সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশে অন্তর্বর্তী সরকারের সংস্কার প্রস্তাব নিয়ে গণভোট আয়োজনের আলোচনায় একটি বিতর্ক মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে। কিছু সমালোচক প্রশ্ন তুলেছেন যে, গণভোটে সরকার কেবল ‘ভোট দেওয়ার আহ্বান’ জানাতে পারবে, কিন্তু নিজেদের প্রস্তাবিত সংস্কারের পক্ষে বা ‘হ্যাঁ’-এর পক্ষে প্রচারণা চালাতে পারবে না। তাদের যুক্তি, সরকারের ‘হ্যাঁ’ ভোটের পক্ষে প্রচারণায় করদাতাদের অর্থ ব্যয় করা অনৈতিক এবং এতে সরকারের ‘নিরপেক্ষতা’ ক্ষুণ্ণ হয়।
পৃথিবীর অনেক গণতান্ত্রিক দেশে গণভোটের ইতিহাস ঘাটলে দেখা যায়, সরকার সেখানে সবসময়ই ‘নিরপেক্ষ দর্শক’ নয়। অনেক সময় তারা ‘সক্রিয় পক্ষ’। ২০১৬ সালে যুক্তরাজ্যের ব্রেক্সিট গণভোটের উদাহরণটি এক্ষেত্রে সবচেয়ে প্রাসঙ্গিক এবং শক্তিশালী দলিল হতে পারে। তৎকালীন ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী ডেভিড ক্যামেরন কেবল গণভোটের আয়োজন করেই খালাস হননি। তাঁর সরকার সরকারি কোষাগারের অর্থ ও প্রশাসনিক যন্ত্র ব্যবহার করে পূর্ণ শক্তিতে ‘রিমেইন’ বা ইউরোপীয় ইউনিয়নে থাকার পক্ষে প্রচারণা চালিয়েছিলেন।
সেই সময় ব্রিটিশ সরকার সরকারি খরচে ৯৩ লাখ পাউন্ড (বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ১৫০ কোটি টাকা) ব্যয় করে ২৭ পৃষ্ঠার একটি রঙিন পুস্তিকা তৈরি করেছিল। এই পুস্তিকাটি যুক্তরাজ্যের ২ কোটি ৭০ লাখ পরিবারে ডাকযোগে পাঠানো হয়। পুস্তিকার শিরোনাম ছিল— ‘সরকার কেন বিশ্বাস করে যে ইইউতে থাকাই যুক্তরাজ্যের জন্য সেরা সিদ্ধান্ত’। সরকার যুক্তি দিয়েছিল, যেহেতু তারা দেশের অর্থনীতির অভিভাবক এবং নীতি-নির্ধারক, তাই জনগণকে সঠিক পথ দেখানো তাদের পবিত্র দায়িত্ব। ব্রিটিশ পার্লামেন্ট বা আদালত কিন্তু এই প্রচারণা নিয়ে প্রশ্ন তোলেনি। কারণ সরকার যখন একটি পলিসি বা নীতিতে বিশ্বাস করে, তখন তা জনগণকে জানানো এবং সেই নীতির পক্ষে জনমত গঠন করা তার শাসনতান্ত্রিক অধিকারের মধ্যেই পড়ে।
একই চিত্র দেখা গেছে স্কটল্যান্ডের স্বাধীনতার পক্ষের গণভোটে। ২০১৪ সালের সেই গণভোটে স্কটিশ সরকার (যারা স্বাধীনতা চায়) এবং ব্রিটিশ কেন্দ্রীয় সরকার (যারা অখণ্ডতা চায়) উভয়েই রাষ্ট্রীয় যন্ত্র ব্যবহার করেছে নিজেদের এজেন্ডার পক্ষে। স্কটল্যান্ডের তৎকালীন ফার্স্ট মিনিস্টার অ্যালেক্স স্যামন্ড এবং তাঁর সরকার সরকারী কর্মচারীদের ব্যবহার করে ৬৭০ পৃষ্ঠার একটি শ্বেতপত্র প্রকাশ করে। শ্বেতপত্রের নাম ছিল ‘স্কটল্যান্ডস ফিউচার’। স্বাধীনতার এই রোডম্যাপ রচনা, মুদ্রণ এবং প্রচার— সবই হয়েছিল সরকারি অর্থে।
অন্যদিকে লন্ডনে বসে ব্রিটিশ সরকারও হাত গুটিয়ে ছিল না। তারা ব্রিটিশ অর্থ মন্ত্রণালয়কে ব্যবহার করে একের পর এক প্রতিবেদন প্রকাশ করে দেখিয়েছিল যে স্বাধীনতা নিলে স্কটল্যান্ড আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে। এই গবেষণা এবং প্রচারণার খরচ ব্রিটিশ করদাতাদের পকেট থেকেই গিয়েছিল। এখানে দুই সরকারই রেফারি ছিল না। তারা ছিল খেলোয়াড়। নির্বাচন কমিশন কেবল ভোটের দিন এবং ব্যালট গণনা তদারকি করেছে।
বিশ্বের অন্যান্য প্রান্তেও এরকম নজির পাওয়া যায়। নিউজিল্যান্ডে ২০১৫-১৬ সালে পতাকা পরিবর্তনের গণভোটে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী জন কি প্রকাশ্যে নতুন পতাকার পক্ষে প্রচারণা চালিয়েছিলেন। রাষ্ট্র প্রায় ২৬ মিলিয়ন ডলার খরচ করেছিল সেই প্রক্রিয়ায়। কানাডায় ১৯৯৫ সালের কুইবেক স্বাধীন হবে কিনা বিষয়ে গণভোটের সময় ফেডারেল সরকার অখণ্ডতার পক্ষে বিশাল র্যালি ও প্রচারণার আয়োজন করেছিল সরকারি অর্থায়নে।
আবার অতি সম্প্রতি ২০২৩ সালে অস্ট্রেলিয়ায় ‘ভয়েস টু পার্লামেন্ট’ গণভোটে লেবার পার্টির সরকার সরাসরি ‘ইয়েস’ ক্যাম্পেইনের পক্ষে ছিল। প্রধানমন্ত্রী অ্যান্থনি অ্যালবানিজ নিজে টি-শার্ট পরে ক্যাম্পেইন করেছেন এবং সরকারি ওয়েবসাইট ব্যবহার করে জনগণকে বুঝিয়েছেন কেন এই পরিবর্তন দরকার। এই দেশগুলোর ভেতর সরকার কীভাবে একটা নির্দিষ্ট মতের পক্ষে প্রচারণা চালাতে পারলো? পারলো কারণ তারা এটা বোঝে যে, গণভোট কোনো নিরীহ জনমত জরিপ নয়। গণভোট হল এক রাজনৈতিক লড়াই যেখানে সরকারকে প্রমাণ করতে হয় তাদের প্রস্তাবটি কেন শ্রেষ্ঠ।
এখন প্রশ্ন হলো, ব্রিটেনের যদি সরকারি খরচে প্রতিটি ঘরে ঘরে সরকারের অবস্থানের পক্ষে লিফলেট পাঠাতে পারে, তবে বাংলাদেশ সরকার কেন ডিজিটাল প্রচারণায় বা জনমত গঠনে অর্থ খরচ করতে পারবে না? স্কটিশ সরকার যদি সরকারি কর্মচারীদের দিয়ে ৬৭০ পৃষ্ঠার স্বাধীনতার দলিল লিখিয়ে প্রচার করতে পারে, তবে বাংলাদেশ সরকার কেন ‘জুলাই চার্টার’ বা সংস্কার প্রস্তাবের পক্ষে সরকারি চ্যানেল ব্যবহার করতে পারবে না?
রাষ্ট্রবিজ্ঞানের প্রস্তাবক নীতি অনুযায়ী, গণভোটের প্রশ্নটি আকাশ থেকে পড়ে না। সরকারই এটি প্রণয়ন করে। সরকার এই বিশ্বাস থেকেই সংবিধান সংশোধন বা রাষ্ট্র সংস্কারের মতো প্রস্তাবনা নিয়ে আসে যে, এই পরিবর্তনগুলো রাষ্ট্রের মঙ্গলের জন্য অপরিহার্য। এখন যে সরকার নিজেই মনে করে প্রস্তাবটি জাতির জন্য কল্যাণকর, সেই সরকার যদি প্রচারণার মাঠে নেমে বলে, ‘আমরা জানি না আপনারা কী ভোট দেবেন, আমাদের কোনো মতামত নেই’ —তাহলে তা অসততা ও প্রশাসনিক দায়িত্বজ্ঞানহীনতা। রাষ্ট্রবিজ্ঞানে একে বলা হয় ‘প্যারাডক্স অব নিউট্রালিটি’। একজন ডাক্তার রোগীকে প্রেসক্রিপশন দিয়ে বলতে পারেন না যে, ‘ওষুধটা খেলে আপনার ভালো হতেও পারে, নাও হতে পারে, আমি নিশ্চিত নই’। ঠিক তেমনি রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্বে থাকা সরকার সংস্কারের প্রেসক্রিপশন দিয়ে ফলাফলের ব্যাপারে উদাসীন থাকতে পারে না।
গণভোট নিয়ে সরকারী প্রচারণায় ‘করদাতাদের টাকা’ খরচ নিয়ে যে মায়াকান্না করা হচ্ছে, তাও যুক্তির ধোপে টেকে না। রাষ্ট্রের করদাতাদের অর্থ ব্যয় করা হয় রাষ্ট্রের উন্নয়ন, স্থিতিশীলতা এবং সঠিক পরিচালনার জন্য। ভৌত অবকাঠামো, যেমন সেতু বা কালভার্ট নির্মাণে এবং তার পক্ষে জনমত গঠনে বা বিজ্ঞাপনে যদি সরকারের অর্থ ব্যয় করা বৈধ হয়, তবে রাষ্ট্রের ‘আইনি ও নৈতিক অবকাঠামো’ বা সংবিধান সংস্কারের পক্ষে জনমত গঠনে অর্থ ব্যয় করা কেন অবৈধ হবে? একটি টেকসই সংবিধান বা রাষ্ট্রকাঠামো তো বহু সেতুর চেয়েও বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
আমাদের কিন্তু ‘রেফারি’ এবং ‘খেলোয়াড়’-এর ভূমিকা গুলিয়ে ফেললে চলবে না। গণভোটে রেফারি হলো নির্বাচন কমিশন, যাদের কাজ ভোটগ্রহণ প্রক্রিয়াটি স্বচ্ছ রাখা। কিন্তু সরকার এখানে রেফারি নয়, সরকার এখানে প্রস্তাবক।
সরকার যদি এখানে ‘নিরপেক্ষ’ সাজার ভান করে, তবে তা হবে তার সংস্কারের মেন্ডেটের উপর দাঁড়িয়ে নেয়া শপথের সাথে এক ধরণের বিশ্বাসঘাতকতা করা। নিউজিল্যান্ডের পতাকা পরিবর্তনের গণভোট বা ব্রেক্সিটের ক্ষেত্রে সরকারের পক্ষ হেরে গিয়েছিল। কিন্তু তাতে সরকারের প্রচারণার বৈধতা মিথ্যা হয়ে যায় না। সরকার তার দায়িত্ব পালন করেছে— জনগণকে বুঝিয়েছে। এরপর জনগণ নিরপেক্ষভাবে তাদের রায় দিয়েছে।
লেখক: গবেষক