রাষ্ট্রপতি নির্বাচন: সংবিধান ও আইন কী বলে?

প্রকাশ : ২৬ জুলাই ২০২৬, ১৩: ২৮
স্ট্রিম গ্রাফিক্স

রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিনের পদত্যাগের পর নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচন নিয়ে দেশজুড়ে আলোচনা শুরু হয়েছে। অনেকের মনে প্রশ্ন-বাংলাদেশে রাষ্ট্রপতি কীভাবে নির্বাচিত হন? রাষ্ট্রপতি হতে কী যোগ্যতা প্রয়োজন? নির্বাচন কি জনগণের প্রত্যক্ষ ভোটে, নাকি সংসদ সদস্যদের মাধ্যমে হয়? সংসদ সদস্যরা কি গোপন নাকি প্রকাশ্য ভোট দেন? রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে দলীয় সিদ্ধান্তের বাইরে ভোট দিলে সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদ প্রযোজ্য হয় কি না? এসব প্রশ্নের উত্তর সংবিধান ও রাষ্ট্রপতি নির্বাচন আইন, ১৯৯১-এ নিহিত।

রাষ্ট্রপতি হওয়ার যোগ্যতা

বাংলাদেশের সংবিধানের ৪৮(৪) অনুচ্ছেদে রাষ্ট্রপতি পদের জন্য তিনটি মৌলিক যোগ্যতা নির্ধারণ করা হয়েছে। প্রথমত, প্রার্থীর বয়স কমপক্ষে ৩৫ বছর হতে হবে। দ্বিতীয়ত, তাঁকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হওয়ার যোগ্য হতে হবে। তৃতীয়ত, সংবিধানের অধীনে অভিশংসনের মাধ্যমে রাষ্ট্রপতির পদ থেকে অপসারিত কোনো ব্যক্তি পুনরায় রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হওয়ার যোগ্য নন। এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, কোনো বর্তমান সংসদ সদস্য রাষ্ট্রপতি পদে প্রার্থী হতে চাইলে তাঁকে আগে সংসদ সদস্যপদ থেকে পদত্যাগ করতে হয় না।

স্পিকারের রাষ্ট্রপতি হিসেবে দায়িত্বপালন

সংবিধানের ৫০(৪) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, রাষ্ট্রপতি তাঁর কার্যভারকালে সংসদ সদস্য পদে নির্বাচিত হওয়ার যোগ্য থাকেন না। তবে কোনো সংসদ সদস্য রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হলে এবং দায়িত্ব গ্রহণ করলে, সেই দিন থেকেই তাঁর সংসদ সদস্যপদ স্বয়ংক্রিয়ভাবে শূন্য হয়ে যায়। অন্যদিকে, সংবিধানের ৫৪ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী রাষ্ট্রপতির পদ শূন্য হলে বা রাষ্ট্রপতি দায়িত্ব পালনে অসমর্থ হলে জাতীয় সংসদের স্পিকার সাময়িকভাবে রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালন করেন। এ ক্ষেত্রে তিনি রাষ্ট্রপতি পদে অধিষ্ঠিত হন না; কেবল রাষ্ট্রপতির কার্যাবলি সম্পাদন করেন। ফলে তাঁর স্পিকার ও সংসদ সদস্য হিসেবে অবস্থানের কোনো পরিবর্তন ঘটে না এবং তাঁর সংসদ সদস্যপদও শূন্য হয় না।

সংবিধানের অনুচ্ছেদ ৫৪-এ বলা হয়নি যে স্পিকার রাষ্ট্রপতি পদে ‘অধিষ্ঠিত’ হন, বলা হয়েছে তিনি রাষ্ট্রপতির ‘দায়িত্ব সম্পাদন’ করবেন। সংবিধান ও আইন অনুযায়ী রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হওয়ার পর স্পিকার স্বপদে ফিরে আসবেন। বাংলাদেশের সাংবিধানিক চর্চায়ও এর সমর্থন পাওয়া যায়। যেমন ২০০২ সালে অধ্যাপক বদরুদ্দোজা চৌধুরী রাষ্ট্রপতির পদ ত্যাগ করার পর তৎকালীন স্পিকার জামিরউদ্দিন সরকার প্রায় তিন মাস রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালন করেছিলেন। পরে নতুন রাষ্ট্রপতি দায়িত্ব গ্রহণ করলে তিনি পুনরায় স্পিকারের দায়িত্ব পালন অব্যাহত রাখেন।

রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের পদ্ধতি ও প্রক্রিয়া

সংবিধান অনুযায়ী রাষ্ট্রপতি রাষ্ট্রের সাংবিধানিক প্রধান। তবে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই তিনি প্রধানমন্ত্রীর পরামর্শ অনুযায়ী দায়িত্ব পালন করেন। ফলে রাষ্ট্রপতি রাষ্ট্রের ধারাবাহিকতা, সাংবিধানিক বৈধতা ও জাতীয় ঐক্যের প্রতীক হলেও দৈনন্দিন রাষ্ট্র পরিচালনায় তাঁর ভূমিকা সীমিত। এ কারণেই বাংলাদেশের মতো সংসদীয় প্রজাতন্ত্রে রাষ্ট্রপতি জনগণের প্রত্যক্ষ ভোটে নয়, সংসদ সদস্যদের মাধ্যমে পরোক্ষভাবে নির্বাচিত হন। রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের মৌলিক কাঠামো সংসদীয় প্রজাতন্ত্রগুলোর অনুরূপ হলেও ভোটদানের পদ্ধতির ক্ষেত্রে বাংলাদেশ একটি ব্যতিক্রম।

১৯৭২ সালের সংবিধানে সংসদ সদস্যদের গোপন ভোটে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের বিধান ছিল। ১৯৭৫ সালে রাষ্ট্রপতিশাসিত ব্যবস্থা চালুর পর জনগণের প্রত্যক্ষ ভোটে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের ব্যবস্থা প্রবর্তিত হয়, যার মাধ্যমে জিয়াউর রহমান, বিচারপতি আবদুস সাত্তার এবং হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হন। ১৯৯১ সালে দ্বাদশ সংশোধনীর মাধ্যমে সংসদীয় শাসনব্যবস্থা পুনঃপ্রবর্তনের পর সংবিধানের ৪৮(১) অনুচ্ছেদ সংশোধন করে রাষ্ট্রপতিকে জাতীয় সংসদের সদস্যদের ভোটে নির্বাচনের বিধান করা হয়। এর পরিপ্রেক্ষিতে রাষ্ট্রপতি নির্বাচন আইন, ১৯৯১ প্রণয়ন করে নির্বাচন পরিচালনার বিস্তারিত পদ্ধতি নির্ধারণ করা হয়।

বর্তমান ব্যবস্থায় রাষ্ট্রপতি জনগণের প্রত্যক্ষ ভোটে নয়, জাতীয় সংসদের সদস্যদের মাধ্যমে নির্বাচিত হন। নির্বাচন আয়োজন ও তদারকির দায়িত্ব নির্বাচন কমিশনের ওপর ন্যস্ত। আইন অনুযায়ী নির্বাচন কমিশনার নির্বাচনী কর্তা হিসেবে সরকারি গেজেটে তফসিল ঘোষণা, মনোনয়নপত্র গ্রহণ, যাচাই, প্রার্থিতা প্রত্যাহার এবং ভোটগ্রহণের তারিখ নির্ধারণ করেন।

রাষ্ট্রপতি নির্বাচন আইন, ১৯৯১-এর ৪ ধারায় রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে ভোটদানের জন্য সংসদ সদস্যদের বৈঠক সংসদ কক্ষেই অনুষ্ঠিত হওয়ার বাধ্যবাধকতা নির্ধারণ করা হয়েছে। অন্যদিকে, জাতীয় সংসদের কার্যপ্রণালী-বিধির ৩১১ বিধি অনুযায়ী সংসদ-কক্ষের ব্যবহার সংসদের বৈঠকের মধ্যেই সীমাবদ্ধ। এজন্য আইনে [ধারা ৫-এর উপধারা (২) ও (৩)] বলা হয়েছে নির্বাচন কমিশন জাতীয় সংসদের স্পিকারের সঙ্গে পরামর্শক্রমে সরকারি গেজেটে প্রজ্ঞাপন জারি করে নির্ধারিত ভোট গ্রহণের দিন সংসদ-সদস্যদের বৈঠক আহ্বান করবেন এবং বৈঠকে শুধুমাত্র রাষ্ট্রপতি নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে।

রাষ্ট্রপতি পদে মনোনয়নের জন্য একজন সংসদ সদস্য প্রস্তাবক এবং অপর একজন সংসদ সদস্য সমর্থক হিসেবে মনোনয়নপত্রে স্বাক্ষর করেন। প্রার্থীকেও সম্মতিসূচক স্বাক্ষর করতে হয়। মনোনয়নপত্র যাচাইয়ের পর একজন মাত্র বৈধ প্রার্থী থাকলে তাঁকে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত ঘোষণা করা হয়। একাধিক বৈধ প্রার্থী থাকলে ভোটগ্রহণ অনুষ্ঠিত হয় এবং সর্বাধিক ভোটপ্রাপ্ত প্রার্থী রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হন। বাংলাদেশের সংসদীয় ব্যবস্থার ইতিহাসে কেবল ১৯৯১ সালেই রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে ভোট অনুষ্ঠিত হয়েছে। অন্যান্য সময়ে সরকারী দলের মনোনীত প্রার্থী বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হয়েছেন।

আইন রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের প্রক্রিয়া নির্ধারণ করলেও প্রার্থী মনোনয়ন মূলত রাজনৈতিক দলের অভ্যন্তরীণ সিদ্ধান্তের বিষয়। বাস্তবে সংসদে সংখ্যাগরিষ্ঠ দলের নেতা হিসেবে প্রধানমন্ত্রীই রাষ্ট্রপতি মনোনয়নে প্রধান ভূমিকা পালন করেন। ফলে অধিকাংশ ক্ষেত্রে দলীয় নেতৃত্বের আস্থাভাজন ও গ্রহণযোগ্য ব্যক্তিরাই রাষ্ট্রপতি পদে মনোনীত হন।

প্রকাশ্য ভোটের বিধান: বাংলাদেশের ব্যতিক্রম

রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের ক্ষেত্রে বাংলাদেশের সবচেয়ে ব্যতিক্রমী বৈশিষ্ট্য হলো ভোটদানের পদ্ধতি। অধিকাংশ সংসদীয় গণতন্ত্রে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে গোপন ব্যালটের বিধান থাকলেও বাংলাদেশে রাষ্ট্রপতি নির্বাচন আইন, ১৯৯১ কার্যত প্রকাশ্য ভোটের ব্যবস্থা করেছে। আইনের ধারা ১০ অনুযায়ী ব্যালট পেপার দুটি অংশে বিভক্ত থাকে—কাউন্টার ফয়েল এবং আউটার ফয়েল। কাউন্টার ফয়েলে ভোটদাতা সংসদ সদস্যের নাম, বিভক্তি নম্বর এবং তাঁর স্বাক্ষর সংরক্ষিত থাকে। অপরদিকে আউটার ফয়েলে রাষ্ট্রপতি পদপ্রার্থীদের নামের বিপরীতে ভোটদাতা নিজের পূর্ণ নাম স্বাক্ষর করে ভোট প্রদান করেন।

ফলে কোন সংসদ সদস্য কাকে ভোট দিয়েছেন তা নির্দিষ্টভাবে শনাক্ত করা সম্ভব হয়। অর্থাৎ এটি প্রচলিত অর্থে গোপন ব্যালট নয়। এই বিধান প্রবর্তনের পেছনে সরকারের যুক্তি ছিল দলীয় শৃঙ্খলা নিশ্চিত করা।

রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে কি সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদ প্রযোজ্য?

রাষ্ট্রপতি নির্বাচন নিয়ে সবচেয়ে বেশি আলোচিত সাংবিধানিক প্রশ্নগুলোর একটি হলো—কোনো সংসদ সদস্য যদি দলীয় সিদ্ধান্তের বাইরে অন্য প্রার্থীকে ভোট দেন, তাহলে কি সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী তাঁর সংসদ সদস্যপদ বাতিল হবে?

সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, কোনো সংসদ সদস্য যদি যে রাজনৈতিক দলের মনোনয়নে নির্বাচিত হয়েছেন সংসদে আনীত কোনো প্রস্তাবের ওপর সেই দলের সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে ভোট দেন অথবা দল থেকে পদত্যাগ করেন, তাহলে তাঁর আসন শূন্য হবে। কিন্তু রাষ্ট্রপতি নির্বাচন সংসদের আইন প্রণয়ন কার্যক্রম বা সংসদের স্বাভাবিক কার্যপ্রণালির অংশ নয়; এটি সংবিধান এবং রাষ্ট্রপতি নির্বাচন আইন, ১৯৯১-এর অধীনে পরিচালিত একটি পৃথক সাংবিধানিক নির্বাচন। ফলে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে ভোটদানকে সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদের অর্থে "সংসদে ভোটদান" হিসেবে গণ্য করা যায় না।

অর্থাৎ বর্তমান সাংবিধানিক ও আইনগত অবস্থান অনুযায়ী রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে প্রদত্ত ভোটের ক্ষেত্রে ৭০ অনুচ্ছেদ স্বয়ংক্রিয়ভাবে প্রযোজ্য নয়। তবে প্রকাশ্য ভোটের বিধান এবং দলীয় শৃঙ্খলার রাজনৈতিক বাস্তবতার কারণে সংসদ সদস্যদের স্বাধীনভাবে ভোট দেওয়ার সুযোগ বাস্তবে খুবই সীমিত।

১৯৯১ সালের বিতর্কিত অধ্যাদেশ

রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে ৭০ অনুচ্ছেদ প্রযোজ্য নয়—এই বিষয়টি ১৯৯১ সালেই বড় রাজনৈতিক বিতর্ক সৃষ্টি করেছিল। রাষ্ট্রপতি নির্বাচন আইন কার্যকর হওয়ার পর তৎকালীন সরকার একটি অধ্যাদেশ জারি করে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনকে সংসদের কার্যপ্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে গণ্য করার উদ্যোগ নেয়, যাতে ৭০ অনুচ্ছেদের দলত্যাগবিরোধী বিধান রাষ্ট্রপতি নির্বাচনেও কার্যকর হয়। কিন্তু বিরোধী দলগুলোর তীব্র প্রতিবাদ ও সমালোচনার মুখে সরকার কয়েক দিনের মধ্যেই অধ্যাদেশটি প্রত্যাহার করে। 

বাংলাদেশের সংসদীয় ব্যবস্থায় রাষ্ট্রপতি পদ দীর্ঘদিন ধরে অভিজ্ঞ রাজনীতিক, প্রধান বিচারপতি ও বিশিষ্ট শিক্ষাবিদদের মাধ্যমে নৈতিক কর্তৃত্ব, সাংবিধানিক স্থিতিশীলতা এবং জাতীয় ঐক্যের প্রতীক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত ছিল। কিন্তু সংসদে একক দলীয় সংখ্যাগরিষ্ঠতা এবং দলীয় সিদ্ধান্তের কেন্দ্রীভবনের ফলে রাষ্ট্রপতি নির্বাচন ক্রমেই রাজনৈতিকভাবে পূর্বনির্ধারিত প্রক্রিয়ায় পরিণত হয়েছে। সংবিধান রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের একটি সুস্পষ্ট ও গণতান্ত্রিক কাঠামো নির্ধারণ করলেও, সেই কাঠামোর কার্যকারিতা শেষ পর্যন্ত নির্ভর করে রাজনৈতিক সংস্কৃতি, দলীয় গণতন্ত্র এবং সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রতি শ্রদ্ধাবোধের ওপর।

  • ড. কে এম মহিউদ্দিন: অধ্যাপক, সরকার ও রাজনীতি বিভাগ, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়
Ad 300x250

সম্পর্কিত