ত্বকী হত্যা: বিচারহীনতার ১৩ বছর
তেরো বছর ধরে মার্চ মাসের ৮ তারিখে নারায়ণগঞ্জের শহীদ মিনারে জ্বলে ওঠে প্রতিবাদের মোমবাতি। দাবি একটাই—মেধাবী কিশোর তানভীর মুহাম্মদ ত্বকী হত্যার বিচার। ২০১৩ সালের ৬ মার্চ নিখোঁজ হওয়ার পর ১৩টি বছর পেরিয়ে গেলেও আজও অধরা ন্যায়বিচার। গত এক যুগের বেশি সময়ে ১০২ বার চার্জশিট দাখিলের তারিখ অতিক্রান্ত হয়েছে; ১০৩তম তারিখ ধার্য হয়েছে আগামী ২৬ এপ্রিল।
প্রভাবশালী ওসমান পরিবারের বিরুদ্ধে আঙুল তুলে এই দীর্ঘ লড়াই চালিয়ে যাচ্ছেন ত্বকীর বাবা, বিশিষ্ট সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব রফিউর রাব্বি। হামলা, হুমকি আর সাতটি মামলার বোঝা মাথায় নিয়েও তিনি দমে যাননি। ২০২৪ সালের গণ-অভ্যুত্থানের পর নতুন করে আশার আলো দেখলেও বাধার দেয়াল এখনো পুরোপুরি কাটেনি। কেন ঝুলে আছে র্যাবের তদন্ত? প্রভাবশালী আসামিদের প্রভাব কি এখনো বিচারের পথ রুদ্ধ করে রাখছে? এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজতেই রফিউর রাব্বির মুখোমুখি হয়েছিলেন ঢাকা স্ট্রিম-এর স্টাফ রিপোর্টার ইমরান হোসাইন।
ইমরান হোসাইন

স্ট্রিম: আশা করছি ভালো আছেন। পরিবারের সবাই কেমন আছেন?
রফিউর রাব্বি: গলায় ইনফেকশনের কারণে ত্বকীর মা কথা বলতে পারছে না। যা কিছু বলার লিখেই আমাদের জানাচ্ছে। এছাড়া ভালো আছি।
স্ট্রিম: আপনার ছেলে তানভীর মুহাম্মদ ত্বকী হত্যার ১৩ বছর পার হতে চলল। এই নির্মম হত্যাকাণ্ডের পেছনে অনেকেই নারায়ণগঞ্জের রাজনৈতিক ও সামাজিক নানা ইস্যুতে আপনার সোচ্চার ভূমিকাকে প্রধান কারণ হিসেবে দেখছে। এক্ষেত্রে আপনার মূল্যায়ন কী?
রফিউর রাব্বি: শুধু এটিই একমাত্র কারণ নয়। ২০১৪ সালের ৫ মার্চ র্যাবের তৎকালীন অতিরিক্ত মহাপরিচালক কর্নেল জিয়াউল আহসান সংবাদ সম্মেলনে জানিয়েছিলেন, র্যাব তাদের তৈরি করা অভিযোগপত্রে ত্বকীকে হত্যা করার পেছনে তিনটি কারণ উল্লেখ করেছে। প্রথমত, ২০১১ সালে নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশন নির্বাচনে শামীম ওসমানের বিপক্ষে ডা. সেলিনা হায়াৎ আইভীর নির্বাচন পরিচালনার মূল দায়িত্ব পালন করেছিলাম আমি। সেখানে শামীম ওসমানের নানা অপকীর্তি জনগণের সামনে তুলে ধরি। ওই নির্বাচনে শামীম ওসমান ১ লাখ ৩ হাজার ভোটের ব্যবধানে পরাজিত হন। র্যাব বলছে, এটি এক নম্বর কারণ।
দ্বিতীয় কারণটি হলো, ২০১১ সালের জুনে ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ রুটে বাসের ভাড়া ২২ টাকা থেকে হঠাৎ ৩২ টাকা করা হয়। তখন সব রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠন মিলে ‘যাত্রী অধিকার সংরক্ষণ ফোরাম’ গঠন করা হয়, যার আহ্বায়ক ছিলাম আমি। পরিবহন খাত থেকে ওসমান পরিবার যে চাঁদা নিত, সেটি আমরা একটি সংবাদ সম্মেলন করে তথ্যপ্রমাণসহ তুলে ধরি। আমাদের আন্দোলনের মুখে তিন দফায় ভাড়া কমিয়ে ২৭ টাকায় আনা হয়। র্যাবের মতে, এটি ছিল ত্বকীকে হত্যার দ্বিতীয় কারণ।
আর তৃতীয় কারণটি হলো, নারায়ণগঞ্জের ১ নম্বর রেলগেটে রেলওয়ের বিশাল জায়গা দখল করে মার্কেট নির্মাণ শুরু করেছিলেন শামীম ওসমানের বড় ভাই নাসিম ওসমান। সেখানে আজমেরী ওসমানসহ ওসমান পরিবারের অন্য সদস্য এবং আওয়ামী লীগের কিছু ক্যাডার মিলেমিশে ভাগবাঁটোয়ারা করছিল। ২০১২ সালের শীতকালে নারায়ণগঞ্জের সব সংগঠন মিলে ‘ভূমি রক্ষা নাগরিক আন্দোলন’ গড়ে ওঠে। ওই সংগঠনেরও আহ্বায়ক করা হয় আমাকে। আন্দোলনটি এত বড় আকার ধারণ করেছিল যে একপর্যায়ে র্যাবের তৎকালীন মহাপরিচালক ও আওয়ামী লীগ নেতা ওবায়দুল কাদের নারায়ণগঞ্জে এসে ঘোষণা দেন যে, সেখানে কোনো মার্কেট হবে না। র্যাব বলছে, এটি হলো তিন নম্বর কারণ। মূলত এই তিন কারণে আমাকে শায়েস্তা করতেই তারা ত্বকীকে টার্গেট করে।
স্ট্রিম: ত্বকী হত্যাকাণ্ডের তদন্ত পুলিশ থেকে র্যাবে যাওয়ার বিষয়টি আপনি কীভাবে দেখছেন?
রফিউর রাব্বি: আমার কাছে বিষয়টি খুব ইতিবাচক মনে হয় না। ঘটনাটা তো ২০১৩ সালের ৬ মার্চের। সেদিন ত্বকী নিখোঁজ হয়। পরে ৮ মার্চ পুলিশই তার লাশ উদ্ধার করে। সেদিনই আমরা একটি এফআইআর করি। তখন কিন্তু আমরা কারও নাম উল্লেখ না করে অজ্ঞাতনামা আসামি দিয়ে করেছিলাম। তখন অনেকেই বলছিল—এটা অমুকদের কাজ। কিন্তু আমি মনে করি, প্রমাণ ছাড়া কারও নাম দেওয়া ঠিক নয়। রাজনৈতিক ব্যক্তিরা অনেক সময় একে অপরকে ফাঁসানোর জন্য এমনটা করে। এতে করে মূল ঘটনাটাই নষ্ট হয়ে যায়। সে কারণেই আমি তখন কোনো নাম দিতে চাইনি।
এরপর ১৩ মার্চ ঢাকার ডিবি থেকে অ্যাসিস্ট্যান্ট পুলিশ কমিশনার শহীদুল আলম আসেন। এই ঘরে বসে আমার সঙ্গে কথা বলেন। তিনি আমাকে নাসিম ওসমান ও তার ছেলে আজমেরী ওসমানের একটি টেলিফোন কথোপকথনের রেকর্ড শোনান। সেই কথোপকথন শোনার পর আমি নিশ্চিত হই যে ঘটনাটি ওরাই ঘটিয়েছে। এর দুই দিন পর, নারায়ণগঞ্জে আমাদের একটি সমাবেশ ছিল। ১৫ মার্চ সেখানে—শহীদ মিনারে—আমি প্রথম প্রকাশ্যে বলি যে, এই ঘটনার সঙ্গে ওরা জড়িত।
স্ট্রিম: আপনি নিজেই শহীদ মিনারে সেটা বলেছিলেন?
রফিউর রাব্বি: হ্যাঁ। এরপর ১৭ মার্চ আমরা পুলিশকে একটি লিখিত অবগতি পত্র দিই। সেখানে শামীম ওসমান, অয়ন ওসমানসহ মোট সাতজনের নাম উল্লেখ করি।
স্ট্রিম: পুলিশ কর্মকর্তার শোনানো ফোনালাপে আসলে কী ছিল, যার পর আপনি ওসমান পরিবারের জড়িত থাকার বিষয়ে নিশ্চিত হলেন?

রফিউর রাব্বি: (একটি নথি বের করে পড়ে শোনান) ডকুমেন্টে ‘Bangladesh Form No. (M) 34’ হিসেবে উল্লেখ ছিল। কথোপকথনটি ছিল নাসিম ওসমান ও তার ছেলে আজমেরী ওসমানের মধ্যে। সময় বিকেল ৪টা ৪১ মিনিট, এবং কথোপকথনের দৈর্ঘ্য প্রায় সাড়ে পাঁচ মিনিট।
ডকুমেন্ট অনুযায়ী কথোপকথনের একটি অংশ ছিল এ রকম—
নাসিম ওসমান: কাজটা কে করেছে?
আজমেরী ওসমান: ছোটটায় করেছে—অয়ন (ওসমান)।
নাসিম ওসমান: তুমি সাথে আছ? তোমার আশপাশ ক্লিয়ার কর। এটা ধরা পড়লে কিন্তু আগেরটাও বেরিয়ে আসবে।
আজমেরী ওসমান: (নিরুত্তর)
নাসিম ওসমান: যেটা ধরা পড়েছে, ও কে?
আজমেরী ওসমান: ও আমার বন্ধু। ছাত্রসমাজ করে।
নাসিম ওসমান: সাবধান, যাতে সন্দেহ করতে না পারে।
আজমেরী ওসমান: এজন্যই এখন আমি বেশি বেশি ঘুরাঘুরি করছি, যাতে সন্দেহ না করে।
নাসিম ওসমান: এজন্য প্রচুর টাকা খরচ করতে হচ্ছে। এখনো টাকা দিয়ে এলাম। এটা প্রকাশ পেলে কিন্তু আমাদের রাজনীতি শেষ হয়ে যাবে।
এই কথোপকথন শোনার পরই আমার কাছে স্পষ্ট হয় যে ত্বকী হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে কারা জড়িত থাকতে পারে।
স্ট্রিম: ওসমান পরিবারের বিরুদ্ধে প্রকাশ্যে কথা বলার কারণে আপনাকে ব্যক্তিগতভাবে নানাভাবে দমানোর চেষ্টা করা হয়েছে। সেই পরিস্থিতিটা কেমন ছিল?
রফিউর রাব্বি: আমাদের মুখ বন্ধ করার জন্য তারা বহু চেষ্টা করেছে। ত্বকী হত্যা মামলার আইনজীবী প্রদীপ বাবুর চেম্বারে হামলা করে তার গুরুত্বপূর্ণ ফাইলপত্র তছনছ করেছে। একবার শহীদ মিনারে একটা প্রোগ্রামে বাবু দাঁড়িয়ে ছিল। শামীম ওসমান এসে হুমকির সূরে বলেছিলো, ‘মালাউনের বাচ্চা, তোরে দেখা নিমু।’ তবে যখন আমরা প্রকাশ্যে বলতে শুরু করলাম যে, ওসমান পরিবার ঘাতক পরিবার এবং ১৯৭৩ সাল থেকে এ পর্যন্ত তারা ২৪টি খুন করেছে, তখন আমরা একটা ধীর পরিবর্তন লক্ষ্য করলাম। মানুষ আস্তে আস্তে সাহসী হতে শুরু করে। নানা আন্দোলনে তারা অংশগ্রহণ করতে শুরু করে।

স্ট্রিম: রাজনৈতিক ক্ষমতার অপব্যবহার করে আপনার বিরুদ্ধে মামলা করছে—এমন অভিযোগ শোনা যায়। এ নিয়ে কিছু বলবেন?
রফিউর রাব্বি: রাজনৈতিক ক্ষমতা ব্যবহার করে আমার বিরুদ্ধে মোট সাতটি মামলা দেওয়া হয়। শামীম ওসমানের স্ত্রী, মামাশ্বশুর, ব্যাংকের ডিজিএম, জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক—এমনকি হেফাজতে ইসলামের নারায়ণগঞ্জের আমিরকে দিয়ে ধর্ম অবমাননার মামলাও দেওয়া হয়। শামীম ওসমানের স্ত্রী আমার বিরুদ্ধে কয়েক কোটি টাকার মানহানির মামলা করেছিলেন। কারণ, আমি বলেছিলাম, তার বাবা আসলেই রাজাকার ছিলেন। একজন রাজাকারের মেয়ের সাথে তিনি (শামীম ওসমান) ঘর করেন কীভাবে! সংসদে গিয়ে মুক্তিযুদ্ধের কথা বলে কীভাবে!
স্ট্রিম: আপনার বিরুদ্ধে ধর্ম অবমাননার মতো স্পর্শকাতর অভিযোগ কীভাবে এবং কেন আনা হয়েছিল?
রফিউর রাব্বি: আমি শহীদ মিনারে একটি অনুষ্ঠানে বলেছিলাম, মুক্তিযুদ্ধের চেতনা হচ্ছে অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশ; সংবিধানে ‘বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম’ প্রতিস্থাপনের জন্য মুক্তিযুদ্ধ হয়নি। এটাকে তারা ইসলাম ধর্মের অবমাননা আখ্যা দিয়ে আমার বিরুদ্ধে মিছিল করাল। জুমার নামাজের সময় বিভিন্ন মসজিদে আমার বিরুদ্ধে উসকানিমূলক চিরকুট পাঠানো হলো। ২০১৬ সালে ওই ধর্ম অবমাননা মামলার ধার্য তারিখে আমি যেন আদালতে যেতে না পারি, সে জন্য নিজস্ব ব্যবসা ও কারখানার দুই-আড়াই হাজার লোককে টুপি পরিয়ে বড় ব্যানার নিয়ে হাজির করা হয়েছিল। আমার ‘কল্লা’ চেয়ে তারা মিছিলও করেছে। আমাকে আদালত থেকে ফোন করে বলা হলো, গেলে মেরে ফেলবে। পরে আমি এসপিকে ফোন করে পুলিশের গাড়ির সহায়তায় আদালতে যাই। শেষ পর্যন্ত হাইকোর্ট থেকে মামলাটি খারিজ হয়ে যায়।
স্ট্রিম: আপনার বিরুদ্ধে ব্যাংকের কর্মকর্তাদের দিয়ে মামলা করার কথা বলেছিলেন। সেটা কীভাবে?
রফিউর রাব্বি: শামীম ওসমান ব্যাংক কর্মকর্তাদের পরিবার ও সন্তান-সন্ততিদের গতিবিধি ট্র্যাক করে তাদের ব্ল্যাকমেইল করত। এমনকি শেষ পর্যন্ত তার গুন্ডাবাহিনীর অস্ত্রের মুখে ব্যাংক কর্মকর্তারা আমার বিরুদ্ধে মামলা করে।

স্ট্রিম: আপনার বিরুদ্ধে থাকা সেই সাতটি মামলার বর্তমান অবস্থা কী?
রফিউর রাব্বি: এখন আর কোনো মামলা নেই, সবগুলোই খারিজ হয়ে গেছে। আমি আইনি লড়াইয়ে পিছিয়ে যাইনি। ৫ আগস্ট সরকার পতনের আগেই আমার বিরুদ্ধে থাকা ছয় মামলা খারিজ হয়। সরকার পতনের পর বাকি একটাও খারিজ হয়। আওয়ামী আমলে ছয় মামলা বাতিল হওয়ার পরও শামীম ওসমানের গুন্ডারা শহীদ মিনারে আমাদের সমাবেশে নেশাগ্রস্ত অবস্থায় পিস্তল নিয়ে ঢুকে ফাঁকা গুলি ছোড়ার বাস্তবতাও দেখেছে নারায়ণগঞ্জবাসী।
স্ট্রিম: আপনাকে সামাজিকভাবে হেয় করার বিষয়টি কেমন ছিল? পাশাপাশি শারীরিকভাবে কোনো নির্যাতন করেছিল কি?
রফিউর রাব্বি: শারীরিকভাবে আমাকে কিছু করতে পারবে না, এটা তারা খুব ভালো করেই জানত। এ জন্যই তারা আমার ছেলেকে টার্গেট করে। সামাজিকভাবে হেয় করার জন্য একবার তারা আমার গলায় জুতার মালা দেওয়া ছবি দিয়ে সারা শহর পোস্টারে ভরে ফেলেছিল। কিন্তু শহরের মানুষ এতে উল্টো প্রতিক্রিয়া দেখায়। মানুষ তো আমাকে অন্তত এইরকম ভাবার কোনো কারণ পায়নি।
স্ট্রিম: শামীম ওসমান পরিবারের নিজস্ব টর্চার সেল ছিল বলে একটা কথা প্রচলিত আছে। এব্যাপারে আপনার মন্তব্য কী?
রফিউর রাব্বি: নারায়ণগঞ্জে তাদের ছয়টি টর্চার সেল বা নির্যাতনকেন্দ্র ছিল। ‘উইনার ফ্যাশন’ নামের তেমনই একটি টর্চার সেলে ত্বকীকে হত্যা করা হয়। ত্বকীকে হত্যার পরই আমরা এসব টর্চার সেলের কথা জানতে পারি। এসপিকে চিঠি দেওয়ার পর পুলিশ সেগুলোতে যায় এবং আলামত সংগ্রহ করে সেগুলো বন্ধ করে দেয়। ওই টর্চার সেলগুলোতে অসংখ্য মানুষকে ধরে এনে রাতে নির্যাতন ও হত্যা করা হয়েছে। আশেপাশের মানুষ প্রায়ই গুলি শব্দ ও নির্যাতিতদের চিৎকার শুনতো। শহরের প্রাণকেন্দ্রে প্রকাশ্যে এসব ঘটত, অথচ প্রশাসনের কোনো বিকার ছিল না।
স্ট্রিম: ত্বকীর নির্মম হত্যাকাণ্ডের পর ১৩ বছর ধরে মার্চ মাসের ৮ তারিখে আপনারা বিচার চেয়ে মোমবাতি প্রজ্বালন করে আসছেন। দীর্ঘ এই সময়ে আপনাদের প্রতি রাষ্ট্র কি পুরোপুরি বধির ছিল?
রফিউর রাব্বি: আমার এবং আরও অনেকের ধারণা, রাষ্ট্র বধির হয়েই আছে। তবে এই ১৩ বছরে দেশের অনেক বিশিষ্ট মানুষ বধির ছিলেন না, তারা আমাদের পাশে দাঁড়িয়েছেন। বেলাল চৌধুরী, আসাদ চৌধুরী, রফিক আজাদ, হেলাল হাফিজের মতো কবিরা ত্বকীকে নিয়ে কবিতা লিখেছেন। শিল্পীদের মধ্যে হাশেম খান, রফিকুন নবী, শহীদ কবির, বীরেন সোম থেকে শুরু করে বহু শিল্পী ত্বকীর জন্য ছবি এঁকেছেন। অনেকে গান লিখেছেন, প্রামাণ্যচিত্র তৈরি করেছেন। ত্বকীকে নিয়ে এখন পর্যন্ত প্রায় ২০টির মতো প্রকাশনা বেরিয়েছে। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে একজন ত্বকী হত্যাকাণ্ড নিয়ে পিএইচডি করেছেন। দেশের বাইরেও ২২টি দেশে ত্বকী হত্যার বিচার চাওয়া হচ্ছে।
স্ট্রিম: বিশ্বের ২২টি দেশে প্রতিবাদ এবং দেশের ভেতরে আপনাদের এই দীর্ঘ ধারাবাহিক আন্দোলন—সম্প্রতি জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে এর কোনো প্রভাব আছে বলে মনে করেন?
রফিউর রাব্বি: হ্যাঁ, ১৩ বছর ধরে বিরতিহীনভাবে বিচার চেয়ে যাওয়ার নজির বিশ্বে খুব কমই পাওয়া যাবে। আনু মুহাম্মদ, বাসদের খালেকুজ্জামানসহ অনেকেই বলেন—শেখ হাসিনার যে পতন হলো, তা শুধু জুলাই মাসের ছাত্র-জনতার আন্দোলনের ফসল নয়, ত্বকীর বিচারের দাবিতে প্রতি মাসে আমরা যে ধারাবাহিক আন্দোলন করেছি, তাতেও শেখ হাসিনা সরকারের এক একটি ভিত ভেঙেছে। আমাদের এই ধারাবাহিক ছোট ছোট আন্দোলনেরই একটি চূড়ান্ত বহিঃপ্রকাশ হচ্ছে জুলাই গণ–অভ্যুত্থান। শেখ হাসিনা সরকার নিজেদের অপরাজেয় মনে করত।
স্ট্রিম: এই ১৩ বছরের বিচারহীনতার সংস্কৃতি রাষ্ট্র ও সমাজের ওপর কী প্রভাব ফেলেছে বলে মনে করেন? রাষ্ট্র ব্যর্থ হলে সমাজের গন্তব্য কোথায় গিয়ে দাঁড়াবে?
রফিউর রাব্বি: আমাদের সংবিধানে ৯০ দিনের মধ্যে অভিযোগপত্র দেওয়ার কথা বলা আছে, আর সেখানে পার হলো ১৩ বছর! এই সময়ে তিনটি সরকার বদল হয়েছে। বিচার না পেলে মানুষের মধ্যে বিচারব্যবস্থার প্রতি অনীহা, অশ্রদ্ধা ও আস্থাহীনতা তৈরি হয়।
বিচারব্যবস্থার ওপর মানুষের আস্থা ফিরিয়ে আনা না গেলে রাষ্ট্রে গণতন্ত্র বা মানবাধিকার কোনো কিছুই টিকবে না। রাষ্ট্র ব্যর্থ হলে আমরা নিজেদের সভ্য দেশ হিসেবে দাবিই করতে পারব না। সরকার যদি রাজনৈতিক কারণে বেছে বেছে বিচার করে এবং কিছু বিচার আটকে রাখে—যেমনটা শেখ হাসিনার সময় হয়েছে—সেটা কোনো প্রক্রিয়া হতে পারে না। বিচার পাওয়া প্রত্যেক নাগরিকের অধিকার।
স্ট্রিম: তদন্তের প্রথম দিকে তো কিছুটা অগ্রগতি ছিল। ২০১৪ সালে র্যাব সংবাদ সম্মেলন করে অভিযোগপত্র দেওয়ার কথাও বলেছিল। তাহলে বিচারপ্রক্রিয়া আটকে গেল কীভাবে?
রফিউর রাব্বি: অদৃশ্য শক্তি তো আসলে দৃশ্যমানই ছিল। ২০১৪ সালের ৫ মার্চ সংবাদ সম্মেলন করে র্যাব বলেছিল, ওসমান পরিবারের ১১ জন মিলে ত্বকীকে হত্যা করেছে এবং তারা অচিরেই অভিযোগপত্র দেবে। কিন্তু র্যাবের অভিযোগ ঘোষণার তিন মাস পর, ৩ জুন শেখ হাসিনা সংসদে দাঁড়িয়ে বলেন, তিনি ওসমান পরিবারের পাশে আছেন। এরপরই বিচার কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যায়। এমনকি বিচারিক প্রক্রিয়াকে নানাভাবে নাই করে দেয়ার বাস্তবতাও তৈরি করেছিল।

স্ট্রিম: মূল অভিযুক্তদের অনেকেই নানাভাবে পালিয়ে গেল। এক্ষেত্রে আপনি কাকে দায়ী করবেন?
রফিউর রাব্বি: ৫ আগস্টের পর শামীম ওসমানের পুরো পরিবার বিভিন্ন দেশে পালিয়ে গেছে। তারা কীভাবে সপরিবার দেশ থেকে পালাল? সরকারি বাহিনী ও কিছু রাজনৈতিক লোক তাদের দেশ ছাড়তে সহযোগিতা করেছে। এক্ষেত্রে আমি প্রশাসনের দায়িত্বশীলতার ঘাটতিকে দায়ী বলে মনে করছি।
স্ট্রিম: ৫ আগস্টের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর বিচার প্রক্রিয়ায় দৃশ্যমান বাধা তো আর নেই। বর্তমান তদন্তকারী সংস্থার তৎপরতাকে কীভাবে মূল্যায়ন করছেন?
রফিউর রাব্বি: এই ১৩ বছরের মধ্যে সাড়ে ১১ বছরই ছিল শেখ হাসিনার শাসনকাল। তাঁর ইচ্ছাতেই বিচারপ্রক্রিয়া বন্ধ করে রাখা হয়েছিল। এখন অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে শুরুতে সদিচ্ছা দেখা গিয়েছিল। কয়েকজন উপদেষ্টা জোর দিয়ে বলেছিলেন, তাঁরা অগ্রাধিকার ভিত্তিতে ত্বকী ও সাগর-রুনি হত্যার বিচার দ্রুতগতিতে করবেন। তাদের সেই প্রতিশ্রুতির পর তদন্তকারী সংস্থা র্যাবের কিছুটা তৎপরতা দেখা যায়। নতুন করে পাঁচ-ছয়জনকে গ্রেপ্তার করা হয়। একজনের ১৬৪ ধারায় জবানবন্দিও নেওয়া হয়। কিন্তু রাজনৈতিক সরকার ছাড়া সবকিছুর গতিই মন্থর থাকে। কারণ সেনাবাহিনী, র্যাব বা পুলিশ জানে যে, অন্তর্বর্তীকালীন সরকার দীর্ঘস্থায়ী নয়।
আমার মনে হয়, সেই কারণেই যারা তদন্ত করেছে তারা বিষয়টিকে খুব বেশি গুরুত্ব দিয়ে এগিয়ে নিয়ে যায়নি। অর্ডার ছিল ঠিকই, কিন্তু বাস্তবে সেটাকে খুব একটা গুরুত্ব দেওয়া হয়নি।
স্ট্রিম: এখন পর্যন্ত তদন্তকারী সংস্থা সুনির্দিষ্ট কী কী আলামত সংগ্রহ করেছে বলে জানেন?
রফিউর রাব্বি: আমি দেখেছি, তারা অনেক কিছুই সংগ্রহ করেছে। উইনার ফ্যাশন নামের যে টর্চার সেলে ত্বকীকে হত্যা করা হয়েছিল, সেটির ভাড়ার চুক্তিপত্র, ট্রেড লাইসেন্স, সাইনবোর্ডে থাকা টেলিফোন নম্বরটি কার নামে—এসব কাগজপত্র তারা জোগাড় করেছে। এ ছাড়া ত্বকীকে হত্যার পর আজমেরী ওসমানের যে গাড়িতে করে লাশ শীতলক্ষ্যায় ফেলে দেওয়া হয়, সেই গাড়ির চালক জমশেদকে আবার গ্রেপ্তার করা হয়েছে। এখন সে কারাগারেই আছে। তবে বাকি আসামিরা কেউ জামিনে, কেউ পলাতক। এ জন্যই হয়তো সব গুছিয়ে অভিযোগপত্র দিতে তাদের দেরি হচ্ছে।
স্ট্রিম: শেখ হাসিনার সময়ের চাপ এখন নেই। তারপরও অভিযোগপত্র দাখিল করতে এত দেরি হওয়ার পেছনের কারণ কি বলে মনে হচ্ছে?
রফিউর রাব্বি: শেখ হাসিনার সময়ের চাপটা এখন নেই, সেটা ঠিক। কিন্তু বাধাটা অন্য জায়গায়। আমি র্যাবকে স্পষ্ট বলেছি, এই হত্যাকাণ্ডের নির্দেশদাতা শামীম ওসমান, তাঁর ছেলে, ভাতিজাসহ যারা যারা জড়িত, প্রত্যেককে যথাযথভাবে আইনের আওতায় আনতে হবে। অভিযোগপত্র যেন এমন না হয়, যার ফাঁকফোকর গলে নিম্ন আদালতে কারও সাজা হলেও উচ্চ আদালত থেকে তারা সহজেই বেরিয়ে যায়। এত বছর পর অভিযোগপত্র আসার পর যদি দেখা যায় তাতে ত্রুটি আছে এবং আমরা নারাজি দিই, তখন মামলাটি হয়তো র্যাব থেকে অন্য কোনো তদন্ত সংস্থায় যাবে, যা কাম্য নয়। এর আগে মামলাটি পুলিশ থেকে র্যাবে এসেছিল।
স্ট্রিম: ওসমান পরিবারের পলায়নের পেছনে বিপুল অঙ্কের অর্থের লেনদেন হয়েছে বলে গুঞ্জন রয়েছে। এই অর্থ কি এখন বিচারপ্রক্রিয়াকে প্রভাবিত করতে পারে?
রফিউর রাব্বি: শোনা যায়, ৩০০ থেকে ৫০০ কোটি টাকার বিনিময়ে তারা পালিয়েছে। তাদের তো হাজার হাজার কোটি টাকা। এই টাকা তারা এখনো বিভিন্ন গোষ্ঠীকে দিচ্ছে বলে আমরা শুনছি। তারা পালিয়েছে তাদের রেখে যাওয়া সংস্কৃতি তো পালায়নি। অর্থের বিনিময়ে তারা বিচারকে প্রভাবিত বা প্রলম্বিত করার চেষ্টা করবে, সেটাই স্বাভাবিক। এদিক থেকে এখনো বিচারপ্রক্রিয়া অন্যদিকে মোড় নেওয়ার আশঙ্কা এখনো রয়ে গেছে।
স্ট্রিম: রাজনৈতিক দলগুলোর অবস্থান, বিশেষ করে বিএনপির ভূমিকা কীভাবে দেখছেন? অতীতে তো তারা ত্বকী হত্যার বিচার চেয়েছিল।
রফিউর রাব্বি: ২০১৩ সালের মে মাসে খালেদা জিয়া নারায়ণগঞ্জে এসে ত্বকী হত্যার বিচার দাবি করেছিলেন। তিনি বলেছিলেন, শামীম ওসমানের মতো গডফাদার এমন হত্যাকাণ্ডের পরও বাইরে ঘুরে বেড়ায় কীভাবে। এমনকি গাজীপুরে এক নির্বাচনী সমাবেশে তারেক রহমানও ত্বকীর কথা উল্লেখ করেছিলেন। ক্ষমতার বাইরে থাকলে রাজনৈতিক দলগুলোর এক রকম চরিত্র দেখা যায়, আবার ক্ষমতায় গেলে অন্য রকম হয়। তবে আমরা আশা করি, ত্বকীর বিচারের ক্ষেত্রে অন্তত তারা কোনো রাজনৈতিক দুরভিসন্ধি বিবেচনায় আনবেন না।
স্ট্রিম: ত্বকী হত্যার বিচারের দীর্ঘ আন্দোলনে বিভিন্ন রাজনৈতিক দল নানা উদ্দেশ্যেই আপনাদের পাশে এসে সামিল হয়েছে তাদের কীভাবে সামলাতেন?
রফিউর রাব্বি: সিপিবি, বাসদসহ বাম প্রগতিশীল দলগুলো আমাদের সঙ্গে ছিল। তবে যারা এই আন্দোলন থেকে রাজনৈতিক ফায়দা লুটতে চাইত, তারা যেন এর সঙ্গে যুক্ত হতে না পারে, সে বিষয়ে আমরা খুব সচেতন ছিলাম। বিএনপির নেতারা শুরু থেকেই আমাদের মঞ্চে আসতে চেয়েছিলেন, কিন্তু আমরা বারণ করেছি। কারণ, তখন বিএনপিকে মঞ্চে তুললে শামীম ওসমান সহজেই প্রমাণ করার চেষ্টা করতেন যে বিএনপি তাদের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করছে। এমনকি একসময় শামীম ওসমানের পক্ষে কাজ করত, এমন একটি টিভি চ্যানেলও আমাদের আন্দোলনে যুক্ত হতে চেয়েছিল। আমরা দিইনি, কারণ এতে আমাদের পুরো আন্দোলনই প্রশ্নবিদ্ধ হতো।

স্ট্রিম: বিচারের এই দীর্ঘ লড়াইয়ে আপনাদের আসন্ন কর্মসূচি কী?
রফিউর রাব্বি: প্রতিবছরই ত্বকীকে ঘিরে আমাদের কিছু কর্মসূচি থাকে। এবারও আছে। শুক্রবার (৬ মার্চ) সকাল সাড়ে ৯টায় নারায়ণগঞ্জের বন্দর সিরাজ শাহর আস্তানায় ত্বকীর সমাধিতে পুষ্পস্তবক অর্পণ ও মিলাদ মাহফিলের আয়োজন করা হয়েছে। এরপর ৮ মার্চ সন্ধ্যা সাতটায় নারায়ণগঞ্জ সাংস্কৃতিক জোটের উদ্যোগে নারায়ণগঞ্জ কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে আলোক প্রজ্বালন কর্মসূচি পালিত হবে। সবশেষ ১৪ মার্চ বেলা আড়াইটায় ঢাকায় জাতীয় সংসদ ভবনের সামনে বিশেষ সমাবেশ অনুষ্ঠিত হবে। ‘ত্বকী সমাবেশ’ নামের এই কর্মসূচিতে কথা, গান, নাটক ও ছবি আঁকার মধ্য দিয়ে এই হত্যাকাণ্ডের বিচারহীনতার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানানো হবে। আরেকটা কর্মসূচি নিয়ে আমরা আলোচনা করছি, আগামী ১২ তারিখ যখন সংসদ বসবে, তখন আমাদের একটি পরিকল্পনা রয়েছে। আমরা নিয়মতান্ত্রিকভাবেই এগোতে চাই। ত্বকীর মায়ের লেখা একটি খোলা চিঠি ২৯৭ জন সংসদ সদস্যের সবার হাতে পৌঁছে দেওয়ার পরিকল্পনা আমাদের রয়েছে।
স্ট্রিম: একজন বিচারপ্রার্থী ও বাবা হিসেবে বর্তমান সরকারের কাছে আপনার প্রত্যাশা কী?
রফিউর রাব্বি: এখন বিএনপি সরকার গঠন করেছে, তাদের সবচেয়ে বড় দায়িত্ব হলো বিচারব্যবস্থার ওপর মানুষের আস্থা ফিরিয়ে আনা। নির্বাহী ও বিচার বিভাগকে স্বাধীনভাবে চলতে দিতে হবে, অর্থের কাছে বিক্রি হওয়া যাবে না। তা না হলে, এই আস্থার সংকট থেকে উত্তরণ খুবই কঠিন হবে।
স্ট্রিম: সবশেষে, আদালতের আগামী ধার্য দিনে অভিযোগপত্র (চার্জশিট) দাখিল নিয়ে আপনারা কতটা আশাবাদী?
রফিউর রাব্বি: গতকাল বৃহস্পতিবার ১০২তম বারের মতো তদন্ত কর্মকর্তা চার্জশিট দাখিল করতে পারেননি। আগামী এপ্রিলের ২৬ তারিখ পরবর্তী তারিখ নির্ধারণ করেছে আদালত। হ্যাঁ, আমরা আশাবাদী। আমরা আশাবাদী এ কারণে যে, অভিযোগপত্রটি এমনভাবে তৈরি হোক, যাতে আইনে কোনো ফাঁকফোকর না থাকে। ফাঁক থাকলে নিম্ন আদালতে হয়তো সাজা হবে, কিন্তু উচ্চ আদালতে গিয়ে আসামিরা পার পেয়ে যাবে।
স্ট্রিম: ঢাকা স্ট্রিমকে সময় দেয়ার জন্য আপনাকে৷ ধন্যবাদ।
রফিউর রাব্বি: আপনাকেও ধন্যবাদ।

তেরো বছর ধরে মার্চ মাসের ৮ তারিখে নারায়ণগঞ্জের শহীদ মিনারে জ্বলে ওঠে প্রতিবাদের মোমবাতি। দাবি একটাই—মেধাবী কিশোর তানভীর মুহাম্মদ ত্বকী হত্যার বিচার। ২০১৩ সালের ৬ মার্চ নিখোঁজ হওয়ার পর ১৩টি বছর পেরিয়ে গেলেও আজও অধরা ন্যায়বিচার। গত এক যুগের বেশি সময়ে ১০২ বার চার্জশিট দাখিলের তারিখ অতিক্রান্ত হয়েছে; ১০৩তম তারিখ ধার্য হয়েছে আগামী ২৬ এপ্রিল।
প্রভাবশালী ওসমান পরিবারের বিরুদ্ধে আঙুল তুলে এই দীর্ঘ লড়াই চালিয়ে যাচ্ছেন ত্বকীর বাবা, বিশিষ্ট সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব রফিউর রাব্বি। হামলা, হুমকি আর সাতটি মামলার বোঝা মাথায় নিয়েও তিনি দমে যাননি। ২০২৪ সালের গণ-অভ্যুত্থানের পর নতুন করে আশার আলো দেখলেও বাধার দেয়াল এখনো পুরোপুরি কাটেনি। কেন ঝুলে আছে র্যাবের তদন্ত? প্রভাবশালী আসামিদের প্রভাব কি এখনো বিচারের পথ রুদ্ধ করে রাখছে? এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজতেই রফিউর রাব্বির মুখোমুখি হয়েছিলেন ঢাকা স্ট্রিম-এর স্টাফ রিপোর্টার ইমরান হোসাইন।
স্ট্রিম: আশা করছি ভালো আছেন। পরিবারের সবাই কেমন আছেন?
রফিউর রাব্বি: গলায় ইনফেকশনের কারণে ত্বকীর মা কথা বলতে পারছে না। যা কিছু বলার লিখেই আমাদের জানাচ্ছে। এছাড়া ভালো আছি।
স্ট্রিম: আপনার ছেলে তানভীর মুহাম্মদ ত্বকী হত্যার ১৩ বছর পার হতে চলল। এই নির্মম হত্যাকাণ্ডের পেছনে অনেকেই নারায়ণগঞ্জের রাজনৈতিক ও সামাজিক নানা ইস্যুতে আপনার সোচ্চার ভূমিকাকে প্রধান কারণ হিসেবে দেখছে। এক্ষেত্রে আপনার মূল্যায়ন কী?
রফিউর রাব্বি: শুধু এটিই একমাত্র কারণ নয়। ২০১৪ সালের ৫ মার্চ র্যাবের তৎকালীন অতিরিক্ত মহাপরিচালক কর্নেল জিয়াউল আহসান সংবাদ সম্মেলনে জানিয়েছিলেন, র্যাব তাদের তৈরি করা অভিযোগপত্রে ত্বকীকে হত্যা করার পেছনে তিনটি কারণ উল্লেখ করেছে। প্রথমত, ২০১১ সালে নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশন নির্বাচনে শামীম ওসমানের বিপক্ষে ডা. সেলিনা হায়াৎ আইভীর নির্বাচন পরিচালনার মূল দায়িত্ব পালন করেছিলাম আমি। সেখানে শামীম ওসমানের নানা অপকীর্তি জনগণের সামনে তুলে ধরি। ওই নির্বাচনে শামীম ওসমান ১ লাখ ৩ হাজার ভোটের ব্যবধানে পরাজিত হন। র্যাব বলছে, এটি এক নম্বর কারণ।
দ্বিতীয় কারণটি হলো, ২০১১ সালের জুনে ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ রুটে বাসের ভাড়া ২২ টাকা থেকে হঠাৎ ৩২ টাকা করা হয়। তখন সব রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠন মিলে ‘যাত্রী অধিকার সংরক্ষণ ফোরাম’ গঠন করা হয়, যার আহ্বায়ক ছিলাম আমি। পরিবহন খাত থেকে ওসমান পরিবার যে চাঁদা নিত, সেটি আমরা একটি সংবাদ সম্মেলন করে তথ্যপ্রমাণসহ তুলে ধরি। আমাদের আন্দোলনের মুখে তিন দফায় ভাড়া কমিয়ে ২৭ টাকায় আনা হয়। র্যাবের মতে, এটি ছিল ত্বকীকে হত্যার দ্বিতীয় কারণ।
আর তৃতীয় কারণটি হলো, নারায়ণগঞ্জের ১ নম্বর রেলগেটে রেলওয়ের বিশাল জায়গা দখল করে মার্কেট নির্মাণ শুরু করেছিলেন শামীম ওসমানের বড় ভাই নাসিম ওসমান। সেখানে আজমেরী ওসমানসহ ওসমান পরিবারের অন্য সদস্য এবং আওয়ামী লীগের কিছু ক্যাডার মিলেমিশে ভাগবাঁটোয়ারা করছিল। ২০১২ সালের শীতকালে নারায়ণগঞ্জের সব সংগঠন মিলে ‘ভূমি রক্ষা নাগরিক আন্দোলন’ গড়ে ওঠে। ওই সংগঠনেরও আহ্বায়ক করা হয় আমাকে। আন্দোলনটি এত বড় আকার ধারণ করেছিল যে একপর্যায়ে র্যাবের তৎকালীন মহাপরিচালক ও আওয়ামী লীগ নেতা ওবায়দুল কাদের নারায়ণগঞ্জে এসে ঘোষণা দেন যে, সেখানে কোনো মার্কেট হবে না। র্যাব বলছে, এটি হলো তিন নম্বর কারণ। মূলত এই তিন কারণে আমাকে শায়েস্তা করতেই তারা ত্বকীকে টার্গেট করে।
স্ট্রিম: ত্বকী হত্যাকাণ্ডের তদন্ত পুলিশ থেকে র্যাবে যাওয়ার বিষয়টি আপনি কীভাবে দেখছেন?
রফিউর রাব্বি: আমার কাছে বিষয়টি খুব ইতিবাচক মনে হয় না। ঘটনাটা তো ২০১৩ সালের ৬ মার্চের। সেদিন ত্বকী নিখোঁজ হয়। পরে ৮ মার্চ পুলিশই তার লাশ উদ্ধার করে। সেদিনই আমরা একটি এফআইআর করি। তখন কিন্তু আমরা কারও নাম উল্লেখ না করে অজ্ঞাতনামা আসামি দিয়ে করেছিলাম। তখন অনেকেই বলছিল—এটা অমুকদের কাজ। কিন্তু আমি মনে করি, প্রমাণ ছাড়া কারও নাম দেওয়া ঠিক নয়। রাজনৈতিক ব্যক্তিরা অনেক সময় একে অপরকে ফাঁসানোর জন্য এমনটা করে। এতে করে মূল ঘটনাটাই নষ্ট হয়ে যায়। সে কারণেই আমি তখন কোনো নাম দিতে চাইনি।
এরপর ১৩ মার্চ ঢাকার ডিবি থেকে অ্যাসিস্ট্যান্ট পুলিশ কমিশনার শহীদুল আলম আসেন। এই ঘরে বসে আমার সঙ্গে কথা বলেন। তিনি আমাকে নাসিম ওসমান ও তার ছেলে আজমেরী ওসমানের একটি টেলিফোন কথোপকথনের রেকর্ড শোনান। সেই কথোপকথন শোনার পর আমি নিশ্চিত হই যে ঘটনাটি ওরাই ঘটিয়েছে। এর দুই দিন পর, নারায়ণগঞ্জে আমাদের একটি সমাবেশ ছিল। ১৫ মার্চ সেখানে—শহীদ মিনারে—আমি প্রথম প্রকাশ্যে বলি যে, এই ঘটনার সঙ্গে ওরা জড়িত।
স্ট্রিম: আপনি নিজেই শহীদ মিনারে সেটা বলেছিলেন?
রফিউর রাব্বি: হ্যাঁ। এরপর ১৭ মার্চ আমরা পুলিশকে একটি লিখিত অবগতি পত্র দিই। সেখানে শামীম ওসমান, অয়ন ওসমানসহ মোট সাতজনের নাম উল্লেখ করি।
স্ট্রিম: পুলিশ কর্মকর্তার শোনানো ফোনালাপে আসলে কী ছিল, যার পর আপনি ওসমান পরিবারের জড়িত থাকার বিষয়ে নিশ্চিত হলেন?

রফিউর রাব্বি: (একটি নথি বের করে পড়ে শোনান) ডকুমেন্টে ‘Bangladesh Form No. (M) 34’ হিসেবে উল্লেখ ছিল। কথোপকথনটি ছিল নাসিম ওসমান ও তার ছেলে আজমেরী ওসমানের মধ্যে। সময় বিকেল ৪টা ৪১ মিনিট, এবং কথোপকথনের দৈর্ঘ্য প্রায় সাড়ে পাঁচ মিনিট।
ডকুমেন্ট অনুযায়ী কথোপকথনের একটি অংশ ছিল এ রকম—
নাসিম ওসমান: কাজটা কে করেছে?
আজমেরী ওসমান: ছোটটায় করেছে—অয়ন (ওসমান)।
নাসিম ওসমান: তুমি সাথে আছ? তোমার আশপাশ ক্লিয়ার কর। এটা ধরা পড়লে কিন্তু আগেরটাও বেরিয়ে আসবে।
আজমেরী ওসমান: (নিরুত্তর)
নাসিম ওসমান: যেটা ধরা পড়েছে, ও কে?
আজমেরী ওসমান: ও আমার বন্ধু। ছাত্রসমাজ করে।
নাসিম ওসমান: সাবধান, যাতে সন্দেহ করতে না পারে।
আজমেরী ওসমান: এজন্যই এখন আমি বেশি বেশি ঘুরাঘুরি করছি, যাতে সন্দেহ না করে।
নাসিম ওসমান: এজন্য প্রচুর টাকা খরচ করতে হচ্ছে। এখনো টাকা দিয়ে এলাম। এটা প্রকাশ পেলে কিন্তু আমাদের রাজনীতি শেষ হয়ে যাবে।
এই কথোপকথন শোনার পরই আমার কাছে স্পষ্ট হয় যে ত্বকী হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে কারা জড়িত থাকতে পারে।
স্ট্রিম: ওসমান পরিবারের বিরুদ্ধে প্রকাশ্যে কথা বলার কারণে আপনাকে ব্যক্তিগতভাবে নানাভাবে দমানোর চেষ্টা করা হয়েছে। সেই পরিস্থিতিটা কেমন ছিল?
রফিউর রাব্বি: আমাদের মুখ বন্ধ করার জন্য তারা বহু চেষ্টা করেছে। ত্বকী হত্যা মামলার আইনজীবী প্রদীপ বাবুর চেম্বারে হামলা করে তার গুরুত্বপূর্ণ ফাইলপত্র তছনছ করেছে। একবার শহীদ মিনারে একটা প্রোগ্রামে বাবু দাঁড়িয়ে ছিল। শামীম ওসমান এসে হুমকির সূরে বলেছিলো, ‘মালাউনের বাচ্চা, তোরে দেখা নিমু।’ তবে যখন আমরা প্রকাশ্যে বলতে শুরু করলাম যে, ওসমান পরিবার ঘাতক পরিবার এবং ১৯৭৩ সাল থেকে এ পর্যন্ত তারা ২৪টি খুন করেছে, তখন আমরা একটা ধীর পরিবর্তন লক্ষ্য করলাম। মানুষ আস্তে আস্তে সাহসী হতে শুরু করে। নানা আন্দোলনে তারা অংশগ্রহণ করতে শুরু করে।

স্ট্রিম: রাজনৈতিক ক্ষমতার অপব্যবহার করে আপনার বিরুদ্ধে মামলা করছে—এমন অভিযোগ শোনা যায়। এ নিয়ে কিছু বলবেন?
রফিউর রাব্বি: রাজনৈতিক ক্ষমতা ব্যবহার করে আমার বিরুদ্ধে মোট সাতটি মামলা দেওয়া হয়। শামীম ওসমানের স্ত্রী, মামাশ্বশুর, ব্যাংকের ডিজিএম, জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক—এমনকি হেফাজতে ইসলামের নারায়ণগঞ্জের আমিরকে দিয়ে ধর্ম অবমাননার মামলাও দেওয়া হয়। শামীম ওসমানের স্ত্রী আমার বিরুদ্ধে কয়েক কোটি টাকার মানহানির মামলা করেছিলেন। কারণ, আমি বলেছিলাম, তার বাবা আসলেই রাজাকার ছিলেন। একজন রাজাকারের মেয়ের সাথে তিনি (শামীম ওসমান) ঘর করেন কীভাবে! সংসদে গিয়ে মুক্তিযুদ্ধের কথা বলে কীভাবে!
স্ট্রিম: আপনার বিরুদ্ধে ধর্ম অবমাননার মতো স্পর্শকাতর অভিযোগ কীভাবে এবং কেন আনা হয়েছিল?
রফিউর রাব্বি: আমি শহীদ মিনারে একটি অনুষ্ঠানে বলেছিলাম, মুক্তিযুদ্ধের চেতনা হচ্ছে অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশ; সংবিধানে ‘বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম’ প্রতিস্থাপনের জন্য মুক্তিযুদ্ধ হয়নি। এটাকে তারা ইসলাম ধর্মের অবমাননা আখ্যা দিয়ে আমার বিরুদ্ধে মিছিল করাল। জুমার নামাজের সময় বিভিন্ন মসজিদে আমার বিরুদ্ধে উসকানিমূলক চিরকুট পাঠানো হলো। ২০১৬ সালে ওই ধর্ম অবমাননা মামলার ধার্য তারিখে আমি যেন আদালতে যেতে না পারি, সে জন্য নিজস্ব ব্যবসা ও কারখানার দুই-আড়াই হাজার লোককে টুপি পরিয়ে বড় ব্যানার নিয়ে হাজির করা হয়েছিল। আমার ‘কল্লা’ চেয়ে তারা মিছিলও করেছে। আমাকে আদালত থেকে ফোন করে বলা হলো, গেলে মেরে ফেলবে। পরে আমি এসপিকে ফোন করে পুলিশের গাড়ির সহায়তায় আদালতে যাই। শেষ পর্যন্ত হাইকোর্ট থেকে মামলাটি খারিজ হয়ে যায়।
স্ট্রিম: আপনার বিরুদ্ধে ব্যাংকের কর্মকর্তাদের দিয়ে মামলা করার কথা বলেছিলেন। সেটা কীভাবে?
রফিউর রাব্বি: শামীম ওসমান ব্যাংক কর্মকর্তাদের পরিবার ও সন্তান-সন্ততিদের গতিবিধি ট্র্যাক করে তাদের ব্ল্যাকমেইল করত। এমনকি শেষ পর্যন্ত তার গুন্ডাবাহিনীর অস্ত্রের মুখে ব্যাংক কর্মকর্তারা আমার বিরুদ্ধে মামলা করে।

স্ট্রিম: আপনার বিরুদ্ধে থাকা সেই সাতটি মামলার বর্তমান অবস্থা কী?
রফিউর রাব্বি: এখন আর কোনো মামলা নেই, সবগুলোই খারিজ হয়ে গেছে। আমি আইনি লড়াইয়ে পিছিয়ে যাইনি। ৫ আগস্ট সরকার পতনের আগেই আমার বিরুদ্ধে থাকা ছয় মামলা খারিজ হয়। সরকার পতনের পর বাকি একটাও খারিজ হয়। আওয়ামী আমলে ছয় মামলা বাতিল হওয়ার পরও শামীম ওসমানের গুন্ডারা শহীদ মিনারে আমাদের সমাবেশে নেশাগ্রস্ত অবস্থায় পিস্তল নিয়ে ঢুকে ফাঁকা গুলি ছোড়ার বাস্তবতাও দেখেছে নারায়ণগঞ্জবাসী।
স্ট্রিম: আপনাকে সামাজিকভাবে হেয় করার বিষয়টি কেমন ছিল? পাশাপাশি শারীরিকভাবে কোনো নির্যাতন করেছিল কি?
রফিউর রাব্বি: শারীরিকভাবে আমাকে কিছু করতে পারবে না, এটা তারা খুব ভালো করেই জানত। এ জন্যই তারা আমার ছেলেকে টার্গেট করে। সামাজিকভাবে হেয় করার জন্য একবার তারা আমার গলায় জুতার মালা দেওয়া ছবি দিয়ে সারা শহর পোস্টারে ভরে ফেলেছিল। কিন্তু শহরের মানুষ এতে উল্টো প্রতিক্রিয়া দেখায়। মানুষ তো আমাকে অন্তত এইরকম ভাবার কোনো কারণ পায়নি।
স্ট্রিম: শামীম ওসমান পরিবারের নিজস্ব টর্চার সেল ছিল বলে একটা কথা প্রচলিত আছে। এব্যাপারে আপনার মন্তব্য কী?
রফিউর রাব্বি: নারায়ণগঞ্জে তাদের ছয়টি টর্চার সেল বা নির্যাতনকেন্দ্র ছিল। ‘উইনার ফ্যাশন’ নামের তেমনই একটি টর্চার সেলে ত্বকীকে হত্যা করা হয়। ত্বকীকে হত্যার পরই আমরা এসব টর্চার সেলের কথা জানতে পারি। এসপিকে চিঠি দেওয়ার পর পুলিশ সেগুলোতে যায় এবং আলামত সংগ্রহ করে সেগুলো বন্ধ করে দেয়। ওই টর্চার সেলগুলোতে অসংখ্য মানুষকে ধরে এনে রাতে নির্যাতন ও হত্যা করা হয়েছে। আশেপাশের মানুষ প্রায়ই গুলি শব্দ ও নির্যাতিতদের চিৎকার শুনতো। শহরের প্রাণকেন্দ্রে প্রকাশ্যে এসব ঘটত, অথচ প্রশাসনের কোনো বিকার ছিল না।
স্ট্রিম: ত্বকীর নির্মম হত্যাকাণ্ডের পর ১৩ বছর ধরে মার্চ মাসের ৮ তারিখে আপনারা বিচার চেয়ে মোমবাতি প্রজ্বালন করে আসছেন। দীর্ঘ এই সময়ে আপনাদের প্রতি রাষ্ট্র কি পুরোপুরি বধির ছিল?
রফিউর রাব্বি: আমার এবং আরও অনেকের ধারণা, রাষ্ট্র বধির হয়েই আছে। তবে এই ১৩ বছরে দেশের অনেক বিশিষ্ট মানুষ বধির ছিলেন না, তারা আমাদের পাশে দাঁড়িয়েছেন। বেলাল চৌধুরী, আসাদ চৌধুরী, রফিক আজাদ, হেলাল হাফিজের মতো কবিরা ত্বকীকে নিয়ে কবিতা লিখেছেন। শিল্পীদের মধ্যে হাশেম খান, রফিকুন নবী, শহীদ কবির, বীরেন সোম থেকে শুরু করে বহু শিল্পী ত্বকীর জন্য ছবি এঁকেছেন। অনেকে গান লিখেছেন, প্রামাণ্যচিত্র তৈরি করেছেন। ত্বকীকে নিয়ে এখন পর্যন্ত প্রায় ২০টির মতো প্রকাশনা বেরিয়েছে। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে একজন ত্বকী হত্যাকাণ্ড নিয়ে পিএইচডি করেছেন। দেশের বাইরেও ২২টি দেশে ত্বকী হত্যার বিচার চাওয়া হচ্ছে।
স্ট্রিম: বিশ্বের ২২টি দেশে প্রতিবাদ এবং দেশের ভেতরে আপনাদের এই দীর্ঘ ধারাবাহিক আন্দোলন—সম্প্রতি জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে এর কোনো প্রভাব আছে বলে মনে করেন?
রফিউর রাব্বি: হ্যাঁ, ১৩ বছর ধরে বিরতিহীনভাবে বিচার চেয়ে যাওয়ার নজির বিশ্বে খুব কমই পাওয়া যাবে। আনু মুহাম্মদ, বাসদের খালেকুজ্জামানসহ অনেকেই বলেন—শেখ হাসিনার যে পতন হলো, তা শুধু জুলাই মাসের ছাত্র-জনতার আন্দোলনের ফসল নয়, ত্বকীর বিচারের দাবিতে প্রতি মাসে আমরা যে ধারাবাহিক আন্দোলন করেছি, তাতেও শেখ হাসিনা সরকারের এক একটি ভিত ভেঙেছে। আমাদের এই ধারাবাহিক ছোট ছোট আন্দোলনেরই একটি চূড়ান্ত বহিঃপ্রকাশ হচ্ছে জুলাই গণ–অভ্যুত্থান। শেখ হাসিনা সরকার নিজেদের অপরাজেয় মনে করত।
স্ট্রিম: এই ১৩ বছরের বিচারহীনতার সংস্কৃতি রাষ্ট্র ও সমাজের ওপর কী প্রভাব ফেলেছে বলে মনে করেন? রাষ্ট্র ব্যর্থ হলে সমাজের গন্তব্য কোথায় গিয়ে দাঁড়াবে?
রফিউর রাব্বি: আমাদের সংবিধানে ৯০ দিনের মধ্যে অভিযোগপত্র দেওয়ার কথা বলা আছে, আর সেখানে পার হলো ১৩ বছর! এই সময়ে তিনটি সরকার বদল হয়েছে। বিচার না পেলে মানুষের মধ্যে বিচারব্যবস্থার প্রতি অনীহা, অশ্রদ্ধা ও আস্থাহীনতা তৈরি হয়।
বিচারব্যবস্থার ওপর মানুষের আস্থা ফিরিয়ে আনা না গেলে রাষ্ট্রে গণতন্ত্র বা মানবাধিকার কোনো কিছুই টিকবে না। রাষ্ট্র ব্যর্থ হলে আমরা নিজেদের সভ্য দেশ হিসেবে দাবিই করতে পারব না। সরকার যদি রাজনৈতিক কারণে বেছে বেছে বিচার করে এবং কিছু বিচার আটকে রাখে—যেমনটা শেখ হাসিনার সময় হয়েছে—সেটা কোনো প্রক্রিয়া হতে পারে না। বিচার পাওয়া প্রত্যেক নাগরিকের অধিকার।
স্ট্রিম: তদন্তের প্রথম দিকে তো কিছুটা অগ্রগতি ছিল। ২০১৪ সালে র্যাব সংবাদ সম্মেলন করে অভিযোগপত্র দেওয়ার কথাও বলেছিল। তাহলে বিচারপ্রক্রিয়া আটকে গেল কীভাবে?
রফিউর রাব্বি: অদৃশ্য শক্তি তো আসলে দৃশ্যমানই ছিল। ২০১৪ সালের ৫ মার্চ সংবাদ সম্মেলন করে র্যাব বলেছিল, ওসমান পরিবারের ১১ জন মিলে ত্বকীকে হত্যা করেছে এবং তারা অচিরেই অভিযোগপত্র দেবে। কিন্তু র্যাবের অভিযোগ ঘোষণার তিন মাস পর, ৩ জুন শেখ হাসিনা সংসদে দাঁড়িয়ে বলেন, তিনি ওসমান পরিবারের পাশে আছেন। এরপরই বিচার কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যায়। এমনকি বিচারিক প্রক্রিয়াকে নানাভাবে নাই করে দেয়ার বাস্তবতাও তৈরি করেছিল।

স্ট্রিম: মূল অভিযুক্তদের অনেকেই নানাভাবে পালিয়ে গেল। এক্ষেত্রে আপনি কাকে দায়ী করবেন?
রফিউর রাব্বি: ৫ আগস্টের পর শামীম ওসমানের পুরো পরিবার বিভিন্ন দেশে পালিয়ে গেছে। তারা কীভাবে সপরিবার দেশ থেকে পালাল? সরকারি বাহিনী ও কিছু রাজনৈতিক লোক তাদের দেশ ছাড়তে সহযোগিতা করেছে। এক্ষেত্রে আমি প্রশাসনের দায়িত্বশীলতার ঘাটতিকে দায়ী বলে মনে করছি।
স্ট্রিম: ৫ আগস্টের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর বিচার প্রক্রিয়ায় দৃশ্যমান বাধা তো আর নেই। বর্তমান তদন্তকারী সংস্থার তৎপরতাকে কীভাবে মূল্যায়ন করছেন?
রফিউর রাব্বি: এই ১৩ বছরের মধ্যে সাড়ে ১১ বছরই ছিল শেখ হাসিনার শাসনকাল। তাঁর ইচ্ছাতেই বিচারপ্রক্রিয়া বন্ধ করে রাখা হয়েছিল। এখন অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে শুরুতে সদিচ্ছা দেখা গিয়েছিল। কয়েকজন উপদেষ্টা জোর দিয়ে বলেছিলেন, তাঁরা অগ্রাধিকার ভিত্তিতে ত্বকী ও সাগর-রুনি হত্যার বিচার দ্রুতগতিতে করবেন। তাদের সেই প্রতিশ্রুতির পর তদন্তকারী সংস্থা র্যাবের কিছুটা তৎপরতা দেখা যায়। নতুন করে পাঁচ-ছয়জনকে গ্রেপ্তার করা হয়। একজনের ১৬৪ ধারায় জবানবন্দিও নেওয়া হয়। কিন্তু রাজনৈতিক সরকার ছাড়া সবকিছুর গতিই মন্থর থাকে। কারণ সেনাবাহিনী, র্যাব বা পুলিশ জানে যে, অন্তর্বর্তীকালীন সরকার দীর্ঘস্থায়ী নয়।
আমার মনে হয়, সেই কারণেই যারা তদন্ত করেছে তারা বিষয়টিকে খুব বেশি গুরুত্ব দিয়ে এগিয়ে নিয়ে যায়নি। অর্ডার ছিল ঠিকই, কিন্তু বাস্তবে সেটাকে খুব একটা গুরুত্ব দেওয়া হয়নি।
স্ট্রিম: এখন পর্যন্ত তদন্তকারী সংস্থা সুনির্দিষ্ট কী কী আলামত সংগ্রহ করেছে বলে জানেন?
রফিউর রাব্বি: আমি দেখেছি, তারা অনেক কিছুই সংগ্রহ করেছে। উইনার ফ্যাশন নামের যে টর্চার সেলে ত্বকীকে হত্যা করা হয়েছিল, সেটির ভাড়ার চুক্তিপত্র, ট্রেড লাইসেন্স, সাইনবোর্ডে থাকা টেলিফোন নম্বরটি কার নামে—এসব কাগজপত্র তারা জোগাড় করেছে। এ ছাড়া ত্বকীকে হত্যার পর আজমেরী ওসমানের যে গাড়িতে করে লাশ শীতলক্ষ্যায় ফেলে দেওয়া হয়, সেই গাড়ির চালক জমশেদকে আবার গ্রেপ্তার করা হয়েছে। এখন সে কারাগারেই আছে। তবে বাকি আসামিরা কেউ জামিনে, কেউ পলাতক। এ জন্যই হয়তো সব গুছিয়ে অভিযোগপত্র দিতে তাদের দেরি হচ্ছে।
স্ট্রিম: শেখ হাসিনার সময়ের চাপ এখন নেই। তারপরও অভিযোগপত্র দাখিল করতে এত দেরি হওয়ার পেছনের কারণ কি বলে মনে হচ্ছে?
রফিউর রাব্বি: শেখ হাসিনার সময়ের চাপটা এখন নেই, সেটা ঠিক। কিন্তু বাধাটা অন্য জায়গায়। আমি র্যাবকে স্পষ্ট বলেছি, এই হত্যাকাণ্ডের নির্দেশদাতা শামীম ওসমান, তাঁর ছেলে, ভাতিজাসহ যারা যারা জড়িত, প্রত্যেককে যথাযথভাবে আইনের আওতায় আনতে হবে। অভিযোগপত্র যেন এমন না হয়, যার ফাঁকফোকর গলে নিম্ন আদালতে কারও সাজা হলেও উচ্চ আদালত থেকে তারা সহজেই বেরিয়ে যায়। এত বছর পর অভিযোগপত্র আসার পর যদি দেখা যায় তাতে ত্রুটি আছে এবং আমরা নারাজি দিই, তখন মামলাটি হয়তো র্যাব থেকে অন্য কোনো তদন্ত সংস্থায় যাবে, যা কাম্য নয়। এর আগে মামলাটি পুলিশ থেকে র্যাবে এসেছিল।
স্ট্রিম: ওসমান পরিবারের পলায়নের পেছনে বিপুল অঙ্কের অর্থের লেনদেন হয়েছে বলে গুঞ্জন রয়েছে। এই অর্থ কি এখন বিচারপ্রক্রিয়াকে প্রভাবিত করতে পারে?
রফিউর রাব্বি: শোনা যায়, ৩০০ থেকে ৫০০ কোটি টাকার বিনিময়ে তারা পালিয়েছে। তাদের তো হাজার হাজার কোটি টাকা। এই টাকা তারা এখনো বিভিন্ন গোষ্ঠীকে দিচ্ছে বলে আমরা শুনছি। তারা পালিয়েছে তাদের রেখে যাওয়া সংস্কৃতি তো পালায়নি। অর্থের বিনিময়ে তারা বিচারকে প্রভাবিত বা প্রলম্বিত করার চেষ্টা করবে, সেটাই স্বাভাবিক। এদিক থেকে এখনো বিচারপ্রক্রিয়া অন্যদিকে মোড় নেওয়ার আশঙ্কা এখনো রয়ে গেছে।
স্ট্রিম: রাজনৈতিক দলগুলোর অবস্থান, বিশেষ করে বিএনপির ভূমিকা কীভাবে দেখছেন? অতীতে তো তারা ত্বকী হত্যার বিচার চেয়েছিল।
রফিউর রাব্বি: ২০১৩ সালের মে মাসে খালেদা জিয়া নারায়ণগঞ্জে এসে ত্বকী হত্যার বিচার দাবি করেছিলেন। তিনি বলেছিলেন, শামীম ওসমানের মতো গডফাদার এমন হত্যাকাণ্ডের পরও বাইরে ঘুরে বেড়ায় কীভাবে। এমনকি গাজীপুরে এক নির্বাচনী সমাবেশে তারেক রহমানও ত্বকীর কথা উল্লেখ করেছিলেন। ক্ষমতার বাইরে থাকলে রাজনৈতিক দলগুলোর এক রকম চরিত্র দেখা যায়, আবার ক্ষমতায় গেলে অন্য রকম হয়। তবে আমরা আশা করি, ত্বকীর বিচারের ক্ষেত্রে অন্তত তারা কোনো রাজনৈতিক দুরভিসন্ধি বিবেচনায় আনবেন না।
স্ট্রিম: ত্বকী হত্যার বিচারের দীর্ঘ আন্দোলনে বিভিন্ন রাজনৈতিক দল নানা উদ্দেশ্যেই আপনাদের পাশে এসে সামিল হয়েছে তাদের কীভাবে সামলাতেন?
রফিউর রাব্বি: সিপিবি, বাসদসহ বাম প্রগতিশীল দলগুলো আমাদের সঙ্গে ছিল। তবে যারা এই আন্দোলন থেকে রাজনৈতিক ফায়দা লুটতে চাইত, তারা যেন এর সঙ্গে যুক্ত হতে না পারে, সে বিষয়ে আমরা খুব সচেতন ছিলাম। বিএনপির নেতারা শুরু থেকেই আমাদের মঞ্চে আসতে চেয়েছিলেন, কিন্তু আমরা বারণ করেছি। কারণ, তখন বিএনপিকে মঞ্চে তুললে শামীম ওসমান সহজেই প্রমাণ করার চেষ্টা করতেন যে বিএনপি তাদের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করছে। এমনকি একসময় শামীম ওসমানের পক্ষে কাজ করত, এমন একটি টিভি চ্যানেলও আমাদের আন্দোলনে যুক্ত হতে চেয়েছিল। আমরা দিইনি, কারণ এতে আমাদের পুরো আন্দোলনই প্রশ্নবিদ্ধ হতো।

স্ট্রিম: বিচারের এই দীর্ঘ লড়াইয়ে আপনাদের আসন্ন কর্মসূচি কী?
রফিউর রাব্বি: প্রতিবছরই ত্বকীকে ঘিরে আমাদের কিছু কর্মসূচি থাকে। এবারও আছে। শুক্রবার (৬ মার্চ) সকাল সাড়ে ৯টায় নারায়ণগঞ্জের বন্দর সিরাজ শাহর আস্তানায় ত্বকীর সমাধিতে পুষ্পস্তবক অর্পণ ও মিলাদ মাহফিলের আয়োজন করা হয়েছে। এরপর ৮ মার্চ সন্ধ্যা সাতটায় নারায়ণগঞ্জ সাংস্কৃতিক জোটের উদ্যোগে নারায়ণগঞ্জ কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে আলোক প্রজ্বালন কর্মসূচি পালিত হবে। সবশেষ ১৪ মার্চ বেলা আড়াইটায় ঢাকায় জাতীয় সংসদ ভবনের সামনে বিশেষ সমাবেশ অনুষ্ঠিত হবে। ‘ত্বকী সমাবেশ’ নামের এই কর্মসূচিতে কথা, গান, নাটক ও ছবি আঁকার মধ্য দিয়ে এই হত্যাকাণ্ডের বিচারহীনতার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানানো হবে। আরেকটা কর্মসূচি নিয়ে আমরা আলোচনা করছি, আগামী ১২ তারিখ যখন সংসদ বসবে, তখন আমাদের একটি পরিকল্পনা রয়েছে। আমরা নিয়মতান্ত্রিকভাবেই এগোতে চাই। ত্বকীর মায়ের লেখা একটি খোলা চিঠি ২৯৭ জন সংসদ সদস্যের সবার হাতে পৌঁছে দেওয়ার পরিকল্পনা আমাদের রয়েছে।
স্ট্রিম: একজন বিচারপ্রার্থী ও বাবা হিসেবে বর্তমান সরকারের কাছে আপনার প্রত্যাশা কী?
রফিউর রাব্বি: এখন বিএনপি সরকার গঠন করেছে, তাদের সবচেয়ে বড় দায়িত্ব হলো বিচারব্যবস্থার ওপর মানুষের আস্থা ফিরিয়ে আনা। নির্বাহী ও বিচার বিভাগকে স্বাধীনভাবে চলতে দিতে হবে, অর্থের কাছে বিক্রি হওয়া যাবে না। তা না হলে, এই আস্থার সংকট থেকে উত্তরণ খুবই কঠিন হবে।
স্ট্রিম: সবশেষে, আদালতের আগামী ধার্য দিনে অভিযোগপত্র (চার্জশিট) দাখিল নিয়ে আপনারা কতটা আশাবাদী?
রফিউর রাব্বি: গতকাল বৃহস্পতিবার ১০২তম বারের মতো তদন্ত কর্মকর্তা চার্জশিট দাখিল করতে পারেননি। আগামী এপ্রিলের ২৬ তারিখ পরবর্তী তারিখ নির্ধারণ করেছে আদালত। হ্যাঁ, আমরা আশাবাদী। আমরা আশাবাদী এ কারণে যে, অভিযোগপত্রটি এমনভাবে তৈরি হোক, যাতে আইনে কোনো ফাঁকফোকর না থাকে। ফাঁক থাকলে নিম্ন আদালতে হয়তো সাজা হবে, কিন্তু উচ্চ আদালতে গিয়ে আসামিরা পার পেয়ে যাবে।
স্ট্রিম: ঢাকা স্ট্রিমকে সময় দেয়ার জন্য আপনাকে৷ ধন্যবাদ।
রফিউর রাব্বি: আপনাকেও ধন্যবাদ।

মেধাবী কিশোর তানভীর মুহাম্মদ ত্বকী হত্যার ১৩ বছর পূর্ণ হতে চললেও আজও অধরা ন্যায়বিচার। গত ৫ মার্চ এই মামলার চার্জশিট দাখিলের ১০২তম ধার্য তারিখ থাকলেও এদিনও আদালতে তদন্ত প্রতিবেদন জমা পড়েনি। নতুন করে ১০৩তম তারিখ নির্ধারিত হয়েছে আগামী ২৬ এপ্রিল।
২ ঘণ্টা আগে
ভারতের রাজনীতিতে জওহরলাল নেহরু বিশ্ববিদ্যালয় বা জেএনইউ একটি শক্তিশালী রাজনৈতিক বয়ান। কেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী বা স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর মতো উচ্চপদস্থ ব্যক্তিরা একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র আন্দোলন নিয়ে এতটা উদ্বিগ্ন থাকেন? এর পেছনে রয়েছে গভীর রাজনৈতিক, কৌশলগত এবং আদর্শিক কারণ।
৭ ঘণ্টা আগে
ইরানের নেতৃত্বকে ‘মোল্লা’ বলে উড়িয়ে দেওয়া কোনো যৌক্তিক আলাপ নয় বরং অগভীর ব্যঙ্গচিত্র। এই ব্যঙ্গ ‘যা বুঝে না, তাকে ছোট করার’ আমেরিকার স্বভাবজাত প্রবণতার অংশ।
১ দিন আগে
৪ মার্চ ২০২৬ তারিখ পর্যন্ত প্রাপ্ত সর্বশেষ তথ্য বিশ্লেষণ করলে বোঝা যায় মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনীতিতে সংযুক্ত আরব আমিরাত এক চরম অস্তিত্ব সংকটের মুখে দাঁড়িয়ে আছে। ইরানের 'ট্রুথফুল প্রমিজ ৪' অপারেশনের আওতায় গত কয়েকদিনে দুবাই আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর ও বুর্জ আল আরবের মতো আইকনিক স্থাপনায় নজিরবিহীন ক্ষেপণাস্ত
১ দিন আগে