গত ১৯ ডিসেম্বর রাতে ময়মনসিংহের ভালুকায় ‘পাইওনিয়ার নিট ফ্যাক্টরি’তে কর্মরত পোশাককর্মী দীপু চন্দ্র দাসকে নির্মমভাবে পিটিয়ে ও পুড়িয়ে হত্যার ঘটনা ঘটে। এক কন্যা শিশুর পিতা ২৮ বছর বয়সী এ হিন্দু ব্যক্তিকে ধর্ম নিয়ে কটূক্তির অভিযোগে পিটিয়ে হত্যার পর মহাসড়কের বিভাজকে গাছে ঝুলিয়ে তাঁর লাশে আগুন দেয় দুর্বৃত্তরা। হযরত মুহাম্মদ (সা.) সম্পর্কে কটূক্তির অভিযোগে দিপু চন্দ্র দাসকে পিটিয়ে হত্যা করলেও দিপুর বিরুদ্ধে ধর্ম নিয়ে কটূক্তির কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি বলে র্যাব কর্মকর্তা জানান।
এমন নৃশংস, ভয়াবহ একটি অপরাধ ঘটে যাওয়ার পর কিছু সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও মানবাধিকার সংগঠন এবং ব্যক্তি প্রতিবাদ ও নিন্দা জানালেও দেশব্যাপী ব্যাপক কোনো নিন্দা বা ক্ষোভ লক্ষ্য করা যায়নি। বরং কিছু কথিত ‘ইসলামী’ ও ‘সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যক্তিত্ব’ একে শুধু সমর্থন নয় বরং প্রকাশ্যে প্রশংসা করেছে।
বিষয়টি বেশকিছু প্রশ্নের অবতারণা করে। প্রথমত: কাউকে কী শুধু অভিযোগের ভিত্তিতে শাস্তি দেয়া যায়? এ জন্যে কী কাউকে হত্যা করা যায়? দ্বিতীয়ত: যদি কোনো ব্যক্তি সত্যিই ধর্ম অবমাননা করে তবে তা সত্যিই করেছে কিনা তা নির্ধারণ করা হবে কীভাবে? কে করবে? তার শাস্তিই বা কী?
প্রথম প্রশ্নের উত্তর হচ্ছে কোনো অবস্থাতেই হত্যা তো দূরের কথা, কাউকে যথাযথ প্রক্রিয়া, আত্মপক্ষ সমর্থনের পর্যাপ্ত সুযোগ, যথাযথ যোগ্য কর্তৃপক্ষের পক্ষপাতমুক্ত বিচার, যার উদ্দেশ্য হলো ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা ছাড়া কোনোরূপ শাস্তি দেওয়া যায় না। কারণ, যদি অভিযুক্ত দোষী না হয়, অপরাধ না করে থাকে তবে তাঁকে শাস্তি দেওয়া অন্যায় ও অপরাধ। কাজেই বিচারবিহীন হত্যা বা শাস্তি দেওয়া একটি অপরাধ। কোরআন শরিফে সূরা মাইদাহর ৩২ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে, যে মানুষ হত্যা করে, যে নরহত্যা বা দেশে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টিকরল, সে যেন সমগ্র মানবজাতিকে হত্যা করল। আর যে একজনের জীবন রক্ষা করল, সে যেন সমগ্র মানবজাতিকে রক্ষা করল।
আন্ডারস্ট্যান্ডিং ইসলাম ইউকেতে ওপরের আয়াতের সূত্রে বলা হয়েছে, শুধু দুই কারণে হত্যা করা যায়। নরহত্যা আর অরাজকতা, বিশৃঙ্খলা বা দাঙ্গা সৃষ্টির অপরাধে।
একই ওয়েবসাইটে ধর্ম অবমাননা বা হযরত মুহাম্মদ (সা.) সম্পর্কে কটূক্তি সম্পর্কে বলা হয়েছে, কোরআনে একাধিকবার বলা হয়েছে, কীভাবে হযরত মুহাম্মদ (সা.)-সহ অন্যান্য নবীদের প্রতি কটূক্তি বা অবমাননা করা হয়েছে, কিন্তু আল্লাহ একবারও তাদের প্রতি ক্ষিপ্ত হতে বলেননি।
দ্বিতীয়ত: কোরআন, হাদিস ও সমগ্র মুসলিম বিশ্ব একমত যে ইসলামী শাস্তি শুধুমাত্র সার্বভৌম, প্রতিষ্ঠিত রাষ্ট্রের মাধ্যমে দেওয়া যায়। তাই অন্য কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠী যদি এ ধরনের শাস্তি দেওয়ার চেষ্টা করে, তবে তাদের বিশৃঙ্খলাকারী হিসাবে ঘোষণা করা যায়, যার জন্যে কোরআনে শাস্তি হিসেবে মৃত্যুদণ্ডের বিধান দেওয়া হয়েছে।
তৃতীয়ত: এ বিষয়ে ইসলামী আইনশাস্ত্রবীদগণ একমত নন। কেউ কেউ এ বিষয়ে মৃত্যুদণ্ডের কথা বললেও অন্য অনেকে অভিযুক্তের অনুতাপ গ্রহণযোগ্য ও এর জন্য সময় দেওয়ার কথা বলেন। হানাফি পণ্ডিত আল-সারাকসি বলেন, সত্যিকারের কুফর (অবিশ্বাস) নিশ্চয়ই সবচেয়ে বড় পাপ, কিন্তু তা একজন মানুষ ও তার সৃষ্টিকর্তার মধ্যে। এর শাস্তি কেয়ামতের (শেষ বিচার) আগ পর্যন্ত স্থগিত থাকবে। অর্থাৎ, কোনো মানুষের এতে হস্তক্ষেপ করা উচিত নয়।
চতুর্থত: সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে, সমস্ত কোরানে কোথাও একটিবারের জন্যও ধর্ম নিয়ে কটূক্তি বা ধর্ম অবমাননার শাস্তির কথা বলা হয়নি। সেখানে সূরা আন-নিসা (৪: ১৪০)তে বলা হয়েছে, তুমি যদি কাউকে আল্লাহর বাণী অস্বীকার ও উপহাস করতে শোন, তাদের সাথে বসবে না যতক্ষণ না তারা অন্য বিষয়ে কথা বলা শুরু করে, নইলে তোমরাও তাদের মতো হয়ে যাবে।
অর্থাৎ, এমনকি তাদের থামাতেও বলা হয়নি। তাদের প্রতি ক্ষোভ, হিংসা, আক্রমণ বা শাস্তি তো দূরের কথা। এ বিষয়ে কোরানের ভাষ্য অত্যন্ত নমনীয়।
এখন বিবেচ্য হলো আমরা, এদেশের মুসলিমরা কোনটা বেছে নেব? শান্তির ধর্ম ইসলামের ক্ষমা, সহনশীলতা, নমনীয়তা না হিংসা, বিদ্বেষ, যা কিনা ইসলাম ও মুসলিমদের বদনাম করবে, কলঙ্কিত করবে।
এরপরের প্রশ্ন হলো, যদি এই হয় ইসলামের ধর্মীয় অবস্থান, তবে কেন কথিত ‘ইসলামী পণ্ডিতেরা’ এর সমর্থন করে? কেন মুসলিম সংখাগরিষ্ঠ দেশে এমন ঘটনা ঘটে? কেন শুধু অমুসলিমদের বিরুদ্ধেই এ অভিযোগ উঠে? আর কেনই বা গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র ব্যবস্থায় এটা বারংবার ঘটে?
সেইসব কথিত ‘ইসলামী পণ্ডিতেরা’ এর সমর্থন করে কা’ব বিন আশরাফ সম্পর্কিত হাদিসের ভিত্তিতে। কিন্তু আন্ডারস্ট্যান্ডিং ইসলাম ইউকে ব্যাখ্যা করে যে, কা’ব বিন আশরাফকে শুধুমাত্র হযরত মুহাম্মদ (সা.) সম্পর্কে কটূক্তির অভিযোগে শাস্তি দেওয়া হয়নি বরং তার গোত্র বনু নজির ও হযরত মুহাম্মদ (সা.) এর মধ্যে সম্পাদিত চুক্তি ভঙ্গ এবং হযরত মুহাম্মদ (সা.)-কে হত্যার ষড়যন্ত্র করার জন্য শাস্তি দেওয়া হয়েছিল। একে কোরআন ও অন্যান্য হাদিসের প্রেক্ষিতে দেখলে এটাই প্রতীয়মান হয় যে ইসলাম ও হযরত মুহাম্মদ (সা.) সম্পর্কে কটূক্তির বিষয়ে কোরআন যেমন, তেমনই হযরত মুহাম্মদ (সা.) এর নিজের অবস্থানও ছিল খুবই নমনীয়। কাজেই ঐসব ‘পণ্ডিত’ বা ধর্মীয় প্রভাবশালী ব্যক্তিদের অবস্থান এর সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।
মুসলিম সংখাগরিষ্ঠ দেশে এ ধরনের ঘটনা ঘটে এবং প্রধানত অমুসলিমদের বিরুদ্ধে ঘটে। মূলতঃ এ বিষয়ে মুসলিমদের অজ্ঞানতা, জাত্যাভিমান, অন্য ধর্মাবলম্বীদের প্রতি সন্দেহ, তাদের নিজেদের সমমানের মানুষ মনে না করা, মানবাধিকার ও আইনের প্রতি শ্রদ্ধা না থাকা, কিছু অসাধু ধর্মীয় ও রাজনৈতিক প্রভাবশালী ব্যক্তি ও গোষ্ঠীর উস্কানি, ইত্যাদির ফলে এসব ঘটনা ঘটে।
এটা অবাস্তব যে এদেশে কখনো কোনো ইসলাম ধর্মাবলম্বী অন্য ধর্ম সম্পর্কে কটূক্তি করে না, কিন্তু তাদের বিরুদ্ধে ধর্ম অবমাননার অভিযোগ উঠে না, কারণ তারা দলে ভারী। একই কারণে ভারতে মুসলিম বা অহিন্দু ধর্মাবলম্বীরা হিন্দুত্ববাদী উগ্রবাদীদের হামলার শিকার হয় একই অভিযোগে, কিন্তু হিন্দুত্ববাদীরা নয়।
বাংলাদেশের মতো একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র ব্যবস্থায় এটা যে বারংবার ঘটে, তার পেছনে একাধিক কারণ ও ঐতিহাসিক পটভূমি রয়েছে। রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে ধর্মের ব্যবহার অনেক পুরনো হলেও দক্ষিণ এশিয়ায় ব্রিটিশ উপনিবেশবাদীরা হিন্দু-মুসলিম দ্বন্দ্বকে উষ্কে দেয় নিজেদের দখলদারিত্ব দীর্ঘায়িত করতে। যার ফল হিসেবে এখানে ধর্মের ভিত্তিতে বিভাজিত রাষ্ট্র ভারত ও পাকিস্তান গঠিত হয়। আর তার জন্মলগ্নে ধর্মের নামে খুন করা হয় লাখ লাখ মানুষকে। সব ধর্মের মানুষই এর শিকার হয়। সেসব নতুন রাষ্ট্রে ধর্ম হয়ে উঠে রাজনীতির এক প্রধান হাতিয়ার। এগুলো ভিন্ন ভিন্ন ধর্মের মানুষের মধ্যে অবিশ্বাস, সন্দেহ, এমনকি হিংসা, তীব্রতর করে তোলে।
বাংলাদেশের স্বাধীনতা আন্দোলন ও মুক্তিযুদ্ধের সময় ইসলাম ধর্মকে এ দেশেরই হিন্দু-মুসলিম নির্বিশেষে জনগণের বিরুদ্ধে ব্যবহার করে তৎকালীন পশ্চিম পাকিস্তানের ক্ষমতাবান ও তাদের এদেশীয় দোসর-দালালরা। স্বাধীনতার পর ও এদেশে পাকিস্তানি দোসরদের তৎপরতা বন্ধ হয়নি। তারা ধীরে ধীরে পুনর্বাসিত হয়। তেমনই সাম্প্রদায়িকতার বিষবাষ্পও সমাজে জিয়ে থাকে। বিভিন্ন সময়ে অমুসলিমদের ওপর হামলা হতে থাকে, যার পেছনে মূল অজুহাত হলো ইসলাম, কোরআন ও হযরত মুহাম্মদ (সা.) সম্পর্কে কটূক্তি বা অবমাননা।
২০২৪-এর জুলাই আন্দোলনে ক্ষমতার পালাবদলে কথিত ‘ইসলামী’ উগ্রবাদী গোষ্ঠীটি ক্ষমতাবান হয়ে ওঠে আর ধর্ম অবমাননার অভিযোগে হিন্দু-মুসলিম নির্বিশেষে তাদের অপছন্দের ব্যক্তিদের ওপর আক্রমণ বাড়তে থাকে। এটা প্রথমে শুরু হয় প্রতিবাদ-বিক্ষোভ আকারে, দ্রুতই তা মাজার, মানুষ, এমনকি মৃতদেহের ওপর আক্রমণে রূপান্তরিত হয়, আর চূড়ান্ত পরিণতিতে ঘটে হত্যাকাণ্ড।
এ অবনতি বা সহিংসতার ক্রমশ বর্ধনে রাষ্ট্র তথা সরকার ও প্রশাসনের সহায়ক ভূমিকা অস্বীকার করার কোনো উপায় নেই। প্রথমদিকে যখন এমন অভিযোগ ওঠা শুরু হলো, তখন তাদের (সরকার ও প্রশাসন) প্রতিক্রিয়া ছিল কোনোরূপ তদন্ত ও প্রমাণ ছাড়াই তাৎক্ষণিকভাবে অভিযুক্তকে গ্রেপ্তার এবং তার বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করা। অপরদিকে এমনকি তারা (অভিযুক্ত) আক্রান্ত হলেও তার ওপর আক্রমণকারীদের বিরুদ্ধে কোনো আইনি ব্যবস্থা নেওয়া বা এই অপরাধে কাউকে কখনো শাস্তি দেওয়ার কোনো নজির নেই।
অন্যদিকে সামাজিকভাবেও গ্রাহ্য করার মতো কোনো নিন্দা, প্রতিবাদ বা প্রতিরোধের চেষ্টা ছিল না। তাই একদিকে যেমন এসব গুরুতর ফৌজদারি অপরাধ মামুলি ঘটনায় পরিণত হয়েছে, এক ধরনের বৈধতা পেয়েছে, অন্যদিকে তেমনই অপরাধী ও সম্ভাব্য অপরাধীরা আরও সাহস, আসকারা পেয়েছে।
দিপু চন্দ্র দাসকে নারকীয়ভাবে হত্যার পর তা আন্তর্জাতিকভাবে আলোড়ন সৃষ্টি করায় হত্যাকারীদের চিহ্নিত ও গ্রেপ্তার করা হচ্ছে কিন্তু অপরাধীরা শাস্তি পাবে কি না, তা সময়ই বলবে। সামগ্রিকভাবে এ নিয়ে সামাজিক অসন্তোষ ও প্রত্যাখ্যান সীমিত, যা আমাদের মানবিক ও নৈতিক দেউলিয়াত্বকেই প্রকাশ করে। অন্যদিকে, যারা প্রকাশ্যে সমর্থন করে একে বৈধতা দেওয়ার চেষ্টা করছে, তারাও এ অপরাধে অপরাধী। তাই তাদের বিরুদ্ধে যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি। যদি প্রথম থেকেই রাষ্ট্র, সমাজ, আইন ও প্রশাসন তাদের নিজ নিজ দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করত, তবে দিপু চন্দ্র দাসকে এভাবে প্রাণ হারাতে হতো না।
আমরা নিশ্চয়ই আমাদের দেশকে ইজরায়েল বা ভারতের মতো বৈষম্যপূর্ণ, হিংসাত্মক, বিষাক্ত ধর্মীয় বর্ণবাদী রাষ্ট্র ও সমাজে পরিণত করতে চাই না। যদি তাই হয় তাহলে যথাযথ বিচার প্রক্রিয়ার মাধ্যমে দ্রুততম সময়ে এসব অপরাধের সঙ্গে যারা জড়িত এবং তাদের উৎসাহদাতা ও সমর্থনকারীসহ সকলের কঠোর শাস্তি নিশ্চিত করা ছাড়া আর কোনো বিকল্প নেই।
আবু আলা মাহমুদুল হাসান: গবেষক ও লেখক