leadT1ad

বগুড়ায় কি তারেক রহমান ‘বিএনপির লিগ্যাসি’ ধরে রাখতে পারবেন

রবিউল ইসলাম
রবিউল ইসলাম

স্ট্রিম গ্রাফিক

দেড় যুগেরও বেশি সময়ের নির্বাসিত মেঘ কাটিয়ে বগুড়ার আকাশে এখন প্রত্যাবর্তনের সুর। দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর সাবেক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের জন্মভূমি বগুড়ায় পা রাখতে যাচ্ছেন তারেক রহমান। গত ১১ জানুয়ারি তাঁর বগুড়া সফরে যাওয়ার কথা থাকলেও শেষ মুহূর্তে নির্বাচন কমিশনের অনুরোধে সফর স্থগিত করেন তারেক রহমান। ধারণা করা হচ্ছে, ২১ জানুয়ারি নির্বাচন কমিশন প্রার্থীদের প্রতীক বরাদ্দ দেওয়ার পরই তিনি উত্তরবঙ্গ সফরে বের হবেন।

তারেক রহমান সর্বশেষ বগুড়ায় এসেছিলেন ২০০৬ সালের ২৪ ডিসেম্বর। দীর্ঘ ১৯ বছর পর আবার তিনি বগুড়ায় পা রাখতে যাচ্ছেন। তাঁর এই আগমন কেবল একজন নেতার ঘরে ফেরা নয়, বরং উত্তরাঞ্চলের রাজনীতির চিরায়ত সমীকরণ নতুন করে লেখার এক মহেন্দ্রক্ষণ। কিন্তু এবারের প্রেক্ষাপট ভিন্ন। একদিকে উত্তরবঙ্গের ‘দুর্গ’ রক্ষায় বিএনপির আবেগী প্রস্তুতি, অন্যদিকে জুলাই পরবর্তী বাংলাদেশে জামায়াতে ইসলামীর সুনিপুণ ও সুশৃঙ্খল সাংগঠনিক জাল। প্রশ্ন উঠেছে, ইতিহাসের ধারাবাহিকতা কি বজায় থাকবে, নাকি নতুন কোনো বাঁক নেবে বগুড়ার রাজনীতি?

বাংলার ইতিহাসে বগুড়া বা প্রাচীন ‘পুণ্ড্রবর্ধন’ সব সময়ই প্রতিরোধের দুর্গ হিসেবে পরিচিত। ইতিহাসের পাতা উল্টালে দেখা যায়, এখানকার মাটি যাদের ওপর একবার আস্থা রেখেছে, সহজে তাদের থেকে মুখ ফিরিয়ে নেয়নি। জিয়া পরিবারের প্রতি বগুড়াবাসীর যে অকুণ্ঠ সমর্থন, তা অনেকটা মিথলজিক্যাল বা কিংবদন্তিতুল্য ভালোবাসায় রূপ নিয়েছে। বিএনপির সাধারণ নেতাকর্মীদের কাছে তারেক রহমানের আগমন যেন গ্রিক পুরাণের সেই বীরের প্রত্যাবর্তনের মতো, যিনি দীর্ঘ বনবাস কাটিয়ে নিজের সাম্রাজ্য পুনরুদ্ধার করতে আসছেন।

১৯৭৮ সালে বিএনপি প্রতিষ্ঠার পর থেকে অবাধ নির্বাচনে এ জেলায় দলটির অপরাজিত থাকার রেকর্ড ইতিহাসের এক অকাট্য দলিল। কিন্তু গ্রিক দার্শনিক হেরাক্লিটাস বলেছিলেন, একই নদীতে দুবার নামা যায় না।’ অর্থাৎ সময় ও প্রবাহ নিরন্তর পরিবর্তনশীল। সতের বছর আগের রাজনীতি আর জুলাই গণঅভ্যুত্থান পরবর্তী ‘জেন-জি’ বা নতুন প্রজন্মের আকাঙ্ক্ষার মধ্যে এক বিস্তর ফারাক তৈরি হয়েছে।

তারেক রহমান কি সেই ফারাক পূরণ করতে পারবেন? এবারই তিনি বগুড়া-৬ আসন থেকে প্রথমবার নির্বাচনে প্রার্থী হয়েছেন। এর আগে এই আসনে ২০০১ সালে লড়েছিলেন স্বয়ং খালেদা জিয়া এবং জয়ী হয়েছিলেন। ১৯৭৩ সাল থেকে এ পর্যন্ত ৬বার এই আসনে জিতেছে বিএনপি। এরমধ্যে ১৯৭৩ সালে আওয়ামী লীগ, ১৯৮৬ সালে জামায়াত, ১৯৮৮ সালে স্বতন্ত্র, ২০১৪ সালে জাতীয় পার্টি (বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায়) এবং ২০২৩ সালের উপনির্বাচনে আওয়ামী লীগ জয় পেয়েছিল।

সুতরাং বিগত সময়গুলোতে বিএনপির জয় পাওয়া যতটা সহজ ছিল, এখন তারেক রহমানের জন্য হয়তো অতটা সহজ হবে না। কারণ ইতিমধ্যেই করতোয়ায় প্রবাহিত হয়েছে অনেক জল।

অস্বীকার করার উপায় নেই, আওয়ামী লীগ যখন গৃহহারা, জাতীয় পার্টির অবস্থাও এতিম সন্তানের মতো নাজুক, জামায়াতে ইসলামী তখন কাজ করছে নিঃশব্দে। সতের বছরের দীর্ঘ জুলুম-নির্যাতনের মধ্য দিয়ে অনেকটা ডারউইনের বিবর্তনবাদের মতো পরিবেশের সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিয়েছে জামায়াত।

আসন্ন নির্বাচনে আওয়ামী লীগের অনুপস্থিতি ও জাতীয় পার্টির ভঙ্গুর দশার সুযোগে জামায়াত এখন বিএনপির প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী। জামায়াতের নির্বাচনী কৌশল কেবল জনসভার মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই; তারা ‘ঘরমুখী’ রাজনীতি বা মাইক্রো-ম্যানেজমেন্টে মন দিয়েছে। উঠান বৈঠক, তরুণ ও নারী ভোটারদের কাছে পৌঁছানোর জন্য তাদের যে সুশৃঙ্খল কমিটি, তা অনেকটা ‘পিরামিড স্ট্রাকচার’ বা কাঠামোগত দর্শনের ওপর ভিত্তি করে দাঁড়িয়ে।

গ্রিক দার্শনিক হেরাক্লিটাস বলেছিলেন, ‘একই নদীতে দুবার নামা যায় না।’ অর্থাৎ সময় ও প্রবাহ নিরন্তর পরিবর্তনশীল। সতের বছর আগের রাজনীতি আর জুলাই গণঅভ্যুত্থান পরবর্তী ‘জেন-জি’ বা নতুন প্রজন্মের আকাঙ্ক্ষার মধ্যে এক বিস্তর ফারাক তৈরি হয়েছে।

তবে এই প্রজন্মের তরুণ প্রজন্ম পড়াশোনায় অনেক বেশি এগিয়ে, সারা বিশ্বের জ্ঞান তাদের হাতের মুঠোয়। ফলে তারা জানে, একাত্তরে জামায়াতের ভূমিকা কী ছিল, নারী ইস্যুতে জামায়াতের দর্শন কী, ধর্মীয় উগ্রতায় জামায়াতের পলিসি কী।

এসব ইস্যু জামায়াত কীভাবে মোকাবিলা করবে, তা স্পষ্ট নয়। তবে বগুড়ার প্রতিটি আসনে বিএনপির দুর্বল জায়গাগুলো চিহ্নিত করে জামায়াত যেভাবে প্রার্থী ও কৌশল সাজাচ্ছে, তা সচেতন নাগরিকদের ভাবিয়ে তুলছে। তারা কেবল ভোট চাইছে না, বরং সমস্যা সমাধানকারী এক ‘বিকল্প শক্তি’ হিসেবে নিজেদের জাহির করছে।

এসবই তারেক রহমানের জন্য সমূহ চ্যালেঞ্জ। তবে বগুড়া বিএনপির নেতারা এসব চ্যালেঞ্জকে তুড়ি মেরেই উড়িয়ে দিতে চান। জেলা বিএনপির সভাপতি রেজাউল করিম বাদশা এবং সাধারণ সম্পাদক মোশারফ হোসেনের কণ্ঠে আত্মবিশ্বাসের সুর—‘ধানের শীষের জনপ্রিয়তা নিয়ে তাদের বিন্দুমাত্র সন্দেহ নেই।’ কিন্তু রাজনীতির দর্শন বলে, ‘জনপ্রিয়তা’ এবং ‘ভোট’ সবসময় এক সুতোয় গাঁথা থাকে না। জনপ্রিয়তাকে ব্যালটে রূপান্তর করার জন্য যে সাংগঠনিক দৃঢ়তা প্রয়োজন, সেখানে অভ্যন্তরীণ ছোটখাটো গ্রুপিং বিএনপির জন্য দুশ্চিন্তার কারণ হতে পারে।

অন্যদিকে, জামায়াতের বগুড়া শহরের আমির আবিদুর রহমানের দাবি—তরুণ ভোটাররা এবার নতুন নেতৃত্ব চায়। জুলাই বিপ্লবে রাজপথে লড়াই করা তরুণদের একটি বড় অংশ গতানুগতিক রাজনৈতিক ফাঁদ থেকে বেরিয়ে আসতে চায়। তারা চায় কর্মসংস্থান, সুশাসন এবং স্বচ্ছতা।

সুতরাং, তারেক রহমান যখন বগুড়ার মানুষের সামনে দাঁড়াবেন, তখন তাঁকে কেবল স্মৃতির জাবর কাটলে চলবে না; বরং উত্তরবঙ্গের উন্নয়নের এক আধুনিক ও বাস্তবসম্মত ব্লু-প্রিন্ট পেশ করতে হবে।

বগুড়ার রাজনীতি এখন এক সন্ধিক্ষণে। একদিকে জিয়ার উত্তরাধিকারের প্রতি আবেগী টান, অন্যদিকে জামায়াতের সুদূরপ্রসারী ও কৌশলগত সাংগঠনিক পরিকল্পনা। শেষ পর্যন্ত মানুষ কি ‘বিএনপির লিগ্যাসি’ বেছে নেবে নাকি ‘পরিবর্তন’-এর নতুন দর্শনে ঝুঁকবে? তারেক রহমানের আগমনই হবে সেই লিটমাস টেস্ট।

রবিউল ইসলাম: কবি ও ব্যাংকার

Ad 300x250

সম্পর্কিত