সরকার ভুল পথে হাঁটছে

হাসনাত কাইয়ূম
হাসনাত কাইয়ূম

প্রকাশ : ১৩ এপ্রিল ২০২৬, ১৯: ২৬
স্ট্রিম গ্রাফিক

বিল পাসের মাধ্যমে অন্তর্বর্তী সরকারের জারি করা সুপ্রিম কোর্টে বিচারক নিয়োগ, সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় ও মানবাধিকার কমিশন অধ্যাদেশ বাতিলের ঘটনাটি কেবল হতাশাজনক নয়, বরং এটি রাষ্ট্রের গণতান্ত্রিক রূপান্তরের পথে বড় অশনিসংকেত। ড. ইউনূস সরকারের যে অল্প কয়েকটি ইতিবাচক পদক্ষেপ ছিল, তার মধ্যে ছিল এ অধ্যাদেশগুলো। কিন্তু এগুলো বাতিলের মধ্য দিয়ে আমরা কার্যত আবারও সেই পুরনো ফ্যাসিবাদী ও আমলাতান্ত্রিক কাঠামোয় ফিরে যাচ্ছি। এই পদক্ষেপ জুলাই গণঅভ্যুত্থানের মূল স্পিরিট ও মানুষের আকাঙ্ক্ষার সরাসরি বিপরীত।

অধ্যাদেশগুলো বাতিলের পরিণতি বহুমুখী। প্রথমত, উচ্চ আদালতে বিচারক নিয়োগের ক্ষমতা পুনরায় প্রধানমন্ত্রীর হাতে ফিরে যাবে। সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় বিলুপ্ত হওয়ায় নিম্ন আদালতের বিচারকদের চাকরি, পদোন্নতি ও বদলির নিয়ন্ত্রণ ক্ষমতা আবারও আইন মন্ত্রণালয়ের কুক্ষিগত হলো। এর অর্থ– বিচার বিভাগ স্বাধীনভাবে কাজ করার যেটুকু সুযোগ তৈরি হয়েছিল, তা অঙ্কুরেই বিনষ্ট করে দেওয়া হলো।

সবচেয়ে ভয়ের জায়গাটি হলো মানবাধিকার কমিশনের ক্ষমতা খর্ব করা। আওয়ামী লীগের সময়ে প্রণীত ‘মানবাধিকার কমিশন আইন-২০০৯’ পুনরায় বহাল করার মানে, এ কমিশনকে আবারও একটি নখদন্তহীন বাঘে পরিণত করা। অন্তর্বর্তী সরকারের অধ্যাদেশে মানবাধিকার কমিশনকে যে স্বাধীনভাবে তদন্ত ও শাস্তি প্রদানের সুপারিশ করার ক্ষমতা দেওয়া হয়েছিল, তা কেড়ে নেওয়া হয়েছে। এখন সরকারি কর্মচারী বা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের বিরুদ্ধে মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ উঠলেও কমিশন নিজে থেকে তার তদন্ত করতে পারবে না। তারা কেবল সরকারের কাছে প্রতিবেদন চাইতে পারবে এবং শাস্তির সুপারিশ করতে পারবে। সরকার শাস্তি না দিলে কমিশনের কিছুই করার থাকবে না।

সবচেয়ে হাস্যকর দিকটি হলো, রাষ্ট্রীয় বাহিনীর বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ এলে তার তদন্তের আগে রাষ্ট্রের অনুমতি নিতে হবে। রাষ্ট্রীয় বাহিনী যখন রাষ্ট্রের পক্ষ হয়ে জনগণের বিপক্ষে অবস্থান নেয়, তখন সেই নিপীড়ন তদন্তের অনুমতি যদি সেই রাষ্ট্রের কাছ থেকেই নিতে হয়– তার ফল কী হবে, সেটা আর বলার অপেক্ষা রাখে না। যার বিরুদ্ধে চুরির অভিযোগ, তিনিই যদি সিদ্ধান্ত নেন যে তদন্ত হবে কি না; তাহলে সেই চুরি কোনোদিনও থামবে না।

গত ১৫-১৬ বছর ফ্যাসিস্ট আমলে মানবাধিকার কমিশনের যে করুণ অবস্থা আমরা দেখেছি, ঠিক সেই অন্ধকার জায়গাতেই আবার দেশকে ফিরিয়ে নেওয়া হচ্ছে। লেখক মুশতাককে যেভাবে জেলে প্রাণ দিতে হলো কিংবা শত শত মানুষকে যেভাবে গুমের শিকার ও বিনা বিচারে ধুঁকে মরতে হলো– রাষ্ট্র সেই একই রাষ্ট্রীয় অপরাধ ও গুম-খুনের প্রক্রিয়ার দিকে জাতিকে আবার ঠেলে দিচ্ছে।

রাষ্ট্রের ভেতরের বিভিন্ন সংস্থাকে জনগণের ওপর নজরদারি করার সুযোগ দেওয়া আরেকটি গভীর উদ্বেগের বিষয়। আনসার, বিজিবি বা ডিজিএফআই– যাদের মূল কাজ কাউন্টার ইন্টেলিজেন্স বা সীমান্ত রক্ষা, তাদেরকে কেন দেশের নাগরিকদের ওপর নজরদারির ক্ষমতা দেওয়া হবে? তার মানে কি রাষ্ট্র বা সরকার মনে করছে, ভবিষ্যতে আবারও মানুষকে গুম করা লাগতে পারে? আবারও বিনা বিচারে মাসের পর মাস, বছরের পর বছর রাজনৈতিক কর্মী ও সাধারণ মানুষকে জেলে আটকে রাখার প্রয়োজন হতে পারে?

দিনশেষে রাজনীতিবিদদেরই সবচেয়ে বড় মানবাধিকার কর্মী হওয়ার কথা। সেই জায়গা থেকে আমরা এখনই এই সরকারের বিরুদ্ধে রাজপথে নেমে আন্দোলন বা সরকার পতনের ডাক দিতে চাই না। জুলাই-আগস্টের গণঅভ্যুত্থানে রক্ত দিতে দিতে এদেশের মানুষ ক্লান্তও বটে।

শুক্রবার (১০ এপ্রিল) আমরা মুক্তিযুদ্ধের ঘোষণাপত্র দিবস পালন করতে গিয়ে আলোচনা করছিলাম– কীভাবে বাহাত্তরের সংবিধানের মাধ্যমে সাম্য, মানবিক মর্যাদা ও সামাজিক সুবিচারের প্রতিশ্রুতি থেকে সরে গিয়ে জাতির সঙ্গে প্রতারণা করা হয়েছিল। আমরা একই ঘটনার পুনরাবৃত্তি দেখতে পাচ্ছি জুলাই সনদের ক্ষেত্রে। যে বিষয়ে বিএনপিও আমাদের সঙ্গে ঐকমত্য পোষণ করেছিল; এখন তারাই আইনি চাতুর্যের আশ্রয় নিয়ে সেই সনদের মূল চেতনাকে পাশ কাটাতে চাইছে। মানুষের গণতান্ত্রিক অধিকার নিশ্চিত ও মর্যাদাপূর্ণ রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করা তো জরুরি। যেখানে রাষ্ট্র কোনোভাবেই জনগণের জীবনের জন্য হুমকি হয়ে উঠবে না। কিন্তু সেই মৌলিক জায়গাগুলো থেকে সরকার সরে যাচ্ছে।

সংবিধান সংস্কার সভার আইনি বৈধতা নিয়ে শুরুতেই বিএনপির প্রশ্ন তোলা প্রমাণ করে, তারা নব্বইয়ের তিন জোটের রূপরেখা যেমন নিজেরা পালন করেনি; আজকেও তারা একই ভুলের বৃত্তে ঘুরপাক খাচ্ছে। বিএনপি গত ১৭ বছর ধরে মজলুম ছিল। কিন্তু আজ তারা মজলুমের পক্ষে না থেকে জুলুমবাজদের পক্ষের শক্তি বা নিজেই জুলুমবাজ হয়ে ওঠার চেষ্টা করছে। লুটেরা, পাচারকারী ও ‘ডিপ স্টেট’-এর সুবিধাভোগীদের পক্ষে রাখতেই হয়তো তারা এই পুরনো পথে হাঁটছে। স্পষ্ট করে বলতে চাই, র‍্যাব গঠন করে বিএনপি যেমন সবচেয়ে বেশি মূল্য চুকিয়েছিল; বর্তমানে মানবাধিকার ও বিচার বিভাগের স্বাধীনতা খর্বের একই ভুল পথে হেঁটে তারা নিজেদের কবর নিজেরাই খুঁড়ছে।

আমি নিজেকে মানবাধিকার কর্মীর চেয়ে একজন রাজনৈতিক কর্মী হিসেবে পরিচয় দিতেই স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করি। তবে দিনশেষে রাজনীতিবিদদেরই সবচেয়ে বড় মানবাধিকার কর্মী হওয়ার কথা। সেই জায়গা থেকে আমরা এখনই এই সরকারের বিরুদ্ধে রাজপথে নেমে আন্দোলন বা সরকার পতনের ডাক দিতে চাই না। জুলাই-আগস্টের গণঅভ্যুত্থানে রক্ত দিতে দিতে এদেশের মানুষ ক্লান্তও বটে।

আমরা চাই সরকারের সঙ্গে দরকষাকষি করতে; সেমিনার বা মিডিয়ার মাধ্যমে চাপ প্রয়োগ করতে। যতক্ষণ পর্যন্ত এক শতাংশ সম্ভাবনাও আছে যে, সরকার তার ভুল বুঝতে পারবে, বিএনপি তার চাতুর্য থেকে বেরিয়ে এসে জনগণের ম্যান্ডেটকে সম্মান জানাবে; ততক্ষণ আমরা ধৈর্য ধরব। তারা প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন, আগামী সেশনেই এই বিষয়গুলো বিল আকারে আনা হবে। যদি তারা জনগণের আকাঙ্ক্ষা অনুযায়ী– কোনো আইনি চাতুরি না করে ৩৩টি রাজনৈতিক দলের ঐক্যমতের ভিত্তিতে বিলগুলো পাস করে, তবে আমরা সাধুবাদ জানাব। কিন্তু সরকার যদি ক্রমাগত জনগণের বিপক্ষে অবস্থান নেয়, রাষ্ট্রযন্ত্রকে ব্যবহার করে জনগণের ওপর নিপীড়ন চালানোর কাঠামোটা জিইয়ে রাখে; তবে বাধ্য হয়ে আমাদের আবারও রাজপথে নামতে হবে। জনগণের বিপক্ষের শক্তি হয়ে কোনো সরকারই টিকে থাকতে পারে না। হাসিনা সরকারের পরিণতি কী হয়েছে, তা দেখার জন্য আমাদের খুব দূরে যেতে হয় না। জনগণের সঙ্গে প্রতারণা করলে তার দায়ভার সরকারকেই নিতে হবে। আমরা এখনও আশাবাদী, সরকার তার জনবিমুখী ও আত্মঘাতী অবস্থান থেকে সরে এসে জনগণের কাঙ্ক্ষিত রাষ্ট্র বিনির্মাণে মনোযোগী হবে।

  • হাসনাত কাইয়ূম: সভাপতি, বাংলাদেশ রাষ্ট্র সংস্কার আন্দোলন

সম্পর্কিত