ভঙ্গুর পাহাড় থেকে সবুজ সমৃদ্ধি: কৃষির নতুন সম্ভাবনা পার্বত্য চট্টগ্রাম

এম শহীদুল ইসলাম
এম শহীদুল ইসলাম

প্রকাশ : ১৭ জুলাই ২০২৬, ২০: ৩৪
স্ট্রিম গ্রাফিক্স

পার্বত্য চট্টগ্রামকে আমরা সাধারণত একটু ভিন্ন চোখেই দেখে থাকি। আমাদের সাধারণ মানুষের কাছে এই অঞ্চলটি মানেই হলো দুর্গম পথ, পরিবেশগত নানা ধরনের ঝুঁকি এবং আর্থ-সামাজিক দিক থেকে পিছিয়ে থাকা এক চ্যালেঞ্জিং জায়গা। কিন্তু এই ভাবনার বাইরেও এটি বাংলাদেশের অন্যতম বড় এক অব্যবহৃত সম্পদ। দেশের মোট আয়তনের প্রায় দশ ভাগের এক ভাগ জুড়ে আছে রাঙামাটি, খাগড়াছড়ি ও বান্দরবান। প্রচুর বৃষ্টিপাত, বৈচিত্র্যময় ভূপ্রকৃতি আর অসাধারণ সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যে ঘেরা এই অঞ্চল। সবচেয়ে বড় কথা হলো— পার্বত্য চট্টগ্রাম হতে পারে আমাদের উচ্চমূল্যের কৃষি, পরিবেশবান্ধব চাষাবাদ এবং সবুজ অর্থনীতির প্রধান কেন্দ্র।

বাংলাদেশ এখন প্রধান খাদ্যশস্য উৎপাদনে প্রায় স্বয়ংসম্পূর্ণ। তাই এখন আমাদের কৃষির মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত পুষ্টি নিরাপত্তা, ফসলের বহুমুখীকরণ, কৃষকের আয় বৃদ্ধি এবং রপ্তানিমুখী কৃষি ব্যবস্থা গড়ে তোলা। উন্নয়নের এই নতুন ধাপে পার্বত্য চট্টগ্রাম বিশেষ জাতীয় মনোযোগের দাবি রাখে। সঠিক নীতি, বৈজ্ঞানিক উদ্ভাবন ও ধারাবাহিক বিনিয়োগের মাধ্যমে আমাদের এই পাহাড়গুলো পুরো দক্ষিণ এশিয়ার জন্য টেকসই পাহাড়ি কৃষির এক অনন্য মডেল হয়ে উঠতে পারে।

পাহাড়ের ভিন্নধর্মী কৃষি পরিবেশ

সমতলের চেয়ে পাহাড়ের কৃষির ধরন একেবারেই আলাদা। এখানকার পাহাড়, উপত্যকা ও ঢালু জমি মিলে চমৎকার এক আবহাওয়া তৈরি করেছে, যা নানা ধরনের ফসল উৎপাদনের জন্য দারুণ উপযোগী। এখানে বছরে প্রায় দুই হাজার থেকে সাড়ে তিন হাজার মিলিমিটার বৃষ্টিপাত হয়। বছরের বেশির ভাগ সময় তাপমাত্রা ফসল উৎপাদনের অনুকূলেই থাকে। এমন পরিবেশ ফলজ বাগান, মসলা, বাগিচা ফসল, কৃষি বনায়ন ও ঔষধি গাছের জন্য আদর্শ। সমতলের জলাবদ্ধ মাটিতে যেসব ফসল ভালো হয় না, পাহাড়ের পানি নিষ্কাশন সুবিধাযুক্ত মাটিতে তা দারুণভাবে বেড়ে ওঠে। জলবায়ু পরিবর্তনের এই সময়ে কৃষিতে এমন বহুমুখীকরণ খুবই জরুরি।

বাংলাদেশ এখন প্রধান খাদ্যশস্য উৎপাদনে প্রায় স্বয়ংসম্পূর্ণ। তাই এখন আমাদের কৃষির মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত পুষ্টি নিরাপত্তা, ফসলের বহুমুখীকরণ, কৃষকের আয় বৃদ্ধি এবং রপ্তানিমুখী কৃষি ব্যবস্থা গড়ে তোলা। উন্নয়নের এই নতুন ধাপে পার্বত্য চট্টগ্রাম বিশেষ জাতীয় মনোযোগের দাবি রাখে।

কৃষির উন্নতির প্রথম শর্ত হলো সুস্থ মাটি। ভারী বৃষ্টির কারণে পাহাড়ের মাটি কিছুটা অম্লীয়, যাতে জৈব সার ও প্রয়োজনীয় পুষ্টি উপাদানের কিছুটা ঘাটতি থাকে। খাড়া ঢালের কারণে শুষ্ক মৌসুমে মাটি সহজে রসও ধরে রাখতে পারে না। তবে এগুলো কোনো স্থায়ী সমস্যা নয়। বিজ্ঞানভিত্তিক উপায়ে এর সমাধান সম্ভব। সঠিক মাত্রায় সার, কম্পোস্ট ও জৈব সার ব্যবহারের মাধ্যমে পাহাড়ি মাটির উর্বরতা ও উৎপাদন দুটোই বাড়ানো যায়। মাটি শুধু ফসল ফলায় না; এটি পানি ধরে রাখে এবং জীববৈচিত্র্য টিকিয়ে রাখে। তাই পাহাড়ের কৃষি উন্নয়নের মূল ভিত্তি হতে হবে মাটির স্বাস্থ্য রক্ষা করা।

পাহাড়ের কৃষির সবচেয়ে বড় শত্রু জমি বা বৃষ্টির অভাব নয়, বরং ওপরের উর্বর মাটির ক্ষয়ে যাওয়া। বর্ষায় ভারী বৃষ্টিতে ঢালু পাহাড়ের ওপরের স্তর ধুয়ে যায়, যার ফলে পাহাড়ধসও ঘটে। প্রতি বছর আমরা বিপুল পরিমাণ পুষ্টিসমৃদ্ধ মাটি হারাচ্ছি। ভূমিক্ষয়ের কারণে কেবল ফসলের ফলনই কমে না, নদীর নাব্যতা কমে গিয়ে বন্যার ঝুঁকি বাড়ে এবং রাস্তাঘাটও নষ্ট হয়। এক বর্ষায় যে মাটি ধুয়ে যায়, প্রকৃতিতে তা পুনরায় তৈরি হতে বহু বছর লেগে যায়। তাই মাটি রক্ষা করা এখন কেবল কৃষির জন্য নয়, বরং অর্থনীতি ও পরিবেশের জন্য অত্যন্ত জরুরি।

আদিবাসী জ্ঞানের মূল্যায়ন

যুগের পর যুগ ধরে পাহাড়ি জনগোষ্ঠী পরিবেশের সঙ্গে মানিয়ে নিয়ে জুম চাষ করে আসছে। আগে জুম চাষের পর জমি দীর্ঘদিন ফেলে রাখায় মাটি উর্বরতা ফিরে পেত। কিন্তু এখন জনসংখ্যা বাড়ায় জমির ওপর চাপ বেড়েছে, জুম চাষের চক্র ছোট হয়ে এসেছে, যা পরিবেশের জন্য ঝুঁকির কারণ হচ্ছে। তবে ভবিষ্যতের উন্নয়নের দোহাই দিয়ে আদিবাসীদের এই ঐতিহ্যবাহী পদ্ধতি হঠাৎ করে বন্ধ করা ঠিক হবে না। বরং তাদের এই আদি জ্ঞানের সঙ্গে আধুনিক বিজ্ঞানের সমন্বয় ঘটাতে হবে। আধুনিক কৃষি বনায়ন ও মিশ্র চাষের মাধ্যমে স্থানীয় সংস্কৃতির প্রতি শ্রদ্ধা রেখেই পরিবেশবান্ধব বিকল্প তৈরি করা সম্ভব।

ভবিষ্যতের উন্নয়নের দোহাই দিয়ে আদিবাসীদের এই ঐতিহ্যবাহী পদ্ধতি হঠাৎ করে বন্ধ করা ঠিক হবে না। বরং তাদের এই আদি জ্ঞানের সঙ্গে আধুনিক বিজ্ঞানের সমন্বয় ঘটাতে হবে। আধুনিক কৃষি বনায়ন ও মিশ্র চাষের মাধ্যমে স্থানীয় সংস্কৃতির প্রতি শ্রদ্ধা রেখেই পরিবেশবান্ধব বিকল্প তৈরি করা সম্ভব।

আশার কথা হলো, পাহাড়ি কৃষির জন্য প্রয়োজনীয় অনেক প্রযুক্তিই এখন আমাদের হাতে রয়েছে। কৃষি বনায়ন, বাঁশ চাষ, বিন্না ঘাসের ব্যবহার এবং মালচিংয়ের মতো পদ্ধতিগুলো মাটির ক্ষয় রোধ করতে পারে। পাশাপাশি বৃষ্টির পানি ধরে রাখার মতো কৌশলগুলো পাহাড়কে রক্ষা করতে পারে।

আমাদের দেশে বৈজ্ঞানিক গবেষণার একটি শক্ত ভিত্তিও আছে। বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট (বারি), বিশেষ করে খাগড়াছড়ির রামগড় পাহাড়ি কৃষি গবেষণা কেন্দ্র এ নিয়ে দারুণ কাজ করেছে। বারি'র বিজ্ঞানীরা পাহাড়ের উপযোগী আম, আনারস, কলা, লেবু, আদা, হলুদের পাশাপাশি কফি, কাজুবাদাম, ড্রাগন ফল ও অ্যাভোকাডোর উন্নত জাত ও চাষপদ্ধতি উদ্ভাবন করেছেন। এখন শুধু সরকারি-বেসরকারি উদ্যোগে এই প্রযুক্তিগুলো কৃষকদের দোরগোড়ায় পৌঁছে দেওয়া দরকার।

অপেক্ষায় এক নীরব বিপ্লব

পার্বত্য চট্টগ্রাম চাইলেই বাংলাদেশের 'ফলের রাজধানী' বা উদ্যানতাত্ত্বিক কেন্দ্র হয়ে উঠতে পারে। প্রচলিত ফলের পাশাপাশি নতুন ফলের বাণিজ্যিক চাষ বাড়ছে। আদা, হলুদ ও গোলমরিচের মতো মসলার রয়েছে ব্যাপক রপ্তানির সুযোগ। এসব ফসল সাধারণ ধান বা গমের চেয়ে কয়েক গুণ বেশি লাভজনক এবং এগুলো সারা বছর পাহাড়কে সবুজ রেখে মাটিকেও সুরক্ষিত রাখে।

জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে পাহাড়ে বৃষ্টিপাত ও পাহাড়ধস বাড়ছে। তাই এখন কেবল ফসল উৎপাদন নয়, প্রকৃতিকে টিকিয়ে রাখার সক্ষমতাও বাড়াতে হবে। এর জন্য একটি সমন্বিত 'জাতীয় পাহাড়ি কৃষি মিশন' চালু করা সময়ের দাবি। এই মিশনের অধীনে সরকার, গবেষক, বেসরকারি বিনিয়োগকারী এবং স্থানীয় মানুষকে এক ছাতার নিচে কাজ করতে হবে।

থাইল্যান্ড, ভিয়েতনাম বা ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চল আমাদের জন্য ভালো উদাহরণ হতে পারে, যারা পাহাড়ি অঞ্চলকে কৃষির মূল চালিকাশক্তিতে পরিণত করেছে। তাদের মতো আমাদের কৃষকদেরও লাভজনক বাজারের সঙ্গে যুক্ত করতে হবে। গ্রামীণ রাস্তাঘাট, হিমাগার, প্যাকিং ও প্রক্রিয়াজাতকরণ শিল্পে জরুরি বিনিয়োগ প্রয়োজন। ফল ও মসলা প্রক্রিয়াজাত করে জুস, শুকনো খাবার বা গুঁড়ো মসলা তৈরি করতে পারলে ফসল নষ্ট হওয়া কমবে এবং কৃষকের আয় বাড়বে।

জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে পাহাড়ে বৃষ্টিপাত ও পাহাড়ধস বাড়ছে। তাই এখন কেবল ফসল উৎপাদন নয়, প্রকৃতিকে টিকিয়ে রাখার সক্ষমতাও বাড়াতে হবে। এর জন্য একটি সমন্বিত 'জাতীয় পাহাড়ি কৃষি মিশন' চালু করা সময়ের দাবি। এই মিশনের অধীনে সরকার, গবেষক, বেসরকারি বিনিয়োগকারী এবং স্থানীয় মানুষকে এক ছাতার নিচে কাজ করতে হবে।

বাংলাদেশ যখন একটি উন্নত রাষ্ট্র হওয়ার পথে এগিয়ে যাচ্ছে, তখন পার্বত্য চট্টগ্রাম হতে পারে টেকসই পাহাড়ি কৃষির এক অনন্য মডেল। এর জন্য প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদী সদিচ্ছা। পাহাড় কোনো শোষণের জায়গা নয়; এটি পরম যত্নে লালন করার জায়গা। আমরা যদি পাহাড়ের মাটি, বন, পানি ও মানুষের পেছনে সঠিকভাবে বিনিয়োগ করি, তবে এটি হয়ে উঠবে আমাদের অর্থনীতির অন্যতম বড় শক্তি।

বাংলাদেশের কৃষির আগামীর সূর্য হয়তো এই পাহাড় থেকেই উদিত হবে।

  • ড. এম. শহীদুল ইসলাম: কৃষিবিজ্ঞানী ও নীতি বিশ্লেষক; সাবেক মহাপরিচালক, বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট (বারি)
Ad 300x250

সম্পর্কিত