মিডল ইস্ট আইয়ের প্রধান সম্পাদক ডেভিড হার্স্ট লেখাটি লিখেছিলেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানের সঙ্গে যুদ্ধবিরতিতে যাওয়ার আগে। এই যুদ্ধবিরতির পরিণতি কী হতে পারে, তা বিবেচনায় লেখাটি গুরুত্বপূর্ণ।
লেখা:

দিন যত গড়াচ্ছিল, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ততই অস্থির হয়ে উঠছিলেন। তাঁর নিজের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে একের পর এক উগ্র ও অসংলগ্ন পোস্ট দিচ্ছিলেন। বোঝা যাচ্ছিল, পরিস্থিতি ক্রমশ তাঁর মুঠোর বাইরে চলে যাচ্ছে। হেসেখেলে জয় পাওয়ার আশায় যে যুদ্ধ শুরু করেছিলেন, সেই যুদ্ধই দিনশেষে দুঃস্বপ্নে পরিণত হতে যাচ্ছে।
অথচ এই মানুষটিই মাত্র একদিন আগে ইরানি সভ্যতা মাটির সঙ্গে মিশিয়ে দেওয়ার হুমকি দিয়েছিলেন। বলেছিলেন, ইরানকে প্রস্তর যুগে ফিরিয়ে দেওয়া হবে। এমনকি হরমুজ প্রণালি জোর করে খুলে দেওয়ার উদ্দেশ্যে হাজার হাজার মার্কিন নৌ-সেনা জড়ো করা হয়েছিল।
কিন্তু বাস্তবে এখন দেখা যাচ্ছে সম্পূর্ণ ভিন্ন দৃশ্য। ইরান নিজেই ঠিক করছে কোন জাহাজ পার হবে, আর কোনটি আক্রমণের শিকার হবে। মার্কিন নৌবহর নিরাপদ দূরত্বে থেকে এই পরিস্থিতি দেখছে। এমনকি প্রণালি দিয়ে যাতায়াতের জন্য এখন প্রতি ট্যাংকারকে প্রায় ২০ লাখ ডলার ‘টোল’ দিতে হচ্ছে। সেটিও চীনা মুদ্রা ইউয়ানে।
চার সপ্তাহ আগেও চিত্রটা ছিল ভিন্ন। ইসরায়েলের সেনাপ্রধান আইয়াল জামির দাবি করেছিলেন, তারা ইরানের প্রায় ৮০ শতাংশ আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থা ধ্বংস করে ফেলেছে এবং ‘প্রায় পুরোপুরি আকাশ আধিপত্য’ প্রতিষ্ঠা করেছে। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সেই দাবি ভেঙে পড়ছে। এখন দেখা যাচ্ছে, মার্কিন যুদ্ধবিমান নিয়মিতভাবে ধ্বংস হচ্ছে। যুদ্ধের ষষ্ঠ সপ্তাহে এসে দেখা গেল, ইরানের আকাশ প্রতিরক্ষা আরও কার্যকর হয়ে উঠেছে।
সবচেয়ে বিস্ময়কর বিষয় হলো—১৩ হাজারেরও বেশি বিমান হামলার পরও ইরান রাষ্ট্র হিসেবে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে।
ইরানের এই স্থিতিশীলতাকে বোঝার জন্য তুলনা করা যায় মধ্যপ্রাচ্যের অন্যান্য শাসনব্যবস্থার সঙ্গে। ইরাক ও সিরিয়ার বাথ পার্টি, কিংবা লিবিয়ার জামাহিরিয়া—এসব ব্যবস্থার পতন হয়েছিল অত্যন্ত দ্রুত। সাদ্দাম হোসেন, বাশার আল-আসাদ কিংবা মুয়াম্মার গাদ্দাফির পতনের সঙ্গে সঙ্গেই পুরো কাঠামো ভেঙে পড়েছিল।
এই শাসনব্যবস্থাগুলো ছিল মূলত ব্যক্তিনির্ভর। নেতা না থাকলেই ব্যবস্থা অচল হয়ে যেত। সিরিয়ায় ২০২৪ সালের ডিসেম্বরে আসাদের পতনের সময় প্রায় কোনো প্রতিরোধই দেখা যায়নি।
কিন্তু ইরানের ক্ষেত্রে চিত্র সম্পূর্ণ ভিন্ন। এখানে রাষ্ট্র কাঠামোটি অনেক বেশি প্রাতিষ্ঠানিক এবং বহুস্তরীয়। মোসাদ ও সিআইএ-এর অনুপ্রবেশ, এমনকি ধারাবাহিক টার্গেটেড হত্যাকাণ্ড—যেভাবে হামাস ও হিজবুল্লাহর নেতৃত্বকে দুর্বল করা হয়েছিল—তারপরও ইরানের কমান্ড-কাঠামো ভেঙে পড়েনি।
দেশের ভেতরে কোনো বিকল্প রাজনৈতিক বা জাতিগত শক্তিও মাথা তুলে দাঁড়াতে পারেনি। এমনকি ইরানি কুর্দিদের ক্ষেত্রেও দেখা গেছে, তারা যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ নেওয়ার অভিযোগ সরাসরি অস্বীকার করেছে।
এতে স্পষ্ট হয়ে উঠেছে, ইসলামি প্রজাতন্ত্রের কাঠামোটি বোমা হামলা বা নেতৃত্ব হত্যার মাধ্যমে সহজে ভাঙার মতো নয়। বরং এটি মধ্যপ্রাচ্যের অন্যান্য অনেক ব্যবস্থার তুলনায় অনেক বেশি সহনশীল।
তবে এর মানে এই নয় যে ইরানের ভেতরে কোনো অসন্তোষ নেই। প্রবাসী ইরানিদের মধ্যে এখনো বিতর্ক চলছে—রেভল্যুশনারি গার্ডের কঠোর দমন-পীড়নের সমালোচনা করা হবে, নাকি ইসরায়েলের ওপর হামলাকে সমর্থন করা হবে।
কিন্তু ট্রাম্পের সরাসরি হামলা সেই দ্বন্দ্বকে অনেকটাই চাপা দিয়েছে। জাতীয়তাবোধ ও বাইরের হুমকির বিরুদ্ধে প্রতিরোধই এখন বড় হয়ে উঠেছে। বিশ্লেষকদের মতে, এই যুদ্ধ ইরানে বিপ্লব-সমর্থনকে নতুন করে জাগিয়ে তুলেছে।
এই প্রভাব শুধু ইরানের ভেতরেই সীমাবদ্ধ নেই। আরব বিশ্বেও এর প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে। যেসব দেশ আগে ইরানের প্রতি নিরপেক্ষ বা ইতিবাচক ছিল, তারা আরও ঘনিষ্ঠ হচ্ছে। আর যারা আগে বিরোধী ছিল, তাদের মধ্যেও নতুন ধরনের প্রতিযোগিতা শুরু হয়েছে—কে ফিলিস্তিনের পক্ষে বেশি অবস্থান নিচ্ছে।
এর একটি গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ দেখা যায় সিরিয়ায়। গত সপ্তাহে দেশজুড়ে ইসরায়েলের একটি আইন—যেখানে ‘সন্ত্রাসী’ হিসেবে দোষী সাব্যস্ত ফিলিস্তিনিদের জন্য মৃত্যুদণ্ডের বিধান রাখা হয়েছে—তার বিরুদ্ধে বিক্ষোভ শুরু হয়।
দামেস্ক থেকে শুরু হয়ে এই বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে দারা, কুনেইত্রা, আলেপ্পো, লাতাকিয়া, হোমস ও ইদলিবে। আলেপ্পো বিশ্ববিদ্যালয়ে হাজার হাজার শিক্ষার্থী রাস্তায় নেমে স্লোগান দেয়—‘আমাদের প্রাণ আর রক্ত দিয়ে ফিলিস্তিনকে মুক্ত করব।’
এখানে বিষয়টি আরও তাৎপর্যপূর্ণ, কারণ এই অঞ্চলগুলোই একসময় সিরিয়ার গৃহযুদ্ধে ইরান-সমর্থিত
বাহিনীর বিরুদ্ধে লড়েছিল। অথচ এখন সেই জনগণই ইসরায়েলের বিরুদ্ধে অবস্থান নিচ্ছে।
জর্ডানেও একই প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। যদিও দেশটির সরকার পশ্চিমাপন্থী, কিন্তু সাধারণ মানুষের মধ্যে ইরানের প্রতি সমর্থন বাড়ছে। এমনকি বিশ্লেষকদের মতে, প্রকাশ্যে না বললেও অধিকাংশ জর্ডানীয় এই যুদ্ধে ইরানের পক্ষেই রয়েছে।
এই পরিস্থিতি ইসরায়েলের জন্য একটি বড় ধাক্কা। একসময় যেসব আরব দেশ ইসরায়েলের সঙ্গে শান্তিচুক্তি করেছিল—মিশর, জর্ডান, এমনকি উপসাগরীয় দেশগুলো—সেখানেও এখন জনমতের বড় অংশ ইসরায়েলের বিরুদ্ধে অবস্থান নিচ্ছে।
বিশ্লেষক মামুন ফান্দির ভাষায়, ইসরায়েল আবার আরব বিশ্বের ‘শত্রু’তে পরিণত হয়েছে। শান্তি প্রতিষ্ঠার যে ধারণা সামনে আনা হয়েছিল, তা এখন অনেকটাই ভেঙে পড়েছে।
এই পুরো পরিস্থিতির কেন্দ্রে রয়েছে হরমুজ প্রণালি। আগে মনে করা হতো, এই প্রণালি ইরানের জন্য যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি উপসাগরীয় দেশগুলোর জন্যও। কিন্তু যুদ্ধ প্রমাণ করেছে—এই ধারণা ভুল।
ইরান এখন এই প্রণালিকে এমনভাবে ব্যবহার করছে, যা পুরো বিশ্ব অর্থনীতিকে প্রভাবিত করছে। ইউরোপে ডিজেলের দাম ইতোমধ্যে ৩০ শতাংশ বেড়ে গেছে।
এই কৌশল পারমাণবিক অস্ত্র বা ক্ষেপণাস্ত্রের চেয়েও বেশি কার্যকর হয়ে উঠেছে, কারণ এটি সরাসরি বৈশ্বিক বাজারে প্রভাব ফেলছে।
এই পরিস্থিতিতে বিভিন্ন পক্ষ থেকে সমঝোতার প্রস্তাবের পর গতকাল মঙ্গলবার প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প রাজি হয়েছেন দুই সপ্তাহের যুদ্ধবিরতিতে। এই যুদ্ধবিরতিতে মধ্যস্থতা করেছে পাকিস্তান। পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ জানিয়েছেন, আগামী শুক্রবার আনুষ্ঠানিকভাবে দুই দেশ আলোচনায় বসবে।
সব মিলিয়ে, এই যুদ্ধের ফলাফল একেবারেই প্রত্যাশার বিপরীত। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের লক্ষ্য ছিল ইরানকে দুর্বল করা। কিন্তু বাস্তবে তারা ইরানকে আরও শক্তিশালী অবস্থানে নিয়ে গেছে।
যদি এই মুহূর্তে ট্রাম্প স্থায়ী যুদ্ধবিরতিতে যান, তাহলে তিনি এমন একটি ইরানকে রেখে যাবেন, যা আগের চেয়ে অনেক বেশি কৌশলগত দিক থেকে শক্তিশালী।
ইসরায়েলি প্রেসিডেন্ট নেতানিয়াহু বহু বছর আগে থেকেই ইরানের বিরুদ্ধে সরাসরি যুদ্ধে জড়াতে চাচ্ছিলেন। অবশেষে তাঁর খায়েশ পূরণ হলেও, যুদ্ধের ফল হয়ে উল্টো। এই যুদ্ধ আরব ও ইরানিদের মধ্যে নতুন ধরনের ঐক্য সৃষ্টি করেছে।
মধ্যপ্রাচ্য এখন এমন এক নতুন বাস্তবতার দিকে এগোচ্ছে, যেখানে শক্তির ভারসাম্য বদলে গেছে এবং সেই নতুন খেলায় শক্তিশালী কার্ডগুলো এখন ইরানের হাতেই।
(ইংরেজি থেকে অনুবাদ করেছেন মাহজাবিন নাফিসা)

দিন যত গড়াচ্ছিল, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ততই অস্থির হয়ে উঠছিলেন। তাঁর নিজের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে একের পর এক উগ্র ও অসংলগ্ন পোস্ট দিচ্ছিলেন। বোঝা যাচ্ছিল, পরিস্থিতি ক্রমশ তাঁর মুঠোর বাইরে চলে যাচ্ছে। হেসেখেলে জয় পাওয়ার আশায় যে যুদ্ধ শুরু করেছিলেন, সেই যুদ্ধই দিনশেষে দুঃস্বপ্নে পরিণত হতে যাচ্ছে।
অথচ এই মানুষটিই মাত্র একদিন আগে ইরানি সভ্যতা মাটির সঙ্গে মিশিয়ে দেওয়ার হুমকি দিয়েছিলেন। বলেছিলেন, ইরানকে প্রস্তর যুগে ফিরিয়ে দেওয়া হবে। এমনকি হরমুজ প্রণালি জোর করে খুলে দেওয়ার উদ্দেশ্যে হাজার হাজার মার্কিন নৌ-সেনা জড়ো করা হয়েছিল।
কিন্তু বাস্তবে এখন দেখা যাচ্ছে সম্পূর্ণ ভিন্ন দৃশ্য। ইরান নিজেই ঠিক করছে কোন জাহাজ পার হবে, আর কোনটি আক্রমণের শিকার হবে। মার্কিন নৌবহর নিরাপদ দূরত্বে থেকে এই পরিস্থিতি দেখছে। এমনকি প্রণালি দিয়ে যাতায়াতের জন্য এখন প্রতি ট্যাংকারকে প্রায় ২০ লাখ ডলার ‘টোল’ দিতে হচ্ছে। সেটিও চীনা মুদ্রা ইউয়ানে।
চার সপ্তাহ আগেও চিত্রটা ছিল ভিন্ন। ইসরায়েলের সেনাপ্রধান আইয়াল জামির দাবি করেছিলেন, তারা ইরানের প্রায় ৮০ শতাংশ আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থা ধ্বংস করে ফেলেছে এবং ‘প্রায় পুরোপুরি আকাশ আধিপত্য’ প্রতিষ্ঠা করেছে। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সেই দাবি ভেঙে পড়ছে। এখন দেখা যাচ্ছে, মার্কিন যুদ্ধবিমান নিয়মিতভাবে ধ্বংস হচ্ছে। যুদ্ধের ষষ্ঠ সপ্তাহে এসে দেখা গেল, ইরানের আকাশ প্রতিরক্ষা আরও কার্যকর হয়ে উঠেছে।
সবচেয়ে বিস্ময়কর বিষয় হলো—১৩ হাজারেরও বেশি বিমান হামলার পরও ইরান রাষ্ট্র হিসেবে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে।
ইরানের এই স্থিতিশীলতাকে বোঝার জন্য তুলনা করা যায় মধ্যপ্রাচ্যের অন্যান্য শাসনব্যবস্থার সঙ্গে। ইরাক ও সিরিয়ার বাথ পার্টি, কিংবা লিবিয়ার জামাহিরিয়া—এসব ব্যবস্থার পতন হয়েছিল অত্যন্ত দ্রুত। সাদ্দাম হোসেন, বাশার আল-আসাদ কিংবা মুয়াম্মার গাদ্দাফির পতনের সঙ্গে সঙ্গেই পুরো কাঠামো ভেঙে পড়েছিল।
এই শাসনব্যবস্থাগুলো ছিল মূলত ব্যক্তিনির্ভর। নেতা না থাকলেই ব্যবস্থা অচল হয়ে যেত। সিরিয়ায় ২০২৪ সালের ডিসেম্বরে আসাদের পতনের সময় প্রায় কোনো প্রতিরোধই দেখা যায়নি।
কিন্তু ইরানের ক্ষেত্রে চিত্র সম্পূর্ণ ভিন্ন। এখানে রাষ্ট্র কাঠামোটি অনেক বেশি প্রাতিষ্ঠানিক এবং বহুস্তরীয়। মোসাদ ও সিআইএ-এর অনুপ্রবেশ, এমনকি ধারাবাহিক টার্গেটেড হত্যাকাণ্ড—যেভাবে হামাস ও হিজবুল্লাহর নেতৃত্বকে দুর্বল করা হয়েছিল—তারপরও ইরানের কমান্ড-কাঠামো ভেঙে পড়েনি।
দেশের ভেতরে কোনো বিকল্প রাজনৈতিক বা জাতিগত শক্তিও মাথা তুলে দাঁড়াতে পারেনি। এমনকি ইরানি কুর্দিদের ক্ষেত্রেও দেখা গেছে, তারা যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ নেওয়ার অভিযোগ সরাসরি অস্বীকার করেছে।
এতে স্পষ্ট হয়ে উঠেছে, ইসলামি প্রজাতন্ত্রের কাঠামোটি বোমা হামলা বা নেতৃত্ব হত্যার মাধ্যমে সহজে ভাঙার মতো নয়। বরং এটি মধ্যপ্রাচ্যের অন্যান্য অনেক ব্যবস্থার তুলনায় অনেক বেশি সহনশীল।
তবে এর মানে এই নয় যে ইরানের ভেতরে কোনো অসন্তোষ নেই। প্রবাসী ইরানিদের মধ্যে এখনো বিতর্ক চলছে—রেভল্যুশনারি গার্ডের কঠোর দমন-পীড়নের সমালোচনা করা হবে, নাকি ইসরায়েলের ওপর হামলাকে সমর্থন করা হবে।
কিন্তু ট্রাম্পের সরাসরি হামলা সেই দ্বন্দ্বকে অনেকটাই চাপা দিয়েছে। জাতীয়তাবোধ ও বাইরের হুমকির বিরুদ্ধে প্রতিরোধই এখন বড় হয়ে উঠেছে। বিশ্লেষকদের মতে, এই যুদ্ধ ইরানে বিপ্লব-সমর্থনকে নতুন করে জাগিয়ে তুলেছে।
এই প্রভাব শুধু ইরানের ভেতরেই সীমাবদ্ধ নেই। আরব বিশ্বেও এর প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে। যেসব দেশ আগে ইরানের প্রতি নিরপেক্ষ বা ইতিবাচক ছিল, তারা আরও ঘনিষ্ঠ হচ্ছে। আর যারা আগে বিরোধী ছিল, তাদের মধ্যেও নতুন ধরনের প্রতিযোগিতা শুরু হয়েছে—কে ফিলিস্তিনের পক্ষে বেশি অবস্থান নিচ্ছে।
এর একটি গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ দেখা যায় সিরিয়ায়। গত সপ্তাহে দেশজুড়ে ইসরায়েলের একটি আইন—যেখানে ‘সন্ত্রাসী’ হিসেবে দোষী সাব্যস্ত ফিলিস্তিনিদের জন্য মৃত্যুদণ্ডের বিধান রাখা হয়েছে—তার বিরুদ্ধে বিক্ষোভ শুরু হয়।
দামেস্ক থেকে শুরু হয়ে এই বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে দারা, কুনেইত্রা, আলেপ্পো, লাতাকিয়া, হোমস ও ইদলিবে। আলেপ্পো বিশ্ববিদ্যালয়ে হাজার হাজার শিক্ষার্থী রাস্তায় নেমে স্লোগান দেয়—‘আমাদের প্রাণ আর রক্ত দিয়ে ফিলিস্তিনকে মুক্ত করব।’
এখানে বিষয়টি আরও তাৎপর্যপূর্ণ, কারণ এই অঞ্চলগুলোই একসময় সিরিয়ার গৃহযুদ্ধে ইরান-সমর্থিত
বাহিনীর বিরুদ্ধে লড়েছিল। অথচ এখন সেই জনগণই ইসরায়েলের বিরুদ্ধে অবস্থান নিচ্ছে।
জর্ডানেও একই প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। যদিও দেশটির সরকার পশ্চিমাপন্থী, কিন্তু সাধারণ মানুষের মধ্যে ইরানের প্রতি সমর্থন বাড়ছে। এমনকি বিশ্লেষকদের মতে, প্রকাশ্যে না বললেও অধিকাংশ জর্ডানীয় এই যুদ্ধে ইরানের পক্ষেই রয়েছে।
এই পরিস্থিতি ইসরায়েলের জন্য একটি বড় ধাক্কা। একসময় যেসব আরব দেশ ইসরায়েলের সঙ্গে শান্তিচুক্তি করেছিল—মিশর, জর্ডান, এমনকি উপসাগরীয় দেশগুলো—সেখানেও এখন জনমতের বড় অংশ ইসরায়েলের বিরুদ্ধে অবস্থান নিচ্ছে।
বিশ্লেষক মামুন ফান্দির ভাষায়, ইসরায়েল আবার আরব বিশ্বের ‘শত্রু’তে পরিণত হয়েছে। শান্তি প্রতিষ্ঠার যে ধারণা সামনে আনা হয়েছিল, তা এখন অনেকটাই ভেঙে পড়েছে।
এই পুরো পরিস্থিতির কেন্দ্রে রয়েছে হরমুজ প্রণালি। আগে মনে করা হতো, এই প্রণালি ইরানের জন্য যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি উপসাগরীয় দেশগুলোর জন্যও। কিন্তু যুদ্ধ প্রমাণ করেছে—এই ধারণা ভুল।
ইরান এখন এই প্রণালিকে এমনভাবে ব্যবহার করছে, যা পুরো বিশ্ব অর্থনীতিকে প্রভাবিত করছে। ইউরোপে ডিজেলের দাম ইতোমধ্যে ৩০ শতাংশ বেড়ে গেছে।
এই কৌশল পারমাণবিক অস্ত্র বা ক্ষেপণাস্ত্রের চেয়েও বেশি কার্যকর হয়ে উঠেছে, কারণ এটি সরাসরি বৈশ্বিক বাজারে প্রভাব ফেলছে।
এই পরিস্থিতিতে বিভিন্ন পক্ষ থেকে সমঝোতার প্রস্তাবের পর গতকাল মঙ্গলবার প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প রাজি হয়েছেন দুই সপ্তাহের যুদ্ধবিরতিতে। এই যুদ্ধবিরতিতে মধ্যস্থতা করেছে পাকিস্তান। পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ জানিয়েছেন, আগামী শুক্রবার আনুষ্ঠানিকভাবে দুই দেশ আলোচনায় বসবে।
সব মিলিয়ে, এই যুদ্ধের ফলাফল একেবারেই প্রত্যাশার বিপরীত। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের লক্ষ্য ছিল ইরানকে দুর্বল করা। কিন্তু বাস্তবে তারা ইরানকে আরও শক্তিশালী অবস্থানে নিয়ে গেছে।
যদি এই মুহূর্তে ট্রাম্প স্থায়ী যুদ্ধবিরতিতে যান, তাহলে তিনি এমন একটি ইরানকে রেখে যাবেন, যা আগের চেয়ে অনেক বেশি কৌশলগত দিক থেকে শক্তিশালী।
ইসরায়েলি প্রেসিডেন্ট নেতানিয়াহু বহু বছর আগে থেকেই ইরানের বিরুদ্ধে সরাসরি যুদ্ধে জড়াতে চাচ্ছিলেন। অবশেষে তাঁর খায়েশ পূরণ হলেও, যুদ্ধের ফল হয়ে উল্টো। এই যুদ্ধ আরব ও ইরানিদের মধ্যে নতুন ধরনের ঐক্য সৃষ্টি করেছে।
মধ্যপ্রাচ্য এখন এমন এক নতুন বাস্তবতার দিকে এগোচ্ছে, যেখানে শক্তির ভারসাম্য বদলে গেছে এবং সেই নতুন খেলায় শক্তিশালী কার্ডগুলো এখন ইরানের হাতেই।
(ইংরেজি থেকে অনুবাদ করেছেন মাহজাবিন নাফিসা)

দক্ষিণ এশিয়ায় খুব কম জলসম্পদ অবকাঠামোই ফারাক্কা বাঁধের মতো দীর্ঘস্থায়ী ও বিতর্কিত প্রভাব সৃষ্টি করেছে। ভারতের একটি জাতীয় উন্নয়ন প্রকল্প হিসেবে পরিকল্পিত এই বাঁধটি ধারাবাহিকভাবে বাংলাদেশের জন্য আন্তর্জাতিক বৈধতা, পরিবেশগত নিরাপত্তা এবং মানবকল্যাণ সংশ্লিষ্ট গুরুতর সমস্যা উত্থাপন করে এসেছে।
৬ ঘণ্টা আগে
ট্রাম্প প্রশাসন বেশ জোর গলায় এই সামরিক অভিযানকে ‘নিখুঁত ও অপ্রতিরোধ্য’ দাবি করে আসছিল। উদ্দেশ্য ছিল ইরানের ‘আসন্ন পারমাণবিক হুমকি’ চিরতরে মুছে ফেলা। একই সঙ্গে ইরানি জনগণকে উসকে দিয়ে তাদের সরকারের পতন ঘটানো। কিন্তু বাস্তবতা এখন সেই ঘোষণার ঠিক উল্টো।
১ দিন আগে
পে-স্কেলের একটি পরোক্ষ প্রভাব নিয়ে আলোচনা হয়—বেসরকারি খাতে মজুরি বৃদ্ধির চাপ। বলা হয়, সরকারি বেতন বাড়লে বেসরকারি খাতের উদ্যোক্তারা শ্রমিকদের মজুরি বাড়াতে বাধ্য হবেন। কিন্তু বাস্তবতা হলো, যারা হাজার হাজার কোটি টাকা মুনাফা করছেন বা ক্যাশ ইনসেনটিভ পাচ্ছেন, তাদের কতজন সেই লাভের অংশ শ্রমিকদের দেন?
১ দিন আগে
মার্চ ২০২৬। রাজধানীর মহাখালীর সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতালের (আইডিএইচ) করিডোরে শিশুদের কান্না। শয্যার অভাবে হাসপাতালের মেঝেতে শুয়েই চিকিৎসা নিচ্ছে শিশুরা। এই হাসপাতালে মাত্র তিন মাসেই ভর্তি হয়েছে ৫৬০ জন হামের রোগী, যেখানে পুরো ২০২৫ সালে আক্রান্তের সংখ্যা ছিল মাত্র ৬৯ জন।
১ দিন আগে