সর্বজনীন পেনশন স্কিম হযবরল

স্কিম পরিচালনায় সুশাসন নিশ্চিত ছাড়া গ্রাহকের আস্থা ফেরানো যাবে না। স্ট্রিম গ্রাফিক

‘নানা সুযোগ-সুবিধা, কোথায় সেগুলো? ক্লোজিংয়েও মুনাফা দিচ্ছে না; ঠিকমতো ঋণও না। এভাবে চলতে পারে না। সেবা উন্নত না করলে গ্রাহক আসবে না।’ কথাগুলো বলছিলেন বেসরকারিজীবী চাকরিজীবী জাহেদুল ইসলাম শিকদার। ‘সর্বজনীন পেনশন স্কিমে’ যুক্ত জাহেদুলের মতো এমন ক্ষোভ হাজারো গ্রাহকের।

২০২৩ সালের ১৭ আগস্ট ঘটা করে চালু হয় সর্বজনীন পেনশন স্কিম। ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানে শেখ হাসিনার পতনের পরে এই স্কিম থমকে যায়। তবে বিএনপি সরকার প্রাণসঞ্চারে একগুচ্ছ সংশোধনী এনেছে।

গত জুনে ‘সর্বজনীন পেনশন স্কিম বিধিমালা, ২০২৩’– সংশোধন করে অর্থ মন্ত্রণালয়। পেনশনযোগ্য বয়সে পৌঁছানোর পর চাঁদাদাতা তাঁর জমানো অর্থের সর্বোচ্চ ৩০ শতাংশ পর্যন্ত এককালীন তুলে নিতে পারবেন। সংশোধনীতে নিজস্ব জমার বিপরীতে ঋণ নেওয়ার ব্যবস্থার পাশাপাশি সরকারি ও স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানের চুক্তিভিত্তিক আউটসোর্সিং সেবাকর্মীদের প্রগতি স্কিমে আসার সুযোগ রাখা হয়েছে। এছাড়া চাঁদা সংগ্রহের সুবিধা বাড়াতে বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট ব্যাংকসহ (বিডিবিএল) ৪৫টি আর্থিক প্রতিষ্ঠানকে যুক্ত করা হয়েছে।

জানতে চাইলে জাতীয় পেনশন কর্তৃপক্ষের সদস্য মুন্সী আবদুল আহাদ বলেন, ‘আমরা দেশের নানা স্থানে পেনশনের বিষয় নিয়ে কাজ শুরু করেছি। সাধারণ মানুষ স্কিমগুলো নিতে আগ্রহী হবেন বলে আমরা আশাবাদী।’ তিনি আরও বলেন, ‘নানা প্রতিকূলতার মধ্যেও এই স্কিম বাতিল করা হয়নি। গ্রাহকের মধ্যে আস্থার যে সংকট দেখা দিয়েছিল, তা কেটে গেছে।’

পেনশন কর্তৃপক্ষের তথ্যে, গত ২১ জুন পর্যন্ত সমতা, সুরক্ষা, প্রগতি ও প্রবাস চার স্কিমে নিবন্ধন করেছেন ৩ লাখ ৭৮ হাজার ২৮০ জন। একই সময়ে জমা পড়েছে ২৬৩ কোটি ১০ লাখ ৩৩ হাজার টাকা। এর মধ্যে ২০২৩ সালের আগস্ট থেকে ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত নিবন্ধন করেন ৩ লাখ ৭২ হাজার ৯৪ জন। আর জমা অর্থের ১২৪ কোটি ৯৯ লাখ ৫৫ হাজার ৬৭০ টাকা বিভিন্ন মেয়াদের সরকারি ট্রেজারি বন্ডে বিনিয়োগ রয়েছে।

সংশ্লিষ্টরা জানান, সর্বজনীন পেনশন স্কিম চালুর পর নানা বিতর্কের জন্ম হয়। ২০২৪ সালের মাঝামাঝি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক এবং স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জন্য বাধ্যতামূলক ‘প্রত্যয় স্কিম’ চালু করলে আন্দোলন হয়। পরে ওই বছরের আগস্টে তৎকালীন সরকার স্কিমটি বাতিল করে।

গত জুনে ‘সর্বজনীন পেনশন স্কিম বিধিমালা, ২০২৩’– সংশোধন করে অর্থ মন্ত্রণালয়। পেনশনযোগ্য বয়সে পৌঁছানোর পর চাঁদাদাতা তাঁর জমানো অর্থের সর্বোচ্চ ৩০ শতাংশ পর্যন্ত এককালীন তুলে নিতে পারবেন। সংশোধনীতে নিজস্ব জমার বিপরীতে ঋণ নেওয়ার ব্যবস্থার পাশাপাশি সরকারি ও স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানের চুক্তিভিত্তিক আউটসোর্সিং সেবাকর্মীদের প্রগতি স্কিমে আসার সুযোগ রাখা হয়েছে।

রাজধানীর একটি বেসরকারি বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক অনিল সরকার স্ট্রিমকে বলেন, তৎকালীন সরকারের অবস্থানের কারণেই মানুষের মনে পুরো স্কিম নিয়ে সন্দেহ ঢুকে যায়। রাজনৈতিক পটপরিবর্তন বা সরকারি নীতি পরিবর্তনের কারণে আমরা আর্থিক ঝুঁকি নিতে পারি না।

স্থবিরতা কেন

সর্বজনীন পেনশন স্কিম থমকে যাওয়ার বিষয়ে সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) জ্যেষ্ঠ সহযোগী গবেষক আবু সালেহ মো. শামীম স্ট্রিমকে বলেন, সর্বজনীন পেনশন স্কিম বয়স্কদের সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে বড় ভূমিকা রাখে। ফলে শুরুতে মানুষ আগ্রহী হলেও, সরকার পরিবর্তনে অগ্রগতি শ্লথ হয়ে পড়ে। বেসরকারি বিমা খাত নিয়ে মানুষের নেতিবাচক ধারণাও কাজ করেছে।

তিনি বলেন, সর্বজনীন পেনশন স্কিমকে একই নিক্তিতে ফেলে মানুষ আর্থিক ক্ষতি আগে বিবেচনা করেছে। আবার স্কিম চালু হলেও, ঋণ পাওয়ার ক্ষেত্রে গ্রাহকের নানা ভোগান্তি ও অব্যবস্থাপনা সংকট আরও বাড়িয়েছে। সামাজিক বিমা যে সরকারের সম্পূর্ণ গ্যারান্টিযুক্ত একটি ব্যবস্থা (যেমন সঞ্চয়পত্র), তা সরকার মানুষের কাছে সঠিকভাবে তুলে ধরতে পারেনি।

আবু সালেহ মো. শামীম বলেন, বর্তমান সরকার ২০৩০ সালের মধ্যে প্রায় ৪ কোটি মানুষকে সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনীর আওতায় আনার ইতিবাচক কর্মসূচি ঘোষণা করেছে। বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে সুনির্দিষ্ট রোডম্যাপ ও কাঠামোগত প্রস্তুতির অভাব দূর করা গেলে মানুষ সর্বজনীন পেনশন স্কিমে আস্থা রাখবে।

তিনি আরও বলেন, বেসরকারি চাকরিজীবীদের তহবিল সুরক্ষায় অভিন্ন নীতি করা প্রয়োজন। কোনো কর্মী চাকরি বদল করলেও যেন তাঁর জমা টাকা সুরক্ষিত এবং স্থানান্তরযোগ্য থাকে (অ্যাক্টিভ লেবার মার্কেট পলিসি)।

সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী এমএম খালেকুজ্জামান বলেন, টেকসই পেনশন স্কিমের চ্যালেঞ্জ হলো দীর্ঘমেয়াদে তহবিলের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। স্কিম পরিচালনায় সুশাসন নিশ্চিত করা না গেলে গ্রাহকেরা আস্থাশীল হবেন না। তার আগে আর্থিক স্বাক্ষরতার হারও বাড়াতে হবে।

Ad 300x250

সম্পর্কিত