জাতীয় সংসদ নির্বাচন ২০২৬

ও গণভোট

ক্লিক করুন

ইরানের হামলা আরব দেশগুলোকে যুক্তরাষ্ট্রের কাছে টানবে, না দূরে ঠেলে দেবে

প্রকাশ : ০৬ মার্চ ২০২৬, ২২: ২৮
স্ট্রিম গ্রাফিক

এক সপ্তাহ ধরে ইরান তার প্রতিবেশী আরব দেশগুলোর দিকে শত শত ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন ছুঁড়ে চলেছে। শুরুতে এসব হামলার লক্ষ্যবস্তু দেশগুলোতে থাকা মার্কিন সামরিক ঘাঁটি থাকলেও ইতিমধ্যে দেশটি বেসামরিক এবং জ্বালানি স্থাপনাগুলোতেও হামলা করছে।

এটা সত্য কাতারের মতো কোনো কোনো উপসাগরীয় আরব রাষ্ট্রের কাছে এই যুদ্ধ একেবারেই অপ্রত্যাশিত। হঠাৎ করে যুদ্ধের সম্মুখভাগে পড়ে অত্যন্ত ক্ষুব্ধও তারা। কিন্তু না চাইলেও এ যুদ্ধ ইতিমধ্যে উপসাগরীয় অঞ্চলের দেশগুলোর নিরাপদ ভ্রমণ, পর্যটন ও আর্থিক কেন্দ্র হিসেবে যে ভাবমূর্তি গড়ে উঠেছিল তা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যের ‘মূলধন’ তেল আর গ্যাসশিল্পও স্মরণকালের সবচেয়ে বড় ঝুঁকিতে পড়েছে।

ইরানের এই পাল্টা হামলা কি আরব দেশগুলোকে যুদ্ধ থামাতে যুক্তরাষ্ট্রের ওপর চাপ তৈরি করবে, নাকি আরব রাষ্ট্রগুলো আরও বেশি যুক্তরাষ্ট্রের ঘনিষ্ঠ হয়ে ইরানের বিরুদ্ধে পুরো দমে যুদ্ধে জড়িয়ে পড়বে, এক সপ্তাহ টানা যুদ্ধের পর এখনো বিষয়টি পরিষ্কার নয়।

দশের বিপরীতে এক—ইরান

যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলার জবাবে ইরান ১১টি দেশে সরাসরি পাল্টা হামলা চালিয়েছে। এরই মধ্যে ইরানের গোলা পড়েছে ইসরায়েল, সৌদি আরব, ওমান, আরব আমিরাত, কাতার, বাহরাইন, কুয়েত, ইরাক, জর্ডান, আজারবাইজান ও সাইপ্রাস।

উপসাগরীয় অঞ্চলের সবচেয়ে বড় বাণিজ্য ও পর্যটন কেন্দ্র হলো সংযুক্ত আরব আমিরাত। ফাইন্যান্সিয়াল টাইমস তার এক প্রতিবেদনে বলেছে, ইরান এখন পর্ন্ত ইসরায়েলের ওপর যতটা হামলা করেছে, সংযুক্ত আরব আমিরাতের ওপর প্রায় একই সংখ্যক ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন ছুঁড়েছে তারা।

আর কাতারে ইরানের হামলার প্রেক্ষাপটে গত মঙ্গলবারই এক ব্রিফিংয়ে দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র মাজেদ আল আনসারি বলেছেন, ‘সব সীমা অতিক্রম হয়ে গেছে।’ অন্যদিকে একই দিনে সৌদি আরবের সরকারি বার্তা সংস্থা ‘সৌদি প্রেস এজেন্সি’ জানিয়েছে, সৌদি আরবের যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত মন্ত্রিসভার বৈঠক বলা হয়েছে, নিরাপত্তা এবং নাগরিকদের সুরক্ষার জন্য সব প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেবে তারা।

ওয়াশিংটনের আরও ঘনিষ্ঠ হতে পারে উপসাগরীয় আরবা

ইরানের পাল্টা অভিযানের সময় উপসাগরীয় রাষ্ট্রগুলোর দিকে নিক্ষেপ করা অধিকাংশ ক্ষেপণাস্ত্রই আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থার মাধ্যমে লক্ষ্যবস্তুতে পৌঁছানোর আগেই ধ্বংস করে দেওয়া হয়। কিন্তু ধ্বংস হওয়া ক্ষেপণাস্ত্রের ধ্বংসাবশেষের আঘাত ও আগুন লাগা থেকে হতাহতের ঘটনা ঘটেছে।

বিবিসি জানিয়েছে, ইরানের ড্রোন প্রায় অপ্রতিরোধ্য হয়ে উঠেছে। প্রতিরক্ষাব্যবস্থার ফাঁক গলে উপসাগরীয় আরব অঞ্চলে বাণিজ্য, ভ্রমণ ও পর্যটনের পুরো ব্যবস্থাকে অস্থির করে তুলেছে। ইরানের কৌশলও সম্ভবত এটাই—অর্থাৎ তার আরব প্রতিবেশীদের জন্য ঝুঁকি বাড়ানো, যাতে তারা যুক্তরাষ্ট্রের ওপর যুদ্ধ শেষ করার জন্য চাপ সৃষ্টি করে।

বিবিসির মতে, ওই অঞ্চলের গুরুত্বপূর্ণ তেল ও গ্যাসশিল্পকে ইরান একটি অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করছে। বৈশ্বিক অর্থনীতি বড় ধাক্কা দিতে পারে এই দুই শিল্প। তবে বিবিসির মতে, ইরানের এই কৌশল উল্টো ফলও দিতে পারে। এমনও হতে পারে যে উপসাগরীয় রাষ্ট্রগুলো ওয়াশিংটনের আরও কাছাকাছি চলে যাবে। এমনও সম্ভব যে উপসাগরীয় রাষ্ট্রগুলো কোনো না কোনোভাবে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের ইরানের বিরুদ্ধে এই যুদ্ধের অংশ হয়ে পড়বে।

এখন পর্যন্ত উপসাগরীয় রাষ্ট্রগুলো যুক্তরাষ্ট্রকে তাদের ভূখণ্ড বা আকাশসীমা ব্যবহার করে ইরানের ওপর হামলা চালানোর অনুমতি দেয়নি। সৌদি আরবকে এ জন্য ধন্যবাদও জানিয়েছে ইরান। কিন্তু এই পরিস্থিতি এখন বদলে যেতে পারে এবং তারা যেকোনো সময় ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযানে অংশ নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিতে পারে।

বিবিসি কাতার সংবাদদাতা বারবারা প্লেট-উশের মতে, এই মুহূর্তে উপসাগরীয় দেশগুলো তাদের মনোযোগ নিজেদের প্রতিরক্ষার দিকে কেন্দ্রীভূত রেখেছে। তবে সবকিছুই নির্ভর করছে যুদ্ধ আর কতদিন চলতে থাকে তার ওপর।

কিছু রাষ্ট্র এখনো এই যুদ্ধে ইসরায়েলের পাশে দাঁড়ানোর ধারণা থেকে দূরে থাকতে চাইবে। গাজায় ইসরায়েলের চালানো প্রাণঘাতী ও ধ্বংসাত্মক অভিযান এবং লেবানন ও সিরিয়ার মতো দেশগুলোতে সামরিক হস্তক্ষেপ আরবদের সঙ্গে ইসরায়েলের সম্পর্ককে আরও উত্তেজনাপূর্ণ করে তুলেছে।

গত বছর যখন ইসরায়েল কাতারে হামলা চালিয়ে সেখানে হামাসের নেতৃত্বের কয়েকজন সদস্যকে হত্যার চেষ্টা করেছিল, তখন আরব রাষ্ট্রগুলো ভীষণ ক্ষুব্ধ হয়ে উঠেছিল। এরপরও এখন স্পষ্ট যে ইরানের পাল্টা হামলা উপসাগরীয় রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে ঐক্যকে আরও শক্তিশালী করেছে।

গালফ কো-অপারেশন কাউন্সিলের ছয় সদস্য দেশ—সৌদি আরব, কুয়েত, কাতার, বাহরাইন, সংযুক্ত আরব আমিরাত এবং ওমান—ইতিমধ্যে জরুরি বৈঠকে সংহতি প্রকাশ করেছে এবং অঙ্গীকার করেছে যে তারা তাদের নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতা রক্ষা এবং তাদের ভূখণ্ড, নাগরিক ও বাসিন্দাদের সুরক্ষার জন্য সব প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেবে, যার মধ্যে আগ্রাসনের জবাব দেওয়ার বিকল্পও রয়েছে।

সম্পর্কিত