জাতীয় সংসদ নির্বাচন ২০২৬

ও গণভোট

ক্লিক করুন

বাংলাদেশের ব্যবসা ও বিনিয়োগ পরিবেশ: উত্তরণের উপায় কী

দীর্ঘদিন ধরে দেশের বিনিয়োগ পরিবেশে যে সংস্কার প্রয়োজন ছিল, তা প্রায় অনুপস্থিত। গত এক দশকে কোনো সমন্বিত বা ব্যবস্থা-ভিত্তিক সংস্কারের উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। এর মধ্যে বিগত অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের ১৮ মাসের শাসনামলে ব্যবসায়ীদের আস্থার ব্যাপক ঘাটতি তৈরি হয়।

এম মাসরুর রিয়াজ
এম মাসরুর রিয়াজ

বাংলাদেশের ব্যবসা ও বিনিয়োগের পরিবেশ বর্তমানে এক সংকটময় পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। এটি কোনো আকস্মিক ঘটনা নয়, বরং বহু বছরের অবহেলার চূড়ান্ত পরিণতি। অর্থনৈতিক সুশাসনের অভাব এবং নীতি নির্ধারণে প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতার ধারাবাহিক অবক্ষয় এই পরিস্থিতিকে আরও নাজুক করে তুলেছে। সম্প্রতি একটি রাজনৈতিক সরকারের দায়িত্ব গ্রহণ ব্যবসায়ী মহলে কিছুটা আস্থা ফিরিয়ে আনলেও, মূল সমস্যাগুলোর সমাধান ছাড়া এই আস্থাকে টেকসই করা কঠিন হবে।

দীর্ঘদিন ধরে দেশের বিনিয়োগ পরিবেশে যে সংস্কার প্রয়োজন ছিল, তা প্রায় অনুপস্থিত। গত এক দশকে কোনো সমন্বিত বা ব্যবস্থা-ভিত্তিক সংস্কারের উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। এর মধ্যে বিগত অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের ১৮ মাসের শাসনামলে ব্যবসায়ীদের আস্থার ব্যাপক ঘাটতি তৈরি হয়। মূলত দুটি বড় নেতিবাচক কারণ এই সময়কালে বিনিয়োগ পরিবেশকে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে। প্রথমত, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি এবং সরকারি দপ্তর বা সিভিল সার্ভিসে একধরনের অস্থিরতা ও অনিশ্চয়তা। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছিল জাতীয় নির্বাচনের জন্য দীর্ঘ প্রতীক্ষা, যা সার্বিকভাবে ‘বিজনেস কনফিডেন্স’ বা ব্যবসায়িক আত্মবিশ্বাস তলানিতে নিয়ে যায়।

দ্বিতীয়ত, সরকারের সাথে বেসরকারি খাত, বিনিয়োগকারী এবং বাণিজ্য সংশ্লিষ্টদের বিশাল দূরত্ব তৈরি হয়েছিল। নীতিনির্ধারকদের পক্ষ থেকে ব্যবসায়ীদের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগের (এঙ্গেজমেন্ট) যে ধারাবাহিকতা থাকা প্রয়োজন, তা একেবারেই ছিল না। ফলে এই ১৮ মাসে বিনিয়োগ ও ব্যবসা-বাণিজ্যের পরিবেশের দৃশ্যত কোনো উন্নতি হয়নি।

বিনিয়োগ পরিবেশ নাজুক কেন

বিনিয়োগ পরিবেশ উন্নত রাখা একটি চলমান প্রক্রিয়া, যা বৈশ্বিক ব্যবসা ও অর্থনীতির সাথে তাল মিলিয়ে নিয়মিত সংস্কারের দাবি রাখে। কিন্তু বাংলাদেশে দীর্ঘ সময় ধরে কোনো সমন্বিত বা কাঠামোগত সংস্কার হয়নি। লাইসেন্সিং, রেগুলেশন, আইনি কাঠামো, কর ও শুল্ক ব্যবস্থা এবং ট্রেড ফ্যাসিলিটেশন (যেমন—বন্দরের সক্ষমতা, লজিস্টিকস, বর্ডার ক্লিয়ারেন্স ও ভূমি সংস্কার)—এসব মিলিয়ে যে সামগ্রিক সংস্কার প্রয়োজন ছিল, তা গত এক দশকে হয়নি।

দেশি ও বিদেশি বিনিয়োগ উৎসাহিত করতে বর্তমান সরকারের নীতি হতে হবে সম্পূর্ণ বিনিয়োগবান্ধব। বিনিয়োগের ক্ষেত্রে কী কী অন্তরায় রয়েছে, তা দ্রুত পর্যালোচনা করতে হবে এবং সেই পর্যালোচনার ভিত্তিতে অবিলম্বে সমন্বিত সংস্কার কর্মসূচি শুরু করতে হবে।

এর ফলে একদিকে যেমন আইনি ও রেগুলেটরি কাঠামো অনেক ক্ষেত্রেই ব্যবসাবান্ধব নয়, বরং অত্যন্ত জটিল; অন্যদিকে যেসব ক্ষেত্রে আইন ও নীতি ভালো, সেখানেও প্রশাসনিক সক্ষমতার অভাবে তা বাস্তবায়ন হচ্ছে না। সরকারি দপ্তরগুলোতে সক্ষমতার অভাব, অস্বচ্ছতা এবং দুর্নীতির কারণে ‘লাস্ট মাইল ডেলিভারি’ মুখ থুবড়ে পড়ছে। একটি সিদ্ধান্ত বা ক্লিয়ারেন্স পেতে দিনের পর দিন, এমনকি অজানা সময় পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হয়। ব্যবসা ও বিনিয়োগের ক্ষেত্রে প্রেডিক্টিবিলিটি (পূর্বাভাসযোগ্যতা) এবং নির্দিষ্ট সময়সীমা অত্যন্ত জরুরি, যা আমাদের এখানে একেবারেই অনুপস্থিত। কোনো পূর্ব আলোচনা ছাড়াই হুটহাট নীতি বা শর্ত পরিবর্তন করে ফেলা হয়, যা আগের চেয়েও জটিল অবস্থার সৃষ্টি করে।

অবকাঠামো ও আইনি জটিলতা

আমাদের বন্দরগুলো (ভবিষ্যতের কথা বাদ দিলেও) বর্তমান বাণিজ্যের চাপ সামলাতেই হিমশিম খাচ্ছে। বন্দরগুলো সাগর বা গভীর সমুদ্রের ওপর না হওয়ায় বড় বা মাঝারি আকারের জাহাজ ভিড়তে পারে না। এর সাথে ইনল্যান্ড কনটেইনার পোর্ট, স্টোরেজ ও মাল্টিমোডাল ট্রান্সপোর্টেশনের মতো লজিস্টিক ব্যবস্থা অত্যন্ত দুর্বল। ফলে প্রতিযোগী দেশগুলোর তুলনায় আমাদের লজিস্টিক খরচ ও সময়—দুটোই অনেক বেশি।

অবকাঠামোর আরেকটি বড় জায়গা হলো বিদ্যুৎ ও জ্বালানি। ২০১১ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত অভ্যন্তরীণ গ্যাস অনুসন্ধান অঘোষিতভাবে বন্ধ রেখে দেশীয় শিল্পকে পুরোপুরি এলএনজি-নির্ভর করে ফেলা হয়েছে। এলএনজি আমদানি অত্যন্ত ব্যয়বহুল এবং ডলারের ওপর নির্ভরশীল। ফলে গ্যাস-নির্ভর শিল্পকারখানাগুলো এখন নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস সরবরাহ ও চাপের (প্রেশার) অভাবে ভুগছে, আর নতুন উদ্যোক্তারা গ্যাস সংযোগই পাচ্ছেন না। বন্দর, লজিস্টিকস ও জ্বালানি—এই তিন খাতের দুর্বলতা আমাদের বিনিয়োগকে সাংঘাতিকভাবে ব্যাহত করছে।

এছাড়া জমির প্রাপ্যতা এবং ল্যান্ড রেজিস্ট্রেশন বা ডকুমেন্টেশনের প্রক্রিয়া অত্যন্ত জটিল, সময়সাপেক্ষ ও ব্যয়বহুল, যা নতুন বিনিয়োগকারীদের নিরুৎসাহিত করে। অন্যদিকে, বিশ্বব্যাংকের হিসাব অনুযায়ী, ‘এনফোর্সমেন্ট অব কনট্রাক্ট’ বা চুক্তি বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ বিশ্বের সবচেয়ে দুর্বল দেশগুলোর একটি।

আমাদের আদালতে একটি সাধারণ বাণিজ্যিক মামলা নিষ্পত্তি হতে বছরের পর বছর লেগে যায়। আবার আদালতের বাইরের ‘বিকল্প বিরোধ নিষ্পত্তি’ বা আরবিট্রেশন ও মিডিয়েশন ব্যবস্থাও অত্যন্ত পুরোনো ও অকার্যকর।

কর ব্যবস্থার বোঝা

আমাদের কর ব্যবস্থা অত্যন্ত জটিল ও ব্যয়বহুল। প্রতিযোগী দেশগুলোর তুলনায় আমাদের করের হার এমনিতে বেশি। তার ওপর মাল্টিপল ট্যাক্সেশন ও ভ্যাটের কারণে ‘ইফেক্টিভ ট্যাক্স ইনসিডেন্স’ বা কার্যকর করভার অনেক বেড়ে যায়।।

কাগজে-কলমে কর্পোরেট করহার ২৭-২৮% হলেও, সব মিলিয়ে তা ৪০-৫০% ছাড়িয়ে যায়। টেলিকম, টোব্যাকো বা বেভারেজের মতো খাতে তা ৭০ শতাংশেরও বেশি। এই উচ্চ করহার ও জটিল কমপ্লায়েন্স প্রক্রিয়া ব্যবসাকে অত্যন্ত ব্যয়বহুল করে তুলেছে। বৈদেশিক বিনিয়োগ আকর্ষণে বাংলাদেশ কেন পিছিয়ে আছে বা আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানগুলো কেন ভরসা পায় না—তার মূল উত্তর লুকিয়ে আছে এই কাঠামোগত দুর্বলতাগুলোর মাঝেই।

বাংলাদেশের মতো বিপুল জনসংখ্যার দেশে প্রতি বছর লাখ লাখ তরুণের কর্মসংস্থান প্রয়োজন। এজন্য উৎপাদনমুখী বা ম্যানুফ্যাকচারিং খাতের কোনো বিকল্প নেই। সার্ভিস সেক্টর তখনই বড় হতে পারবে, যখন ম্যানুফ্যাকচারিং খাত একটি শক্তিশালী ভোগের সুযোগ তৈরি করে দেবে।

বিগত বছরগুলোতে সরকারি কর্মকর্তারা মুখে সংস্কারের কথা বললেও বাস্তবে তার প্রয়োগ দেখা যায়নি। বিনিয়োগ ও বাণিজ্য কোনো একটি নির্দিষ্ট বিষয়ের ওপর নির্ভর করে না। জমি, লাইসেন্স, রেগুলেশন এবং নীতির ধারাবাহিকতা—সবকিছু মিলিয়ে সমন্বিত সংস্কার প্রয়োজন। অন্তর্বর্তীকালীন সরকার ছোটখাটো কিছু সংস্কার করলেও এই পাহাড়সমান সমস্যা সমাধানে তা একেবারেই অপ্রতুল। এখানে একটি দীর্ঘমেয়াদি ও একে অপরের সঙ্গে সংযুক্ত (ইন্টারকানেক্টেড) সংস্কার কর্মসূচি চালু করা জরুরি।

নির্বাচিত সরকারের ভূমিকা ও ব্যবসায়ীদের প্রত্যাশা

দীর্ঘ একটি অনিশ্চিত সময় পার করে দেশে নতুন রাজনৈতিক সরকার দায়িত্ব গ্রহণ করেছে। জনগণের দ্বারা নির্বাচিত একটি সরকার পাঁচ বছরের জন্য ক্ষমতায় আসায় অর্থনীতি ও ব্যবসা খাতে একটি বড় ইতিবাচক বার্তা গেছে। অন্তর্বর্তীকালীন বা তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা দীর্ঘায়িত হলে জনমনে ও বিনিয়োগকারীদের মধ্যে একধরনের শঙ্কা তৈরি হয়। সেই জায়গা থেকে বিএনপি একটি বড় ম্যান্ডেট নিয়ে সরকার গঠন করায় ব্যবসায়ীদের আত্মবিশ্বাস ফিরে আসছে। কারণ, পাঁচ বছর মেয়াদি সরকারের কাছে ব্যবসায়ীরা ‘নীতির স্থিতিশীলতা’ প্রত্যাশা করেন এবং দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা করতে ভরসা পান।

ভবিষ্যৎ প্রবৃদ্ধির রূপরেখা ও সম্ভাবনাময় খাত

বাংলাদেশের মতো বিপুল জনসংখ্যার দেশে প্রতি বছর লাখ লাখ তরুণের কর্মসংস্থান প্রয়োজন। এজন্য উৎপাদনমুখী বা ম্যানুফ্যাকচারিং খাতের কোনো বিকল্প নেই। সার্ভিস সেক্টর তখনই বড় হতে পারবে, যখন ম্যানুফ্যাকচারিং খাত একটি শক্তিশালী ভোগের সুযোগ তৈরি করে দেবে।

তবে শুধু দেশীয় ১৮ কোটি মানুষের বাজারের ওপর নির্ভর করলে চলবে না। আমাদের ‘এক্সপোর্ট লেড ম্যানুফ্যাকচারিং’ বা রপ্তানিমুখী উৎপাদনে যেতে হবে। তৈরি পোশাক শিল্পের পাশাপাশি ম্যান-মেইড ফাইবার ও হাই-ভ্যালু প্রোডাক্টে বৈচিত্র্য আনতে হবে। নতুন বিনিয়োগকারীদের জন্য লাইট ম্যানুফ্যাকচারিং (ইলেকট্রনিকস, ইলেকট্রিক্যাল, ছোট মেশিনারিজ), চামড়া ও পাদুকা, ডিজিটাল ইকোনমি এবং এগ্রো-প্রসেসিং অত্যন্ত সম্ভাবনাময়। পাশাপাশি, স্থানীয় বাজারের জন্য খাদ্য ও পানীয়, এফএমসিজি, ফার্মাসিউটিক্যালস এবং প্লাস্টিক শিল্পে মনোযোগ দেওয়া যেতে পারে।

করণীয় কী

দেশি ও বিদেশি বিনিয়োগ উৎসাহিত করতে বর্তমান সরকারের নীতি হতে হবে সম্পূর্ণ বিনিয়োগবান্ধব। বিনিয়োগের ক্ষেত্রে কী কী অন্তরায় রয়েছে, তা দ্রুত পর্যালোচনা করতে হবে এবং সেই পর্যালোচনার ভিত্তিতে অবিলম্বে সমন্বিত সংস্কার কর্মসূচি শুরু করতে হবে। সর্বশেষ, বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণের জন্য কৌশলগতভাবে কিছু গুরুত্বপূর্ণ খাত এবং সম্ভাবনাময় দেশ চিহ্নিত করে সেখানে অত্যন্ত সুশৃঙ্খলভাবে ‘বিনিয়োগ উন্নয়ন’ বা ইনভেস্টমেন্ট প্রমোশন প্রোগ্রাম চালু করতে হবে। তবেই ঘুরে দাঁড়াবে বাংলাদেশের অর্থনীতি।

লেখক: বেসরকারি গবেষণাপ্রতিষ্ঠান পলিসি এক্সচেঞ্জ বাংলাদেশ-এর চেয়ারম্যান এবং প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও)

সর্বাধিক পঠিত

সম্পর্কিত