জাতীয় সংসদ নির্বাচন ২০২৬

ও গণভোট

ক্লিক করুন

ভারত কেন নতুন সন্ত্রাসবিরোধী কৌশলের কথা ভাবছে

লেখা:
লেখা:
শশী থারুর

প্রকাশ : ১২ মার্চ ২০২৬, ১১: ২৭
এআই জেনারেটেড ছবি

গত মাসে ভারতের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় দেশের প্রথম আনুষ্ঠানিক জাতীয় সন্ত্রাসবিরোধী নীতি ও কৌশল প্রকাশ করেছে। এর নাম দেওয়া হয়েছে ‘প্রহার’। এই ঐতিহাসিক দলিলটি প্রতিক্রিয়াশীল ও খণ্ডিত নিরাপত্তা কাঠামো থেকে সুসংগঠিত আইন-ভিত্তিক কাঠামোতে রূপান্তরের ইঙ্গিত—যা ভারতের বৈচিত্র্যময় নিরাপত্তা সংস্থাগুলোর জন্য সুসংহত পথনির্দেশিকা হিসেবে কাজ করবে।

আফগানিস্তানে সোভিয়েতদের বিরুদ্ধে ‘মুজাহিদিন’ হামলায় সাফল্য পেয়েছিল। সেই সাফল্যে উৎসাহিত হয়ে একই কৌশল নিয়ে ভারতের বিরুদ্ধে তা প্রয়োগ শুরু করে পাকিস্তান। এর পর থেকে সাড়ে তিন দশক ধরে ভারত সন্ত্রাসবাদের মোকাবিলা করে আসছে। জম্মু ও কাশ্মীর সীমান্তের ওপারের বিদ্রোহী থেকে শুরু করে বামপন্থী উগ্রবাদ এবং আল-কায়েদা ও ইসলামিক স্টেটের মতো আন্তর্জাতিক নেটওয়ার্ককে মোকাবিলা করতে হয়েছে। এর মধ্য দিয়ে সন্ত্রাসবাদের সঙ্গে ভারতের যে অভিজ্ঞতা তা অন্য যেকোনো আধুনিক গণতন্ত্রের চেয়ে বেশি বৈচিত্র্যময় ও দীর্ঘস্থায়ী।

ঐতিহাসিকভাবে ভারত স্থানীয় সামরিক প্রতিক্রিয়া, আনলফুল অ্যাক্টিভিটিজ (প্রিভেনশন) অ্যাক্টের মতো বিশেষ আইনি হাতিয়ার এবং সংস্থাভিত্তিক কাঠামোর মাধ্যমে সন্ত্রাসবাদ মোকাবিলা করেছে। গোয়েন্দা বিভাগ থেকে রাজ্য পর্যায়ের সন্ত্রাসবিরোধী স্কোয়াডসহ সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলো সাধারণত আলাদাভাবে কাজ করত। কেবল হামলার পরেই তারা তথ্য ভাগ করত। ফলে ‘শূন্য সহিষ্ণুতা’র আওয়াজের আড়ালে কোনো নিরবচ্ছিন্ন সুরক্ষাবলয় নয়, বরং তা অস্থির পরিস্থিতি তৈরি করেছিল।

‘প্রহার’ এই প্রতিক্রিয়াশীল ও বিচ্ছিন্ন কাঠামোর পরিবর্তে কাঠামোবদ্ধ দৃষ্টিকোণ প্রতিষ্ঠার লক্ষ্য নিয়েছে। এটি ভারতের বিশাল ও আলাদা আলাদাভাবে পরিচালিত নিরাপত্তা কাঠামোয় ঐক্য ও সমন্বয় নিশ্চিত করবে। বিদেশি পর্যবেক্ষকদের কাছে এটি হয়তো নিছক আমলাতান্ত্রিক একত্রীকরণ কোনো পদক্ষেপ মনে হতে পারে। কিন্তু যে দেশ ১৯৯৩ সালের মুম্বাই বোমা হামলা, ২০০১ সালের পার্লামেন্ট হামলা এবং ২০০৮ সালের মুম্বাই হামলা সহ্য করেছে, সেই দেশের জন্য এটি রাষ্ট্রের নিরাপত্তা কৌশলের চেয়ে দ্রুতগতিতে যে হুমকি বিকশিত তার বহু বিলম্বিত এক স্বীকৃতি।

প্রহার একটি হিন্দি শব্দ (স্ট্রাইক) এবং একইসঙ্গে একটি ইংরেজি আদ্যক্ষরের সংক্ষেপ। এই কাঠামোগত দর্শন সাতটি স্তম্ভকে তুলে ধরে।

সেগুলো হলো—

১. দেশের স্বার্থ ও নাগরিকদের রক্ষায় সন্ত্রাসী হামলা প্রতিরোধ।

২. প্রতিক্রিয়া হবে তাৎক্ষণিক ও আনুপাতিক।

৩. সরকারের বিভিন্ন উদ্যোগকে সমন্বয় সাধনের জন্য অভ্যন্তরীণ সক্ষমতার একত্রীকরণ।

৪. হুমকি প্রশমনে মানবাধিকার ও আইনের শাসনভিত্তিক প্রক্রিয়া।

৫. উগ্রবাদের মতো সন্ত্রাসবাদের জন্য উর্বর বা অনুকূল পরিস্থিতি দুর্বল করা

৬. বৈশ্বিক ঐকমত্য তৈরিতে আন্তর্জাতিক প্রচেষ্টার সঙ্গে সামঞ্জস্য করা বিধান

৭. সমাজের সব শ্রেণিকে কাজে লাগিয়ে পুনরুদ্ধার ও স্থিতিশীলতা অর্জন।

প্রহার কৌশল ‘সংকট-মোকাবিলা’ মডেলের পরিবর্তে ‘প্রতিরোধ-প্রথম’ কাঠামো প্রতিষ্ঠা করেছে। এই কাঠামো গোয়েন্দা-নির্দেশিত পদক্ষেপের ওপর জোর দেয় এবং একাধিক সংস্থার তাৎক্ষণিক পাওয়া তথ্য ব্যবস্থার প্রাণশক্তিতে রূপান্তরিত করেছে। একাধিক সংস্থা ও গোয়েন্দাদের জয়েন্ট টাস্ক ফোর্সের ভূমিকাকে সমন্বয় করে। এই কৌশলের উদ্দেশ্য হলো বিভাজন দূর করা এবং রাজ্য পুলিশ ও কেন্দ্রীয় সংস্থাগুলো সমন্বিত কমান্ডের অধীনে পরিচালনা নিশ্চিত করা।

সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো ভারতের যুক্তরাষ্ট্রীয় কাঠামো। ‘প্রহার’ সফল হতে হলে কেন্দ্রীয় সরকারকে প্রায় ৩০টি রাজ্য পুলিশ বাহিনীর নিবিড় সহযোগিতা নিশ্চিত করতে হবে। যাদের অনেকেরই সম্পদের ঘাটতি আছে, প্রযুক্তিগতভাবে পিছিয়ে আছে এবং স্থানীয় রাজনীতির প্রভাবে জর্জরিত।

ড্রোনভিত্তিক অনুপ্রবেশ ও এনক্রিপটেড যোগাযোগের মতো আধুনিক হুমকিও স্পষ্টভাবে মোকাবিলা এবং সংগঠিত অপরাধ ও সন্ত্রাসী নেটওয়ার্কের মধ্যে যোগসূত্রও অনুধাবন করে প্রহার। পাশাপাশি এটি প্রাথমিক প্রতিবেদন থেকে চূড়ান্ত বিচার পর্যন্ত তদন্তের প্রতিটি ধাপে আইন বিশেষজ্ঞদের মত নেয়। আর এতে আইনের শাসন কেবল কথার কথা না হয়ে পদ্ধতিগত ত্রুটির সুযোগে হাই-প্রোফাইল সন্দেহভাজনরা পার না পায় তা নিশ্চিত করে।

এই দৃষ্টিভঙ্গি সমস্যার মূল কারণকেও সামনে থেকে মোকাবিলা করে। মানবাধিকারের ওপর জোর দেওয়া ইঙ্গিত দেয় যে, কঠোর দমননীতি সন্ত্রাসী নিয়োগকারীদের প্রচারণার হাতিয়ারে পরিণত হতে পারে। এছাড়া এই দলিল ডার্ক ওয়েব, ক্রিপ্টো ওয়ালেট ও ড্রোনের মতো প্রযুক্তির সঙ্গে মিলিয়ে ‘ডিজিটাল উগ্রবাদ’-এর ক্রমবর্ধমান হুমকিতেও মনোযোগ ফেলে।

এটি এমন এক যুগ যেখানে যেকোনো একজন সন্ত্রাসী একাই ঘরের বেসমেন্টে বসে উগ্রবাদী হতে পারে, ভিন্ন ভিন্ন নেটওয়ার্কের মাধ্যমে অর্থায়ন পেতে পারে এবং দূর থেকে সহিংসতা ঘটাতে পারে। সেখানে সীমান্তের বেড়া ও শারীরিক নজরদারি যথেষ্ট নয়। নতুন কৌশল কেবল ভৌত নিরাপদ আশ্রয় নয়, আধুনিক সন্ত্রাসবাদকে টিকিয়ে রাখা ডিজিটাল ও আর্থিক বাস্তুতন্ত্রে প্রবেশাধিকার বন্ধ করার ওপরও মনোযোগ দেয়। ‘প্রহার’ এভাবে সাইবার-সন্ত্রাসবিষয়ক বৈশ্বিক আলোচনায় ভারতকে নেতৃস্থানীয় অবস্থানে রাখে এবং কীভাবে আইনি কাঠামোকে একবিংশ শতাব্দীর যুদ্ধের বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ করা যায় তা দেখায়।

প্রহার কেবল তার সামগ্রিক দৃষ্টিভঙ্গির জন্য নয়, এর প্রকাশ্য চরিত্রের জন্যও আলাদা। অতীতে ভারতের যেকোনো নিরাপত্তা কৌশল ফিসফিসানিতে আলোচিত হতো বা গোপন ম্যানুয়ালে চাপা পড়ে থাকত। কোনো রাখঢাক না করে এটি প্রকাশ করে ভারত সরকার দেশের জনগণ ও আন্তর্জাতিক সমাজকে ইঙ্গিত দিচ্ছে, তারা সমন্বিত পদক্ষেপের দৃষ্টিভঙ্গির প্রতি অঙ্গীকারবদ্ধ।

নিঃসন্দেহে ‘প্রহার’ ভারতের জন্য এক মাইলফলক। কিন্তু আট পৃষ্ঠার এক কৌশল থেকে নিরাপদ বাস্তবতার পথে অনেক বাস্তব বাধা রয়েছে। শুরুতেই, সমন্বিত পদক্ষেপের দৃষ্টিভঙ্গিকে সুনির্দিষ্টভাবে বাস্তবায়ন করতে হবে, যাতে স্বেচ্ছাচারী বিচার বা কোনো বিশেষ সম্প্রদায়কে বিচ্ছিন্ন করার আশঙ্কা না থাকে।

সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো ভারতের যুক্তরাষ্ট্রীয় কাঠামো। ‘প্রহার’ সফল হতে হলে কেন্দ্রীয় সরকারকে প্রায় ৩০টি রাজ্য পুলিশ বাহিনীর নিবিড় সহযোগিতা নিশ্চিত করতে হবে। যাদের অনেকেরই সম্পদের ঘাটতি আছে, প্রযুক্তিগতভাবে পিছিয়ে আছে এবং স্থানীয় রাজনীতির প্রভাবে জর্জরিত। এই রাজ্যগুলোতে সন্ত্রাসবিরোধী কার্যপদ্ধতি মানসম্পন্ন করা হবে একটি দুরূহ কাজ। আর এর জন্য প্রয়োজন প্রশিক্ষণ ও অবকাঠামোয় বিশাল বিনিয়োগ।

প্রকৃতপক্ষে ‘প্রহার’ হলো কৌশলগত স্পষ্টতার উদাহরণ। এটি প্রতিক্রিয়াশীল থেকে সক্রিয় অবস্থানে রূপান্তরের উদাহরণ—যা সংঘবদ্ধ অপরাধী, রাষ্ট্রীয় মদদ পাওয়া শক্তি ও ডিজিটাল নাশকতার মধ্যে যোগসূত্রকে সামনে রাখে। তবে এর সাফল্য বোঝা যাবে পত্রিকার শিরোনামে নয়, বরং সেই মানুষ আর সন্ত্রাসী হয়নি, সেই বোমা আর ফাটেনি, সেই রক্ত আর ঝরেনি— আগামী দিনের তেমন নিস্তব্ধতায়।

সর্বাধিক পঠিত

সম্পর্কিত