কে এম মহিউদ্দিন

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের দ্বিতীয় তথা বাজেট অধিবেশন সমাপ্ত হয়েছে। নতুন সংসদের কার্যক্রম মূল্যায়নের জন্য এটি এখনও প্রাথমিক সময় হলেও প্রথম দুটি অধিবেশন সংসদের কার্যক্রমে সদস্যদের অংশগ্রহণ দেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতি এবং গণতান্ত্রিক চর্চা সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ কিছু ইঙ্গিত দিয়েছে। সংসদে বিতর্কের পরিবেশ তুলনামূলকভাবে প্রাণবন্ত হয়েছে, বিরোধী দলের উপস্থিতি দৃশ্যমান হয়েছে এবং জাতীয় বিভিন্ন ইস্যুতে আলোচনা হয়েছে। কিন্তু প্রথম অধিবেশনে সংবিধান সংস্কার বিষয়ে আলোচনার জন্য বিরোধী দলের মুলতবি প্রস্তাব এবং দ্বিতীয় অধিবেশনে একই বিষয়ে বিশেষ কমিটি গঠন নিয়ে সরকার ও বিরোধী দলের মধ্যে যে প্রক্রিয়াগত বিরোধ প্রকাশ্যে এসেছে, তা সংসদের ভবিষ্যৎ কার্যকারিতা এবং রাজনৈতিক ঐকমত্যের প্রশ্নকে নতুন করে সামনে নিয়ে এসেছে।
নতুন সংসদের একটি ইতিবাচক দিক হলো দীর্ঘদিন পর সরকার ও বিরোধী দলের মধ্যে সংসদীয় বিতর্কের একটি পরিবেশ সৃষ্টি হয়েছে। বাজেট অধিবেশনে মূল্যস্ফীতি, কর্মসংস্থান, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, স্থানীয় সরকার ও অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনা নিয়ে সদস্যরা মতামত দিয়েছেন। সংসদ যে কেবল আইন পাসের প্রতিষ্ঠান নয়, বরং সরকারের জবাবদিহি নিশ্চিত করার সর্বোচ্চ রাজনৈতিক মঞ্চ—এই ধারণার আংশিক প্রতিফলনও দেখা গেছে। তবে সংসদীয় বিতর্ক তখনই অর্থবহ হয়, যখন সেই আলোচনা সরকারের নীতিনির্ধারণে প্রভাব ফেলে এবং সংসদ কেবল আনুষ্ঠানিক অনুমোদনের জায়গায় সীমাবদ্ধ না থেকে নীতিনির্ধারণের কার্যকর ক্ষেত্র হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে।
এই প্রেক্ষাপটে সংবিধান সংস্কারকে কেন্দ্র করে সৃষ্ট বিরোধ নতুন সংসদের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষায় পরিণত হয়েছে। মতপার্থক্যের মূল বিষয়টি সংবিধান সংস্কারের প্রয়োজনীয়তা নয়; বরং সেই সংস্কারের প্রক্রিয়া। সরকার মনে করে, বিদ্যমান সংবিধানের আওতায় নির্বাচিত জাতীয় সংসদই সংবিধান সংশোধনের একমাত্র সাংবিধানিক ও বৈধ ফোরাম। তাই সংসদের একটি বিশেষ কমিটি গঠন করে বিশেষজ্ঞ, রাজনৈতিক দল এবং নাগরিক সমাজের মতামত নিয়ে সংবিধানের অষ্টাদশ সংশোধনী বিল প্রণয়নের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। অন্যদিকে, বিরোধী দলের অবস্থান ভিন্ন। তাদের দাবি, গণভোটে জনগণ যে রায় দিয়েছে, তার আলোকে প্রথমে একটি সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠন করতে হবে। সেই পরিষদে সর্বদলীয় ও বহুপক্ষীয় আলোচনার মাধ্যমে সাংবিধানিক সংস্কারের রূপরেখা চূড়ান্ত হওয়ার পর তা সংসদে আসা উচিত। তাদের মতে, সংসদের বিশেষ কমিটির মাধ্যমে এই প্রক্রিয়া পরিচালনা করা গণভোটের রায় ও জুলাই অভ্যুত্থানের চেতনার সঙ্গে পুরোপুরি সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।
এই মতবিরোধের কারণে বিরোধী দল বিশেষ কমিটিতে সদস্য মনোনয়ন দেয়নি এবং কমিটি গঠনের প্রস্তাবের প্রতিবাদে ওয়াকআউট করেছে। অন্যদিকে সরকার পাঁচটি পদ শূন্য রেখে ভবিষ্যতে বিরোধী দল চাইলে কমিটিতে যোগ দেওয়ার সুযোগ খোলা রেখেছে। এই অবস্থান সরকারকে রাজনৈতিক নমনীয়তার একটি বার্তা দেওয়ার সুযোগ দিলেও, বিরোধী দলের অংশগ্রহণ ছাড়া কমিটির সুপারিশ কতটা সর্বজনগ্রাহ্য হবে, সেই প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে।
সংবিধান কেবল একটি আইনি দলিল নয়; এটি রাষ্ট্রের মৌলিক রাজনৈতিক সমঝোতার প্রকাশ। তাই সংবিধান সংশোধনের ক্ষেত্রে কেবল সাংবিধানিক বৈধতা যথেষ্ট নয়; প্রয়োজন রাজনৈতিক বৈধতা এবং সর্বোচ্চ মাত্রার অংশগ্রহণমূলক প্রক্রিয়া। সংসদে সংখ্যাগরিষ্ঠতার ভিত্তিতে সংশোধনী পাস করা আইনগতভাবে সম্ভব হলেও, তা যদি বৃহত্তর রাজনৈতিক ঐকমত্য অর্জন করতে না পারে, তবে ভবিষ্যতে সেই সংশোধনের গ্রহণযোগ্যতা নিয়েও বিতর্ক থেকে যেতে পারে।
অন্যদিকে, বিরোধী দলের জন্যও প্রশ্ন রয়েছে। সংসদীয় গণতন্ত্রে মতপার্থক্য প্রকাশের প্রধান ক্ষেত্র সংসদ নিজেই। ফলে বিশেষ কমিটির বাইরে থেকে কেবল প্রতিবাদ জানানো, নাকি কমিটিতে অংশ নিয়ে বিকল্প প্রস্তাব উপস্থাপন করা—এই সিদ্ধান্ত বিরোধী দলের রাজনৈতিক কৌশল ও দায়িত্ববোধেরও একটি গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা। সংসদে উপস্থিত থেকে যুক্তি, সংশোধনী এবং আলোচনার মাধ্যমে প্রভাব বিস্তার করাই সংসদীয় রাজনীতির মৌলিক দর্শন। এখন বিশেষ কমিটি তার ম্যান্ডেট অনুযায়ী সংবিধান বিশেষজ্ঞ, নাগরিক সমাজের প্রতিনিধি এবং জুলাই জাতীয় সনদে স্বাক্ষরকারী রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে আলোচনার ভিত্তিতে সংবিধানের প্রয়োজনীয় সংশোধনীর সুপারিশ প্রণয়ন করবে যার ভিত্তিতে সংবিধানের অষ্টাদশ সংশোধনী সরকারি বিল সংসদে উত্থাপিত হবে। তবে পুরো প্রক্রিয়ার রাজনৈতিক গ্রহণযোগ্যতা অনেকাংশে নির্ভর করবে বিরোধী দল শেষ পর্যন্ত এই প্রক্রিয়ায় অংশগ্রহণ করে কি না এবং সরকার বিরোধী মতামতকে কতটা আন্তরিকভাবে অন্তর্ভুক্ত করতে সক্ষম হয় তার ওপর।
সংবিধান সংশোধনের লক্ষ্যে কেবল সরকারের পক্ষ থেকে বিল উত্থাপন করতে এমন বাধ্যবাধকতা নেই। সংসদের কার্যপ্রণালি বিধি অনুসারে একই বিষয়ে বেসরকারি সদস্যদেরও বিল উত্থাপনের অধিকার রয়েছে, যদিও এ ধরনের বিল উত্থাপনের জন্য সংসদের সংখ্যাগরিষ্ঠ সদস্যের সমর্থন প্রয়োজন হবে। সে বিবেচনায়, বিরোধী দলের সদস্যরা যদি জুলাই সনদে বর্ণিত প্রস্তাবগুলো বাস্তবায়নে শক্তিশালী অবস্থান নিতে চান, তবে সংসদের বিদ্যমান সাংবিধানিক ও সংসদীয় কাঠামোর মধ্যেই বেসরকারি সদস্যদের বিল হিসেবে সংবিধানের সংশ্লিষ্ট সংশোধনী প্রস্তাব উত্থাপন করতে পারেন। এতে সংসদে বিষয়টি নিয়ে আনুষ্ঠানিক বিতর্ক, সংশোধনী প্রস্তাব এবং ভোটাভুটির সুযোগ সৃষ্টি হবে। তবে বর্তমান সাংবিধানিক কাঠামো অধীনে গঠিত সংসদকে সাময়িক সময়ের জন্য সংবিধান সংস্কার পরিষদের রূপান্তর করার সুযোগ নেই।
নির্বাহী বিভাগের কার্যক্রমে স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা ও কার্যকর তদারকি প্রতিষ্ঠায় মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটির গুরুত্ব অত্যন্ত বেশি। ওয়েস্টমিনস্টার ধাঁচের সংসদীয় ব্যবস্থায় মন্ত্রণালয়ভিত্তিক স্থায়ী কমিটির ধারণা তুলনামূলকভাবে নতুন হলেও বাংলাদেশ জাতীয় সংসদ এ ক্ষেত্রে অগ্রণী ভূমিকা পালন করেছে। ব্রিটিশ হাউজ অব কমন্স ও ভারতের লোকসভায় এ ধরনের ব্যবস্থা চালুর আগেই বাংলাদেশের সংবিধান (১৯৭২) —এর ৭৬ অনুচ্ছেদের আলোকে জাতীয় সংসদের কার্যপ্রণালি-বিধিতে মন্ত্রণালয়-সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটি গঠনের বিধান অন্তর্ভুক্ত করা হয়। অতীতে বিভিন্ন সময়ে এসব কমিটি গঠনে দীর্ঘসূত্রীতার কারণে অষ্টম জাতীয় সংসদের শেষ অধিবেশনে কার্যপ্রণালি-বিধির ২৪৬ বিধি সংশোধন করে নতুন সংসদের তৃতীয় অধিবেশনের মধ্যেই মন্ত্রণালয়-সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটি গঠনের বাধ্যবাধকতা আরোপ করা হয়।
যদিও কার্যপ্রণালি-বিধি অনুযায়ী কমিটি গঠন করার ক্ষেত্রে সে অর্থে এখনও বিধির লঙ্ঘন হয়নি, তবুও প্রথম দুটি অধিবেশনে অধিকাংশ কমিটি গঠিত না হওয়ায় সংসদের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সাংবিধানিক দায়িত্ব —নির্বাহী বিভাগের ওপর কার্যকর নজরদারি —বাস্তবে স্থগিত রয়েছে। অর্থ ও আইন মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত দুটি কমিটি গঠিত হলেও অন্যান্য মন্ত্রণালয়ের কার্যক্রম সংসদীয় পর্যালোচনার বাইরে থেকে গেছে। এর ফলে প্রথমত, মন্ত্রণালয়গুলোর নীতি, প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত ও কর্মসম্পাদন নিয়ে সংসদীয় পর্যায়ে ধারাবাহিক পর্যালোচনার সুযোগ সৃষ্টি হয়নি। দ্বিতীয়ত, সরকারি ব্যয়, উন্নয়ন প্রকল্প, ক্রয় কার্যক্রম এবং বাজেট বাস্তবায়নের ওপর নিয়মিত সংসদীয় তদারকি অনুপস্থিত থাকায় আর্থিক জবাবদিহি দুর্বল হয়েছে। আরও গুরুত্বপূর্ণ হলো, স্থায়ী কমিটি কেবল সরকারের সমালোচনার ক্ষেত্র নয়; এটি সরকার ও বিরোধী দলের মধ্যে তুলনামূলকভাবে কম দলীয় মেরূকরণে নীতিগত ঐকমত্য গড়ে তোলার একটি কার্যকর প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থা। কমিটি গঠনে বিলম্বের ফলে সেই সহযোগিতামূলক সংসদীয় সংস্কৃতির বিকাশও বাধাগ্রস্ত হয়েছে।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের সামনে এখন কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রাতিষ্ঠানিক দায়িত্ব রয়েছে। এর মধ্যে অগ্রাধিকার হওয়া উচিত পরবর্তী অধিবেশনের শুরুতেই অবশিষ্ট সব মন্ত্রণালয়-সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটি গঠন এবং সেগুলোকে নিয়মিত বৈঠক, গবেষণা-সহায়তা, প্রকাশ্য শুনানি ও সুপারিশ বাস্তবায়নের কার্যকর পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে সক্রিয় করে তোলা। কারণ সংসদের কার্যকারিতা কেবল অধিবেশনকক্ষের বিতর্কে নয়; বরং কমিটি ব্যবস্থার মাধ্যমে নির্বাহী বিভাগের ওপর ধারাবাহিক, তথ্যভিত্তিক ও প্রাতিষ্ঠানিক তদারকি প্রতিষ্ঠার ওপরও নির্ভর করে।
একটি কার্যকর সংসদের শক্তি সংখ্যাগরিষ্ঠতার জোরে নয়; বরং ভিন্নমতকে প্রাতিষ্ঠানিক সংলাপে রূপান্তর করার সক্ষমতায়। সংসদ যদি আইন প্রণয়নের পাশাপাশি নির্বাহী বিভাগের জবাবদিহি নিশ্চিত করা, কার্যকর তদারকি পরিচালনা এবং জাতীয় ঐকমত্য গঠনের প্রধান রাজনৈতিক মঞ্চ হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করতে পারে, তবে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ বাংলাদেশের সংসদীয় গণতন্ত্রে একটি নতুন দৃষ্টান্ত স্থাপন করতে সক্ষম হবে। কিন্তু রাজনৈতিক মতভেদ যদি সংসদের ভেতরে যুক্তিনির্ভর আলোচনার পরিবর্তে সংসদের বাইরের সংঘাতে রূপ নেয়, তবে এই সংসদও তার সম্ভাবনার পূর্ণ বিকাশ ঘটাতে পারবে না।
তবে আশার কথা, সংসদে বিতর্কের পরিবেশ ফিরে এসেছে, বিরোধী দলের সক্রিয় অংশগ্রহণ সংসদীয় রাজনীতিকে তুলনামূলকভাবে প্রাণবন্ত করেছে এবং দীর্ঘদিন পর নীতিগত মতবিনিময়ের একটি ক্ষেত্র তৈরি হয়েছে। অন্যদিকে, সংবিধান সংস্কারের প্রক্রিয়া নিয়ে সরকার ও বিরোধী দলের মতপার্থক্য এবং অধিকাংশ মন্ত্রণালয়-সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটি গঠনে বিলম্ব সংসদের তদারকি সক্ষমতা ও রাজনৈতিক ঐকমত্যের সংস্কৃতি নিয়ে প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। প্রথম ও দ্বিতীয় অধিবেশনের সমাপনী বৈঠকে সংসদ নেতা ও বিরোধীদলীয় নেতার বক্তব্যে সহনশীলতা, সংলাপ, সমঝোতা এবং জাতীয় ঐক্যের প্রয়োজনীয়তা বারবার উচ্চারিত হয়েছে। গণতান্ত্রিক রাজনীতিতে এই বার্তা নিঃসন্দেহে ইতিবাচক। এখন প্রয়োজন সেই রাজনৈতিক সদিচ্ছার বাস্তব প্রতিফলন।

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের দ্বিতীয় তথা বাজেট অধিবেশন সমাপ্ত হয়েছে। নতুন সংসদের কার্যক্রম মূল্যায়নের জন্য এটি এখনও প্রাথমিক সময় হলেও প্রথম দুটি অধিবেশন সংসদের কার্যক্রমে সদস্যদের অংশগ্রহণ দেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতি এবং গণতান্ত্রিক চর্চা সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ কিছু ইঙ্গিত দিয়েছে। সংসদে বিতর্কের পরিবেশ তুলনামূলকভাবে প্রাণবন্ত হয়েছে, বিরোধী দলের উপস্থিতি দৃশ্যমান হয়েছে এবং জাতীয় বিভিন্ন ইস্যুতে আলোচনা হয়েছে। কিন্তু প্রথম অধিবেশনে সংবিধান সংস্কার বিষয়ে আলোচনার জন্য বিরোধী দলের মুলতবি প্রস্তাব এবং দ্বিতীয় অধিবেশনে একই বিষয়ে বিশেষ কমিটি গঠন নিয়ে সরকার ও বিরোধী দলের মধ্যে যে প্রক্রিয়াগত বিরোধ প্রকাশ্যে এসেছে, তা সংসদের ভবিষ্যৎ কার্যকারিতা এবং রাজনৈতিক ঐকমত্যের প্রশ্নকে নতুন করে সামনে নিয়ে এসেছে।
নতুন সংসদের একটি ইতিবাচক দিক হলো দীর্ঘদিন পর সরকার ও বিরোধী দলের মধ্যে সংসদীয় বিতর্কের একটি পরিবেশ সৃষ্টি হয়েছে। বাজেট অধিবেশনে মূল্যস্ফীতি, কর্মসংস্থান, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, স্থানীয় সরকার ও অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনা নিয়ে সদস্যরা মতামত দিয়েছেন। সংসদ যে কেবল আইন পাসের প্রতিষ্ঠান নয়, বরং সরকারের জবাবদিহি নিশ্চিত করার সর্বোচ্চ রাজনৈতিক মঞ্চ—এই ধারণার আংশিক প্রতিফলনও দেখা গেছে। তবে সংসদীয় বিতর্ক তখনই অর্থবহ হয়, যখন সেই আলোচনা সরকারের নীতিনির্ধারণে প্রভাব ফেলে এবং সংসদ কেবল আনুষ্ঠানিক অনুমোদনের জায়গায় সীমাবদ্ধ না থেকে নীতিনির্ধারণের কার্যকর ক্ষেত্র হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে।
এই প্রেক্ষাপটে সংবিধান সংস্কারকে কেন্দ্র করে সৃষ্ট বিরোধ নতুন সংসদের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষায় পরিণত হয়েছে। মতপার্থক্যের মূল বিষয়টি সংবিধান সংস্কারের প্রয়োজনীয়তা নয়; বরং সেই সংস্কারের প্রক্রিয়া। সরকার মনে করে, বিদ্যমান সংবিধানের আওতায় নির্বাচিত জাতীয় সংসদই সংবিধান সংশোধনের একমাত্র সাংবিধানিক ও বৈধ ফোরাম। তাই সংসদের একটি বিশেষ কমিটি গঠন করে বিশেষজ্ঞ, রাজনৈতিক দল এবং নাগরিক সমাজের মতামত নিয়ে সংবিধানের অষ্টাদশ সংশোধনী বিল প্রণয়নের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। অন্যদিকে, বিরোধী দলের অবস্থান ভিন্ন। তাদের দাবি, গণভোটে জনগণ যে রায় দিয়েছে, তার আলোকে প্রথমে একটি সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠন করতে হবে। সেই পরিষদে সর্বদলীয় ও বহুপক্ষীয় আলোচনার মাধ্যমে সাংবিধানিক সংস্কারের রূপরেখা চূড়ান্ত হওয়ার পর তা সংসদে আসা উচিত। তাদের মতে, সংসদের বিশেষ কমিটির মাধ্যমে এই প্রক্রিয়া পরিচালনা করা গণভোটের রায় ও জুলাই অভ্যুত্থানের চেতনার সঙ্গে পুরোপুরি সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।
এই মতবিরোধের কারণে বিরোধী দল বিশেষ কমিটিতে সদস্য মনোনয়ন দেয়নি এবং কমিটি গঠনের প্রস্তাবের প্রতিবাদে ওয়াকআউট করেছে। অন্যদিকে সরকার পাঁচটি পদ শূন্য রেখে ভবিষ্যতে বিরোধী দল চাইলে কমিটিতে যোগ দেওয়ার সুযোগ খোলা রেখেছে। এই অবস্থান সরকারকে রাজনৈতিক নমনীয়তার একটি বার্তা দেওয়ার সুযোগ দিলেও, বিরোধী দলের অংশগ্রহণ ছাড়া কমিটির সুপারিশ কতটা সর্বজনগ্রাহ্য হবে, সেই প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে।
সংবিধান কেবল একটি আইনি দলিল নয়; এটি রাষ্ট্রের মৌলিক রাজনৈতিক সমঝোতার প্রকাশ। তাই সংবিধান সংশোধনের ক্ষেত্রে কেবল সাংবিধানিক বৈধতা যথেষ্ট নয়; প্রয়োজন রাজনৈতিক বৈধতা এবং সর্বোচ্চ মাত্রার অংশগ্রহণমূলক প্রক্রিয়া। সংসদে সংখ্যাগরিষ্ঠতার ভিত্তিতে সংশোধনী পাস করা আইনগতভাবে সম্ভব হলেও, তা যদি বৃহত্তর রাজনৈতিক ঐকমত্য অর্জন করতে না পারে, তবে ভবিষ্যতে সেই সংশোধনের গ্রহণযোগ্যতা নিয়েও বিতর্ক থেকে যেতে পারে।
অন্যদিকে, বিরোধী দলের জন্যও প্রশ্ন রয়েছে। সংসদীয় গণতন্ত্রে মতপার্থক্য প্রকাশের প্রধান ক্ষেত্র সংসদ নিজেই। ফলে বিশেষ কমিটির বাইরে থেকে কেবল প্রতিবাদ জানানো, নাকি কমিটিতে অংশ নিয়ে বিকল্প প্রস্তাব উপস্থাপন করা—এই সিদ্ধান্ত বিরোধী দলের রাজনৈতিক কৌশল ও দায়িত্ববোধেরও একটি গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা। সংসদে উপস্থিত থেকে যুক্তি, সংশোধনী এবং আলোচনার মাধ্যমে প্রভাব বিস্তার করাই সংসদীয় রাজনীতির মৌলিক দর্শন। এখন বিশেষ কমিটি তার ম্যান্ডেট অনুযায়ী সংবিধান বিশেষজ্ঞ, নাগরিক সমাজের প্রতিনিধি এবং জুলাই জাতীয় সনদে স্বাক্ষরকারী রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে আলোচনার ভিত্তিতে সংবিধানের প্রয়োজনীয় সংশোধনীর সুপারিশ প্রণয়ন করবে যার ভিত্তিতে সংবিধানের অষ্টাদশ সংশোধনী সরকারি বিল সংসদে উত্থাপিত হবে। তবে পুরো প্রক্রিয়ার রাজনৈতিক গ্রহণযোগ্যতা অনেকাংশে নির্ভর করবে বিরোধী দল শেষ পর্যন্ত এই প্রক্রিয়ায় অংশগ্রহণ করে কি না এবং সরকার বিরোধী মতামতকে কতটা আন্তরিকভাবে অন্তর্ভুক্ত করতে সক্ষম হয় তার ওপর।
সংবিধান সংশোধনের লক্ষ্যে কেবল সরকারের পক্ষ থেকে বিল উত্থাপন করতে এমন বাধ্যবাধকতা নেই। সংসদের কার্যপ্রণালি বিধি অনুসারে একই বিষয়ে বেসরকারি সদস্যদেরও বিল উত্থাপনের অধিকার রয়েছে, যদিও এ ধরনের বিল উত্থাপনের জন্য সংসদের সংখ্যাগরিষ্ঠ সদস্যের সমর্থন প্রয়োজন হবে। সে বিবেচনায়, বিরোধী দলের সদস্যরা যদি জুলাই সনদে বর্ণিত প্রস্তাবগুলো বাস্তবায়নে শক্তিশালী অবস্থান নিতে চান, তবে সংসদের বিদ্যমান সাংবিধানিক ও সংসদীয় কাঠামোর মধ্যেই বেসরকারি সদস্যদের বিল হিসেবে সংবিধানের সংশ্লিষ্ট সংশোধনী প্রস্তাব উত্থাপন করতে পারেন। এতে সংসদে বিষয়টি নিয়ে আনুষ্ঠানিক বিতর্ক, সংশোধনী প্রস্তাব এবং ভোটাভুটির সুযোগ সৃষ্টি হবে। তবে বর্তমান সাংবিধানিক কাঠামো অধীনে গঠিত সংসদকে সাময়িক সময়ের জন্য সংবিধান সংস্কার পরিষদের রূপান্তর করার সুযোগ নেই।
নির্বাহী বিভাগের কার্যক্রমে স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা ও কার্যকর তদারকি প্রতিষ্ঠায় মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটির গুরুত্ব অত্যন্ত বেশি। ওয়েস্টমিনস্টার ধাঁচের সংসদীয় ব্যবস্থায় মন্ত্রণালয়ভিত্তিক স্থায়ী কমিটির ধারণা তুলনামূলকভাবে নতুন হলেও বাংলাদেশ জাতীয় সংসদ এ ক্ষেত্রে অগ্রণী ভূমিকা পালন করেছে। ব্রিটিশ হাউজ অব কমন্স ও ভারতের লোকসভায় এ ধরনের ব্যবস্থা চালুর আগেই বাংলাদেশের সংবিধান (১৯৭২) —এর ৭৬ অনুচ্ছেদের আলোকে জাতীয় সংসদের কার্যপ্রণালি-বিধিতে মন্ত্রণালয়-সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটি গঠনের বিধান অন্তর্ভুক্ত করা হয়। অতীতে বিভিন্ন সময়ে এসব কমিটি গঠনে দীর্ঘসূত্রীতার কারণে অষ্টম জাতীয় সংসদের শেষ অধিবেশনে কার্যপ্রণালি-বিধির ২৪৬ বিধি সংশোধন করে নতুন সংসদের তৃতীয় অধিবেশনের মধ্যেই মন্ত্রণালয়-সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটি গঠনের বাধ্যবাধকতা আরোপ করা হয়।
যদিও কার্যপ্রণালি-বিধি অনুযায়ী কমিটি গঠন করার ক্ষেত্রে সে অর্থে এখনও বিধির লঙ্ঘন হয়নি, তবুও প্রথম দুটি অধিবেশনে অধিকাংশ কমিটি গঠিত না হওয়ায় সংসদের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সাংবিধানিক দায়িত্ব —নির্বাহী বিভাগের ওপর কার্যকর নজরদারি —বাস্তবে স্থগিত রয়েছে। অর্থ ও আইন মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত দুটি কমিটি গঠিত হলেও অন্যান্য মন্ত্রণালয়ের কার্যক্রম সংসদীয় পর্যালোচনার বাইরে থেকে গেছে। এর ফলে প্রথমত, মন্ত্রণালয়গুলোর নীতি, প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত ও কর্মসম্পাদন নিয়ে সংসদীয় পর্যায়ে ধারাবাহিক পর্যালোচনার সুযোগ সৃষ্টি হয়নি। দ্বিতীয়ত, সরকারি ব্যয়, উন্নয়ন প্রকল্প, ক্রয় কার্যক্রম এবং বাজেট বাস্তবায়নের ওপর নিয়মিত সংসদীয় তদারকি অনুপস্থিত থাকায় আর্থিক জবাবদিহি দুর্বল হয়েছে। আরও গুরুত্বপূর্ণ হলো, স্থায়ী কমিটি কেবল সরকারের সমালোচনার ক্ষেত্র নয়; এটি সরকার ও বিরোধী দলের মধ্যে তুলনামূলকভাবে কম দলীয় মেরূকরণে নীতিগত ঐকমত্য গড়ে তোলার একটি কার্যকর প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থা। কমিটি গঠনে বিলম্বের ফলে সেই সহযোগিতামূলক সংসদীয় সংস্কৃতির বিকাশও বাধাগ্রস্ত হয়েছে।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের সামনে এখন কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রাতিষ্ঠানিক দায়িত্ব রয়েছে। এর মধ্যে অগ্রাধিকার হওয়া উচিত পরবর্তী অধিবেশনের শুরুতেই অবশিষ্ট সব মন্ত্রণালয়-সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটি গঠন এবং সেগুলোকে নিয়মিত বৈঠক, গবেষণা-সহায়তা, প্রকাশ্য শুনানি ও সুপারিশ বাস্তবায়নের কার্যকর পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে সক্রিয় করে তোলা। কারণ সংসদের কার্যকারিতা কেবল অধিবেশনকক্ষের বিতর্কে নয়; বরং কমিটি ব্যবস্থার মাধ্যমে নির্বাহী বিভাগের ওপর ধারাবাহিক, তথ্যভিত্তিক ও প্রাতিষ্ঠানিক তদারকি প্রতিষ্ঠার ওপরও নির্ভর করে।
একটি কার্যকর সংসদের শক্তি সংখ্যাগরিষ্ঠতার জোরে নয়; বরং ভিন্নমতকে প্রাতিষ্ঠানিক সংলাপে রূপান্তর করার সক্ষমতায়। সংসদ যদি আইন প্রণয়নের পাশাপাশি নির্বাহী বিভাগের জবাবদিহি নিশ্চিত করা, কার্যকর তদারকি পরিচালনা এবং জাতীয় ঐকমত্য গঠনের প্রধান রাজনৈতিক মঞ্চ হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করতে পারে, তবে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ বাংলাদেশের সংসদীয় গণতন্ত্রে একটি নতুন দৃষ্টান্ত স্থাপন করতে সক্ষম হবে। কিন্তু রাজনৈতিক মতভেদ যদি সংসদের ভেতরে যুক্তিনির্ভর আলোচনার পরিবর্তে সংসদের বাইরের সংঘাতে রূপ নেয়, তবে এই সংসদও তার সম্ভাবনার পূর্ণ বিকাশ ঘটাতে পারবে না।
তবে আশার কথা, সংসদে বিতর্কের পরিবেশ ফিরে এসেছে, বিরোধী দলের সক্রিয় অংশগ্রহণ সংসদীয় রাজনীতিকে তুলনামূলকভাবে প্রাণবন্ত করেছে এবং দীর্ঘদিন পর নীতিগত মতবিনিময়ের একটি ক্ষেত্র তৈরি হয়েছে। অন্যদিকে, সংবিধান সংস্কারের প্রক্রিয়া নিয়ে সরকার ও বিরোধী দলের মতপার্থক্য এবং অধিকাংশ মন্ত্রণালয়-সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটি গঠনে বিলম্ব সংসদের তদারকি সক্ষমতা ও রাজনৈতিক ঐকমত্যের সংস্কৃতি নিয়ে প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। প্রথম ও দ্বিতীয় অধিবেশনের সমাপনী বৈঠকে সংসদ নেতা ও বিরোধীদলীয় নেতার বক্তব্যে সহনশীলতা, সংলাপ, সমঝোতা এবং জাতীয় ঐক্যের প্রয়োজনীয়তা বারবার উচ্চারিত হয়েছে। গণতান্ত্রিক রাজনীতিতে এই বার্তা নিঃসন্দেহে ইতিবাচক। এখন প্রয়োজন সেই রাজনৈতিক সদিচ্ছার বাস্তব প্রতিফলন।
.png)

পার্বত্য চট্টগ্রামকে সাধারণত আমরা দুর্গম, পরিবেশগতভাবে ঝুঁকিপূর্ণ এবং আর্থ-সামাজিক চ্যালেঞ্জের চোখ দিয়ে দেখি। কিন্তু এই ভাবনার আড়ালে লুকিয়ে আছে বাংলাদেশের অন্যতম বড় এক অব্যবহৃত সম্পদ। পার্বত্য চট্টগ্রাম হতে পারে আমাদের উচ্চমূল্যের কৃষি, পরিবেশবান্ধব চাষাবাদ এবং সবুজ অর্থনীতির প্রধান কেন্দ্র।
২ ঘণ্টা আগে
মিয়ানমারের রাখাইন উপকূল থেকে জুনের শেষে দুটি নৌকা ছেড়ে যায় কক্সবাজার ও রাখাইনের রোহিঙ্গা শরণার্থীদের নিয়ে। উদ্দেশ্য অবৈধভাবে ভিনদেশে পাড়ি দেওয়া। একটি নৌকা যাত্রার পরপরই নিখোঁজ হয়, অন্যটি ডুবে যায় ৮ জুলাই আয়ারওয়াদি উপকূলে। জাতিসংঘের শরণার্থীবিষয়ক সংস্থা ও আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থার হিসাবে,
৩ ঘণ্টা আগে
সরকারি কর্মকর্তাদের মাসিক গাড়ি রক্ষণাবেক্ষণ ভাতা ৫০ হাজার থেকে অর্ধেক করতে সম্প্রতি স্মারক জারি করেছিল অর্থ মন্ত্রণালয়। প্রধানমন্ত্রীয় নির্দেশনার কথা থাকলেও সচিবালয় নির্দেশমালার মারপ্যাচে সেটি স্থগিত করা হয়েছে। এটি আমাদের রাষ্ট্রযন্ত্র কীভাবে কাজ করে তার একটি ক্ষুদ্র নমুনা।
৬ ঘণ্টা আগে
বাংলাদেশের সাংবিধানিক ও রাজনৈতিক ইতিহাসে ২০১১ সালের ৩০ জুন পাস হওয়া 'সংবিধান (পঞ্চদশ সংশোধন) আইন, ২০১১' একটি একটি টার্নিং পয়েন্ট। এর মাধ্যমে রাষ্ট্র ও শাসনব্যবস্থার মৌলিক কিছু কাঠামোগত পরিবর্তন আনা হয়, যার সুদূরপ্রসারী প্রভাব পরবর্তী এক দশকেরও বেশি সময় ধরে দেশের সামগ্রিক রাজনীতিকে আবর্তিত করছে।
১০ ঘণ্টা আগে