঅভ্যুত্থানের দুই বছর
আজমেরী হক বাঁধন

জুলাই আন্দোলনে শহীদ আবু সাঈদের মৃত্যু আমাকে প্রবলভাবে নাড়া দিলেও আমাকে সরাসরি রাজপথে নামতে বাধ্য করেছিল শিশু রিয়া গোপের মর্মান্তিক মৃত্যু। ছাদে খেলতে গিয়ে গুলিবিদ্ধ হওয়া ওই শিশুটির জায়গায় আমি বারবার আমার নিজের সন্তানকে কল্পনা করছিলাম। কারণ, আমার মেয়েও বিকেলবেলা বাবার সঙ্গে ছাদে খেলতে যায়, সাইকেল চালায়। আওয়ামী লীগের শাসনামলে আমি হয়তো কিছুটা সুবিধাপ্রাপ্ত ও নিরাপদ নাগরিক ছিলাম, কিন্তু সাধারণ মানুষের ভেতরের পুঞ্জীভূত ক্ষোভ যখন তীব্রতর হলো, তখন তা আমাদের মতো সুবিধাপ্রাপ্ত মানুষদেরও প্রবলভাবে আলোড়িত করেছিল।
জুলাইয়ের আন্দোলনকে অনেকেই বিদেশি চক্রান্ত, ডলারের প্রভাব বা জঙ্গি উত্থান বলে প্রোপাগান্ডা চালানোর চেষ্টা করেন, যা সম্পূর্ণ আজগুবি একটি ধারণা। রাজপথে আমি নিজের চোখে জিন্স-টি শার্ট পরা মেয়ের পাশাপাশি নেকাব পরা নারী, মাদ্রাসার শিক্ষার্থী, রিকশাওয়ালা, ফুচকা বিক্রেতা, সবজিওয়ালা এবং কোলে শিশু নিয়ে বেরিয়ে আসা গৃহবধূদের দেখেছি। এত বৈচিত্র্যময় সাধারণ মানুষকে কোনো চক্রান্ত বা অর্থের প্রলোভন দিয়ে রাজপথে নামানো অসম্ভব। এটি ছিল শোষিত হতে হতে একটি জাতির চূড়ান্ত বিস্ফোরণ।
যারা দীর্ঘকাল ক্ষমতাসীনদের পৃষ্ঠপোষকতায় সুবিধাভোগী ছিলেন, ক্ষমতার পালাবদলে তাদের হয়তো কষ্ট বেশি হচ্ছে। কিন্তু আপামর জনতা যেভাবে শোষিত হচ্ছিল, তারই অবধারিত বহিঃপ্রকাশ ঘটেছিল ২৪-এর জুলাই মাসে। রাজপথে নামা মানুষের মতাদর্শ বা বিশ্বাস ভিন্ন হলেও সবার লক্ষ্য ছিল একটাই—শেখ হাসিনার পতন। আমি রাজপথে দাঁড়িয়েই এটা অনুভব করেছিলাম। ৩ আগস্ট যখন শিক্ষার্থীদের ডাকে সারা দেশের প্রতিটি ঘরের মানুষ বেরিয়ে আসে, তখনই এই পতন অবধারিত হয়ে গিয়েছিল।
তৎকালীন স্বৈরাচারী সরকার দেশের মানুষকে পশুপাখির চেয়েও জঘন্যভাবে মূল্যায়ন করেছিল। নির্বিচারে গুলি করে মানুষ হত্যা, অযথা গণগ্রেপ্তার, ইন্টারনেট বন্ধ করে দেওয়া এবং এর পাশাপাশি তাদের নির্লজ্জ মিথ্যাচার ছিল চূড়ান্ত পর্যায়ের। একজন নাগরিক হিসেবে আমি চরম অপমানিত বোধ করেছি। অন্যায় করে সেটা লুকানোর জন্য সরকারপ্রধান থেকে শুরু করে মন্ত্রীরা যেভাবে ক্রমাগত মিথ্যাচার করে যাচ্ছিলেন, তা সুশীল ও শিক্ষিত সমাজের জন্য ছিল এক গভীর অপমানজনক পরিস্থিতি। ছাত্র-জনতার ওপর দিয়ে কী চরম বিভীষিকাময় সময় বয়ে গেছে, তা আজ সবারই জানা।
আন্দোলনের সময় জিন্স পরা মেয়ে, নেকাব পরা নারী কিংবা মাদ্রাসার ছেলের হাতে হাত রেখে যখন মিছিল করেছি, তখন সত্যি সত্যিই একটি নতুন বাংলাদেশের স্বপ্ন দেখেছিলাম। স্বপ্ন ছিল দুর্নীতিমুক্ত, বৈষম্যহীন, আইনের শাসনে পরিচালিত এক মানবিক সমাজের। কিন্তু অত্যন্ত আক্ষেপের বিষয় হলো, সেই স্বপ্ন অনেকটাই ম্লান হয়েছে। অন্তর্বর্তীকালীন সরকার কাজও আমাদের আশানুরূপ ছিল না। তাদের সময়ে শুরু হওয়া মব জাস্টিস, নারীর ওপর আক্রমণ, মাজার ভাঙচুর এবং মুক্তিযোদ্ধাদের ম্যুরাল ভাঙার মতো অরাজকতা আমরা কখনোই প্রত্যাশা করিনি। দুর্নীতি তো কমেইনি, বরং বহুগুণে বেড়েছে। যারা এত দিন সুযোগ পায়নি, তারা যেন হঠাৎ সুযোগ পেয়ে দেশকে লুটপাটের স্বর্গরাজ্য বানিয়ে ফেলেছিল। তা সত্ত্বেও অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রতি আমি কৃতজ্ঞ, কারণ তারা একটি সুষ্ঠু নির্বাচন উপহার দিতে পেরেছে, যার মাধ্যমে বর্তমানে একটি নির্বাচিত সরকার দেশ পরিচালনা করছে।
তবে নির্বাচিত রাজনৈতিক সরকারের চেয়ে আমার বেশি প্রত্যাশা ছিল অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের ওপর। কারণ রাজনৈতিক সরকারকে সবসময় জনমতের ওপর নির্ভরশীল থাকতে হয়, কিন্তু সমাজ কাঠামোর ও নারীর অবস্থানের মৌলিক পরিবর্তনের জন্য অন্তর্বর্তী সরকার কিছু কঠিন সিদ্ধান্ত নিতে পারত। আমাকে সবচেয়ে বেশি আহত করেছিল যখন নারী সংস্কার কমিশনের সদস্যদের প্রকাশ্যে সমাবেশ করে 'বেশ্যা' বলে গালি দেওয়া হলো। এত বড় একটি ঘটনার পরও সরকারের নিশ্চুপ ভূমিকা প্রমাণ করেছে যে, এ দেশে নারীর অবস্থান আজও কতটা ঠুনকো। এমন পরিস্থিতি আমাকে দেশের ভবিষ্যৎ নিয়ে চরম হতাশ করেছে।
আগামীর বাংলাদেশের কাছে আমার প্রত্যাশা একটি দুর্নীতিমুক্ত রাষ্ট্র। আমি এমন একটি সমাজ চাই যেখানে ধর্ম, বর্ণ, গোত্র, লিঙ্গ বা বিশ্বাস নির্বিশেষে প্রতিটি নাগরিক তার মর্যাদা, স্বাধীনতা ও অধিকার নিশ্চিতভাবে ভোগ করবে। রাষ্ট্রের নাগরিক হিসেবে তাদের সবারই সমান অধিকার থাকতে হবে। বিশেষ করে নারী অধিকার নিয়ে আমি কাজ করি বলে আমি চাই, সমাজে নারীরা মানুষ হিসেবে তাদের প্রাপ্য সম্মান ও অধিকার বুঝে পাক। আমি এমন একটি ভারসাম্যপূর্ণ সমাজব্যবস্থার স্বপ্ন দেখি, যেখানে ভিন্ন ভিন্ন মতাদর্শের মানুষ একে অপরের বিপক্ষে না দাঁড়িয়ে, পারস্পরিক সহাবস্থান ও সাম্যের ভিত্তিতে একটি মানবিক রাষ্ট্র গড়ে তুলবে।

জুলাই আন্দোলনে শহীদ আবু সাঈদের মৃত্যু আমাকে প্রবলভাবে নাড়া দিলেও আমাকে সরাসরি রাজপথে নামতে বাধ্য করেছিল শিশু রিয়া গোপের মর্মান্তিক মৃত্যু। ছাদে খেলতে গিয়ে গুলিবিদ্ধ হওয়া ওই শিশুটির জায়গায় আমি বারবার আমার নিজের সন্তানকে কল্পনা করছিলাম। কারণ, আমার মেয়েও বিকেলবেলা বাবার সঙ্গে ছাদে খেলতে যায়, সাইকেল চালায়। আওয়ামী লীগের শাসনামলে আমি হয়তো কিছুটা সুবিধাপ্রাপ্ত ও নিরাপদ নাগরিক ছিলাম, কিন্তু সাধারণ মানুষের ভেতরের পুঞ্জীভূত ক্ষোভ যখন তীব্রতর হলো, তখন তা আমাদের মতো সুবিধাপ্রাপ্ত মানুষদেরও প্রবলভাবে আলোড়িত করেছিল।
জুলাইয়ের আন্দোলনকে অনেকেই বিদেশি চক্রান্ত, ডলারের প্রভাব বা জঙ্গি উত্থান বলে প্রোপাগান্ডা চালানোর চেষ্টা করেন, যা সম্পূর্ণ আজগুবি একটি ধারণা। রাজপথে আমি নিজের চোখে জিন্স-টি শার্ট পরা মেয়ের পাশাপাশি নেকাব পরা নারী, মাদ্রাসার শিক্ষার্থী, রিকশাওয়ালা, ফুচকা বিক্রেতা, সবজিওয়ালা এবং কোলে শিশু নিয়ে বেরিয়ে আসা গৃহবধূদের দেখেছি। এত বৈচিত্র্যময় সাধারণ মানুষকে কোনো চক্রান্ত বা অর্থের প্রলোভন দিয়ে রাজপথে নামানো অসম্ভব। এটি ছিল শোষিত হতে হতে একটি জাতির চূড়ান্ত বিস্ফোরণ।
যারা দীর্ঘকাল ক্ষমতাসীনদের পৃষ্ঠপোষকতায় সুবিধাভোগী ছিলেন, ক্ষমতার পালাবদলে তাদের হয়তো কষ্ট বেশি হচ্ছে। কিন্তু আপামর জনতা যেভাবে শোষিত হচ্ছিল, তারই অবধারিত বহিঃপ্রকাশ ঘটেছিল ২৪-এর জুলাই মাসে। রাজপথে নামা মানুষের মতাদর্শ বা বিশ্বাস ভিন্ন হলেও সবার লক্ষ্য ছিল একটাই—শেখ হাসিনার পতন। আমি রাজপথে দাঁড়িয়েই এটা অনুভব করেছিলাম। ৩ আগস্ট যখন শিক্ষার্থীদের ডাকে সারা দেশের প্রতিটি ঘরের মানুষ বেরিয়ে আসে, তখনই এই পতন অবধারিত হয়ে গিয়েছিল।
তৎকালীন স্বৈরাচারী সরকার দেশের মানুষকে পশুপাখির চেয়েও জঘন্যভাবে মূল্যায়ন করেছিল। নির্বিচারে গুলি করে মানুষ হত্যা, অযথা গণগ্রেপ্তার, ইন্টারনেট বন্ধ করে দেওয়া এবং এর পাশাপাশি তাদের নির্লজ্জ মিথ্যাচার ছিল চূড়ান্ত পর্যায়ের। একজন নাগরিক হিসেবে আমি চরম অপমানিত বোধ করেছি। অন্যায় করে সেটা লুকানোর জন্য সরকারপ্রধান থেকে শুরু করে মন্ত্রীরা যেভাবে ক্রমাগত মিথ্যাচার করে যাচ্ছিলেন, তা সুশীল ও শিক্ষিত সমাজের জন্য ছিল এক গভীর অপমানজনক পরিস্থিতি। ছাত্র-জনতার ওপর দিয়ে কী চরম বিভীষিকাময় সময় বয়ে গেছে, তা আজ সবারই জানা।
আন্দোলনের সময় জিন্স পরা মেয়ে, নেকাব পরা নারী কিংবা মাদ্রাসার ছেলের হাতে হাত রেখে যখন মিছিল করেছি, তখন সত্যি সত্যিই একটি নতুন বাংলাদেশের স্বপ্ন দেখেছিলাম। স্বপ্ন ছিল দুর্নীতিমুক্ত, বৈষম্যহীন, আইনের শাসনে পরিচালিত এক মানবিক সমাজের। কিন্তু অত্যন্ত আক্ষেপের বিষয় হলো, সেই স্বপ্ন অনেকটাই ম্লান হয়েছে। অন্তর্বর্তীকালীন সরকার কাজও আমাদের আশানুরূপ ছিল না। তাদের সময়ে শুরু হওয়া মব জাস্টিস, নারীর ওপর আক্রমণ, মাজার ভাঙচুর এবং মুক্তিযোদ্ধাদের ম্যুরাল ভাঙার মতো অরাজকতা আমরা কখনোই প্রত্যাশা করিনি। দুর্নীতি তো কমেইনি, বরং বহুগুণে বেড়েছে। যারা এত দিন সুযোগ পায়নি, তারা যেন হঠাৎ সুযোগ পেয়ে দেশকে লুটপাটের স্বর্গরাজ্য বানিয়ে ফেলেছিল। তা সত্ত্বেও অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রতি আমি কৃতজ্ঞ, কারণ তারা একটি সুষ্ঠু নির্বাচন উপহার দিতে পেরেছে, যার মাধ্যমে বর্তমানে একটি নির্বাচিত সরকার দেশ পরিচালনা করছে।
তবে নির্বাচিত রাজনৈতিক সরকারের চেয়ে আমার বেশি প্রত্যাশা ছিল অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের ওপর। কারণ রাজনৈতিক সরকারকে সবসময় জনমতের ওপর নির্ভরশীল থাকতে হয়, কিন্তু সমাজ কাঠামোর ও নারীর অবস্থানের মৌলিক পরিবর্তনের জন্য অন্তর্বর্তী সরকার কিছু কঠিন সিদ্ধান্ত নিতে পারত। আমাকে সবচেয়ে বেশি আহত করেছিল যখন নারী সংস্কার কমিশনের সদস্যদের প্রকাশ্যে সমাবেশ করে 'বেশ্যা' বলে গালি দেওয়া হলো। এত বড় একটি ঘটনার পরও সরকারের নিশ্চুপ ভূমিকা প্রমাণ করেছে যে, এ দেশে নারীর অবস্থান আজও কতটা ঠুনকো। এমন পরিস্থিতি আমাকে দেশের ভবিষ্যৎ নিয়ে চরম হতাশ করেছে।
আগামীর বাংলাদেশের কাছে আমার প্রত্যাশা একটি দুর্নীতিমুক্ত রাষ্ট্র। আমি এমন একটি সমাজ চাই যেখানে ধর্ম, বর্ণ, গোত্র, লিঙ্গ বা বিশ্বাস নির্বিশেষে প্রতিটি নাগরিক তার মর্যাদা, স্বাধীনতা ও অধিকার নিশ্চিতভাবে ভোগ করবে। রাষ্ট্রের নাগরিক হিসেবে তাদের সবারই সমান অধিকার থাকতে হবে। বিশেষ করে নারী অধিকার নিয়ে আমি কাজ করি বলে আমি চাই, সমাজে নারীরা মানুষ হিসেবে তাদের প্রাপ্য সম্মান ও অধিকার বুঝে পাক। আমি এমন একটি ভারসাম্যপূর্ণ সমাজব্যবস্থার স্বপ্ন দেখি, যেখানে ভিন্ন ভিন্ন মতাদর্শের মানুষ একে অপরের বিপক্ষে না দাঁড়িয়ে, পারস্পরিক সহাবস্থান ও সাম্যের ভিত্তিতে একটি মানবিক রাষ্ট্র গড়ে তুলবে।
.png)
জুলাই গণঅভ্যুত্থানের দ্বিতীয় বার্ষিকী পালনের সময় আমরা গভীর শ্রদ্ধায় স্মরণ করি তাদের, যারা ৫ আগস্ট পর্যন্ত পরিচালিত সেই আন্দোলনে শহীদ হয়েছেন। ছাত্র-তরুণরা পুরোভাগে থাকলেও দেশের সর্বস্তরের মানুষ শামিল হয়েছিল গণঅভ্যুত্থানে। সরকারি চাকরিতে কোটা সংস্কারের দাবিতে আন্দোলন শুরু হলেও সরকারের অপবাদ ও বেপরোয়া
১ ঘণ্টা আগে
নব্বইয়ের গণঅভ্যুত্থানের যে গণতান্ত্রিক আকাঙ্ক্ষা ছিল, তা আজও পুরোপুরি বাস্তবায়িত হয়নি। সেই দৃষ্টিকোণ থেকে দেখলে, চব্বিশের জুলাই অভ্যুত্থান যেন নব্বইয়ের সেই আকাঙ্ক্ষারই এক নতুন পুনরাবৃত্তি, যেখানে জনগণ আবারও একটি প্রকৃত গণতান্ত্রিক বাংলাদেশের দাবি তুলেছে।
২ ঘণ্টা আগে
বাংলাদেশ ও ভারতের সম্পর্কের ভিত গড়ে উঠেছে ভাষা, সংস্কৃতি, ইতিহাস, মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি, সীমান্তবর্তী মানুষের জীবনযাত্রা এবং পারস্পরিক নির্ভরতার ওপর। সেই কারণেই দুই দেশের সম্পর্কে যখন টানাপোড়েন দেখা দেয়, তখন অনেক সময় আনুষ্ঠানিক আলোচনার পাশাপাশি প্রতীকী কিছু পদক্ষেপও বিশেষ গুরুত্ব পায়।
৩ ঘণ্টা আগে
জুলাই আন্দোলনের প্রাথমিক চাওয়া ছিল ছাত্র-ছাত্রীদের ওপর নিপীড়ন বন্ধ করা, যা পরে এক দফা অর্থাৎ সরকারের পতনের দাবিতে পরিণত হয়। যে উদ্দেশ্যে মানুষ রাস্তায় নেমেছিল, ৫ই আগস্টের পর সেই স্বৈরাচার থেকে মুক্তি অর্জনই আমাদের প্রথম ও প্রধান সফলতা।
৩ ঘণ্টা আগে